Categories
কুলিকের রোববার প্রথম পাতা

কুলিক রোববারে আজকের গল্প ‘শ্রাবণ পূর্ণিমার চাঁদ’।লিখেছেন সন্দীপ কুমার ঝা

শ্রাবণ পূর্ণিমার চাঁদ

সন্দীপ কুমার ঝা

কুলিক রোববার মার্চ ৮,২০২০:

…..কাজের ফাঁকে,লুকানো গামছায় মুখ মুছে, নির্বিবাদে চলে যাচ্ছে সময়।কিচ্ছু করার নেই।চশমা মুছে মুছে,চশমাই ঘষে গেছে।ক্রমে আরো অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে,চেনামুখ।

আশে পাশের ছড়ানো মুখেরা কেউ বলল না,কেউ বলেনা,চল গাছের কাছে যাই,চল যাই,নদীর কাছে। তবুও বাঁচার কোল ঘেষে হাঁটি।খই ছড়াতে দল ভর্তি ছায়ামানুষ আসে।কলসীতে ফুটো করে চলে যায়।গড়াগড়ি শালপাতার ঠোঙা জড়িয়ে জ‍্যান্ত থাকে বাঁচা..

ভাঙতে ভাঙতে গুঁড়ো ।গুঁড়োর ভিতর একা।
উঠোনময় ছুটির সকাল,এক্কাদোক্কা আঁকা।

কোথায় যাব?অন্ধকারের হাত,তাড়া করছে, অন্তরমহল পর্যন্ত।শব্দহীনতার ঘর পর্যন্ত তার হানাদারি।একা থাকাটাও যদি পুড়ে যায়,একটা নিঃসঙ্গ মানুষের কিই বা থাকে?রোদের তেজ ক্রমে, কমে আসছে,এবেলা।বুকের ভেতর টাঙানো দড়িতে
টিটকিরি দেয়,ধুলোময় সংসারপাতি খেলা।

জানলা খুলতে হয়,প্রিয় ডাকনাম ডাকলে,নিজের ছায়া ভাঙে।কান ভাঙে।তবুও চৌকাঠের বাইরেই বসে আছে, আলো চোরের দল।বুকের ভিতরে আলোর কোষে যত্মে রাখা,অন্ধকার সিঁদকাঠি,
আত্মঘাতী যুদ্ধের পরবর্তী সংবাদের অপেক্ষায়….

আজ থাক।
এলো মেলো হয়ে যাচ্ছে সব।কিছুতেই মনোযোগে লাগাম পরাতে পারছেন না। লিখতে ইচ্ছা করছে না আর।খোলা কলম ফেলে,লেখার টেবিল থেকে উঠে পরেন রমলা দেবী।

ঘরে কোনও ঘড়ি রাখা নেই।বাইরে বোধহয়,সন্ধ‍্যা সাড়ে সাতটা হবে।শ্রাবণ পূর্ণিমার চাঁদটা,সাদা আগুনের মত এক জ‍্যোৎস্নায়,আকাশটাকে ধুয়ে দিচ্ছে।তবুও কেন যেন মনে হচ্ছে কতদিন এই আকাশ,কেউ যেন মুছে দেয়নি।কত ছায়াধুলো,আকাশটাকে ঢেকে রেখেছে, বুকের মত।বিস্মৃতির ধূলো কি?কিন্তু সবই তো মনে আছে।কোনও ঘটনাই এতটুকু ম্লান নয়!

জলভর্তি মেঘগুলো সব ঝড়ে গেলে,আজ যেন বুক ভরে একটু শ্বাস নেওয়া যেত!অসহ‍্য একটা যন্ত্রনা মোচড় দিয়ে ওঠে।কিন্তু সেটা যে ঠিক কোথায়, তা ঠাওর করে উঠতে পারেন না,রমলা দেবী।নীচের বারান্দায়,বাল্ব কেটে গেছে অনেকদিন।লাগানো হয়নি।হয়তো ইচ্ছে করেই।কার্ণিশে আহত জ‍্যোৎস্না যেন মন খারাপ করে বসে আছে,অন্ধকারের সহবাসে।

আস্তে আস্তে ছাদে উঠে যান রমলা দেবী।ছায়াটাও ওঠে, স্থির,বোবা। দীর্ঘ বছরের সঙ্গী।

‘দিদি চা’-
স্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়।একটানা ঘোরটা, চমকে উঠে ভেঙে যায়।কিছুই ভালো লাগছে না,আর।আজ ক্লাসেও সারাদিন মন দিতে পারেন নি।বেণুর বসবার সেই ডেস্কটার দিকে বারবার নজর যাচ্ছিল।বারবার জট লাগছিল,বক্তৃতার গুঁটিতে।মাথার শিরাগুলো দপদপ করছে।একটা প‍্যারাসিটামল নিলে ভালো হত।কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর,আর নামা হয় না।কি যেন বুঝে নিয়ে,টুনুর মা,চা-এর কাপটা পাশে রেখে চলে যায়,নীচের ঘরে।

দীর্ঘ দিনের বিশ্বাস, আশা,সম্ভাবনা কি এতটাও ওলোট পালট হয়ে যেতে পারে,যাকে মেনে নিতে গোটা জীবনটা ফসকে যাবে?অথচ যাকে বৈরাগ‍্য বলে,তাও তো নেই!চা,কলপাড় বাঁধানো,ঘরের রঙ।সবই তো চলছে।তবুও কি যেন এক ঝড়ের নীচে এইসব শামিয়ানা। ঝড়কে আড়াল করে,ঝড়ের নীচেই সমাধির মত নিস্তব্ধ-মগ্ন,এ জীবন।

কলেজে অধ‍্যাপনার চাকরিটা আর বছর দুই।তারপর হয়তো এই পালিয়ে বেড়ানোর অবলম্বনটুকুও চলে যাবে।অথচ আজ বেণু সঙ্গে থাকলে..।আদর্শ,নীতি, শিক্ষা বেণুকে সবই তো তিনিই দিয়েছিলেন।আর তো কেউ ছিল না বেণুর পাশে।বাবা তো চোখ ফোটার আগেই চলে গিয়েছিলেন,অন‍্য জীবনের কাছে।ঘেন্না, করুণা,আজ আর কিছুই অবশিষ্ট নেই,স্বামীর জন‍্য।শুধু বেণুটাকে যদি বাঁধা যেত,তবে আজ হয়তো জীবনের মানেটা হয়তো এত ফাঁপা হত না।

আজ বেণুর জন্মদিন।অদ্ভূত ভাবে,এটা তার ঘর ছাড়ার দিনও বটে।

ছেলের অনুপস্থিতির জন‍্য,অসহায়তা,পাপবোধ নয়,তার চেয়েও বেশি,নিজের দায়টা কুঁড়ে খায় রমলা দেবীকে।কি-ই বা করার ছিল?আচ্ছা,সত্যিই কি কিছু করার ছিল না?সাঁড়াশির মত দ্বিমুখী প্রশ্ন।জলজ‍্যান্ত একটা শরীরের মত,বেণু নিজেই যেন একটা আস্ত প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে,একলা অস্তিত্বের চৌকাঠে।

মানুষ মরলে নাকি নক্ষত্র হয়!বেণু কি জায়গা পায়নি নক্ষত্রের মধ‍্যে?কত রাত তো ছাদে ধ্বসে গেছে একা একা!তারাদের সাথে।জোৎস্নায়।তবুও তো একবারের জন‍্যেও কেন সে কথা বলেনি?কেন বলেনি,তার ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার কারন?বড় মুখচোরা, অন্তর্মুখী ছিল সে।ঘর থেকে চলে যাওয়ার পাঁচমাস পরে,গৌহাটি পুলিশ যখন,তার মৃত্যুর খবর দেয়,তারপর থেকে একবারের জন‍্যে, স্বপ্নেও আসেনি সে।এত অভিমান,মা এর উপর?এত?

এ জীবনের সব পাওয়া,আজকাল অনর্থক মনে হয়।এই চাকরি ঘর,লেখিকা হিসেবে এই সব খ‍্যাতি-সব।

লোনের টাকায় ঘর। ই.এম আই.চলছে এখনো। সঞ্চয় শেষ হয়েছে,বড় দুই মেয়ের বিয়েতে। বিয়ের গয়নাগাটি সব তো মুছেই নিয়ে গিয়েছিল ওর বাবা।সবাই জানত সব।তবুও মেয়েরা,মা এর সম্পত্তিতে নিজেদের অধিকার দাবী করে গিয়েছে কয়েকবার।রমলা দেবীও কিছু বলতে পারেন নি।মেয়েদের কাছে,এ প্রত‍্যাশা ছিল না।এ শিক্ষা তিনি দেন নি।কেমন সব ঘোর,একটা ধাক্কা লেগেছিল।তবুও নীরব ছিলেন রমলা দেবী। ঠিক অশান্তির ভয়ে নয়।মেয়েদের সে দাবিতে,কোথাও একটা আইনি নায‍্যের অধিকারটাও তো ছিল।সেটাই বা উপেক্ষা করা যায় কিভাবে?আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে হয়নি।দর্শণ পড়ানো রমলা দেবী জানেন,সম্পর্কের ফাঁক দিয়ে আইনি বাতাস খেলে যেতে পারলে,হাড়ে কাঁপন লাগে।কঙ্কালের সঙ্গে যুদ্ধে,কি লাভ!

তাই কলেজ শেষ করে,বেণু যখন নিজের ব‍্যবসা দাঁড় করাতে মোটা অঙ্কের টাকা চায়,তখন রমলা দেবী,তা দিতে পারেন নি।অপেক্ষা করতে বলেছিলেন তাকে।মেয়েদের দাবীর উপেক্ষা অথবা ছেলের হাতে শেষ অবলম্বনটুকু তুলে দেওয়া,তার পক্ষে সম্ভব হয় নি। প্রয়োজন আছে,জেনেও পারেন নি।কেবল একটা -‘না’ এর বিনিময়।তারপর,বেণুও আর কিছু বলেনি। একটাও শব্দও খরচ হয়নি মা ও ছেলের মধ‍্যে!এরপর শুধু একদিন,শেষ রাতের শিশিরের মত,নিঃশব্দে কেমন সব উলট পালটে যায়!

‘দিদি,চা-টা ঠান্ডা হয়ে গেল যে”-টুনুর মা এর কথায় আবার চমক ভাঙে।তবুও কথা বলতে ইচ্ছা করল না।টাকাটা সেদিন হয়তো তিনি দিতেই পারতেন।দেন নি।হয়তো ভুল ছিল,কিংবা নয়।তবুও আজ হিসেবের খাতা হারানোর পর,নতুন করে আর একবার হিসেব করতে ইচ্ছা করে রমলা দেবীর।
সব কিছু আজ,নিজের পক্ষে এনে, জোর করে হলেও মেলাতে ইচ্ছে করে,জীবনের সবটুকু ভুল অথবা ঠিক।

স্বামী তো নিজের সুখ বেছে নিয়েছেন।মেয়েরাও সুখী।কিন্তু তিনি?কিন্তু তিনি কি বাঁচাতে পারলেন নিজের জন‍্য?ছেলেটাকেও তো আটকে রাখতে পারলেন না।কি হত,যদি এক মুহূর্তের জন‍্য,নীতি,আদর্শ,তার শিক্ষা, সংস্কারকে ভুলে গেলে?অন্তত একটি পক্ষ হয়তো তাতে রক্ষা পেত!সারাটা জীবন ধরে,আঁকড়ে রাখা সংস্কার,ন‍্যায়,আর নীতির মূল্যে কি বাঁচানো গেল?

পাশের বাড়ির নেড়ি কুকুরটা কাঁদছে।

ওরা বুঝতে পারে।কি করে বুঝতে পারে কে জানে!আকাশের পশ্চিম কোন থেকে,একটু একটু করে, একদল ঘন কালো মেঘ,যেন এক গভীর চক্রান্তে,পা টিপে টিপে উঠে আসছে,সাদা চাঁদটাকে গিলে খাবে বলে।

আর ছাদের উপরে থাকা চলে না।কাজ শেষ করে টুনুর মা চলে গেছে।মাথার দুপাশের রগ দুটো ফুলে দপদপ করছে।ঠান্ডা চা ভর্তি কাপটা নিয়ে আনমনে উঠে পরেন,রমলা দেবী।ধীরপায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসেন।কি ভেবে,ঢুকলেন স্নান ঘরে।হয়তো ভালো লাগবে একটু।

স্নানঘরে কেটে গেল অনেকক্ষন।সময়কে সঙ্গে নিয়ে,ড্রেনের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে জল।শাওয়ারের শতছিদ্র মুখদিয়ে,তবু কিছুতেই শীতলতা পৌঁছে যাচ্ছে না ক্ষতমুখের দরজায়!তাই ভেসে যাচ্ছে না মাথাব‍্যথাটাও!
এমনিতেই এই পাড়াটা নিঝুম!তারপর এখন অনেকটা রাত হয়েছে।ভারী দেওয়ালের মত,চারপাশে,ঘিরে আছে নিস্তব্ধতা।রাতগভীরে যে পাগল বেহালাদারটা ছড় কাটে,সেই শুধু জেগে আছে।বাজাচ্ছে!
বেহালার সুরটা আজ কেবল কেঁদে কেঁদে উঠছে।পাক খেয়ে উঠতে উঠতে,আবার তলিয়ে যাচ্ছে!বুকের ভিতর কি? শব্দটা যে অতলে পৌঁছাচ্ছে,সেখানে আজ বেণু,ঘরছাড়া বেণু, নিথর দেহ-এ ছাড়া আর কিছু নেই।ভেতরের সব পুরোনো ক্ষতমুখ যেন,সজীব জলের স্পর্শে, ভিজে ভিজে উঠছে আবার।সে সুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে,কেবল বেণুর দিয়ে যাওয়া অসম্পূর্ণতা আর ব‍্যর্থতা।

শোয়ার ঘরের ঘড়িতেএখন রাত তিনটা বেজে চল্লিশ।বিছানায় এলানো শরীর।বুকের ভিতরে বেণু।বাতাসে পাগল বেহালাদারের সুর ভাসে।শুরু হয়েছে, ঝিরঝির বৃষ্টি।বেহালার কান্না,এখন যেন গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পরছে বাতাসে।বেহালার কান্নায়, হিম বাতাস,ক্রমে আরও ভারী ওঠে।অসহায় চাঁদটাকে,কোন ফাঁকে,একটু একটু করে গিলে নিয়েছে,শ্রাবনের রাক্ষুসী মেঘ।

সকাল নয়টা।
কাজের মাসি টুনুর মা আসে।পেছন পেছন পুলিশ।তারও পেছনে ফিসফিস গুঞ্জন। পলিথিন মোড়া হয়ে,রমলা দেবী যখন,পুলিশ ভ‍্যানে ওঠেন,তখন সন্ধ‍্যা পাঁচটা। বিছানার পাশে অবহেলায় পরে আছে স্লিপিং পিলের,তিনটি খালি পাতা।

ভ‍্যান চলতে শুরু করে।ক্রমশঃ দূরে সরে সরে যেতে থাকে বাড়ির ছাদ,কলতলা,এতদিনের আঁকড়ে থাকা ন‍্যায় নীতি, অর্জিত, মূল‍্যবোধ।এবার হয়তো বেণুর সঙ্গে দেখা হবে।হবেই।

খানিক আগে আরও একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে।যেন সব মুছে দেওয়ার চেষ্টা।দুধের মত জ‍্যোৎস্নায়,চাঁদটাও আজ আকাশ ভাসিয়ে দিয়েছে।এই চাঁদে,এখন আর এতটুকু গ্লানি নেই।

রাত গভীর।পাগল বেহালাদার,আবার ছড় কাটতে শুরু করেছে।বেহালা উপচে,সে আশ্চর্য সুর, ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে -বাতাসে- ঘাসে-জ‍্যোৎস্নায়!ক্রমশঃ ছড়িয়ে যাচ্ছে!পাক খেয়ে উঠে,আবার তলিয়ে যাচ্ছে!
ক্রমশঃ তলিয়েই যায়….

89

Leave a Reply