করোনা ডায়েরি
এপ্রিল ৯,২০২০: ইতিহাসে, সাহিত্যে অনেক সঙ্কটকালের কথা পড়েছি l যুদ্ধবিগ্রহ, দেশভাগ, অনাহার, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ – লেখার হরফে এই দুর্যোগের দিনগুলির পরোক্ষ ধারণা পেয়েছি l এসেছে নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয় – বন্যা, খরা, ভূমিকম্প l এক একটি সংকটে পৃথিবীর এক একটি রূপ স্পষ্ট হয়েছে l মানুষ যেন তার ভৌগোলিক পরিবেশকে, তার প্রতিবেশীদের নতুন করে চিনে নিয়েছে l স্মরণকালের মধ্যে আমরা দেখেছি ভূপালের গ্যাস বিপর্যয়, সুনামি, গুজরাটের ভুজ এর ভূমিকম্প, মহারাষ্ট্রের লাটুর এর ভূমিকম্প ইত্যাদি l কখনো প্রাকৃতিক কারণে, কখনো রাষ্ট্রনেতাদের কোন সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে দুর্যোগ l সাম্প্রতিককালে নোটবন্দির সিদ্ধান্ত মানুষের কাছে এমনই একটা সংকটকাল হিসেবে উপস্থিত হয়েছিল l যখন দুর্যোগ আসে তখন আমাদের এই অতিচেনা পৃথিবীটাই যেন অন্যরকম হয়ে যায় l
একটি ভাইরাস, যাকে খালি চোখে দেখাও যায় না, এত ছোট, তার উপদ্রব সারা পৃথিবীকে এমন বিপদে ফেলেছে, স্মরণকালে তার কোনো দ্বিতীয় উদাহরণ নেই l যেটা এখন জানা যাচ্ছে 2019 সালের নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি নাগাদ চীনের উহান প্রদেশে এই ভাইরাসের উদ্ভব হয়েছিল l কিন্তু বিষয়টি তখনই প্রকাশ করা হয়নি l যখন এই ভাইরাস ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পৌঁছে গেছে এবং মানুষ ক্রমে আক্রান্ত হতে শুরু করেছে এবং মারা যেতে শুরু করেছে তখন এটা প্রকাশ পেল l দুই হাজার কুড়ি সালের জানুয়ারি মাসের শেষ নাগাদ এটা মোটামুটি পৃথিবীর সকল দেশ জানতে পারল l ততদিনে করোনাভাইরাস সারা পৃথিবী জুড়ে অনেকটাই ছড়িয়ে পড়েছে এবং অনেকটাই ক্ষতি হয়ে গেছে l তার পরেও প্রায় এক দুই মাস কেটে গেল l মার্চ মাসের 11 তারিখ WHO এই ভাইরাসকে প্যানডেমিক ঘোষণা করল l তারপরে বিষয়টার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হল l ভারত সরকার এই সময়ও কোন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে নি l WHO এর ঘোষণার 11 দিন পর মার্চ মাসের 22 তারিখ করোনা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে মানুষকে সচেতন করবার জন্য একদিনের জনতা কার্ফু জারি করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি l
ঠিক তার দু তিন দিন পর, 25 শে মার্চ থেকে এপ্রিল 14 পর্যন্ত লক ডাউন ঘোষণা করা হলো l অর্থাৎ মানুষ নিজের বাড়িতে বন্দি থাকবেন l সমস্ত রকমের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হলো l আন্তর্জাতিক উড়ান, অন্তর্দেশীয় উড়ান, ট্রেন-বাস, অটো, টোটো, সমস্ত রকম যানের চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী হল l স্কুল-কলেজ, সরকারি-বেসরকারি অফিস, সিনেমা হল, শপিংমল, যে কোনো রকমের অনুষ্ঠান, পাবলিক গেদারিং বন্ধ থাকবে l একমাত্র জরুরী পরিষেবা ক্ষেত্রগুলি খোলা থাকবে যেমন পুলিশ, ব্যাঙ্ক, হাসপাতাল, পৌর পরিষদ, ওষুধের দোকান, সবজি বাজার, মুদিখানার দোকান প্রভৃতি l
লক ডাউনের দিনগুলিতে ঘরে বন্দী অবস্থায় চেনা পৃথিবীটাকে অন্যরকম ভাবে চিনছি l পথঘাট সুনসান l লোকজন বেরোচ্ছে না l প্রথম দিকটায় প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর ছিল l যারা পথে বেরিয়েছিল তাদের ওপর পুলিশের লাঠি চলেছে l ধীরেধীরে বিষয়টি একটু মানবিক হলো l প্রশাসন কঠোর থাকলো কিন্তু বাড়াবাড়ি বন্ধ হল l বিশেষ প্রয়োজনে মানুষ মাস্ক পরে বেরুচ্ছেন l নিজেদের গ্রাম শহরকেই অন্যরকম মনে হচ্ছে l মানুষজন যেন গ্রহান্তরের জীব l
প্রথম দিকে ভয় পেয়ে মানুষ বেশি বেশি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বাড়িতে স্টক করতে শুরু করলেন l কিন্তু পরবর্তীতে প্রশাসনের প্রতিশ্রুতিতে এই প্রবণতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল l যেমনটা সবাই ভয় পেয়েছিলেন, লক ডাউন শুরু হলে বাজারে কিছুই পাওয়া যাবে না, পরবর্তীতে দেখা গেল যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকান খুলছে, বাজার বসছে, ফলে মানুষের এই উন্মাদনা ধীরে ধীরে কমলো l প্রশাসন ও নানা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা থেকে গরিব মানুষদের খাদ্যদ্রব্য বিতরণ করা হলো l রেশন দোকানের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করা হল l
যাদের ছুটে বেড়ানোর অভ্যেস, কাজে এবং নেশায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে ঘরে বন্দী হয়ে আছেন l একটা নতুন ধরনের জীবন তারা দেখছেন l টিভির পর্দায় প্রতিনিয়ত করোনা আক্রান্তের পরিসংখ্যান ফুটে উঠছে l পৃথিবীজুড়ে, দেশজুড়ে, রাজ্যজুড়ে কিভাবে প্রতিদিন করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, তার ওপর চোখ রেখে চলেছেন মানুষ l করোনা পরিষেবায় সরকার কী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে তার সংবাদ আসছে l আশার কথা এর মধ্যে প্রচুর মানুষ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন l
যারা সৃষ্টিশীল মানুষ, এর মধ্যে তাদের সৃষ্টির কিন্তু বিরাম নেই l যারা লেখালেখি করেন তারা বাড়িতে বসেই লিখছেন l সোশ্যাল সাইটে সেগুলো প্রকাশিত হচ্ছে l করোনা ভাইরাসের আক্রমণ এবং তাকে ঘিরে মানুষের এই যে বর্তমান জীবনযাপন তাকে ঘিরে নানা ধরনের ছড়া, গল্প, কবিতা, উপন্যাসের সিরিজ লেখা চলছে l
যারা গান করেন তারা গানের চর্চা জারি রেখেছেন l ছবি আঁকেন যারা তাঁরা তাঁদের সৃষ্টিশীল মন নিয়ে নানা ধরনের ছবি আঁকছেন এবং এইভাবে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছেন l এই সময়ের আতঙ্ক, এই সময়ের অনিশ্চয়তা বিষয়গুলো বিভিন্ন ধরনের লেখা কবিতা গল্প ছড়ার মধ্যে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে চলেছে l
‘রায়গঞ্জ কালচারাল ফোরাম’ রায়গঞ্জের একটি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক সংস্থা l এর মধ্যেই ঘরবন্দি সৃজনশীল মানুষদের লক্ষ্য করে এই সংস্থা একটি প্রতিযোগিতার আহ্বান করে দিয়েছে স্বরচিত কবিতা রচনা এবং রূপসজ্জা বিষয়ে l পয়লা এপ্রিল থেকে 7 এপ্রিল পর্যন্ত সোশ্যাল সাইটে এই আহ্বান ছিল l প্রচুর সংখ্যক মানুষ এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন l
লক ডাউন এর দিনগুলি ভয়ে, আশঙ্কায় কাটছে l আগামীর চিন্তায় সবাই উদ্বিগ্ন l এই ভাইরাস নিশ্চয় জব্দ হবে l মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যাবে l কিন্তু এর যে ধাক্কা লাগবে অর্থনীতিতে সেটা সম্বন্ধে মানুষ উদ্বিগ্ন l ইতিমধ্যেই সরকার স্বল্প সঞ্চয়ে সুদের হার হ্রাস করেছে l সুদের ওপর নির্ভরশীল বয়স্ক মানুষজনের জীবনে সঙ্কট বেড়েছে l এমন ভয় হচ্ছে যে প্রচুর মানুষ তাদের কাজ হারাবেন l অর্থনীতি এতটাই ভেঙে পড়বে যে আগামী দিনগুলোতে নতুন করে নিয়োগের সুযোগ বেশ কিছু দিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে l
শোনা যাচ্ছে যে লকডাউন এর মেয়াদ আরও বাড়বে l লকডাউন এর কারণে ভারতে করোনা সংক্রমনের ওপর যে রাশ টানা গেছে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় l কিন্তু ভাইরাস নির্মূল হয়নি l ফলে বর্ধিত লক ডাউনের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে এবং সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে l
যাদব চৌধুরী, শিক্ষক ও সাহিত্যিক রায়গঞ্জ,উত্তর দিনাজপুর