সুরাহা

নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত

***************

প্রাচীন পাকুড় গাছটার গুঁড়িতে বসে আকাশপাতাল ভাবছিলো  কাজল।তাদের জীবনটা যেন যানজটে আটকে পড়া বাস-ট্যাক্সির মতো সহসা থমকে গেছে।এই জট কবে খুলবে সে জানেনা।আজ থেকে এ জেলার প্রায় সব দোকান খুলে যাওয়ার কথা। খুলেছেও অনেকগুলো।সে আশায় ছিলো তারাও  তাদের অস্থায়ী দোকান নিয়ে বসতে পারবে।বাজারের কাছে রাস্তার ধার ঘেঁষে ওরা চা ও তেলেভাজা নিয়ে বসে।প্রতিদিন বিকেলে ওরা স্বামী-স্ত্রী মিলে দোকান চালায়।তেলেভাজাটা বেশ ভালোই বানায় তাপসী। বিক্রিবাটা ভালোই হয়।কাজল প্রধানত চা তৈরি করে।সে দোকান আজ প্রায় দেড়মাস বন্ধ। দোকানটা নিয়ে বসা গেলে আর অন্যের দয়ার দানে দিন গুজরান করতে হোতো না তাদের। কিন্তু  দোকান বসাতে গেলে পুলিশ বাঁধা দেয়।ফুটপাতের দোকান নাকি খোলার অনুমতি নেই।লক ডাউন উঠে না যাওয়া পর্যন্ত দোকান বন্ধই রাখতে হবে তাদের।কথাটা শুনে ডুকরে কেঁদে উঠেছিলো তাপসী। কাজলের চোখও ভিজে উঠেছিল।কিন্তু সে তো পুরুষ মানুষ।অসহায় ক্রোধে মুখ খিস্তি করে সরকারকে এক কিস্তি গালাগাল দিয়ে সে দোকানের ভার নিয়ে বাড়ির পথ ধরেছিলো।

জমানো টাকা কবেই ফুরিয়ে গেছে।সরকারি বেসরকারি  অনুদানে আধপেটা খেয়ে বা না খেয়ে দিন চললেও,রাত কাটতে চায় না।তখন মেয়ের চিন্তা দুই স্বামীস্ত্রীকে পেয়ে বসে।

একটাই সন্তান ওদের।রিংকি। খুব ছোটো বেলা থেকেই মেয়েটার লেখাপড়ায় বেশ আগ্রহ।ছেলে নেই তো কী হয়েছে?  মেয়েকেই ওরা ছেলের মতো করে মানুষ করবে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় বেশ ভালো ফল করেছে মেয়েটা।

সেই মেয়েই একদিন নার্সিং ট্রেনিংয়ে যাবে বলে বায়না ধরলো।ওর সহপাঠিনী আরো কয়েকজন  নাকি নার্সের ট্রেনিংয়ে যাচ্ছে। মেয়ের আবদারে ওকে নার্সিং শিখতে বেঙ্গালুরু যেতে দিতে বাধ্য হয়েছে ওরা। ওদের পাড়ার নারায়ণ বাবুর মেয়েও সেখানে নার্সিং পড়ে।সেই ভরসাতেই  মেয়ের কথায় ওরা মত দিয়েছে।সেখান থেকে তিন-সাড়েতিন বছর পর পাশ করে বেরোলে সরকারি চাকুরি একেবারে পাকা।তার জন্য কোনো নেতাকে ধরাধরি করতে বা খুশি করতে হবেনা।ভবিষ্যতের স্বপ্ন ওদের দু’চোখে রেশমি সুতোয় ঝুলছিলো।হঠাৎ এক দুঃস্বপ্ন —লকডাউন।

বিকেলে তপন মাস্টারের বাড়িতে টিভির খবর দেখতে গিয়েছিলো কাজল।খবর শুনে টলতে টলতে বাড়ি ফিরে মাটির উঁচু বারান্দায় থপ্ করে বসে পড়েছিলো সে।

: কী হোলো রে? কী হোলো তোর?উদ্বিগ্ন প্রশ্ন বৃদ্ধ উমেশ হাজরার। 

: আরো চোদ্দো দিন।মুখেনাকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে কাজল।

: চোদ্দো দিন! কীসের চোদ্দো দিন?

: লক ডাউন।

:  আরো চোদ্দো দিন! বলে হাঁপাতে হাঁপাতে   বসে পড়ে বুড়োও।তার শরীরের জীর্ণ কাঠামোয় হাঁপানির রাজত্ব। তার ওষুধ– ইনহেলার ও ট্যাবলেট ফুরিয়ে এসেছে। ছেলের আয় উপার্জন নেই।নিজের চোখেই তো দেখতে  পাচ্ছে। কী ভাবে ওষুধ কেনার টাকা চাইবে তার কাছে? শুধু কি তাই?ওষুধের দোকান তো শহরে আর শহর এখান থেকে সাত-আট কিলোমিটার দূরে।পুরোনো যে লজঝড় বাসটা বৃদ্ধ  উমেশ হাজরার মতো ধুঁকতে ধুঁকতে আপন অঙ্গের ঝাঁকুনিতে পথঘাট কাঁপাতে কাঁপাতে দিনে দুবার শহর থেকে বাংলাদেশ সীমান্তের এই গ্রামে যাতায়াত করতো সেটিও লকডাউনের কারণে গ্যারেজবন্দি।বাসের খালাসি বিপিন দাস বরাবর তাকে শহর থেকে ওষুধপাতি এনে দেয়।।এই ভাঙাচোরা রাস্তায় অটো-টোটোও বড় একটা চলে না।ভরসা একমাত্র  সাইকেল।ওরা বাপবেটার কেউ সাইকেল চালাতেই জানে না।জানতো রিংকি। সে তো কোন দূরদেশে আটকে পড়ে আছে।কে বুড়োকে ওষুধ এনে দেবে?   

পাড়ার হরি বর্মণকে অনুরোধ করেছিলো উমেশ। সে রাজি হয়নি।বলেছিলো : না,কাকা,যাওয়া যাবেনা। পুলিশে মারবে।মহা আতান্তরে পড়ে আছে বুড়ো।ঘোমটা মাথায় তাপসীকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে অতি কষ্টে উঠে দাঁড়ায় সে।হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের ঘরে চলে যায়।

: সরকারের দেওয়া বিনি পয়সার চাল তো ফুরিয়ে এলো।কী করে চলবে আরো চোদ্দো দিন?

: জানি না।আমি কিচ্ছু জানি না।

: শুনছি মনোজদাদের ক্লাব থেকে চাল-ডাল-নুন-তেল দেওয়া হচ্ছে। যাবো?

: যাবে? যাও।আমি যাবো না।এভাবে হাত পেতে কারো কাছ থেকে কিছু নিতে আমার বড় লজ্জা করে।

: লজ্জা ধুয়ে জল খাও। মুখ ঝামটা দিয়ে বলে তাপসী। এভাবে বলা তার স্বভাব নয়।তাই লজ্জা  পেয়ে মাথা নীচু করে নরম কণ্ঠে বলে : সে তো না হয় দুটো দানাপানির ব্যবস্থা হোলো,বাবার ওষুধপাতির কী হবে? ওসব ওষুধের তো অনেক দাম। হাসপাতাল থেকে তো বিনি পয়সায় দেয়,তাই না?

: থাকলে দেবে।অধিকাংশ সময় তো থাকেই না। হাসপাতালে যাবেই বা কীভাবে?  গাড়ি ঘোড়া তো কিছুই চলছে না।।তাছাড়া…. ও থামতেই ওর দিকে প্রতীক্ষার চোখ মেলে ধরে বসে থাকে তাপসী। 

: এ সময় বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে নির্ঘাত খোয়ারে ঢুকিয়ে দেবে।

: ধ্যাৎ,কী যে বলো না! তোমার হুঁশ আক্কেল খুব কম।বাবা কি দড়িছেঁড়া গোরু যে খোয়ারে দেবে!

: আরে এখন তো মানুষের জন্যেও খোয়ার হয়েছে।ওই যে কলকাতা থেকে আসতেই শঙ্করীর বাবাকে যেখানে নিয়ে গেছে।চোদ্দো দিন নাকি সেখানেই থাকতে হবে।কোরানটিন না কী যেন নাম!সে তো এক রকম খোয়ারই নাকি?

: তাই বা মন্দ কী? দুবেলা পেটপুরে খাওয়া তো জুটবে।বলতে বলতে হোঁচট খায় তাপসী। শ্বশুর উমেশ হাজরা তার পেছনে দাঁড়িয়ে খক্ করে কেশে উঠলো।

: বাবা,আপনি!      

     তাপসীর কথার জবাব না দিয়ে বুড়ো ছেলের দিকে তাকিয়ে বললে : সুজয়দের বাড়ি থেকে দুটো বাসকপাতা এনে দেতো কাজল।ছেঁচে রস করে খেয়ে দেখি কাশিটা কমে কিনা।কাল থেকে কাশিটা বড্ডো বেড়েছে।

: আনছি।তুমি বসো গিয়ে।

কাশতে কাশতে আর হাঁপাতে হাঁপাতে উমেশ চলে যায়।তাপসী বলে : বাবা শুনতে পায়নি তো?

: পায়নি আবার! তোমার যা গলা।

: তুমি তো কেবল আমার গলাটাই শোনো…

আশঙ্কিত কাজল বউকে বেশি কিছু বলতে না দেবার জন্য সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে: ঠিক

আছে,ঠিক আছে।যাই বাবার জন্য বাসক পাতা নিয়ে আসি।বলে অকারণ ব্যস্ততায় বেরিয়ে যায়।       

সেদিন রাতে পাড়ার ক্লাবের দেয়া চিড়ে গুড় খেয়ে ওরা তিনজনই শুয়ে পড়েছিলো।উমেশের চোখে ঘুম নেই।খক্ খক্ কাশি আর হাঁপানির চোটে রাত কাবার প্রায়।ঘুম ছিল না তাপসী-কাজলের চোখেও। লকডাউনে নার্সিং কলেজ বন্ধ। হস্টেলও বন্ধ।যানবাহনও চলছে না।এমাসে টাকাও পাঠাতে পারেনি  মেয়েকে। ওদের ফোন নেই।চৌধুরীদের বাড়িতে ফোন করে মেয়ে।প্রয়োজনে ওদের বাড়ি গিয়ে মেয়ের কথা শোনে।নইলে চৌধুরীগিন্নি নিজে এসে মেয়ের খবর দেয়।মেয়ের জন্যে বড়ো উদ্বেগে দিন কাটছে দুই স্বামী-স্ত্রীর।কেমন করে যে দিন কাটছে মেয়েটার!ঘুম ওদের চোখের ছায়া মাড়ায় না সহজে।

  ভোরের দিকে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলো দুজনেই। ঘুম ভাঙতে ভাঙতে বেলা প্রায় ন’টা।বুড়োর ঘরের দরজা তখনও ভেজানো।তার    কোনো সাড়াশব্দ নেই।বাসকপাতার রস গরম করে খেয়ে হয়তো ভোরের দিকে কাশির উপশম হয়েছে। আহা,ঘুমোক। যতক্ষণ পারে ঘুমোক। 

      দেখতে দেখতে বেলা প্রায় দশটা।কী ভেবে বুড়োর ঘরের দরজায় ঠেলা মারে তাপসী।এ কী! বিছানায় তো কেউ নেই! 

প্রথমে ব্যাপারটাকে পাত্তা দেয়নি কাজল। আছে, আশেপাশে কোথাও আছে। অবশেষে তারও কেমন সন্দেহ হয়।বুড়ো হাঁটতে হাঁটতে মেয়ের বাড়ি চলে যায় নি তো?

উমেশের একমাত্র মেয়ে সুজলার বিয়ে হয়েছে ভাসিডাঙায়।এখান থেকে তিন-সাড়েতিন কিলোমিটার দূরে।কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ হঠাৎ মেয়ে বাড়ি চলে যাওয়ার বদ অভ্যাস আছে বুড়োর।নিষেধ করলেও শোনে না।কাজল বুঝিয়ে বলেছে,ওদের অভাবের সংসার।হুটহাট যেও না বাবা।সুজলা হয়তো খুশিই হবে।কিন্তু অজয়?

    নিষেধ শোনেনি উমেশ।তবে মেয়ের বাড়িতে বেশিক্ষণ থাকে না। কিছু খায়ও না।বড়জোর এক কাপ লাল চা আর সামান্য মুড়ি। জোর করেই খাওয়াতে হয়।বুড়ো নিশ্চয়ই দুপুর হতে হতে ফিরে আসবে।নিশ্চিন্ত হয় তাপসী ও কাজল।

: বলে গেলে যে কী হয়? বিরক্তি প্রকাশ করে তাপসী।

: আমরা তো আজ বেলা করে উঠেছি। তাই হয়তো……

এমন সময় ওদের সব অনুমান মিথ্যে প্রমাণ করে একটা জিপ এসে দাঁড়ালো ওদের বাড়ির সামনে।

ওদের মতো হত দরিদ্রের বাড়িতে জিপ আসায় বেশ অবাকই হয়েছিল কাজল ও তাপসী।জিপে দুজন——একজন সিভিক পুলিশ, অন্যজন স্বাস্থ্যকর্মী।দুজনই কাজলের সামান্য পরিচিত। 

: চলুন দাদা।

:কোথায়?আশঙ্কিত কাজলের প্রশ্ন।

:স্বাস্থ্যকেন্দ্রে,মানে হাসপাতালে।

:কেন?হাসপাতালে কেন?

:আরে,আপনার বাবা সেখানে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।

:কেন কী হয়েছে বাবার?কাজল ও তাপসীর আতঙ্কিত প্রশ্ন।

: আরে,চলুন না! গেলেই দেখতে পাবেন।

সারাদিন পেটে দানাপানি কিছু পড়ে নি।তার উপর  সকাল থেকে হাঁপানির রোগী বুড়োবাপটা নিরুদ্দেশ। তারও আহার জোটে নি নিশ্চয়ই।বুড়ো কিছু করে বসলো কিনা সেই আশঙ্কায় ওরা শশব্যস্ত হয়ে জিপে গিয়ে বসলো।

জিপ এসে যেখানে থামলো সেটা তো হাসপাতাল নয়।কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই জানালা দিয়ে চোখে পড়লো বুড়ো উমেশ হাজরা একটা খাটিয়ায় নিশ্চিন্ত বসে আছে।

ওরা অনুমতি নিয়ে কোয়ারান্টিনে প্রবেশ করলো।

: বাবা,তুমি এখানে!

: হ্যাঁ ব্যাটা।আমার জ্বর,সর্দি, কাশি,শ্বাসকষ্ট, গায়ে ব্যথা শুনেই ডাক্তারবাবু তড়িঘড়ি এখানে পাঠিয়ে দিলে।আর তোদেরও চোদ্দো দিন এখানে থাকার হুকুম জারি করে দিলেন।দুহপ্তা দুবেলা পেটপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা তো হোলো,কী বলিস?

ওরা দুই স্বামী-স্ত্রী তো হতবাক।

231