ভাস্কর ভট্টাচার্য্য

বিশেষ প্রতিবেদন,মে ১৮,২০২০: ছবিটা দেখেই নিশ্চয় চিনতে পারছি, আঁতকে উঠছি, ধিক্কার জানাচ্ছি, ভার্চুয়ালি ক্রোধ প্রকাশ করছি।হ্যাঁ, ডা: কে সুধাকর- কাল যার ওপর বিশাখাপত্তনমের পুলিশের বর্বরতা গণতন্ত্রের আরেকটি ব্যঙ্গ চিত্ররূপ হয়ে উঠেছে।ডা: সুধাকরের অতীত মোটেই শাসকের গুডবুকে থাকার নয়।অপ্রতুল মাস্ক, পিপিই দিয়ে ডাক্তারদের করোনাযুদ্ধে পাঠানোর প্রকাশ্য প্রতিবাদ করেছিলেন।কি দরকার ছিল মিছিমিছি সাসপেন্সন ডেকে আনার।এদেশে শাসক তো প্রায় ডিভাইন ইমেজের।আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি করান। থালাবাসন খোল করতালের ঢক্কানিনাদে ডাক্তার শব্দ-ভজনা করান।কিন্তু প্রশ্ন করা তো অপরাধ! আর ঈশ্বর তো প্রশ্নাতীত।

গণতন্ত্রের প্রধান উপাদানই নাগরিক স্বর এবং বিরোধী স্বর।যখন রাষ্ট্র এই স্বরকে রোধ করতে চায় তখন গণতন্ত্র একটা সার্কাসে পর্যবসিত হয়। আর যারা এই সার্কাসের কুশীলব হতে চান না তাদেরকে আমরা চিনি সুধাকর, কাফিল খান, বিনায়ক সেনের মতো নামে।


ডাক্তার কাফিল খানকে মনে আছে তো!গোরখপুর হাসপাতলে শিশুমৃত্যু রুখতে যিনি প্রাণপাত করেছিলেন।আর হাসপাতালে অক্সিজেন সাপ্লাই নিয়ে যে দুর্নীতি তার বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। আজ সেই কাফিল খান জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে দিনযাপন করছেন।অবশ্য নমনীয় মেরুদন্ডের ডাক্তাররা। নিঃসন্দেহে নিরাপদ জীবন যাপন করতে পারেন ও এই সার্কাসের অন্য অন্যতম উপাদান হিসেবে থাকতে পারেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। মানবাধিকার কর্মী হিসেবে পরিচিত। ডাক্তার বিনায়ক সেন এর কথা নিশ্চয়ই আমরা মনে করতে পারব। ছত্রিশগড়ের মানুষের পাশে দলিতদের জন্য কাজ করার অপরাধ তাকে মাওবাদী তকমা দিয়ে দীর্ঘদিন কারান্তরালে রাখা হয়।
আসলে শাসকের কোন আলাদা জাত হয়না। এটা ইতিহাস প্রমাণিত। তেমনি মানবতাবাদীদের ও কোন জাত হয়না। গত শতকের চল্লিশের দশকে ভারত বর্ষ থেকে চীনের স্বাধীনতাকামীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে প্রাণ দেন ডাক্তার দ্বারকানাথ কোটনিস। আমরা ডাক্তার সুধাকার, ডাক্তার কাফিল খান বা ডা: বিনায়ক সেনদের স্মরণে রাখলে আমাদের মেরুদণ্ডকেও ঋজু করা দরকার।
ডা: কে সুধাকরের ওপর আক্রমণকারী সহজ-বলি কনস্টেবলকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।
করোনাকে বেশ একটা যুদ্ধের মেটাফোর দেওয়া হয়েছে এবং তাতে ডাক্তারদেরকে ফ্রন্টলাইনার ডাক্তারদেরকে ফ্রন্টলাইনার হিসেবে প্রদর্শন করে অন্তত একটা সামাজিক গিমিক সৃষ্টি করা যায় যা ভবিষ্যৎ ভোটাঙ্কে ফলদায়ী হবার সম্ভাবনা রাখে।
একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আমাদের ভুললে চলবে না গণতন্ত্রের প্রধান উপাদানই নাগরিক স্বর এবং বিরোধী স্বর।যখন রাষ্ট্র এই স্বরকে রোধ করতে চায় তখন গণতন্ত্র একটা সার্কাসে পর্যবসিত হয়। আর যারা এই সার্কাসের কুশীলব হতে চান না তাদেরকে আমরা চিনি সুধাকর, কাফিল খান, বিনায়ক সেনের মতো নামে।
ডা: সুধাকরের ঘটনা একটি রাজ্যের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমাদের রাজ্যে আমরা ডা: গড়াইয়ের উদাহরণ মনে করতে পারব। যিনি রোগীস্বার্থকে সরকারী আদেশের চেয়ে গুরুত্ব দিয়ে সাসপেন্সনে পড়েছিলেন। উদাহরণে লেখাকে ভারবহুল করে তোলার যৌক্তিকতা নেই।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করব ডা: সুধাকরের মানসিক রোগগ্রস্ততার একটা গল্প আমাদের জানানো হচ্ছে।ডা: কাফিল খান সম্পর্কেও বহু সমাজরোচক গল্প মিডিয়া মারফৎ চালান হচ্ছে যেমন হয়েছিল বিনায়ক সেন সম্পর্কেও।কর্পোরেটপুষ্ট মিডিয়াকুল রাষ্ট্রের প্রধান মুখপত্রের ভূমিকা গ্রহণ করছে।আরও মজার ব্যাপার সঙ্গে জোড়া আবশ্যক। দেশের শীর্ষ আদালত যখন রাষ্ট্রের পক্ষে কথা বলে ( যদিও আমরা তামিলনাড়ু হাইকোর্টের ভিটেছাড়া শ্রমিকদের সম্পর্কে সাম্প্রতিক রায় ও প্রাক্তন বিচারপতি দীপক গুপ্তের বক্তব্য স্মরণে রাখব) তখন নাগরিক জীবন যে এক অসহায় সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে।
এখন প্রশ্ন একটাই-
চোখের সামনে অগ্রণী নাগরিকদের (যেমন চিকিৎসকরা) রাষ্ট্রের প্রতিহিংসার বলি হতে দেখেও, আমরা কি নিজেদের নিরাপদ ভাবব না সংহত করব প্রান্তস্বরকেও?