এপ্রিল ৯,২০২০: এই লকডাউন দুটো পরস্পরবিরোধী ছবি তুলে ধরল। এক শ্রেণীর মানুষের কাছে এটা বেশ উৎসব উৎসব ব্যাপার। বেশ নতুন এক ধরনের অনুভূতি। কিছুটা মজা কিছুটা ভয়। জীবনে প্রথম মহামারির অংশীদার হবার অভিজ্ঞতা।
যারা সচরাচর নমাসে ছমাসে বাজার মুখো হন তারাও কারি কারি মাল কিনে ঘরে জমালেন। বস্তা বস্তা ওষুধ চাল আলু কি নেই তাতে। তারপর আছে ম্যাগি নুডুলস ঝুরিভাজা চানাচুর বিস্কুট জ্যাম জেলি ময়দা পাউরুটি তেল মশলা ড্রাই ফ্রুট। এমনিতে মাসের বাজারেও এত মাল কেনেন না তারা। আশঙ্কা করছিলেন বাজারে জিনিস অমিল হতে পারে। তাই ছমাসের সঞ্চয় একবারে করে ফেললেন। তারপরেও দেখা গেল লকডাউন এর দুদিন পর থেকেই পাড়ায়-পাড়ায় সবজি মাছ দুধ পনির ইত্যাদির বিক্রেতার আনাগোনা।
অর্থাৎ পকেটে পয়সা থাকলে খাবারের অভাব হলো না। তারা বরং বেশ কিছুদিন অবসর পেয়ে পরিবারের সাথে রেলিশ করে কাটাচ্ছেন বা গৃহকর্মে হাত লাগাচ্ছেন। সেই ছবি ফলাও করে প্রচার হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। গৃহিণীরা নিত্য নতুন খাবার বানাচ্ছেন। হাতে সময় বেশি পেয়ে এই চ্যালেঞ্জ সেই চ্যালেঞ্জে মেতে উঠছেন। আবার যাদের work-from-home করতে হচ্ছে তারা বেশি অভাব অনুভব করছেন গৃহপরিচারিকার।
বয়স্ক মানুষেরা পড়েছেন আতান্তরে। যাদের আয়া নির্ভর জীবন কিংবা দোকান বাজার ওষুধ শিশুদের জন্য অপরের উপর নির্ভর করতে হয় তারা খানিক বিপদে পড়লেন। হাত বাড়িয়ে দিয়েছে কোথাও কোথাও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। পাড়ার বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো। খানিকটা রেহাই তারাও পেলেন।
এরপর রইল আরেকটা শ্রেণি। এদের সংখ্যা 80 কোটি। ভারতের জনসংখ্যার 60 ভাগ। 15 লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক। ডিটেনশন ক্যাম্প এর বন্দিরা। জেলের বিচারাধীন বন্দির। ডাক্তার নার্স চিকিৎসা পরিষেবার সাথে যুক্ত মানুষ পুলিশ প্রশাসন ব্যাঙ্ক কর্মী পোস্ট অফিস কর্মী সরকারি আধিকারিকরা। যারা উপযুক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছেন। তাদেরও পরিবার-পরিজন আছেন। 24 ঘন্টা ইমারজেন্সি ডিউটিতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। ছেড়ে থাকতে হচ্ছে স্বামী স্ত্রী সন্তান বাবা-মা।
আরো বেশি অসুবিধে যারা একক জীবন কাটান। তাদের অবর্তমানে তাদের সন্তান বা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অসহায়তা। একের পর এক হসপিটালের ডাক্তার নার্স আইসোলেশন এ চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। আমাদের 130 কোটির দেশ ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির মুখে বসে আছে। হু থেকে শুরু করে চিকিৎসক গবেষকরা যেখানে টেস্টের ওপর জোর দিচ্ছেন আমার দেশের মানুষ তত বেশি করে আরো দৈব নির্ভর বেঁচে থাকতে চাইছে। এরা কোনদিনই খোঁজ রাখেনি রাষ্ট্র তাদের কি কি সুবিধা দিতে পারত। এরা খোঁজ রাখেনি রাষ্ট্র কেবল অস্ত্র ব্যবসায় সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলে আর ধর্মের আফিমে ভুলিয়ে রেখেছে আমাদের।
রইল অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকরা। যারা দিন আনে দিন খায়। অটো টোটো রিক্সা ভ্যান ইত্যাদি পরিবহনের সাথে যুক্ত। ফাস্টফুড বিক্রেতা। বাজারে দু গাছা শাক বা দু কিলো গাজর নিয়ে বসা ছোট ছোট বিক্রেতা। কাজ হারানো সঞ্চয় হীন খাদ্যের নিশ্চয়তা হীন। চুপ চাপ মরে যেতে জানা চেতনা হীন প্রতিবাদ হীন হাহাকার সম্বল।
এই মধ্যবিত্ত পকেট এ পয়সাওয়ালা শ্রেণির শিল্প সাহিত্য চর্চা উপচে উঠলো। তৈরি হল মিম নতুন নতুন রেসিপি। সোশ্যাল মিডিয়া ছেয়ে গেল করোনার সংক্রান্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এবং নানা তত্ত্ব কথা। চলে এলো বিশ্ব রাজনীতি সমাজনীতি অর্থনীতি। হাত ধরে এল নব দেশ প্রেম। এল দেশপ্রেমের দেখনদারির প্রতিযোগিতা। শুরু হল মন্বন্তর সাহিত্য থেকে মারি সাহিত্যের আনাগোনা। এল শিল্প-সংস্কৃতিতে এর অবশ্যম্ভাবী প্রভাব। আর এইসব করার জন্য এদের জীবিকা নিশ্চিত ঘরে বসে মাইনে নিশ্চিত। মাইনেতে কাটছাঁট কিছু হতে পারে আপাতত সেটা নামমাত্র।
গোটা দেশজুড়ে বন্ধ হয়ে আছে বোর্ড এক্সাম। অনিশ্চিত লক্ষ লক্ষ ছেলে মেয়ের ভবিষ্যৎ। পিছিয়ে যাচ্ছে একটা গোটা একাডেমিক সেশন। যাদের বাড়িতে এরকম ছেলে মেয়ে আছে সেই বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। ভাগ্যের মারে তারা বড় অসহায়। বন্ধ হয়ে আছে মিড ডে মিল। বন্ধ হয়ে আছে নবম শ্রেণী পর্যন্ত শিশুদের স্কুলের কলকাকলি। বন্ধ হয়ে আছে সামাজিক মেলামেশার সুযোগ। শিশুরা খিটখিটে হয়ে উঠছে। কোথাও কোথাও গার্হস্থ্য হিংসার খবর আসছে। কোথাও গার্হস্থ্য প্রেম নতুন করে আবিষ্কার। কোথাও শিশুর ওপর বেড়ে চলেছে যৌন নির্যাতনের ঘটনা। কোথাও ডিভোর্সের সংখ্যা বাড়ছে । বদ্ধ থাকতে থাকতে অকেজো মানুষ অলস মস্তিষ্ক ব্যয় করছে কুচিন্তায়। বেড়ে গেছে পর্নোগ্রাফিক সাইটের চাহিদা। বেড়ে গেছে মদের চোরাকারবার।
আরেকদিকে রইল কাজ খোয়ানো এবং কাজ খোয়ানোর সম্ভাবনা যুক্ত বিশাল জনগোষ্ঠী। তাদের কাছে স্বভাবতই এই মধ্যবিত্ত আঁতলামি অসহ্য ঠেকছে । এত আমোদ আহ্লাদ এর আয়োজন দৃষ্টিকটু ঠেকছে । কাউকেই দোষ দেবার কিছু নেই। কারুর কাছে সময় কাটানো দায়। কারুর কাছে বেঁচে থাকাটা ম্যাজিক। কারোর কাছে কেবল বোরডম ডানা ছাঁটাই হল্লাবাজি ঠেক বাজির অসুবিধে । কারুর কাছে মৃত্যু অসহায়তা অনাহার অপুষ্টি সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে যাওয়া।
আমাদের এই ভারতে মাত্র 5 শতাংশের হাতে 80% সম্পদ সঞ্চিত। বাকি ভারতের অসম বন্টন চিরসত্য। কারোর কাছে খালি ঘুম খালি ঘুম আর ঘুম। ঘুম থেকে উঠে খাওয়া টিভি দেখা আবার ঘুম। সেই ঘুমে স্বপ্নে পুরনো হারিয়ে যাওয়া মুখ ফিরে ফিরে আসে। হয়তো সকলের জন্য দুর্ভাবনার জন্যই। কারো আবার স্বপ্ন দূরস্থান নির্ঘুম রাত। জ্বালাময় দিন। চিতা ময় টিকে থাকার লড়াই লড়াই। টিকিয়ে রাখার চিন্তা।
এই সবকিছুর পরেও রুপোলি রেখা মানুষ যদি আদৌ কোন শিক্ষা লাভ করে থাকে। যদি বুঝে থাকে ধর্ম বিভাজন নয় অস্ত্র ঝংকার নয় মানুষকে বাঁচাতে পারে একমাত্র নির্মল দূষণমুক্ত প্রকৃতি। মানুষকে বাঁচাতে পারে শিক্ষা স্বাস্থ্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় শুভ এবং সচেতন উদ্যোগ। হিন্দু করোনা মুসলমান করোনা নয়। চিনা ভাইরাস বা আমেরিকান দর্পের লড়াই এর গল্প নয়। বিপর্যয় মানুষের পাশে থাকে শুধুই মানুষ শুধুই বিজ্ঞান শুধুই সমাজ শুধু শুভ চেতনা।
শর্মিষ্ঠা ঘোষ, কবি, রায়গঞ্জ উত্তর দিনাজপুর।