সাফিন আলী

কুলিক রোববার এপ্রিল ২৬,২০২০:

ডাক্তার আশিক আলী হাঁফাতে হাঁফাতে ডক্টরস রুমে এসে ঢুকলেন। কপাল জুড়ে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। পরিপাটি জামা সুন্দর করে বেল্টের তলায় ইন করা। ডাঃ আশিক হাসপাতালের নামকরা সার্জেন। নিজেই দামি গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে আসেন। ছোকরা ডাক্তার এই কম বয়সেও বেশ নাম কামিয়ে ফেলেছে। লোকে বলে উপরওয়ালা হাত দিয়েছে বটে! এসির হাওয়া খেয়ে আসার পথে কপালে এমন ঘামের কোনো কারণ না থাকারই কথা।
মুম্বাইয়ের রাস্তা ফাঁকা ফাঁকা। লকডাউনে মোড়ে মোড়ে মাস্ক সাঁটা পুলিশের নাকাবন্দী। করোনা যেন না গলে যায়। ডাঃ আশিকের গাড়ির সামনে লাগানো স্টিকার দেখে পুলিশ পথ আটকায় না। গাড়িটা একটু আস্তে করলেই হাসি মুখে স্টিকার দেখে হাত তুলে রাস্তা করে দেয়।
বান্দ্রা বাস টার্মিনাসের মোড় ঘুরতেই জটলা চোখে পড়ে। একজন মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে। তাকে ঘিরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে। একজন লোকটার হাত ধরে টেনে টিনের গুমটির আড়ালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। যেন গুলি খাওয়া লোক। বাকিরা সন্ত্রস্ত চোখে রাস্তার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। ওরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না হাত লাগাবে নাকি পালিয়ে যাবে! ডাক্তারের গাড়ির হর্নের আওয়াজে লোকগুলো যেন ভোজবাজির মতো উবে গেল। যন্ত্রণা কাতর লোকটা টিনের গুমটির আড়ালে মুখ লুকিয়ে নিজেকে আপ্রাণ টানছে।
লোকটার গায়ে কোথাও আঘাতের কোনো চিহ্ন নেই। মাটিতে জামা কাপড়ে এক নজর বুলিয়ে কোথাও রক্তের দাগ চোখে পড়লো না।

  • ক্যায়া হুয়া হ্যায়?
    প্রশ্ন শুনে লোকটা বিস্ফোরিত চোখে ডাক্তারের চোখের দিকে তাকায়। লম্বা, জিম করা শরীর দেখে এই ডাক্তারকে সাদা পোশাকের পুলিশ ভাবার মতো ভুল মানুষ করতেই পারে। লোকটার চোখের ভাষা যেন ভয়ে মৃত্যু যন্ত্রণা ভুলে গেছে। পুলিশ। সেদিনকার পুলিশের লাঠির দাগ এখনো পাছায় আছে।
    এই মোড়ের অদূরেই কিছুদিন আগে অনেক বিদেশ বিভুঁইয়ের শ্রমিক এসে জড়ো হয়েছিল। এরা মুম্বাইয়ের আকাশ ছোঁয়া বিল্ডিং ঘাড়ে করে তোলে। এরা নির্মাণ শ্রমিক। কিংবা আশপাশের হোটেলে কাজ করে। আশা ছিল বাড়ি ফেরার। সে হয়নি। ক্ষেপা কুকুর হয়ে ওঠে সবাই। এই মানুষগুলোর পেটের ক্ষিদের থেকেও মানসিক চিকিৎসা দরকার। এরা বাড়ি ফেরার জন্য উন্মুখ। এরা মৃত্যুভয়ে মরছে। মরলে হয়তো বাপ মা বৌ মরা মুখও দেখতে পাবেনা। করোনার ভয়ে পুড়িয়ে দেবে বা মাটি চাপা দিয়ে দেবে কোনো অজানা জায়গায়। শেষবারের মতো কী দেখতে পাবে বাড়িতে ছেড়ে আসা ফুটফুটে তিনমাসের মেয়েটার মুখ?
    ডাঃ আশিক লোকটার গায়ে হাত দিয়ে ওর পাশে বসলেন। এতে রুগী ডাক্তারকে আপন করে নেয়। বড় ভাইয়ের মতো বলেন, আপনার শরীরে কী অসুবিধে হচ্ছে? আমি ডাক্তার আমাকে বলুন।
    কথায় লোকটা আশ্বাস পেলো বোধহয়। আশেপাশে লুকিয়ে থাকা মানুষগুলোও সাহস পেলো। যে লোকটা ওর হাত ধরে টেনে রাস্তা থেকে ওকে গুমটির আড়ালে নিয়ে যাচ্ছিল সে বেরিয়ে আসে।
    ‘ পেট পে দরদ হ্যায় সাহেব। বহুত দরদ হো রাহা হ্যায়।’
    করোনা আক্রান্ত শহর। স্বপ্নের শহর – রুপোলি পর্দার শহরে মড়ক লেগেছে। শয়তানের কালো ছায়া যেন রাতারাতি এই শহরকে শ্মশান বানিয়েছে। যে শহরে টাকা ওড়ে। ভিখারীও মুম্বাইয়ের জিয়নকাঠির ছোঁয়ায় কুবের হয়ে ওঠে, সেই শহর এখন মানুষ ছাড়তে চায়। প্রাণে বাঁচতে মানুষ পায়ে হেঁটেই ১৫০ কিমি পাড়ি দিচ্ছে। বাঁচা দরকার।
    করোনার ভয় লেগেছে হাসপাতালগুলোর গায়েও। সমস্ত আউটডোর বন্ধ। করোনার মতো উপসর্গ না থাকলে হাসপাতালে না আসা যেন অলিখিত নিয়ম। মানুষ পা ভাঙা নিয়ে বাড়িতে বালিশের উপর পা তুলে বসে। দিন গুনছে লকডাউন ওঠার। তখন অপারেশন হবে। করোনার ভয়ে যেন বাকি সব রোগও আত্মগোপন করেছে। কারো কোনো রোগ নেই। বাকি সব রোগের আউটডোর খাঁ খাঁ।
    ডাক্তার লোকটাকে পাঁজাকোলা করে নিজের গাড়িতে তুলে নিলেন। এই লোকটার কাশি জ্বর নেই। কিন্তু এর পেটের অসম্ভব ব্যথা। মারণঘাতী। লংগরখানায় দুবেলা খিচুড়ি খেয়ে এসে ঘরবন্দি জীবন কাটাতে গিয়ে এই মানুষগুলোর দিনলিপি পাল্টে গেছে। ডাক্তার আশিক জানেন পেটের ব্যারাম, কোষ্ঠকাঠিন্য এখন সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা। তবু হাসপাতলে আসেনা এরা কেউ। রোগ চেপে বাড়িতে বসে থাকে। জ্বর কাশি হয়নি। তাই রাস্তায় বেরোনো মানা। বেরোলে পাছা লাল হওয়ার সম্ভাবনা।
    ডক্টরস রুমে ঢুকেই নিজের জুনিয়রকে ডাক্তার তাড়া লাগালেন।
  • ‘ওটি রেডি করো। অপারেশন কারনা হ্যায়। এপেন্ডিসাইটিস।’
    চেঞ্জিং রুমে ঢোকার মুখে দাঁড়িয়ে বললেন , USG র রিপোর্ট আনার পথে সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ পরশ প্যাটেলকে ডেকো। কথা আছে আমার।
    মানুষগুলো ঘরবন্দি থেকে পাগল হয়ে উঠেছে। দেশ জুড়ে খুপরিতে খুপরিতে একলা মানুষ পাগল হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। ক্ষিদে পেট আর বেকারত্বের জ্বালা। মানুষ ঘরে থাকার নয়। এদের বাইরে বেরোনো চাই। এর শেষ চাই।।

206