আভা সরকার মন্ডল
মার্চ ২৮,২০২০ :
আমেরিকায় আক্রান্তের সংখ্যা লাখ ছুঁই ছুঁই, এই কথাটা লিখতে লিখতেই আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেল। ওরা স্টেজ 3 তে লকডাউন শুরু করেছিল আমরা স্টেজ ২ তে। এই আনন্দেই আমরা ভেবেছি যুদ্ধ বুঝি জিতে গেলাম। জন সচেতনতায় উন্নত দেশগুলোর ধারেকাছে আমরা যেতে পারব না কোনদিন। । জনগণকে সচেতন করতে আমাদের কালঘাম ছুটে যাচ্ছে। আমরা কোন স্টেজে আছি আদৌ আমরা জানি কি?
যারা পেটের টানে বাইরে বেরোতে চাইছে তাদের কথা ছেড়ে দিলে চলবে না। তাদের খাবারের ব্যবস্থা হলেই তারা ঘরে থাকবে। গরিবদের পেট টাই এই মুহূর্তে তাদের বড় শত্রু।ওদের পেট টা ঠান্ডা করার ব্যবস্হা করতে পারলেই যুদ্ধ জয় সহজ হবে। সরকারের সাথে সাথে সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতেই হবে ওদের সাহায্যার্থে।আর যে শিক্ষিত বর্বরেরা এই দুঃসময়ে নেমন্তন্ন খেয়ে বেড়ায়, কোন বাধানিষেধের তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার মানুষের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে বেড়ায়, তাদের পিঠ পর্যন্ত কোন লাঠি পৌঁছায় না কারন সেই লাঠিও সংক্রামিত হয়ে যাবে তাহলে। আমাদের দূর্ভাগ্য তাদেরই যত্ন করে ধরে ধরে এনে চিকিৎসা করানো সরকারের দায়িত্ব হয়ে পড়েছে কারন তাদের চিকিৎসা না হলে আরও হাজার হাজার মানুষ সংক্রামিত হবে। আমাদের ইচ্ছে হলেও ঐ বর্বর লোকগুলোকে সমাজ থেকে বের করে দিতে পারছিনা ।আমাদেরই স্বার্থে সুস্থ করে তুলতে হচ্ছে তাদের।ঐ বর্বর দের সম্পত্তি ক্রোক করে যারা আক্রান্তদের সাহায্যের কাজে লাগানো হোক। বিলাত ফেরত উঁচু দরের শিক্ষিত মানুষ যদি জেনে বুঝে এভাবে অপরাধ করে (এটাকে ভুল বলা যাবে না ) তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে আমারা কি আশা করব?তবু সতর্ক হয়ে আমাদের জনসচেতনতা বাড়াতেই হবে।একবার কমিউনিটি স্প্রেড শুরু হলে হাত তুলে দেয়া ছাড়া কোন রাস্তা থাকবে না। লাখ লাখ করোনা ভাইরাস আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা করার মত পরিকাঠামো ডাক্তার কিংবা যন্ত্রপাতি কোনটাই আমাদের নেই। কমিউনিটি স্প্রেড ঠেকাতে সরকারকে সর্বতোভাবে সাহায্য করতে হবে জনগনকেই। গুগোল সার্চ করে জানা যায় ইতালির চিকিৎসা ব্যবস্থা বিশ্বের দ্বিতীয় , ভারতবর্ষের স্থান 145 সেই ইতালির প্রধানমন্ত্রীকে আমরা হাত তুলে দিয়ে কাঁদতে দেখেছি।
সুরক্ষা বলয়ের ভেতরে থেকেও আক্রান্ত দেশের খেলোয়াড়, উচ্চপদে আসীন কর্মকর্তা, এমনকি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত এই রোগের শিকার হয়ে যাচ্ছেন। এই ভাইরাসের চরিত্র সম্পূর্ণভাবে এখনো জানা যায়নি।কবে জাগবো আমরা ?বড় দেরি হয়ে যাচ্ছে।
এখন রাজনীতির সময় নয় ।একজন জনসেবকের আক্রান্ত হাওয়ার সংবাদ কিংবা মৃত্যু সংবাদ হাজার হাজার মানুষের মনোবল ভেঙে দিতে পারে। যারা মানুষের সেবায় নিয়োজিত আছেন তাঁদের উপযুক্ত সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে হবে তাড়াতাড়ি।
আক্রান্তের সংখ্যা কমানো (স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি থেকে), আর সেরে ওঠা রোগীর সংখ্যা বাড়ানো(উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে) এটাই লক্ষ্য আমাদের। পর্যাপ্ত পরিমাণ PPE, স্যানিটাইজার ভেন্টিলেটর ইত্যাদি ছাড়া এক পাও এগোতে পারবেন না আমাদের রক্ষাকারী সেবকরা।
সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। তবু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য মানুষের লাইন বেড়েই চলেছে। সচেতন মানুষজন আবার মুসুরির ডালের সাথে ভাতের ফ্যান মিশিয়ে দিচ্ছেন। দুটো ডিমে চারটে ওমলেট বানিয়ে ঝোল করে খাচ্ছেন।তার মানে এই নয় যে ভারতবর্ষে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। সচেতন জনগণ বাইরে না বেরোনোর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।ঘরে যা আছে তাই দিয়েই 21 দিন পার করতে হবে, কোনভাবেই বাইরে যাওয়া চলবে না এই পণ করেছেন। আশার কথা হলো দেরিতে হলেও এদের সংখ্যা দ্রুত গতিতে বাড়ছে।
কিন্তু গ্রামগঞ্জের অবস্থা খুব খারাপ। অনেকে জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। সেই গ্রামে বাইরে থেকে আসা লোকজনও আছেন। হতে পারে জ্বরটা ঋতু পরিবর্তনের কারণে হচ্ছে, আবার নাও হতে পারে।তারা যদি সচেতন হয়ে অন্যের থেকে দূরে না থাকেন কিংবা চিকিৎসার জন্য নিজেরা বেরিয়ে না আসেন তবে কতজনকে খুঁজে খুঁজে সরকার ঘর থেকে বের করবেন?কিংবা বের করতে করতে হয়ত পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে। একজনের দ্বারা অনেক জন আক্রান্ত হয়ে বসে থাকবেন।এরমধ্যেই আয়ত্বের বাইরে চলে গেছে কিনা সেটাও আমরা বুঝতে পারছি না,কিংবা বুঝতে চাইছি না।ডুবে মরার আগে দুর্বল চিকিৎসা ব্যবস্থার খড়কুটো ধরে বাঁচতে চাইছি।
টাইটানিক সিনেমার শেষ মুহূর্তটির কথা মনে পড়লো।শোনা যায় সেই শেষ মুহূর্তটি দেখে অনেকের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে অসহায় মা সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছেন, শিল্পীরা ডুবতে ভুবতে বাজিয়ে চলেছেন বেহালা…… লাইফ বোটে ভাগ্যবান কিছু মানুষ ছাড়া বাকিদের নিয়ে হুস করে ডুবে গেল টাইটানিক মাঝ সমুদ্রে । পৃথিবীটা নিজেইএখন সমুদ্রের মাঝে ফুটো হয়ে যাওয়া টাইটানিক জাহাজ । জাহাজ ডুবে যাবার আগে কারা বা কতজন সাঁতার কেটে পারে উঠতে পারে ,সেটা দেখতে আমাদের মধ্যে কারা থাকবো আর কারা থাকবো না সেটা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন।
……,যে ক’দিন বেঁচে আছি ঘরেই থাকি এবং আরো বেশিদিন বাঁচার স্বপ্ন দেখি। কেউ না কেউ তো বেঁচে থাকবেই তাদের সাথে আমরাই বা না কেন?বড় যুদ্ধে জিততে হলে, ছোট রড় অনেক অসুবিধার সাথেই যুদ্ধ করে ঘরে থাকতে হবে।থাকতেই হবে। এটাই বেঁচে থাকার একমাত্র রাস্তা।
আভা সরকার মন্ডল
রায়গঞ্জ, উত্তর দিনাজপুর
(28/03/2020)