লক্ষ্যের কাছাকাছি

অপর্ণা চক্রবর্তী

যেন বলছে,”আয়,আমার কাছে আয়”।
আজকের পথটি দীর্ঘ ও বিপদময়।

পাহাড়কে ভালবেসে যারা পাহাড়ে যায় তাদের কাছে যে কোন শৃঙ্গ অভিযানে যাওয়াটাই গর্বের। আমরা অর্থাৎ HMTA-এর সদস্য-সদস্যাগণও এমন একটি অভিযানের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তার কারণ একটাই,পাহাড় সবসময় পাহাড়প্রেমীদের হাতছানি দেয়। আমাদের প্রিয় পাহাড়ি সংস্থা হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ার্স অ্যান্ড ট্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন ২০১৮ সালের মে মাসে ৬৫১২ মিটার উঁচু ভাগীরথী-২ শৃঙ্গ অভিযানে যাওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করে।তারপর থেকেই মনের মধ্যে শুরু হয় যাওয়ার প্রস্তুতি।সংস্থা থেকে ঠিক করা হয় অভিযানের রুট ম্যাপ। অভিযানের জন্য সংস্থার ৬জন সদস্য-সদস্যাদের নিয়ে তৈরী করা হয় দল।টিম লিডার মনতোষ বিশ্বাস,তরুণ সরকার,আঞ্জুমণ আলি আখতার, নিলাদ্রী সিনহা,শঙ্কর ধর এবং আমি অপর্ণা চক্রবর্তী।

যাত্রা শুরুর প্রাকমুহুর্তে

২রা সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে উত্তর দিনাজপুর প্রেসক্লাবে Flag Off অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় আমাদের যাত্রা। শুরু হয় অভিযানের। বিশিষ্ট পর্বতারোহী রতনলাল বিশ্বাস দেশের জাতীয় পতাকা এবং সংস্থার পতাকা তুলে দেন অভিযাত্রীদের হাতে। সংস্থার সাহায্যে আর্থিক ও নানা রকম বাধা বিপত্তিকে জয় করে আমরা অভিযানে যেতে সক্ষম হলাম।

৪ঠা সেপ্টেম্বর—সকলের শুভকামনা ও একরাশ ভালোবাসা নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম ভাগীরথী২ শৃঙ্গ জয়ের পথে।বুকের ভেতর তখন আশা-আকাঙ্ক্ষার অজস্র ঢেউ আছড়ে পড়ছে।ট্রেনে পৌঁছলাম কলকাতা। সেখানে আমাদের টিম লিডার মনতোষ আর ওর স্ত্রী রুপালি অপেক্ষা করছিলো আমাদের জন্য।রুপালি আমাদের জন্য নিয়ে এসেছিলো অনেক খাবারদাবার আর অকুন্ঠ শুভেচ্ছা।ভাবতেই অবাক লাগে যে এই প্রাণোচ্ছল মেয়েটা আজ আর আমাদের মধ্যে নেই।

হার কে আগে জিতে হ্যায়

কলকাতা থেকে আমরা পৌঁছলাম হরিদ্বার। সেখান থেকে ছোট গাড়ি করে উত্তরকাশী হয়ে পৌছালাম গঙ্গোত্রী। কিন্তু তখনও আমাদের অভিযানে যাওয়ার পারমিশন আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়নি। যাই হোক অবশেষে আমরা যাওয়ার পারমিশন পেয়ে গেলাম।

১১ই সেপ্টেম্বর—আমরা জয়ের উল্লাসে গঙ্গোত্রী থেকে রওনা হলাম ভাগীরথীর উদ্দেশে। প্রথম দিন আমরা ১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে চিরবাসা হয়ে পৌঁছালাম ভুজবাসা।গঙ্গাকে ডানদিকে রেখে আমরা অভিযানের পথে এগিয়ে চললাম। এখানেই আমাদের সাথে যোগ দিল ১২জন পোর্টার, ২জন হ্যাপ ও গাইড সরবনজি। সরবনজি সারা অভিযানে আমাদের সাথে সহযোগিতা করেছেন।

পরের দিন,12ই সেপ্টেম্বর—এদিন আমরা রওনা হলাম আমাদের বেস ক্যাম্প নন্দন বনের উদ্দেশ্যে। সেই দিনের পথটি ছিল বেশ বিপদজনক।আমরা গোমুখ,গঙ্গোত্রী হিমবাহ পার হয়ে নন্দন বনে যাব। ১৯৯৮ সালে আমি প্রথমবার গোমুখকে দেখেছিলাম।এখন আবার দেখে মন খারাপ হয়ে গেলো। আজ আর গোমুখ সেই তখনকার মত নেই।সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। প্রকৃতি প্রতিমুহূর্তে পরিবর্তন হচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে একটা সময়ে আমরা হয়তো আর গোমুখকে খুঁজেই পাবোনা।এসবই বিশ্ব উষ্ণায়নের কুফল।

বরফে প্রায় ঢেকে গেছে টেন্ট

আমাদের যাওয়ার পথে আমরা দেখতে পেলাম ভাগীরথী ১,২,ও ৩ শৃঙ্গেরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ি আছে। মনে হচ্ছে যেন আমাদের ডাকছে মাথা তুলে। যেন বলছে,”আয়,আমার কাছে আয়”।
আজকের পথটি দীর্ঘ ও বিপদময়।ভুজবাসা থেকে গোমুখের রাস্তা বেশ কঠিন। বেশ কয়েকবার আমাদের চড়াই-উৎরাই করতে হলো।গো মুখের দিয়ে উঠে পড়লাম গঙ্গোত্রী হিমবাহে। এই গঙ্গোত্রী হিমবাহ ও চৌখাম্বা হিমবাহের পাদদেশও ক্রমশ ছোট হয়ে চলেছে।বেশ কিছুটা যাবার পর দেখতে পেলাম নয়নাভিরাম দৃশ্য।পূর্ব দিকে ভাগিরথী পর্বতমালা ও নন্দনবন।আর পশ্চিমদিকে শিবলিঙ্গ পর্বত ও তপোবন।হিমবাহের বাঁদিকে দেখতে পেলাম রক্তবরণ হিমবাহ।আরো কিছুটা আসার পর চতুরঙ্গী হিমবাহকে বাঁপাশে রেখে আমরা গঙ্গোত্রী হিমবাহ ছেড়ে উপরে উঠতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম নন্দনবনে।ফিরে পেলাম সেই অনেকদিন আগের দেখা নন্দনবনকে। নন্দনবনের শোভা অতুলনীয়। প্রকৃতি যেন তার সমস্ত সৌন্দর্য ঢেলে দিয়ে তৈরি করেছে নন্দনবনকে। পাহাড়ের মাথার ওপর অনন্ত,বিশাল গাঢ় নীল আকাশ।আকাশের বিশালতা, উন্মূক্ততা দেখতে হলে, মুক্ত মনকে আবিস্কার করতে হলে এখানে অন্তত একবার আসা উচিত।মনে মনেই গেয়ে উঠলাম “এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়…”।প্রকৃতির এই অপরূপ রূপ মনকে কল্পনায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবেই যাবে।যাই হোক ছোট একটি নালার পাশেই আমাদের টেন্ট লাগানো হলো। এখন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিরাট শিবলিঙ্গ পর্বতমালা। যেন বলছে “কাছে আয়।”

দুর্গম পথ পেরিয়ে

12 ই সেপ্টেম্বর— আমরা খুব অল্প হেঁটেই পৌঁছে গেলাম ৪৮৯৬ মিটার উঁচু এবিসি অর্থাৎ অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্পে।এখানে আমাদের বেশ কয়েকদিন থাকতে হবে। এখান থেকেই শুরু হবে অভিযানের যাবতীয় কার্যকলাপ। পোর্টাররা আমাদের মালপত্র নামিয়ে দিয়ে গেল।ওরা সেইদিনই পৌঁছে যাবে গঙ্গোত্রী। আমাদের যেখানে টেন্ট লাগানো হলো সেই জায়গাটা ছিল বেশ চওড়া। আর তার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটা ছোট নালা। আমাদের থেকে কিছুটা দূরেই পাহাড়ে ওঠার চড়াই শুরু। আমাদের ক্যাম্পের ডানদিকে ভাগিরথী-২শৃঙ্গ। আর তার কিছুটা বাঁপাশে ভাগিরথী-১ ও ভাগীরথী শৃঙ্গ।তার কিছুটা বাঁপাশে বাসুকি পর্বত আর আমাদের ক্যাম্পের ঠিক পেছনে চতুরঙ্গী হিমবাহ। চারদিক ঘিরে রয়েছে নাম না জানা অনেক শৃঙ্গ। আমরা খুব তাড়াতাড়ি এবিসিতে পৌঁছে গিয়েছিলাম।কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে চা জলখাবার খেয়ে আমরা যে দিকে উঠে যাব সেই দিকে কিছুটা হাঁটতে গেলাম। ঘন্টা দুয়েক পরে ফিরে এসে আমরা লাঞ্চ করলাম। তারপর চারিদিকের অনন্য সৌন্দর্য দেখে আর গল্পগুজব করে সেদিনটা পেরিয়ে গেল। পরদিন সকাল থেকে শুরু হলো নরম বরফের আস্তরণ দিয়ে। তবে রোদ উঠতেই গলে গেলো বরফের পাতলা আস্তরণ।কিন্তু একটু বেলা বাড়তেই বাতাস বইতে শুরু করল। চারিদিকে সাদা মেঘের খেলা শুরু হয়ে গেল। উপরে যাওয়ার আগে আমরা তিনদিন এবিসিতে থাকবো আবহাওয়ার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার জন্য। আমরা বারবার ওই রাস্তা দিয়ে উঠবো নামব।

দ্বিতীয়দিন আমরা আমাদের ইক্যুইপমেন্টগুলো পরে একবার নিজেদের ঝালিয়ে নিলাম।

তৃতীয় দিন আমরা নিজের নিজের মালপত্র নিয়ে ক্যাম্প-১এর দিকে এগোলাম।তারপর ক্যাম্প-১এ পৌঁছে আমরা যে যার মালপত্র সেখানে রেখে এলাম।পরের দিন আমাদের ক্যাম্প-১এ পৌঁছানোর পালা। আমরা সেই দিন রাত্রে সবাই মিলে আলোচনা করলাম যে সবাই আমরা ভাগিরথী২ শৃঙ্গ আরোহন করতে যাব।কিন্তু আমাদের গাইড সরবনজি আমাদের বললেন যে,সবাই মিলে গেলে সামিট করা যাবেনা। তখন আমাদের নিজের আমাদের লিডার মনোতোষ বিশ্বাস বলল, “আমি যাব না।”আমিও চিন্তা করলাম যে আমিও বাদ যাই। কারণ একজনও যদি সামিট করে তাহলেই পুরো দলের জয়। আর সবচেয়ে বড় কথা আমাদের সংস্থার জয়। সামিট করা যথেষ্ট কঠিন।কারন ক্যাম্প-২ থেকে সামিট পর্যন্ত পুরোটাই জুমারিং করে যেতে হবে। আমাদের মধ্যে কেউ যদি মাঝপথে থেমে যায় তাহলে পুরো দলটাই থেমে যাবে।এত প্রতিবন্ধকতার সাথে লড়াই করে,এত কষ্ট করে এতদূর এসেও যদি সামিট না করা যায় তাহলে তার থেকে যন্ত্রণার আর কিছু হবে না।মনে কষ্ট চেপেও বললাম ,”আমি থেকে যাচ্ছি”। শেষে তরুণ সরকার,আঞ্জুমণ আলি আখতার,নিলাদ্রি সিনহা ও শঙ্কর ধর-এই চারজনকে পাঠানো হলো সামিট করার জন্য।মনটা খুব খারাপ লাগছিল আমি যেতে পারছিনা জন্য। কিন্তু মনে একটা আনন্দও ছিল যে আমার সহযাত্রীরা নিশ্চই সামিট করে ফিরবে। যাই হোক সেদিন রাত্রে খাওয়া দাওয়া করে আমরা সবাই শুয়ে পড়লাম।পরদিন ভোরে সবাই উঠে পড়লাম।দলের চারজন সদস্য,গাইড আর দুজন হ্যাপ তৈরি হয়ে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়ল।আমরা ওদেরকে কিছুটা এগিয়ে দিয়ে আসলাম। ( ক্রমশঃ)

দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন আগামী ৮ ই জুন, সোমবার।