এপ্রিল ১২, ২০২০:
লকডাউন
লকডাউন চলছে। আজ ১৯তম দিন। সকলেই গৃহবন্দী। সবার সব রুটিন বদলে গেছে। আগে ঘরে শুয়ে বসে থাকা পাবলিককে যেমন ঘরকুনো, অলস, অকর্মা বিভিন্ন উপাধি দেওয়া হতো আজ তাদের কেই প্রকৃত সমঝদার নাগরিক বলে সম্মোধন করা হচ্ছে। সত্যি, এখন ঘরকুনো হয়ে থাকাটাই একমাত্র যে ওষুধ।
অনেক জ্ঞানের কথা বলে ফেললাম।
তবে পাপী পেট, সে তো আর বোঝেনা। সপ্তাহের ছয় দিন গৃহবন্দী থাকলেও সপ্তম দিনে আপনাকে দানাপানি সংগ্রহের জন্য বাইরে বের হতেই হবে। মাস্ক বেঁধে তো কেউ সাথে আবার গ্লাভস পরে।কারণ পেটের মানসিক অবস্থা তো আর করোনা নামক ভাইরাস বুঝবে না। তিনি তো দেমাগী। বড্ড দেমাগী। নিজে যেচে ঘরের দরজার সামনে না আসলেও সুযোগ পেলেই কপাৎ করে ধরবে। এখন যুদ্ধ চলছে মানসিক চাপে থাকা পেটের সাথে আপাদমস্তক দাম্ভিক করোনার।
এমন চাপে ফেলেছে যে মানুষ এখন তার নিজের হাত কেই ভরসা করতে ভুলে গেছে। সেখানে অন্যের সাথে গপ্পো নৈব নৈব চঃ। একটা হাঁচি, একটু নাক টানা দেখলেই চারপাশটা সেকেন্ড ফাঁকা হয়ে যায়। হাসিও পায় সাথে কান্নাও। কি দিনকাল আসলো।
কিন্তু সময় কাটাতে হবে। টিভি, ফোন, গান কিছু সময় ভালো লাগে তারপর আর না। তারপর আমার অবস্থান তো আবার টং এর উপর। আরে না না, মানে বলতে চেয়েছি ফ্ল্যাটের টপ ফ্লোরকে। ওপরে ওঠা নামা মানে শখানেক সিঁড়ি ভাঙা। তাই ভয়ে নামার কথা মাথায় আনাটাও আর একটা ভয়। আসলে অলস ও অকর্ম হবার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি।তবে ঘরে বসে বসে যাতে শরীরে কল কব্জায় মরচে না ধরে তার জন্যও উপায় ২৪ তারিখেই বের করে নিয়ে ছিলাম। ৩২০০ স্কোয়ার ফিটের ছাদে মর্নিং ওয়াক, ইভিনিং ওয়াক, নাইটওয়াক সব চালাতে হবে। সাথে মাথায় যাতে আবার জং না ধরে সেজন্য এক বয়স্ক কাকুর সাথে লকডাউন নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা তবে ডিসটেন্স মেন্টেন করে কারণ দুটো ফ্ল্যাটের মাঝে দুমিটার খানিক গ্যাপ তো হবেই।
বাঙালি তো….
আড্ডা ছাড়া ঠিক জমে না।
তারপর কাকুর চায়ের ঠেক বন্ধ। কিন্তু আমার মতো অলস পাবলিক পেয়ে ওনার ছাদের ঠেক ভালোই জমেছে।কাকু একটু বেশি বকবক করলেই কাকিমা ব্রেক কষে দেয়। তবে আজকাল দেখছি কাকিমা কিছু বলছেন না। তাকে দেখে মনে হয় খুব চিন্তায় আছেন। তার পরিবার মানে তার বাপের ভিটার গ্রাম করণদিঘি। গ্রামের মানুষদের জন্য খুব দুশ্চিন্তা। কারণ গ্রামের বহু মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক। কেউ কেউ বাড়ি ফিরেছে লকডাউন এর আগেই। কেউ কেউ আটকে গেছে ভিন রাজ্যে।করোনার ভয় যেমন আছে, ঠিক তেমন ভাবেই আছে না খেতে পেয়ে মারা যাবার ভয়টাও। ইদানিং কাকিমা খুব উদাসীন। চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। গতকাল কাকু বললেন আজ থেকে তিনি এক অন্য কথা বলবেন, অন্য গল্প শোনাবেন। গল্পটা নাকি ভুখমারী ও মহামারীর। অপেক্ষায় আছি।
সোমা সরকার, শিক্ষক, রায়গঞ্জ, উত্তর দিনাজপুর