ভাস্কর চৌধুরী

ঢাকা শহরের ফাঁকা বহুতল গুলির একটি ফ্ল্যাটে শুরু হয় রিঙ্কু ময়নার অপরীক্ষিত জীবন। ক্রমে তাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।ময়নার আবদারে রিঙ্কু তাকে নিয়ে আসে তাদের যৌথ পরিবারে। রিঙ্কুর দিদির আন্তরিকতায় মুগ্ধ ময়না । রিংকুর মেজোমা বিয়ের বন্ধ করেন। ময়না তার বাবার অনুমতি নেবার জন্য তাকে ফোন করে। তারপর…

একান্নবর্তী ফোন শেষে ময়না রিংকুর কাছে ফিরে এলো। তার পরনে রিংকুর মায়ের বিয়ের শাড়ি। মাথা থেকে গলা , বাহুতে ভারী ব্রেসলেট, হাতে ভারী শোনার চারটি বালা। মায়ের নাকের হীরার নাকফুল, মাথায় সিঁথিতে টিকলি, দু’পায়ে মল, কোমরে রূপার বিছা। ময়না বললো, এখন পাঁচটা ঘন্টা আমাকে সময় দাও। কবুলের লোক দেখো না। এখন বাবার ফোন বন্ধ। রিংকু বললো, এসব দিদিকে বলো। নো সাউন্ড। এ বাড়িতে শব্দ নিষিদ্ধ। আমার মা ঘুমের ভেতর নিঃশব্দে মরেছে। দুটি ভাই আর সেজো কাকা এক মিনিটের হার্ট ফেলিওরে মরেছে। কেউ শব্দ করে নি। এ বাড়িতে কান্না ও হাসি প্রায় নিষিদ্ধ। দাদু কোনোদিন হাসেন নি। ময়না শেষে দিদির কাছে গেলো। সব শুনে দিদি বললো, মোজাম্মেল চাচার আসার সময় হলো। দেখি, তাকে আগে থামাতে হবে। মেজো মাকে জানাতে হবে। এই বলে দিদি মেজো মায়ের কাছে গিয়ে কথাটা বললো। মেজো মা ঘোরের ভেতর থেকে বললো, তোর মা আমাকে ডাকছে। যা করেছি, তার হুকুমে করেছি। আমি যাবো। তোরা মাঝরাতের আগে ডাকবি না। আর আমি যদি দেখে যেতে না পারি, তুই বাকিটা করিস। হুকুম থাকলো। এখন মোজাম্মেলকে থামা। আমি আর কিছু জানি না। তোড়জোড় থেমে গেলো। গরম বাড়ির বাড়ির রাজহাঁস আর খাসি কাটা হয়ে গেছে। রান্নার ডেগচি বসে গেছে। চুলোই জল ফুটছে। দিদি দ্রুত মোজাম্মেল চাচাকে না আসার জন্যে খবর দিলো। খাবারের এলাকায় এসবের আঁচ পড়তে দেয়া হলো না। মোজাম্মেল চাচা রাত বারোটার পর আসবে, এ খবর জেনেই বাড়িতে গরিব লেবারদের দল খেয়ে দোয়া করে চলে গেলো। ময়না সব দেখলো। বড় কষ্ট লাগলো তার।এখন উভয় সংকটে পড়ে সে বললো, এখন কি করবো রিংকু? একটা হুকুম দাও। রিংকু বললো, তোমার বাবার উপর আমার হুকুম চলে না ময়না। প্লিজ ওয়েট। খাবার পর সকলেই নিজ নিজ ঘরে এক অজানা ভয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। এ বাড়ির ইতিহাস সকলের জানা। তাদের শ্বশুরের বাবা থেকে আজ পর্যন্ত যে কিছু অন্দর মহলে ঘটেছে, সকলেই সব জানে। এর মাঝেই ময়না রাত বারোটায় বাবার ফোন পেলো। বাবা সব শুনে বললো,ঐতিহ্যকে সন্মান করো। এখানেই তোমার জীবনের শান্তি। বিয়ে হোক। রিংকু কে এ কথা বলতেই রিংকু আড়মোড়া ভেঙে বললো , যা বলবে দিদিকে বলো। আমি তোমার মতোই আসামি। অগত্যা ময়না আবার দিদির কাছে তার বাবার মতামত জানালো। দিদি খুশি হয়ে সেজো মাকে নিয়ে দিদি রাত বারোটার দিকে মেজো মায়ের ঘরে গেলো। আধা আঁধার ঘরে এক ভৌতিক পরিবেশ। সেজো মা এমন শব্দের অর্থ জানেন। তিনি মুখে কাপড় দিয়ে মেজো মায়ের শরীরে হাত রাখলো। একটু ঝাঁকালো। বুকে হাত রেখে চুপ করে দুমিনিট থেকে একটা বড় চাদর নিয়ে ময়নাকে ডেকে একদিকে ধরো। ময়না ঠান্ডা হয়ে একদিকে ধরে রইলো। শব্দহীন ভাবে সকলের সামনে মেজো মায়ের সারা শরীর মাথা সমেত সাদা চাদরে ঢেকে দেয়া হলো। সকলে মুখে কাপড় চাপা দিয়ে ধীরে ধীরে বাইরের ঘরে এসে গোল হয়ে বসলো। হঠাৎ ময়না ডুকরে কেঁদে উঠলো। উথলে উঠলো। আমার জন্যে, আমার জন্যে অভিমান করে উনি চলে গেলেন। রিংকু বললো, শব্দ করো না। শব্দ করো না। ওসব বলো না। মেজো মা যা করার করেই বিদায় নিয়েছেন। এটি এমন এক ধরণের স্বেচ্ছামৃত্যু যা মা গ্রহণ করেছিলেন। সময় এলেই এ বাড়ির সকলেই এখন ইচ্ছেমৃত্যু ডেকে নেয়। এটিই হলো একধনের ঐতিহ্যের প্র্যাকটিস। তুমিও হয়তো এই ঐতিহ্যের অংশ হয়ে যেতে পারো। ময়না চুপ করে ফ্যাল ফ্যাল করে রিংকুর দিকে তাকিয়ে রইলো। রিংকু গভীর রাতে নিজের ঘরে দিয়ে ইউটিউব ছেড়ে শুনতে লাগলো, আমি সকল নিয়ে বসে আছি– কবিগুরুর সেই গান। ময়না রিংকুর জামা টেনে ধরে জোর করে নিজের ভেতরে অপরাধবোধকে থামাতে চাইলো। রিংকু, তার মাথায় হাত দিয়ে বললো, স্থির হও। স্থির থাকো। এ বাড়িতে সময় খুব ধীরে চলে। আমরা সময়ের জন্যে বসে আছি। আদেশ এলেই নড়বো।

20