বাংলা ছোটোগল্পে মুসলিম জনজীবন (পর্ব ১)

             পুরুষোত্তম সিংহ

গল্প উপন্যাসে বলা হয় মানুষের কথা। তার আবার হিন্দু বা মুসলিম কি। লেখক তাঁর অভিজ্ঞতার কথা, জানার কথা, পাঠককে শোনাতে চান। নিজের সমাজ সম্পর্কে তিনি অনেকখানি জানেন বলেই সে কথা বলতে চান। তাই বলে ভিন্ন সমাজ সম্পর্কে যে জানেন না তা নয়। কিন্তু নিজের সমাজের গভীর তলদেশ পর্যন্ত জানেন, তেমনি নিজের সমাজ সম্পর্কে আঘাত করার অধিকার আছে। সব সমাজ সম্পর্কেই আঘাত করার অধিকার বা সমাজের প্রকৃত রূপ দেখিয়ে দেবার অধিকার লেখকের আছে। স্বাধীনতার পর মুসলিম কথকরা নিজ সমাজকেই প্রবলভাবে মেলে ধরার চেষ্টা করলেন। হিন্দু কথকও সে চেষ্টা করেছেন কিন্তু মুসলিম অন্তঃপুরের প্রবল অভিজ্ঞতা হিন্দু কথকের বিশেষ নেই। আমরা এই আলোচনায় প্রবেশ করব অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের হাত ধরে। ‘কল্লোল’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে সাহিত্য আকাশে একদল নতুন নক্ষত্র দেখা দিয়েছিল। নতুনত্বের সন্ধানে এঁরা প্রত্যেকেই অগ্রসর হয়েছিলেন। ‘কল্লোলের’ উদ্দেশ্য সম্পর্কে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত নিজেই লিখেছেন –“উদ্ধত যৌবনের ফেনিল উদ্দামতা , সমস্ত বাধা –বন্ধনের বিরুদ্ধে নির্বারিত বিদ্রোহ, স্থবির সমাজের পচা ভিত্তিকে উৎখাত করার আলোড়ন।“ (কল্লোল যুগ, দশম প্রকাশ ১৪১৬, এম.সি.সরকার, পৃ. ১৭ ) অচিন্ত্যকুমারের প্রথম গল্প ‘দুইবার রাজা’। এ গল্প ‘কল্লোল’ যুগের দিক পরিবর্তনের গল্প। দারিদ্র নিম্নবিত্ত জীবনের ক্যানভাস উঠে এসেছে এ গল্পে। যেকোন মানুষই জীবনে দুইবার রাজা হয় – প্রথমে বিবাহের কালে আর মৃত্যুর সময়। এ গল্পের অমরও দুইবার রাজা হয়েছে। অচিন্ত্যকুমারের গল্প জীবনের সূচনা বিংশ শতকের তিনের দশকে। ব্যক্তিগত জীবনে মুনসেফ ছিলেন বলেই দেশ-জাতি-মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। গ্রাম না চিনলে মানুষ চেনা যায় না, ভারতবর্ষের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করা যায় না – সেই গ্রামীণ মানুষই বারবার উঠে এসেছে তাঁর গল্পে। গ্রামীণ চাষাভুষা, বর্জিত প্রান্তিক মানুষদেরই তিনি কথাকার। অচিন্ত্যকুমারের গল্পগ্রন্থগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘টুটাফুটো’ (১৯২৮ ), ‘তিরশ্চী’ (১৯৩০ ), ‘ছুড়ি’ (১৯৩৩ ), ‘ডিসক’ (১৯৩৮ ), ‘মাটি’ (১৯৩৯ ), ‘সাক্ষী’ (১৯৩৯ ) ও ‘সিল্কের ব্যান্ডেজ’ (১৯৪০)। গল্প লেখা তাঁর কাছে এক বিস্ময় , এই বিস্ময়ের সন্ধানেই তিনি গল্প বুনে চলেন। তিনি সচেতন ছিলেন গল্পের পরিণতি ও বক্তব্য সম্পর্কে। অচিন্ত্যকুমারের গল্পগুলি নিটোল, কোনো ফাঁক নয়, এক নিঃশ্বাসেই পড়ে ফেলা যায়। ছোটোগল্প সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেন –

“তাই ছোটগল্প লেখবার আগে চাই ছোটগল্পের শেষ, কোথায় সে বাঁক নেবে, কোন্ কোণে। আর কোন রচনায় আরম্ভেই আমরা জেনে বসি না, না উপন্যাসে, না কবিতায়, না নাটকে। আমাকে কতগুলি চরিত্র দাও আমি উপন্যাস শুরু করে দিতে পারব : দাও একটা ঘটনা সংঘাতসঙ্কুল ঘটনা, তুলে দিতে পারব নাটকের প্রথম অঙ্কের যবনিকা – তিন ক্ষেত্রেই রচনার উত্তেজনায় লেখনীর দুর্বারতায় পথ কেটে চলে যেতে পারব এগিয়ে, কিন্তু শেষ না পেলে ছোটগল্প নিয়ে আমি বসতেই পারব না। শুধু ঘটনা যথেষ্ট নয় ; শুধু চরিত্র যথেষ্ট নয় ; চাই আমার সমাপ্তির সম্পূর্ণতা। সব জিনিস সমাপ্ত হলেই কোন সম্পূর্ণ হয় না কিন্তু ছোটগল্পের সমাপ্তিটা সম্পূর্ণ হয়ে ওঠা চাই। তাই ছোটগল্পের কল্পনা কৃতারম্ভ নয়, কৃতশেষ। যতক্ষণ না আমি শেষ জানি ততক্ষণ আমি, কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার –আর সবকিছু, কিন্তু ছোটগল্প লেখক নই, ছোটগল্পের বেলায় চাই আমার শেষ, তাই হয়ত ছোটগল্প শেষ বা শ্রেষ্ঠ শিল্প।“ (ভূমিকা, ‘একশ এক গল্প’ প্রথম প্রকাশ ১৪১০, মিত্র ও ঘোষ, পৃ. ১)

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের গল্পেই প্রথম বিপুলভাবে মুসলিম জনজীবন উঠে আসে। একটি নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি। তখন আমি কলেজে পড়ি, খেলা দেখতে গিয়েছি দূর গ্রামে। এক বৃদ্ধ মুসলিম চাষি পাটের জমি পরিষ্কার করেছিল। প্রচণ্ড রোদে আমরা অপেক্ষা করছি আমগাছের তলায়। সেই বৃদ্ধটিও জমি থেকে অল্প বিশ্রাম নিতে গাছতলায় এল। সেই বৃদ্ধকে দেখে খুব কষ্ট হয়েছিল, ভাবলাম এই বয়সেও পরিশ্রম করে যাচ্ছে। একটু পরেই বৃদ্ধের লুঙ্গির ভিতর থেকে বেজে উঠল ফোন (মূল্য প্রায় তিরিশ হাজার টাকা ) –দেখে বিস্মিত হলাম। এ চাষি নয়, ভালোবাসার তাগিদেই জমিতে আসা। অচিন্ত্যকুমার পেশায় ছিলেন মুনসেফ। গ্রামগঞ্জ হাতের তালুর মত চিনতেন। গ্রামজীবন যে সহজ –সরল নয়, জটিল পঙ্কে লিপ্ত তার পরিচয় আমরা পেয়েছিলাম শরৎচন্দ্রের ‘পল্লিসমাজ’ উপন্যাসে। গ্রামীণ জীবনের কদাচার বড় হয়ে উঠেছে ‘জমি’ গল্পে। গল্পটি ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। জমিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি মুসলিম পরিবারের ধ্বংসের কাহিনি বড় হয়ে উঠেছে এ গল্পে। জীবনে সুখ শান্তির থেকে জমি বড় হয়ে উঠেছে আমিরনের কাছে। গল্পের কাহিনি এমন –সোনামদ্দির জমিতে নজর পড়ে জলিল মুন্সির। আদালতের মামলায় প্রথমে সোনামদ্দির জয় হয়। আবার আপিল করে জলিল। মামলা চালানোর জন্য অনেক অর্থের প্রয়োজনে সোনামদ্দি জমি বন্দক দেয় যুবনালির কাছে। এই যুবনালি ছিল জলিল মুন্সির বেনামদার। ফলে জমি হস্তান্তর হয় জলিল মুন্সির কাছে, তবু সোনামদ্দি লড়াই করে যায়। শেষ ফল দাঁড়ায় জমির মালিক জলিল ও প্রজা সোনামদ্দি। সোনামদ্দি নিয়ম মত খাজনা দিয়ে যায়। ফলে জমি সোনামদ্দিই ভোগ করতে থাকে। শেষে জলিল অন্য চক্রান্ত ফাঁদে –

“জলিল মুন্সি সে –পথে গেল না। নিজে খাজনা বাকি ফেলে নিজের রায়তিস্বত্ব নিলাম করাল। কেনাল চাচাত বোনাই দরবার মোল্লাকে দিয়ে। টাকা দিলে নিজ। নিলাম ইস্তাহার গোপন করল। ঝাঁপিয়ে পড়ল সোনামদ্দির কোলরায়তি বিলোপ হয়ে গেল।“( ‘জমি’, ‘একশ এক গল্প, তদেব, পৃ. ৪১০ ) 

সোনামদ্দি জানতো এ জমি রক্ষা করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রবল জেদ ছিল স্ত্রী আমিরনের। জমিই ছিল আমিরনের অহংকার ও অলংকার। তাই জমি চলে যাওয়ার পরও সোনামদ্দিকে মিথ্যে অভিনয় করে যেতে হয়েছে আমিরনের কাছে। কিন্তু জমি থেকে যেদিন উৎখাত হয়ে পথে নামে সোনামদ্দি সেদিন সমস্ত অভিনয় প্রকাশ পেয়ে যায়। জমি ফিরিয়ে আনতে আমিরন নিকা করে জলিল মুন্সিকে। শর্ত একটাই জমি ফিরিয়ে দিতে হবে সোনামদ্দিকে। সামান্য জমির জন্য নিজের সুখ সংসার, দাম্পত্যজীবন সমস্তই বিসর্জন দিয়েছে আমিরন। তবুও চাষার হৃদয় থেকে জমি উৎখাত হতে দেয় নি। আজ সোনামদ্দি জমি পেয়েছে কিন্তু হারিয়েছে স্ত্রী পুত্রকে। গল্পকার অনবদ্য ভাষায় সোনামদ্দি ও আমিরনের ট্র্যাজিক পরিণতি তুলে ধরেছেন। আজ আর আমিরন তাঁর স্ত্রী নয়, জীবনের সমস্ত দিক শূন্য হয়ে গেছে তাঁর কাছে –

“আমিই কবালার পণ। আমার জন্য মন খারাপ কোরো না। আমার চেয়ে তোমার জমির অনেক দাম বেশি। আমি গেলে কী হয় ? কিন্তু জমি তো তোমার ফিরে এল। তোমার জমির গায়ে তো কেউ হাত দিতে পারল না।‘

‘মহবুর ?’

‘যদি রাত্রে খুব কাঁদে, চুপি-চুপি দিয়ে আসব তোমার কাছে।“ (তদেব, পৃ. ৪১১)

অচিন্ত্যকুমারের গল্প পড়তে গিয়ে বড় বিস্মিত হতে হয়। সহজ সরল ভাষায় গভীর জীবনবোধের গল্প তিনি লেখেন। গল্প পড়ে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে হয়। আসলে গ্রামীণ মানুষদের তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। সেই সহজ –সরলতা ধরা পড়েছে তাঁর গল্পে। আশ্চর্য শৈল্পিক কৌশলে গড়ে তুলেছেন ‘দাঙ্গা’ (১৩৫২) গল্পটি। এটি একটি মুসলিম নারীর ব্যর্থ জীবনের গল্প। সামান্য জমি নিয়ে বিবাদ বেধেছে জিন্নাতের পিতা গফুরালির সঙ্গে মমিনার পিতা মকবুলের। আর গ্রাম্য প্রধানরা সেই বিবাদকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের মধ্যে সংঘর্ষ বাধিয়েছে। আদমপুরে বাড়ি জিন্নাতের আর মমিনার বাড়ি ধুলেশ্বর। মাঝে প্রবাহিত হয়েছে আঁধারমানিক নদী। জমি দখলকে কেন্দ্র করে বন্দি হয়েছে জিন্নাত। মমিনা ভেবেছে এ বিবাদ চিরকাল থেকে যাবে, গ্রাম্য এই বিবাদ থেকে রক্ষার একমাত্র উপায় হল বিবাহ। ধুলেশ্বরের মমিনা যদি আদমপুরের জিন্নাতকে বিবাহ করে তবে কোনো বিবাদ থাকবে না। এই উদ্দেশ্যে রাতের অন্ধকারে বন্দি যুবক জিন্নাতকে নিয়ে সে আঁধারমানিক নদী দিয়ে পালিয়ে যেতে চেয়েছে। কিন্তু সংসারে –‘নারী হৃদয় কে বুঝিবে ‘? নারীর ভালোবাসার মূল্যই বা কতটুকু ! মমিনার ভালোবাসা উপলব্ধি করতে পারে নি জিন্নাত। তাই সে নদীতে হাত দিয়ে জল কেটে কেটে চলে গেছে। ব্যর্থ হৃদয় নিয়ে মমিনা আজ  তাকিয়ে আছে নদীর দিকে। নদী আর চোখের জল যেন একাকার হয়ে গেছে –

“ভাঙা চাঁদ ডুবে গেল পশ্চিমে। মমিনা তাড়াতাড়ি চলে এসে তার ছাড়া বিছানায় শুয়ে পড়ল। বেড়ার ফাঁক দিয়ে নদীর আভাস দেখা যায় ঝাপসা –ঝাপসা। অন্ধকারে আঁধারমানিকের দিকে চেয়ে থেকে ভাবতে লাগল, জিন্নাতের দু’হাতে হঠাৎ এত জোর এল কি করে ?” (‘নুরবানু’, তদেব, পৃ. ৫২১)

‘নুরবানু’ গল্প পড়তে গিয়ে মনে পড়ে তুলসী লাহিড়ীর ‘ছেঁড়াতার’ নাটকের কথা। ক্ষুধার জ্বালা থেকে স্ত্রী পুত্রকে বাঁচাতে রহিম সেদিন তালাক দিয়েছেল ফুলজানকে, সেই তালাকের মধ্যেও ছিল প্রতিবাদের ভাষা। ‘নুরবানু’ গল্পেও প্রচণ্ড ক্ষোভের মুখে কুরমান তালাকের কথা বলে বসেছিল। মুসলিম সমাজের এক ভয়ংকর প্রথা তালাক। একবার উচ্চারণ করলে আর রক্ষা নেই – এই ভয়ঙংর প্রথার বলি হয়েছে বহু নরনারী, যেমন এ গল্পের নুরবানু ও কুরমান। মুসলিম সমাজে তালাকের ক্ষেত্রে অবস্থা বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হল মুখের শব্দ উচ্চারণ। ‘নুরবানু’ গল্পটি প্রকাশিত হয় ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে, ‘ছেঁড়াতার’ প্রকাশের অনেক আগেই। তুলসী লাহিড়ী এ গল্পের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন কিনা জানি না ! ‘ছেঁড়াতার’ দুর্ভিক্ষের পটভূমিকায় লেখা আর এ গল্প নিম্নবিত্তের পটভূমিকায় লেখা। নিজের সংসার চালাতে অক্ষম কুরমান, তাই স্ত্রী নুরবানুকে কাজ করতে যেতে হয় গ্রাম্য মনিব উকিলদ্দি দফাদারের বাড়ি। কিন্তু উকিলদ্দির তীর্যক দৃষ্টির কথা নুরবানু গোপন রাখে নি কুরমানের কাছে। কুরমানের সংসার দারিদ্র্যে ভরা, তাই উকিলদ্দি নানা উপহার দিয়ে নুরবানুকে বশ করতে চায়। কিন্তু একসময় কুরমান কাজ থেকে ছাড়িয়ে নেয় স্ত্রীকে, তবুও বাঘের দৃষ্টি এড়াতে পারে না। উকিলদ্দি একদিন বাড়িতেই এসে উপস্থিত হয় উপহার নিয়ে। জমি থেকে বাড়ি এসে উকিলদ্দিকে দেখে কুরমান আর মেনে নিতে পারে না, সংঘর্ষ বাধে দুজনের মধ্যে। কিন্তু রুগ্ন চেহারার কুরমান পেরেও ওঠে না উকিলদ্দির সঙ্গে। উকিলদ্দি যখন লাঠি দিয়ে প্রচন্ড প্রহার করতে থাকে কুরমানকে তখনই নুরবানু এসে উকিলদ্দির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় –  এই ঘটনাই কুরমানের পুরুষসত্তায় বাধা দেয় –

“আর, যেমনি এল এগিয়ে, হাতের নাগালের মধ্যে, অমনি উকিলদ্দির লাঠি পড়ল কুরমানের মাথায়। মনে হল নুরবানুই যেন লাঠি মারল। মনে হল কুরমানের মারের থেকে উকিলদ্দিকে বাঁচবার জন্যেই তার এই জোটপাট। উকিলদ্দির গায়ে পড়ে তাই এত সাধ্য সাধনা।

কুরমান দিশেহারার মত চেঁচিয়ে উঠল : ‘এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক –বইন। ব্যাস, উথল –পাথল বন্ধ হয়ে গেল মুহূর্তে। সব নিশ্চুপ, নিঃশেষ হয়ে গেল।“ (তদেব, পৃ. ৫২৫)

সুখের দুটি জীবন ভেঙে যায়। তাঁদের সংসারে অর্থ ছিল না ঠিকই কিন্তু কুরমান কোনো অভাবই রাখে নি নুরবানুর। তালাকের মাধ্যমে দিশেহারা হয়ে যায় কুরমান। আজ নুরবানু আর তাঁর স্ত্রী নয়। মুসলিম নিয়ম অনুসারে তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে আবার পেতে হলে অন্য পুরুষের সঙ্গে নিকা করে কাবিবনামা করতে হয়। ভেঙে যায় তাঁদের সুখের দাম্পত্য জীবন। আজ আর কুরমানের স্পর্শের অধিকার নেই নুরবানুকে। নুরবানুকে বিবাহ করে উকিলদ্দি আজ তাঁর সমস্ত স্বপ্ন পূরণ করেছে, তবুও ধরা দেয় না নুরবানু।  নুরবানু যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হয় না উকিলদ্দির সঙ্গে, ফলে সে তালাকও দেয় না। গ্রাম্য সালিশে বিচার হয় –“সত্যিই তো। দশ –সালিশ রায় দিলে। স্বামীর সঙ্গে একরাত্রিও যদি সংসার না করে তবে বিয়ে জায়েজ হয় কি করে ? বিয়ে পোক্ত না হলে তালাক চলবে না। হালাল হওয়া চলে না নুরবানুর।“ (তদেব,পৃ. ৫২৭ ) ফলে যৌন সংসর্গ করতেই হয় নুরবানুকে। অন্যের সঙ্গে যৌন সংসর্গ মেনে নিতে পারে নি কুরমান। তালাকের পরেও যে কুরমান স্ত্রীকে পেতে আগ্রহী ছিল কিন্তু যৌন সংসর্গে সে দিকশূন্য হয়ে যায়। আজ সমস্ত হতাশা গ্রাস করেছে কুরমানকে। ফিরে এসেছে নুরবানু , কিন্তু কোনো আগ্রহ নেই স্ত্রীর প্রতি –এভাবেই ভেঙে গেছে দুটি জীবন। পুরুষের সমস্ত সুখ শান্তি গড়ে ওঠে নারীকে কেন্দ্র করেই, আর সেই নারী হস্তান্তর হলে পুরুষের জীবনে নেমে আসে শ্রাবণ মেঘের ঘন অন্ধকার। সেই অন্ধকার আজ ঘনিয়েছে কুরমানের জীবনে। হতাশার কালো মেঘ আজ গ্রাস করেছে তাঁকে। তবে নুরবানু লড়ুক নারী, তাঁর কাছে আছে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন। কিন্তু যেখানে মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছেদ ঘটে গেছে সেখানে দুটি হৃদয় আবার গড়ে উঠবে কীভাবে ? বোধহয় গড়ে ওঠা আর সম্ভবও নয় ! সেই চরম সত্যেই গল্পকার উপনীত হয়েছেন।

795