আভা সরকার মন্ডল

এপ্রিল ১,২০২০:

কমান্ডো হাসপাতালের যে চিকিৎসক কনফারেন্স শেষে দিল্লি থেকে ফিরেছেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে তিনি ভর্তি আছেন ঐ হাসপাতালেই।তার পরিবারের তিনজনের দেহেও করোনা পজিটিভ ধরা পড়েছে। তাঁরাও ভর্তি আছেন ঐ হাসপাতালেই।আমাদের দুঃশ্চিন্তার মাত্রাটা সাধারনের থেকে একটু বেশি কারণ ওই হাসপাতালেই চিকিৎসক হিসেবে কাজ করছে আমার ভাই।সে যেন সুস্থ শরীরে সেবার দায়িত্ব পালন করতে পারে… এই আশির্বাদ চাইছি সবার কাছে।

সূদুর লন্ডনে যে চিকিৎসক মেয়েটি ও তার চিকিৎসক স্বামী,সেবা করে যাচ্ছে রোগীদের ,তার ফুটফুটে ছোট্ট দুটো সন্তান সামলাচ্ছে ঘর।সেই মেয়েটি র পরিবারের কারো জ্বর, সর্দি হলে উড়ে যাচ্ছে আমাদের প্রাণ।সেই মেয়েটি আমার কাজিন বোন। আশির্বাদ করবেন ওর পরিবারের জন্য।

আমেরিকায় এই ভয়াবহ দুঃসময়ে বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছেন এক মা। তার 21 বছরের মেয়েটি পরিবারের কাছ থেকে স্বেচ্ছায় দূরে আছে। কারন সে আক্রান্ত হলে যেন, তার কারনে বাবা, মা বা বয়স্ক দিদা আক্রান্ত না হন। ওই রাত জাগা মা টি আমার প্রাণের বন্ধু। আশীর্বাদ করবেন এই পরিবারটির জন্য।

কোরিয়াতে আছে আমার পরম আত্মীয়। তার বন্ধু করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বাংলাদেশে।
বিশ্বজুড়ে লকডাউন। দেখা হলো না বন্ধুর মুখ।সে যেন ভেঙে না পরে।রুটিরুজির সন্ধানে সেও দেশ ছেড়ে পরিবার ছেড়ে পড়ে আছে অনেক বছর বিদেশে।তার জন্যও চাই আশির্বাদ।

ইটালি তে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন রেনুর স্বামী। হোম কোয়ারেন্টিনে আছে তার ছেলে। বদ্ধ দরজার এপারে খাবার রেখে দাঁড়িয়ে আছে সে।ছেলে দরজা খুলে খাবার খেয়ে আবার থালাটা রেখে দেবে দরজার এপাশে। চোখের জল ফেলার সময় কই? সন্তর্পনে গ্লাভস হাতে পরিষ্কার করছে থালা। তাঁর আরেক ছেলেকে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স এসে তুলে নিয়ে গেছে। হাসপাতালে জায়গা নেই মেঝেতে ফেলে চলছে নামমাত্র চিকিৎসা। যদি মরে যায় তাহলে স্বামীর মত তার লাশও আর দেখতে পাবে না সে। আর যদি বেঁচে ওঠে এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে কোথায় যাবে ?কার কাছে? বাড়িতে ভাই অসুস্থ, রেণুও কি আর সুস্থ থাকবে ততদিন?
এই রেণু বা তার ছেলে কোন না কোন ভাবে আমাদের আত্মীয়। কি আশীর্বাদ করবেন ,এদের জন্য?

ফ্রান্সে আছে আমার এক কাজিন ভাই। ওখানকার অবস্থাও খুব খারাপ।এই ভাইটির জন্যও চাই আশির্বাদ। ভারতীয়দের জন্য ভাই শোনালো আশার কথা। ওখান কার মানুষের মধ্যে নাকি দাম্ভিকতা বেশি কোন কিছু কে ভয় পায় না একদম। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাও কম ওদের মধ্যে।ওর মতে ভারতীয়রা অনেক বেশি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং ভীতু।
তারা নিশ্চয় করোনা কে ভয় পেয়ে ঘরে থাকবে।ওর বিশ্বাস প্রশাসন আক্রান্তদের চিহ্নিত করে চিকিৎসার আওতায় আনবে।এবং নতুন করে একজনও যেন আক্রান্ত না হয় তার জন্য পুরো দেশকে লকডাউনেই রাখবে।প্রশাসন প্রশাসনের কাজ করছে কিন্তু আমরা কি নিজেদের কাজটা করছি?

হয়তো আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি। তবুও সময় আছে। লকডাউন মেনে চলি,জমায়েত বন্ধ করি। 1 জন আক্রান্ত থেকে যখন 4 জন হলো, পুলিশ প্রশাসন খুঁজে বের করেছেন তাদের। চারজন থেকে 16 জন যখন হলো তখনও বের করেছেন তাদের। 16 থেকে 64 ….প্রচন্ড বেগ পেতে হচ্ছে….এরপর আর খোঁজা সম্ভব হবে না। তখন তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু দেখতে হবে আক্রান্ত রোগীর ঢল। জায়গা থাকবে না হসপিটালে। শুধু নিজামুদ্দিন কাণ্ডের জেরেই 24 ঘন্টায় 10,000 মানুষকে আনা হয়েছে নজরদারির আওতায়। (সূত্র 24 ঘন্টা) এই একটি ঘটনায় উলটপালট হয়ে গেছে সমস্ত হিসেব। এই মুহূর্তে রাস্তাঘাট ,বাজারের ভিড় বা জটলা ভীষণ আতঙ্কের । কারণ দিল্লির জমায়েত থেকে কোথায় কত লোক সংক্রামিত হয়ে ছড়িয়ে গেছে আমরা জানি না। তাদের কেউ যদি এই ভিড়ের সংস্পর্শে আসে তবে ঘটবে মহাবিপদ।

আগামী দু’সপ্তাহ খুব গুরুত্বপূর্ণ।আমরা প্রত্যেকে নিজেরা যেন নিজেদের দায়িত্ব পালন করি।যেহেতু মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় এই ভাইরাস,তাই মানুষ থেকে মানুষকে আলাদা করাটাই একমাত্র কাজ। বাইরে বেরোবো না এক পা ও। চলুন একবার বাঁচার চেষ্টায় বাঁচি। আমাদের সন্তানদের মুখ চেয়ে ঘরে থাকি। ঘরে থেকে বিশ্বের সমস্ত বিপন্ন মানুষের জন্য প্রার্থনা করি। এবং সেই বিপদ আমাদের ঘরে যাতে পা না রাখতে পারে, তার জন্য ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘরে থাকি।আমরাই পারবো বাঁচতে,বাঁচাতে এবং ভালো থাকতে, যদি ঘরে থাকি…

আভা সরকার মন্ডল
রায়গঞ্জ, উত্তর দিনাজপুর
(01/04/2020)

25