সাফিন আলী

বুড়োটা এসেছিল পাহাড়ের গায়ের কোনো গ্রাম থেকে। নাম জানিনা। গায়ে সাদা ছেঁড়া স্যান্ডো গেঞ্জি। মুড়ে যাওয়া ধুতি। হাতে বাঁশের লাঠি। এসে বসলে স্কুলের গেটে। একটু বিশ্রাম নিয়ে লাইনে গিয়ে দাঁড়াবে।
লম্বা লাইন। কানে কানে এসে সামিমদা বলে গেল, হাজারের উপর পেশেন্ট এসেছে। হাত চালাও। স্থানীয় ক্লাবের সহায়তায় হেল্থ ক্যাম্প। কলকাতা থেকে ডাক্তার এসেছে শুনে পাহাড়ি মানুষগুলোর ঢল নেমেছে। তখনো আমি মুম্বাই চলে আসিনি। কলকাতায় থাকি তখন। পুরুলিয়া বলতে অযোধ্যা পাহাড়, পাহাড়ের কোলের ছোটো ছোটো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্রাম, লাল শিমুলের দেশ, সূর্য ডুবে অন্ধকার নামলে ছৌ নাচের আমেজ। পুরুলিয়ার সাথে এইটুকুই পরিচয় ছিল। কেলটে লোকগুলোর মাটির বাড়ি, নিকানো উঠোন টুরিস্টদের ছবি তোলার প্রিয় জায়গা। সেদিন পরিচয় হলো পুরুলিয়ার আত্মার সাথে।
রোদের তেজ ছিল সেদিন প্রবল। পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ছিল পরাক্রমে। রোদে পোড়া এই মানুষগুলো রোদে বেশি সুন্দর দেখায়। নিষ্পাপ মুখগুলো চকচক করে।
ঝুঁকে যাওয়া বুড়োর হাঁটুতে ব্যথা। কোমর ধরেছে। চোখে ঝাপসা দেখে। কানে সোঁ সোঁ আওয়াজ করে। একধার দিয়ে বলে গেল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর?’
বুড়ো চারপাশ দেখে নিলো একবার। তারপর মুখ নামিয়ে বলে, একঠান কথা কইমু?
আমি কান নামিয়ে ওনার মুখের কাছে নিয়ে গেলে বুড়ো সম্মতি পেয়ে ফিসফিসিয়ে বলতে শুরু করে। আমি শুনতে শুনতে স্টেথো, টেবিল, চেয়ার, বাইরের পেসেন্টের লম্বা লাইন ফেলে রেখে স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে চলে গেলাম পাহাড়ের রোদ ঝলসানো সে গ্রামে। হাতে পরা গ্লাভস খুলে দরজায় টোকা মেরে দেখি ভেতরে এক যুবতী শুয়ে। নোংরা কাঁথায় সে মুড়ে আছে। এই দুপুরে শুয়ে কেন?
সকাল থেকে বমি করে করে সে নেতিয়ে গেছে। পেটে বাচ্চা এসেছে। গ্রামের দাই জল ফুটিয়ে খাইয়েছে। তবু বমি থামে না। ঘরে এমনিতে খাবার কিছু নেই। বুড়ি দুটো ছাগল পোষে। তার দুধ আর মুড়ি মাখিয়ে দিয়েছিল। সেটাও উগলে দিয়েছে। দাই বুড়োকে ডেকে বলে, নীচে যাও। বেগুনকোদর থেকে ডাক্তার আনো। মুখ ঝামটা দিয়ে বলেছিল, জামাই কোথায় গেল? অনেকদিন তো হলো।
জামাই মরে গেছে। বুড়ো জানে। ওরা বলেছিল, বিপ্লব সফল হলে প্রতিদিন কাজ পাবে। হাতে মজুরি আসবে। পেটে ভাত পড়বে। গ্রামে হাসপাতাল হবে। বুড়ো ওদের কথায় স্বপ্ন দেখেছিল। এই বঞ্চনার শেষ চাই। চাষের মরশুমে লাইন বেঁধে বর্ধমান, মেদিনীপুর, বীরভূম ধান রুইতে, ধান কাটতে যেতে কষ্ট হয়। ঘরের মেয়ে বউদের ইজ্জত যায়। সমতলের লোভাতুর চোখগুলো গিলে খায়। এখানেই চাষের ব্যবস্থা হলে আরাম হয়। ওরা বলেছিল, পাহাড় কেটে জল আনবে। সেচের ব্যবস্থা করবে। বুড়োর নিজের শক্তি গেছে। ছেলেকে পাঠিয়েছিল। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিল ওদেরই এক ছেলের সাথে।
পাহাড়ের গা দিয়ে পুরুলিয়া থেকে ট্রেন লাইন চলে গেছে ঝাড়খণ্ডের দিকে। পাহাড় থেকে নেমে বাজার আসার সময় রেললাইন পেরোতে হয়। ছোট্ট স্টেশন। দিনে দুটো করে ট্রেন থামে। সকালে আর সন্ধ্যে। প্লাটফর্ম বলতে কিছু নেই। মোরাম বিছানো। তার উপর সবুজ সবুজ ঘাস গজিয়েছে। কয়েকটা বসার বেঞ্চি আছে। বুড়ো ঐরকম একটা বেঞ্চিতে বসে হাঁফ নিচ্ছিল। ঘাড় ঝুলে গেছে। লাইন পেরিয়ে স্টেশন মাস্টারের টিউবকলে গামছা জড়িয়ে স্নান করছিল কেউ। স্নান সেরে যাওয়ার সময় বুড়োকে ডাক দিলে। কুণ্ঠি যাবে?
বাজারে ও তো পাশ করা ডাক্তার নেই। কোয়াকরাই সামলায়। কলকাতা থেকে ডাক্তার এসেছে শুনে তাই এখানে চলে এলে।
মুখ তুলে কাতর চোখে আমার দিকে তাকালো। করুণ আর্তি।

  • একটা বমির বড়ি দেন।
    বুড়ো ভয় পাচ্ছে। মেয়েটার পেটে কিচ্ছু থাকছে না। বমির চোটে বাচ্চা না বেরিয়ে আসে।
    নিজের প্রেসক্রিপশন, মেয়ের বমির ওষুধ নিয়ে বুড়ো লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে আমি পরের পেশেন্ট দেখার প্রস্তুতি নিই। কাগজ টানতে গিয়ে নজর পড়ে মেঝেতে। ছোপ ছোপ কাঁচা রক্ত লেগে আছে। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখি কুঁজো বুড়ো ভিড় ঠেলে এগোচ্ছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে পথ আগলে জিগ্যেস করি, পা দেখি।
    ফাটা পা। জুতো নেই। কালো মোটা চামড়ার মুখে রক্ত লেগে। বুড়ো নির্বিকার। পাহাড়ের পাথুরে রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটতে গিয়ে রক্ত ঝরা নতুন কিছু নয়। ডাক্তারকে বলার মতো নয়। এর ওষুধ লাগেনা। এ ফাটা পা হেঁটে যেতে পারে হাজার ক্রোশ। মেয়ের বমি বন্ধ হওয়া চাই।
    লকডাউন। করোনা। ইমিউনিটি। এই বুড়োরা কেমন আছে?
11