দীপাঞ্জন ঘটক

কেরালায় একটা হাতি মারা গেছে। ডাঙ্গায় জীবিত সবচেয়ে বড় প্রাণী। ভারতে বছরে ১০০ হাতি মেরে ফেলা একটা সাধারণ বিষয়। সাধারণ বিষয় হাতিরও মানুষ মেরে ফেলা। বছরে প্রায় ৫০০ করে। হাতি মানুষকে মারে। মানুষ হাতিকে। ফেসবুকে মানুষের বাপ-বাপান্ত হয়। কারণ শিক্ষিত সভ্য মানুষ হাতি মারে।

হ্যাঁ, মানুষ বাজিপটকার বাইরে গিয়েও হাতি মারে। ভারতে ৬০% হাতি মারা যায় ইলেকট্রিক শক খেয়ে আর ৫% হাতি মারা যায় বিষ খেয়ে।

কারা দেয়? চাষীরা। কেন দেয়? ফসল বাঁচাতে।

আমরা যারা শহুরে পশুপ্রেমী, তাদের মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক যে ফসল বাঁচাতে হাতি মারার প্রয়োজন কোথায়? একটা হাতিকে ফসল খেতে দিলে ক্ষতি কী?

না, ক্ষতি নেই। আমাদের কাছে ফসলের মূল্য নেই। কিন্তু চাষীর কাছে? চাষীর কাছে তার ফসলই তার সন্তান। মাসের পর মাস তার কায়িকশ্রম নিযুক্ত থাকে তার ক্ষেতে। সে জমি চাষে। হাল বয়। বীজ পোঁতে। সার দেয়। কীটনাশক দেয়। আগাছা ছাড়ায়। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত অবধি সে এই রোদ-জলে পড়ে থাকে। গাছ বড় হয়। ফসল জন্মায়। রাতে পালা করে চাষীরা জেগে থাকে। পাহারা দেয়। ফসল আগলায়। তারপর আসে একদল হাতি। মুহূর্তে তছনছ করে দেয় জমি। শুধু পড়ে থাকে চাষীর শ্রমের লাশ। যারা নিজের চোখের সামনে ফসলের এই অবস্থা দেখতে পারেনা, লাঠি নিয়ে ছুটে যায় হাতিদের দিকে। হাতিও ছুটে আসে মানুষটির দিকে। তারপর…

ফেসবুকে নেটিজেনরা সদ্য সন্তানরূপী ফসল বা ফসলরূপী সন্তান হারানো উন্মাদ মানুষটির হাতিদের দিকে লাঠি নিয়ে তেড়ে যাওয়া দেখে মানুষটিকে চার অক্ষরের “বোকা” বলে দেগে দেয়।

পৃথিবীতে ৮০০ কোটি মানুষ। তাই মানুষ মারা গেলে মানুষের সংখ্যা কমে না। শুধু কমে যায় একটা পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। একটা বর। একটা ছেলে। একটা বাবা।

কিন্তু মানুষের তো বনদপ্তর আছে। হাতি এলে সেখানে ফোন করলেই হয়। যেমন করে শহুরে মানুষ পুলিশকে ফোন করে বাড়িতে চোর এলে। বনদপ্তর তো চাষীদের বাজি-পটকাও দেয়।

হ্যাঁ, সত্যিই বনদপ্তর আছে। বনদপ্তর বাজিপটকাও দেয় গ্রামবাসীদের। যাতে হাতি এলে পটকা ফাটিয়ে মানুষ হাতি তাড়াতে পারে। পটকা ফাটালে সত্যিই হাতি চলে যায়। কিন্তু যে পরিমাণ পটকা গ্রামবাসীদের দেওয়া হয়, তা হাতির ক্রমাগত আক্রমণের কাছে নগন্য মাত্র। ফুরিয়ে যায়। হাতির আক্রমণ ফুরোয় না।

তাও হাতি যদি দিনের বেলা আসে, পটকা, চিৎকার, ঢোল বাজিয়ে হাতি তাড়ানো যায়। কিন্তু হাতি রাতে এলে? রোজ এলে? সারাদিন মাঠে কাটানো একটা ক্লান্ত পরিশ্রান্ত শরীর জেগে থাকতে পারবে? আপনি প্রথমদিন রেললাইনের পাশে কোনো ঘরে থাকুন। ট্রেনের যাতায়াত আপনার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দেবে। কিন্তু রোজ ঐ ঘরেই থাকতে হলে, আপনি ট্রেনের যাতায়াতের মধ্যেও ঘুমোতে বাধ্য। কারণ শরীর ঘুম চায়। যে কোনো পরিস্থিতিতে। চাষীদেরও তো তাই।

কেন আসে হাতি লোকালয়ে? কারণ জঙ্গল কমে যায়। সভ্য মানুষ জঙ্গল সাফ করে নগর পত্তন করে৷ খান্ডব দহন চলে এভাবেই। মানেকারা চুপ থাকে। মন্ত্রী হয়েও চুপ থাকে। কারণ তারা পশুপ্রেমী। পশু হত্যায় তাদের আপত্তি, জঙ্গল হত্যায় নয়। তারা হিউম্যান ফর অ্যানিম্যাল, হিউম্যান ফর ফরেস্ট নয়। মানুষ শুধু অক্সিজেন আর বৃষ্টিপাতের মাত্রা ঠিক রাখার জন্য গাছ কাটাকে আটকাতে চায়। প্রাণীদের বাসস্থান আর খাদ্যসুরক্ষা রক্ষার্থে নয়।

বিদ্যুৎ আসার আগে মানুষ রাতে জমির চারপাশে আগুন জ্বালিয়ে রাখত। এখন বিদ্যুতের তার জড়িয়ে রাখে। বিষ মেশানো খাবার ফেলে রাখে। আগেও রাখত। কারণ সে ফসল বাঁচাতে চায়। ফসল বিক্রির টাকায় সে নিজেকে বাঁচাতে চায়। বাঁচাতে চায় নিজের পরিবারকে।

প্রকৃতি সব প্রাণীকে দুটো মন্ত্র দিয়ে পৃথিবীতে ছেড়ে দিয়েছে – বাঁচো আর বংশবৃদ্ধি করো। পৃথিবীর সব প্রাণীর লক্ষ্য ঐ দুটোই। আমরা যতই ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু সত্যিটা হল, মানুষও প্রাণীই। বাঁচতে তাকেও হয়। তখন সে অন্যদের বাঁচানোর কথা ভাবেনা। পৃথিবীর সব চাষী যদি একসাথে ফসল ফলানো বন্ধ করে দেয়, বাঁচার জন্য পৃথিবীর সব পশুপ্রেমী মানুষ পশু মেরে মাংস খেতে শুরু করবে। পৃথিবীর সব মা-বাবা সেই মাংস তুলে দেবে তাদের সন্তানের মুখে। পৃথিবীর সব মানেকারা এভাবেই বাঁচিয়ে রাখতে চাইবে পৃথিবীর সব বরুণদের।

হাতি মৃত্যুর ৬৫% কারণ হিসেবে তাই অনায়াসেই দেগে দেওয়া যায় চাষীদের আর বাকি ৩৫% তো ট্রেনলাইন আর হাতির দাঁত। আফ্রিকার জঙ্গলগুলোর ভেতর ট্রেন নেই। হাতি আছে। দাঁতাল হাতি। টাস্কার। ভারতেও তাই। মানেকা গান্ধী যে পুরুষ হাতি কমে যাওয়ার কথা বলেছেন তাঁর ভিডিওটিতে, সেই দাঁতাল পুরুষ হাতি শুধুমাত্র দাঁতের জন্যই প্রাণ দেয়। আফ্রিকায় প্রতিবছর দশ থেকে পনেরো হাজার হাতি হত্যা হয় এই দাঁতের জন্য। হাতিদের সংসারে পুরুষেরা কমে যায় এভাবেই। শুধু মেয়ে হাতি একা একা মা হতে পারেনা। তাই কমে যায় হাতিদের বংশবৃদ্ধি।

কারা কেনে এই হাতির দাঁতের জিনিস? ফেসবুকে লাঠি নিয়ে চাষীর হাতির দিকে তেড়ে যাওয়া ভিডিও দেখে চার অক্ষরের “বোকা” বলা লোকটি। যাকে সরকার যদি বলে, আপনার অফিস হাতি যদি ভেঙে দেয়, তাহলে যদ্দিন না আপনার অফিসঘর মেরামত হচ্ছে তদ্দিন আপনার বেতন বন্ধ থাকবে। সেই লোকটি। যে লোকটি নতুন অফিস তৈরির পর নিজের বেতন বাঁচাতে সবার আগে অফিসের চারপাশে বিদ্যুতের তার লাগিয়ে দেবে, সেই লোকটি।

পশুপ্রেমীরা আজ অবধি সিসিটিভি ক্যামেরা, স্বল্প ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুতের তার বাদ দিয়ে কোনো সুরাহা দিতে পারেনি চাষীদের। সিসিটিভি বা স্বল্প ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুতের তারে হাতি আর বশ মানেনা। আরেকটু বাড়তি হিসেবে জমির চারপাশে ট্রাঙ্কুইলাইজার হাতে ধরা গার্ড রাখলে ফসলের প্রোডাকশন কস্ট যা বাড়বে, তা ফেসবুকে হাতির ভিডিও দেখা লোকটি দিতে চাইবেনা।

ভিডিও দেখা লোকগুলো আবার ট্রেন লাইনে শুয়ে পড়ে ট্রেনও আটকাতে পারবেনা। বলতে পারবেনা যে হাতিদের জন্য আন্ডারপাস বানাতে হবে, নইলে ট্রেন চলবেনা। বলতে গেলেই, আরপিএফের তরফ থেকে জুটবে জামাই আদর। তখন সেই ভিডিও মোবাইলে দেখে তাদের চার অক্ষরের “বোকা” বলবে কিছু লোক। কেউ বলবে “এসব নকশালদের জঙ্গি আন্দোলন। রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে রুখে দেওয়ার চেষ্টা।” যেমন এখন হত্যাকারীদের ধর্ম খোঁজার চেষ্টা চলছে। চেষ্টা চলছে রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্ধারণের। এই রাজনীতি মানুষের নূন্যতম চাহিদার বাইরে গিয়ে মানুষের অর্থনীতির জন্ম দেয়। অর্থনীতি জন্ম দেয় নতুন রাজনৈতিক ধারার।

হাতি মৃত্যুর আরেকটি বড় কারণ হলো ব্যক্তিগত বা মন্দিরের মালিকানায় থাকা হাতি সঠিক পরিচর্যা পায় না। অত্যাচারিত হয়। হাতি মৃত্যুর পর এক সাক্ষাৎকারে মানেকা গান্ধী কেরালা সরকারকে ব্যক্তিগত বা মন্দিরের মালিকানা থেকে হাতিদের রক্ষা করার জন্য আইন প্রণয়ন করতে বলছেন। এটাতো শুধু কেরালার বিষয় নয়। ভারতের বহু রাজ্যে ব্যক্তিগত বা মন্দিরের মালিকানায় হাতি ও অন্যান্য অনেক প্রাণী আছে। মানেকা গান্ধী নিজে ৩ বারের সরকারের অংশ। কেরালা সরকারকে আইন না করতে বলে নিজের সরকারকে এমন আইন আনার জন্য চাপ দিলেই তো পারেন। ৭ বছর ধরে সুপ্রিম কোর্টে কেস না চালিয়ে গত ৬ বছরে নিজেই তো আইন আনতে পারতেন। এভাবে নিজেদের পিঠ বাঁচানোর দায় মানেকাদের নিতেই হবে।

দায় নিতে হবে নাগরিক মানুষদের সকলকে। ভাইরাল একটি ভিডিওতে আপনি দেখবেন, একটা অজগর একটা হরিণকে ধরে খেতে যাচ্ছে। সেখানে পাশ থেকে একটা মানুষ একটা গাছের ডাল দিয়ে আঘাত করে করে অজগরটিকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিল এবং হরিণটিকে বাঁচালো। এই হরিণ বাঁচানোর মধ্যে নূন্যতম গর্ববোধ নেই। উল্টে খাদ্যশৃঙ্খলে একটি প্রাণীকে অভুক্ত রেখে তাকে মৃত্যু মুখে ঠেলে দেওয়ার অপরাধ আছে। অজগর দেখতে ভয়ঙ্কর আর শক্তিশালী বলে আপনি তাকে অভুক্ত রাখবেন আর হরিণ দেখতে সুন্দর আর দুর্বল বলে আপনি তাকে বাঁচাবেন, এটা প্রাণীজগতের নিয়ম নয়। মানুষকে প্রকৃতি পৃথিবীর বাইরে থেকে এনে পৃথিবীর যাবতীয় শক্তিধর প্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খলে বাধা হয়ে নিরীহ প্রাণীদের বাঁচানোর দায়িত্ব দেয়নি। মানুষও এই খাদ্যশৃঙ্খলেরই অংশ। এটা মানুষকে বুঝতে হবে। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা মানুষ এই বিষয়টা বোঝে। তাই আদিবাসীরা শিকার উৎসব পালন করে প্রতিবছর। কিন্তু তার জন্য তারা নূন্যতম অপরাধবোধে ভোগেনা৷ আফ্রিকার বহু অধিবাসীরা কুমির মেরে কুমিরের মাংস খায়। সেখানে তাদের অপরাধবোধ কাজ করেনা। এটা তাদের বেঁচে থাকার অংশ। যাবতীয় অপরাধবোধ কাজ করে নাগরিক মানুষের মধ্যে।

নাগরিক মানুষ ঠিক এখানেই আর প্রাণী থাকেনা। মানুষ হয়ে ওঠে। তার পরিবেশ হয়ে ওঠে বিষাক্ত। তাই তাকে হাঁটতে হয় পরিবেশ দিবসের মিছিলে। জঙ্গল অধিবাসী সহ অন্যান্য সকল প্রাণীদের রাজনীতি নেই। ফলে তাদের পরিবেশ দিবসও নেই।

37