লকডাউন আর আমি

জীবনের অর্ধ-শতাব্দী পার করে এসেও এই চিত্র কোনদিন দেখিনি!

লকডাউনের কথাই বলছি। ডুয়ার্স এলাকায় বড় হয়েছি। বাড়ির কাছাকাছি নানা চা-বাগান। আর সেই চা-বাগানের সূত্র ধরে ‘লকআউট’ শব্দটার সঙ্গে ছোট থেকে পরিচিত ছিলাম। আবার, বরাবরের কৌতূহলের জায়গা থানাতেও বিভিন্ন কাজে কয়েকবার যাওয়ার সূত্রে ‘লকআপ’ ব্যাপারটাও উঁকিঝুকি দিয়ে দেখেছি। কিন্তু লকডাউন? সত্যি বলছি, জানতাম না আগে।

বিচ্ছিন্ন থাকবার এই দিনগুলি কীভাবে কাটছে, কী ভাবছি, এই প্রশ্নগুলি এলে খানিকটা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে! কেননা, লকডাউন পর্বে যা প্রতিটি মানুষের একান্ত করণীয়, তার অনেকটাই আমি করতে পারিনি। এক চরম অসহয়তায়, অনেক ক্ষেত্রে, বাধ্য হয়েছি নিয়ম ভাঙতে। একটু বিশদেই বলি।

আমার বাবা-মা থাকেন ফালাকাটায়। আমি সপরিবার কোচবিহারে। জানুয়ারি মাসের শেষদিকে হিপ জয়েন্ট ভেঙে যাওয়ায়, মা ও বাবাকে নিজের কাছে এনে রাখি। মা’কে ট্র্যাকশন দিয়ে শুইয়ে রাখা হয়। তিরাশি বছর বয়স্কা মহিলার অপারেশনের ঝুঁকি ডাক্তারবাবু নিতে চাননি। এভাবে ফেব্রুয়ারি মাস কাটবার পর, মার্চ মাসে, দোলযাত্রার দু’চারদিন আগে থেকে মায়ের রক্তপাত শুরু হয়। প্রাবল্য এতটা বাড়ে যে, শেষটায় মা’কে নার্সিং হোমে নেওয়া হয়। প্রায় দিন পনের থেকেও সেই রক্তপাত বন্ধ করা গেল না। ততদিনে নয় ইউনিট রক্ত দেওয়া হয়ে গেছে। গত্যন্তর না দেখে মা’কে নেওয়া হয় শিলিগুড়িতে। দু’দিনে চার বোতল রক্ত সেখানেও দেওয়া হয়। একটু সুস্থতার দিকে যেতে না যেতেই শুরু হয়ে যায় লকডাউন।

মা’কে শিলিগুড়িতে নার্সিং হোমে ভর্তি করে, দুদিন সময় নিয়ে, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য কোচবিহারে ফিরে এসেছিলাম। সেদিনই পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা হল। পরদিন থেকে শুরু হল লকডাউন। প ব সরকার প্রথমটায় সাতাশে মার্চ অবধি লকডাউন ঘোষণা করায় ভেবেছিলাম যে, তেমন অসুবিধে হবে না, যদিও টিভি-তে দেখছিলাম তখন যে, লকডাউন অমান্য করায় পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে। এই অবস্থাতেও কোচবিহার থেকে শিলিগুড়ি পৌঁছলাম ড্রাইভারের সাহসিকতায়। ধন্যবাদ জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ি পুলিশকে। তারা পাহাড়পুর মোড় ও ভেনাস স্কোয়ারে আটকালেও নার্সিং হোম শোনা মাত্রই ছেড়ে দিয়েছিলেন।

কিন্তু মুশকিল হল এবার যে, থাকব কোথায়! বোনের মেয়েটির পরীক্ষা বলে ওর বাড়ি থাকতে চাইনি। এক বন্ধু তাদের বাড়িতে আহ্বান করল প্রথমে। কিন্তু আধাঘন্টার মধ্যেই ফোন করে জানাল যে, ওদের কম্লেক্সে বহিরাগত প্রবেশ নিষেধ হয়ে গেল! জীবনে অনেকবার অনেক ব্যাপারে প্রত্যাখ্যাত হয়েছি। ‘বহিরাগত কোচবিহারে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে’ জাতীয় কথাও শুনেছি। কিন্তু কোনদিনই তার জন্য কোথাও ঢুকতে পারব না এরকমটা ভাবিনি। লকডাউনের প্রথম শিক্ষা আমার এটাই যে, পরিচিত প্রিয়জনও দূরের হয়ে যায় এক মুহূর্তে। ওদের দোষ নেই কোনও। পরিস্থিতিটাই এরকম যে! ঠিক করলাম যে, হোটেলে থাকব। আসলে তখনও বুঝিনি লকডাউনের গুরুত্বটা কী! আশ্রয় পাওয়া তো দূরের কথা, চোখের সামনে দেখলাম যে, হোটেল ফাঁকা করে দেওয়া হচ্ছে! কী করব কোথায় যাব ভাবতে ভাবতে ততক্ষণে আক্ষরিক অর্থে নার্সিং হোমের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। রাস্তাও শুনশান। জনপ্রাণী নেই। দোকানপাট খোলা নেই। কোনও শব্দ নেই। তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ। কিন্তু জল কিনতে পারছি না। খিদেয় নিজের মরণদশা, কিন্তু খাব কী! পকেটে টাকা। তবু কোনও উপায় নেই। দ্বিতীয় শিক্ষা পেলাম- শহরে মানুষ একা থাকতে পারে না। জঙ্গলে পারলেও পারতে পারে!

অগত্যা বোনের বাড়িতে একরকম জোর করেই উঠতে হল। শ্বশুরবাড়িতে ওকে সমস্যায় ফেলছি বুঝেও, স্বার্থপর হয়ে উঠেছি। কী করব তাছাড়া! ওর বাড়ি থেকে অনুজ স্নেহের বীরু বর্মনের স্কুটারে ‘নার্সিং হোম’ লিখে যাতায়াত করছিলাম। পানিট্যাঙ্কি মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশরা দু’চারবার দেখলেন। কিন্তু আটকালেন না। সেবক রোডের মতো ব্যস্ত পথে রাজার হালে স্কুটার চালাব এরকমটা কোনোদিন ভাবি নি। আমার তৃতীয় শিক্ষা হল যে, সবকিছু ভাবতে নেই, বিশেষ করে রাজপথে একা চলব এরকম ভাবনা কখনই ভাবা উচিত না। স্বয়ং রাজাও বোধহয় এরকমটি চাইবেন না। যাহোক, ডাক্তারবাবুও মা’কে আর রাখতে চাইছেন না। মা’কে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, ভাল হল ইত্যাদি ভেবে মঙ্গলবার রাতে বোনের বাড়ি ফিরে জানলাম যে, রাত থেকে সারা দেশ লকডাউন হয়ে যাচ্ছে।

এবার শুরু হল আমার চরম দুরাবস্থা। মায়ের জন্য রাখা কোচবিহারের দু’জন আয়া, যারা এতদিন মায়ের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন, জানালেন যে, তারা এই অবস্থায় বাড়ি থেকে বেরোতে পারবেন না। আমার গৃহস্থালি কাজে সাহায্যকারী যারা, তারাও জানালেন যে, তারা থাকতে পারবেন না। তাদের ও পুত্রের জিম্মায় ছিয়াছি বছরের বাবাকে রেখে আমি সস্ত্রীক শিলিগুড়ি এসেছিলাম মায়ের জন্য। কী করব কীভাবে সামলাব ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে রাত কাটল অনিদ্রায়। ততক্ষণে আর ভাবতে পারছি না। ফালাকাটা কোচবিহার মিলে শতাধিক ফোন করেও মা’কে নিয়ে যাওয়ার কোন পথ আর পাচ্ছি না। শেষটায় ডাক্তারবাবুই পথ বাতলালেন। মা’কে আরও দু’চারটে পরীক্ষা করবার জন্য আরও কিছুদিন রাখবেন ঠিক করলেন। ইতিমধ্যে নার্সিং হোমে ঢোকাও সীমাবদ্ধ হয়ে গেল। দিনে পাঁচমিনিটের জন্য একটিবার ঢোকা কেবল। ডাক্তারবাবুর পরামর্শেই মা’কে নার্সিং হোমে একা ফেলে রেখে আমরা কোচবিহার ফিরলাম আবার।

দু’চারদিন পর, শেষটায় একটা ব্যবস্থা হল। শিলিগুড়ি থেকে একজন আয়া পাওয়া গেল। তিনি ফালাকাটা অবধি আসতে রাজি হলেন। চব্বিশ ঘন্টা থাকবেন। ফালাকাটায় একটি মেয়ে বাবা-মায়ের দেখভাল করে। সে জানুয়ারি থেকে বাড়িতে বলতে গেলে একাই রয়েছে। সবদিক বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে, বাবা-মা’কে ওখানে রাখাই ঠিক হবে। এমনিতে ওই বাড়িতে থেকে অভ্যস্ত ওঁরা। এতদিন ধরে বাড়ি ছাড়া হয়ে হাঁপিয়েও উঠেছেন। তাছাড়া কোচবিহারে রাখবার মতো কোন অবস্থা নেই। নিজেরাও, অন্তত লকডাউনের সময়টুকু, ফালাকাটায় থাকতে পারব। কোচবিহার থেকেও যাতায়াত করতে পারব। অবশেষে মা ছাড়া পেলেন। তাঁকে ফালাকাটায় নিজের প্রিয় আশ্রয়ে রাখা হল।

লকডাউনের এই দুঃসহ সময়ে আমাকে হামেশাই কোচবিহার-ফালাকাটা-শিলিগুড়ি করতে হয়েছে বা হচ্ছে। ভাইরাস আক্রান্ত হতে পারি জেনেও ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। নার্সিং হোমে থাকবার দিনগুলির মতো দুরূহ না হলেও, মায়ের প্রয়োজনীয় রক্তপরীক্ষা এখনও করাতে পারিনি। কেননা রক্তের নমুনা নিতে বাড়িতে কেউ আসছেন না। মা’কে ল্যাবে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। মা একেবারেই শয্যাশায়ী।

ব্যক্তিগত এই সমস্যাকে পাশে সরিয়ে রেখে যদি বৃহত্তর দিকে তাকাই, তাহলে বলব যে, অত্যন্ত প্রয়োজনীয় লকডাউন প্রকৃত অর্থেই আমাদেরকে কৃচ্ছসাধন করতে বাধ্য করাচ্ছে। জাতীয় সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক-ড্রাইভারকে দেখেছি একটু চাল-ডালের জন্য ময়নাগুড়ির গ্রামের বাড়ি বাড়ি আবেদন করতে। দেখেছি, ফেরি ক’রে বেড়ানো মাছওয়ালা বাড়ি থেকে সেফটিপিন চেয়ে মাস্কের ছিঁড়ে যাওয়া ফিতে জোড়া লাগাচ্ছে। জানালা দিয়ে তাকালে দেখতে পাচ্ছি যে, বিহারি নাপিত সেলুন বন্ধ রেখে রাস্তাতে টুল পেতে কাস্টমারের চুল কাটছে। দেখেছি যে, কোচবিহারের পামতলা মোড়ে যে মানুষগুলি রাস্তায় চেয়ার পেতে লটারির টিকিট বিক্রি করে, তারা দূর থেকে নিজেদের জায়গাগুলিকে চোখ দিয়ে মেপে যাচ্ছে। দেখেছি, ফালাকাটার বন্ধ বাড়ি খানিকটা বায়না করেই পরিষ্কার করছে দিনমজুর মংলু। দেখেছি, টেকাটুলির প্রসিদ্ধ ঝুড়ি-বোঁদের দোকানের মালিক গালে হাত দিয়ে ফাঁকা জাতীয় সড়কের দিয়ে চেয়ে রয়েছেন। দেখেছি, ডায়াবেটিক রুগীর একটু হাঁটবার জন্য ছটফটানিকে। দেখছি, মুদী দোকানের সামনে ধৈর্য্য ধরে দাঁড়িয়ে আছে অগুনতি মানুষ, ফাঁকা পেট্রোল পাম্পে হঠাৎ তেল নিতে আসা স্কুটার, সন্ধ্যে সাতটার নির্জনতম রাজপথ, কোলাহলহীন শূন্য মন্দির, মৃতদেহের মতো দাঁড়িয়ে থাকা উঁচুতলগুলিকে। দেখছি, ধীরে ধীরে আবার নীল হয়ে যাচ্ছে মুজনাইয়ের জল, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা ফিরছে বাড়ির পাশের কৃষ্ণচূড়ার ডালে, উত্তর আকাশে ঝকঝক করছে নীল পাহাড়।

এরকম অজস্র কথা বলা যায়। কিন্তু জানি লকডাউন ছাড়া এই পোড়া দেশে আপাতত কোনও উপায় নেই। কেননা টেস্টের ব্যবস্থা অপ্রতুল ও ব্যয়বহুল। ভেলোর ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজ ও হসপিটালের ওয়েবসাইটে টেস্টিং কিটের দাম দেখাচ্ছে ৪৫০০ টাকা। কতজনের পক্ষে সে টাকা খরচ করা সম্ভব? তাই যে পদ্ধতিতে দক্ষিণ কোরিয়া বা ভিয়েতনাম করোনাকে আটকে রাখতে পেরেছে সে পদ্ধতি এখানে দুর অস্ত বলেই মনে হয়। নির্দিষ্ট জোনকে লকডাউন করে বাকি অংশ ছাড় দেওয়ার পদ্ধতি কতটা সফল হবে, সেটা নিয়েও সংশয় রয়ে যাচ্ছে। ‘লকডাউনে বাড়িতে থাকুন’ আবেদন বা নিরন্নদের হাতে কয়েকদিনের খাদ্যসামগ্রী তুলে দিয়ে এই সমস্যা মিটবে না। টেস্ট আর টেস্ট আর টেস্ট ও কোয়ারেনটাইন, এলাকাভিত্তিক লকডাউন, আইসোলেশন হয়ত খানিকটা রেহাই দিতে পারে। তা না হলে ইতিমধ্যে ভেঙে পড়া অর্থনীতি যে কী বিপদ আনবে আগামীদিনগুলিতে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। বিপদ তাই দু’দিকেই- ঘরে থাকলেও, বাইরে বেরোলেও।

মহামারী বোধহয় এই জন্যই বলে। করোনার প্রকোপ একদিন কমবে, প্রতিষেধকও আবিষ্কার হবে। কিন্তু যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তার ফল সত্যিই সুদূরপ্রসারী। ব্যক্তিগত অসুবিধার পাশাপাশি যেভাবে সামগ্রিক ব্যাপার দেখছি তাতে একটি কথাই মনে হচ্ছে যে, প্রকৃতির কাছে মানুষ আজ‌ও বড্ড অসহায়, তার সব শক্তি নিয়েও….

শৌভিক রায়, শিক্ষক ও সাহিত্যিক, কুচবিহার

20