ছোট ছোট কথা — ১

বিপুল দাস

কুলিক রোববার,মার্চ,২০২০: ছেলেবেলায় আমার খুব ভূতের ভয় ছিল। এমন কী অনেক রাতে একা একা বাথরুমে গিয়েও চোখ বুজে দাঁড়াতাম। তখন আমাদের পাড়ায় ঘরবাড়ি অনেক দূরে দূরে ছিল। সন্ধ্যার পর আমার সব কিছুকেই খুব সন্দেহজনক, রহস্যময় মনে হত। দশকাঠা জমির ওপর আমাদের বাড়ি, গাছপালা ছিল অনেক। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, নারকেল, সুপারি, খেজুর, সবেদা, কলা। বিকেলের পর সন্ধ্যা নামতেই আস্তে আস্তে সেগুলো পাল্টাতে শুরু করত। অনেক রাতে সেগুলো আর গাছ থাকত না। আমি শিয়োর ছিলাম। খুব ভোরের দিকে, তখনও হয়তো পুবের কালো ততটা দ্রব হয়নি, বিশেষ করে গরম কালে একটা বাতাস উঠত। আমাদের টিনের চালে সরসর করে শব্দ হ’ত। মা বলেছিল কাঁঠালের ডাল টিনের ওপর দিয়ে ঘষটে যাওয়ার শব্দ। আসলে কেউ টিনের ওপর দিয়ে হালকা চালে হাঁটাহাঁটি করত। খুব গরম পড়লে মা শিয়রের দিকের জানালা খুলে দিত। আর তখন যদি আমার ঘুম ভেঙে যেত, তবেই চিত্তির। অন্ধকার রাতে অতটা চিন্তার কিছু ছিল না, কিছুই দেখা যাবে না। কিন্তু চাঁদনি রাতে আমি জানতাম জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই জানালার সামনে কোনও ভয়ঙ্কর মুখ দেখতে পাব। সুতরাং না তাকানোই ভালো ।
তবু, মানুষের বোধহয় অজানা বিপদের দিকেও একটা অলঙ্ঘনীয় আকর্ষণ থাকে। আমি ফস করে একবার চোখ খুলেই আবার বন্ধ করে ফেলতাম। বন্ধ করার পর মনে হত একটু দূরেই কালো মত কী যেন ছিল।
একটু বড় হওয়ার পর যখন সাহস একটু বাড়ল, তখন জোছনা-ধোয়া ঘরবাড়ি, মাঠঘাট দেখতে দেখতে মনে হত এমন রাতেই আকাশ থেকে পরী নেমে আসে। তখন কিছুদিন আমায় পরীতে পেয়েছিল। যে সব রূপকথায় পরী আছে, সেগুলো পড়তে ভালো লাগত। মনে হত কলাগাছের ওপরে যে সামান্য আলো ঝিকমিক করে উঠল, সে নিশ্চয় কোনও পরীর ডানায় বসানো শলমা চুমকি।
ভোরের সেই হাওয়া, সেই সরসর শব্দ, রাতজাগা পাখির ডাক আর নেই। নতুন ঘর তোলা হবে বলে সব গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এখন শুধু অচেনা মানুষ। তাঁরা এসে আমার মাথার কাছে জানালায় দাঁড়িয়ে থাকে। তাঁরা কেউ নেমে আসে সপ্তর্ষিমণ্ডল থেকে, কেউ কোটি আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্র থেকে, কেউ সরসর শব্দ থেকে উঠে আসে, কেউ আসে আমার প্রাইমারি স্কুলের সরস্বতী পুজোর অঞ্জলি থেকে। আমি মনে মনে বলি — আর একবার শোনাবে সেই মোহিনী কথা। কিন্তু পরী আসে না। রূপকথা, না কী আমারই মনোবাসনায় গড়া সেই পরী ধুলোর পৃথিবীতে নেমে আসে না। আমি জানালায় দাঁড়ানো সারি সারি মুখগুলোকে বলি — একবার, শুধু একবার … তারপর তোমাদের সঙ্গে উড়াল দেব সেই অনন্ত নক্ষত্রবীথির দিকে …

32