সাফিন আলী

ওয়েবডেস্ক,মে ৩,২০২০ : রাত সাড়ে এগারোটার ঘন অন্ধকারে চুপিসাড়ে মাটিতে কোদাল চালাচ্ছিলেন ডাঃ প্রদীপ। অন্ধকারে কাজে সাহায্য করছেন পুলিশ ইন্সপেক্টর। ভয় সবার মনে। এই না ওরা চলে আসে। কোদাল চলছে সন্তর্পণে। যেন আওয়াজ কবরখানা থেকে বাইরে না বেরোয়। অন্ধকারে গা মিশিয়ে একটু দূরে কিশোর ছেলেটা বাবার বন্ধুর মাটিতে কোদাল চালানো দেখছে। পাশেই বাবার নিথর দেহ। ডাঃ সিমনের দেহ। গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে জোনাকির মতো ঐ আলোয়ও চোখ দুটো চকচক করছে। মাটিতে কোদাল চলছে শপ.. শপ.. সপাসপ.. সপাসপ।
ডাঃ সিমন ছিলেন চেন্নাইয়ের এক নাম করা হাসপাতালের নিউরো সার্জেন ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর। জীবিত অবস্থায় ছিলেন কত মানুষের ‘মুশকিল আসান’ এর চাবিকাঠি। ভগবানের পরের স্থান ছিল তাঁর। কিন্তু সেই ভগবান মৃত্যুর পর মাটি পেলোনা সম্মানের সাথে। তিনি মারা গেলেন COVID19 এ আক্রান্ত হয়ে। কিন্তু রোগটা তাঁর দেহে সংক্রামিত হয়েছিল এক রুগীর দেহ থেকেই।
কথা ছিল সৎকার হবে কিলপাউকের টিবি ছাত্রম কবরস্থানে। শেষ বিদায় জানাতে ডাঃ সিমনের স্ত্রী ও ছেলেকে সঙ্গ দেন ডাঃ প্রদীপ সহ আরো কয়েকজন ডাক্তার, কর্পোরেশনের লোকজন ও দুজন এম্বুলেন্স ড্রাইভার। কিন্তু রাস্তায় খবর আসে কবরস্থানে ১০০ র উপরে মানুষ জড়ো হয়েছে। এলাকায় গুজব রটেছে।
‘করোনায় মারা যাওয়া কাউকে কবর দিলে কবরস্থানের মাটি দিয়ে ইনফেকশন ছড়াবে এলাকার মানুষের মধ্যে।’
মৃত্যু ভয়ে মৃত, বোকা, হুজুগে মানুষগুলো জড়ো হয়েছে কবরস্থানে। এই কবর দিতে দেবেনা ওরা।
অশান্তি এড়াতে এম্বুলেন্স নিয়ে যাওয়া হলো ভেলানগাডু কবরস্থানে। ছয় ফুটের মতো কবর খোঁড়া হয়েছে তখন। ৫০- ৬০ জন মানুষ ছুটে আসে ডাঃ প্রদীপদের দিকে। হাতে লাঠি। এলোপাথাড়ি পাথর ছুঁড়তে থাকে অনেকে। রইলো পড়ে কবর। সবাই দিকভ্রান্ত হয়ে ছুট লাগলো এদিক ওদিক।
শরৎচন্দ্রের ‘লালু’ গল্প কিংবা ‘এক যে ছিল রাজা’র দৃশ্য মনে পড়ে যাচ্ছে। ঝড় উঠেছে। আর সবাই ‘শব’ ফেলে রেখেই প্রাণ বাঁচাতে এদিক ওদিক ছুট লাগিয়েছে। তাই না?
না। এখানে হাওয়ার ঝড় ওঠেনি। পাথর আর লাঠির ঝড় উঠেছে। তারই আঘাতে দুই এম্বুলেন্স ড্রাইভারের মাথা ফেটে চৌচির। গলগল করে রক্ত ঝরছে। তখন ডাঃ প্রদীপ উঠে বসলেন এম্বুলেন্সের ড্রাইভারের সিটে। আহত দুই ড্রাইভারের সাহায্যেই বন্ধুর দেহ গাড়িতে যাহোক করে ঢুকিয়ে ছুট লাগালেন। ততক্ষণে এম্বুলেন্স আর অক্ষত নেই। কাঁচ ভেঙে গেছে। লাঠি আর পাথরে গোটা ধাতব শরীর তুবড়ে গেছে।
রাত তখন এগারো। প্রশাসনের সাহায্যে ডাঃ প্রদীপ আবার বন্ধুকে নিয়ে কবরস্থানে ফিরলেন। না। সে এমন অন্তিম পরিণতির যোগ্য নয়। সাধারণ কবরগুলো যেখানে ১২ ফুটের মতো গভীর হয়। সেখানে ৮ ফুটের একটা অগভীর গর্ত খুঁড়ে বন্ধুকে মাটি চাপা দিলেন।
কাদা মাখা ঐ আঙুলগুলো আর কোনোদিন কী নিজের জীবনপণ করে স্টেথো ধরতে পারবে? ডাঃ প্রদীপ যখন আট ফুটের ঐ অগভীর একটা গর্ত তাড়াহুড়ো করে খুঁড়ে বন্ধুর দেহটাকে গুঁজে কাদা চাপা দিলেন; তখন নিশ্চই তাঁর মনে হচ্ছিল প্রদীপ যেন নিজের দেহ নিজেই মাটি চাপা দিলেন! এটা তাঁরও ভবিষ্যৎ। সিমনের মতো তিনিও ডাক্তার। মনে হওয়াটা সমস্ত ডাক্তার ও নার্সের কাছেই স্বাভাবিক। যাঁরা বাড়িতে না বসে থেকে নিজের জীবন পণ করে হাসপাতালে যাচ্ছেন করোনার রুগীর চিকিৎসা করতে। যেখানে কবরস্থান থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর কোনো সম্ভাবনা নেই।
খবরটা পড়ে আঁতকে উঠেছিলাম। অজানা একটা ভয় বুকে চেপে ধরেছে। সেদিন আমার জন্মদিন ছিল। সকাল থেকে এক এক করে বাবা মা ভাই বোনদের সাথে কথা বলছি। বাবা বারবার করে ট্রান্সফার করিয়ে কলকাতা ফিরতে বলছেন। ছেলে দূরে। তাই ভয় পান ওনারা। আমি এতোদিন ভয় পেতাম না। কিন্তু ডাঃ সিমনের এই অন্তিম পরিণতি দেখে আমি ভয় পেতে শুরু করি। মহারাষ্ট্র ও গুজরাতের সীমান্ত এলাকায় আমার হাসপাতাল। করোনার গুদামের উপর যেন বসে আছি। আমি জানি, আমি মারা গেলে আমার দেহ কলকাতা যাবেনা। আমার বাপ মা আমার মুখ দেখতে পাবেনা। আমার দেহ হয়তো এইভাবেই রাতের অন্ধকারেই কোথাও গুঁজে দেওয়া হবে। সরকার চাইলেই কী আমাদের সম্মানের সাথে ‘অন্তিম যাত্রা’র সৌভাগ্য করে দেবে? আইন করে কখনো মানুষের মন পরিবর্তন করা যায়না।
আসলে মানুষ বাঁচতে চায়। বাঁচার জন্য মানুষ পাগল হয়ে যাচ্ছে। ঠিক ভুল বিচার করতে পারছেনা। রাগ করতে পারিনা এই মৃত্যুভয়ে ভীত মানুষগুলোর উপর। অভিমান হয়।।

~ ডাঃ সাফিন আলী
(ছবিটি প্রতীকী। নেট দুনিয়া থেকে নেওয়া)

48