গল্পকথা (পর্ব ৭)

বিপুল দাস

কুলিক রোববার, মে ৩১,২০২০: গুন্টার গ্রাসের দীর্ঘ বক্তৃতার এই অংশটুকু শোনানোর কারণ আর কিছুই নয়, ভাষা যখন সাংকেতিক চিহ্নে আবদ্ধ হয়নি, শুধুমাত্র কথকের উচ্চারিত শব্দগুলো প্রকাশ করত জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা, তখন বিষয়ের বৈশিষ্ট্য কী ছিল, কোন ধরণের গল্প মানুষ বারে বারে শুনতে চাইত, মনের গভীরের কোন ইচ্ছাপূরণের বাসনা তাকে তাড়িত করত গল্পগুলোর দিকে – এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার জন্য।

গ্রামেগঞ্জে তো গল্পের শেষ নেই। গল্পগুলো নদীর মত গড়াতে থাকে। পারের লোকজন জানে। কেউ আঁজলা ভরে, কেউ ঘটি, কেউ কলস ভরে গল্পের জল ঘরে বয়ে নিয়ে যায়। আসলে তো বংশগত ভাবে তারা গল্পটাকেই বয়ে নিয়ে চলে। চা-এর দোকানে বসে চা-এ চুমুক দিতে দিতে, মাঠে নিড়ানির সময়, সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর সময় জলের মত গল্পগুলো বা গল্পের জলধারা সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। রক্তের সঙ্গে ঘোরাফেরা করে। তারপর ভেতরে ভেতরে সাজানো গোছানো চলতে থাকে। মানুষের অভ্যাস এ রকমই। হাতপায়ের মত আমাদের মাথার ভেতরেও কতগুলো আঙুল থাকে। সব সময়ে কিছু একটা আঁকড়ে ধরে সেটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নতুন কিছু বানাতে চায়। আমরা বলি মননক্রিয়া, আমরা বলি ক্রিয়েটিভ সিকনেস। সেই গল্পের মত জল নিয়ে তার মনোবাসনার আঙ্গিকে নতুন একটা গল্প তৈরি হয়।

গল্পের নদী গড়াতে গড়াতে অনেকদূরের জনপদে পৌঁছলে গল্পের গায়ে নতুন মাটি, নতুন রং লাগে। কোনও একজন কথক হাটচালায় বসে তার ঝুলি খুলে গল্প শুরু করলে চারপাশে লোকজন জমাট হতে শুরু করে। সবাই যেন সমস্ত শরীর দিয়ে গল্পটা শুষে নিতে থাকে। কথকঠাকুর গল্পের সুতো ছড়িয়ে দেয়, বাতাসে দোল-খাওয়া সেই সুতো ধরে সবাই তার মনের মত নক্‌শা তৈরি করে নেয়। গল্পের যে অংশ তার মনোগত হয়নি, তার ইচ্ছাপূরণের মত হয়নি, সেই অংশ সে তার ভাবনা দিয়ে বিনির্মাণ করে। সেটা নির্ভর করে শ্রোতার বিশেষ মানসিক বৈশিষ্ট্যের ওপর। বিজয়ী দলের পক্ষে যেমন সোচ্চার সম্মতি থাকে, তেমনি পরাজিত দলের জন্যও কখনও ভালোবাসা তৈরি হয়। খেয়াল করে দেখুন টম অ্যান্ড জেরি দেখার সময় অবচেতনেই আমরা জেরির পক্ষ সমর্থন করতে শুরু করি।

এ ভাবেই হয়তো কোনও এক হাটচালায় বিশুঠাকুর নামের কোনও এক কথকের চারপাশে সবাই গোল হয়ে বসে। বলো বিশুভাই, তারপর ? রায়বংশ কি ফৌত হয়ে গেল? বংশে বাতি দেবে কে ? কার্তিক মাসে পূর্বপুরুষদের জন্য আকাশপ্রদীপ জ্বালবে কে ? গল্প বলো কথকঠাকুর। তোমার গল্প যেন নদীর জলের ধারা। আমাদের বারোমাসে শরীরে মিশে যায়। আমাদের মাথার ভেতরে জমা থাকে। আমাদের ছেলেপুলেদের তো গল্প বলতে হবে। গল্প ছাড়া মানুষ বাঁচে না। অনেক কথা ভুলে যাব, অনেক কথা আমরা নিজেরাই তৈরি করে নেব। এক বিশুপাগলের কথা, হয়তো এক কুঠিয়ালের গোমস্তার গল্প, নীলকুঠির স্কটিশ সাহেব ম্যাকার্থির কথা। সব নদীর মত বয়ে যাবে।

305