সুস্থ থাকুন, ফেব্রুয়ারি ২৯,২০২০: একঢাল কিংবা একমাথা কালো কুচকুচে ঝলমলে চুল কার না ভালো লাগে। কিন্তু আজকালকার দূষণ আর স্ট্রেসের যুগে তেমন কেশবতী বা কেশবান মানুষ মেলাই ভার। আসলে আপনার চুলের অবস্থা আর স্বাস্থ্য পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কারণ হরমোনের ভারসাম্য এবং শরীরে যথাযথ পুষ্টির জোগানের উপরেই কিন্তু আদতে নির্ভর করে আপনার চুলের স্বাস্থ্য। কখন শরীরের কোন দিকটায় নজর দেওয়া দরকার, সে ব্যাপারে আপনার চুল আপনাকে ছোট ছোট কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংকেত পাঠাতে থাকে সময় থাকতেই। সেই সব সংকেত চিনতে শেখা দরকার। আপনারও যদি চুলের কোনও সমস্যা থাকে তা হলে তার পিছনের সঠিক কারণ এবং তা নির্মূল করার জন্য উপযুক্ত উপায় খুঁজে বের করতে হবে। আসুন দেখে নেওয়া যাক, মূলত চুল নিয়ে আমরা কোন কোন সমস্যা গুলো ফেস করতে থাকি নিয়মিত।

১) চুল ওঠা:- চুলের সমস্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো ঝামেলাটা হল চুল উঠে যাওয়ার সমস্যা। মেঝেতে দলা দলা চুল পড়ে থাকতে দেখলে বা চিরুনিতে গোছা গোছা চুল উঠে আসতে দেখলে প্রচণ্ড মন খারাপ হয়ে যায় স্বাভাবিকভাবেই। এই সমস্যার ঠিকঠাক সমাধান করতে হলে আগে এর আসল কারণটা জানা দরকার। মনে রাখতে হবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই পুরোনো চুল উঠে যায় এবং সেই জায়গায় নতুন চুল গজায়। দিনে ১৫০টি করে চুল ওঠাও স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এর চেয়ে বেশি চুল উঠতে থাকলে তাকে ‘প্যাথোলজিকাল হেয়ার লস’ বলা হয় এবং তা যথেষ্ট চিন্তার। সে ক্ষেত্রে কী কারণে অস্বাভাবিকভাবে চুল উঠছে জানতে আপনাকে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে হবে।
বাইরে থেকে চিকিৎসা করে বা নানারকম প্রডাক্ট ব্যবহার করেও চুল ওঠা কমানো যায়। তবে যে প্রডাক্টটি আপনি ব্যবহার করছেন তা যেন প্রাকৃতিক, অর্গানিক এবং রাসায়নিক-মুক্ত হয়, তা না হলে সমস্যা কমার বদলে বেড়েও যেতে পারে।

২)পাতলা চুল:- চুল পাতলা হয়ে যাচ্ছে? স্ট্রেস এর অন্যতম কারণ হতে পারে কিন্তু। চুল ওঠার সমস্যার পূর্বলক্ষণ হিসেবে চুল ক্রমশ পাতলা হয়ে যেতে শুরু করে, যা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে আপনার চুলের অবস্থা ভালো নয়। সমস্যা আরও বেড়ে যাওয়ার আগেই উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। অতিরিক্ত চুলের ট্রিটমেন্ট, চুলের পক্ষে ক্ষতিকর অভ্যাস। পুষ্টির অভাব, পিসিওএস (পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম)-এর মতো হরমোনের সমস্যার কারণে চুল পাতলা হয়ে যেতে পারে। জিনগত কারণে বা বয়স বাড়ার জন্যও চুল পাতলা হয়ে যাওয়া সম্ভব। আসল কারণটা জানতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া খুব জরুরি। আসল কারণ জানার পর একাধিক চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে থেকে সঠিকটি বেছে নিতে হবে, তার মধ্যে পিআরপি (প্লেটলেট-রিচ প্লাজ়মা) থেরাপিও রয়েছে যা আপনার সিস্টেমে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। ‘ক্রনিক টেলোজেন এফ্লুভিয়াম’ নামে একটি সমস্যার কারণেও চুল পাতলা হয়ে যেতে পারে। এটিও একধরনের চুল উঠে যাওয়ার সমস্যা যা মেয়েদের মধ্যে দেখা যায়। ছ’মাসের বেশি সময় ধরে মেয়েদের অতিরিক্ত চুল উঠতে থাকলে তাকে ‘ক্রনিক টেলোজেন এফ্লুভিয়াম’ বলে। এই সমস্যারও উপযুক্ত চিকিৎসা হওয়া দরকার।

৩)মাথায় চুলকানি:- সারাক্ষণ মাথা চুলকোলে একদিকে যেমন বিব্রত অবস্থায় পড়তে হয়, তেমনি অন্যদিকে তা গুরুতর কোনও সমস্যার লক্ষণও হতে পারে। স্ক্যাল্পে চুলকানি মানে আপনার মাথায় সেরাম উৎপাদনের পরিমাণ কম। তা যেমন মানসিক চাপ, ক্লান্তি থেকে হতে পারে, তেমনি আপনি চুলের যত্নের জন্য যে সব প্রডাক্ট ব্যবহার করেন তার কোনও একটি উপাদানে অ্যালার্জি থাকার কারণেও হতে পারে। ফলে শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার কেনার সময় বুঝেশুনে বাছাই করা দরকার৷ সুষম খাবার,পরিমান মতো জল ও নিয়মিত ম্যাসাজ এই সমস্যা কিছুটা কমাতে পারে।

৪)চুলের ডগা ফাটা:-ডগা ফাটা চুলের পিছনেও থাকতে পারে মানসিক চাপ। কেরাটিনের অভাবে চুলের ডগা ফেটে যায় এবং তার পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে৷ উত্তাপ দিয়ে চুল স্টাইল করার সময় যদি কোনও হিট প্রোটেকট্যান্ট প্রডাক্ট চুলে লাগানো না হয়, অথবা ব্লো-ড্রাই করার সময় ড্রায়ারের উত্তাপ যদি খুব চড়া থাকে বা চুলের খুব কাছাকাছি থাকে, তা হলে চুলের ক্ষতি হয় ও ডগা ফেটে যেতে পারে৷ ঘুমোনোর সময় বালিশে ঘষা লেগে অথবা লম্বা চুলের ক্ষেত্রে পোশাকে ঘষা লেগেও চুলের ডগা ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে৷ চুল রং করা বা ব্লো-ড্রাইয়ের মতো হেয়ার ট্রিটমেন্ট এড়িয়ে চলাই ভালো৷ চুল অতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্ত হলে ডগা ফেটে যায় ও চুল ভেঙে ঝরে যায়৷

৪)নিষ্প্রভ চুল:- খারাপ খাদ্যাভ্যাসের কারণে চুল নিষ্প্রভ হয়ে যেতে পারে। চুলে যদি স্বাভাবিক ঝলমলেভাব না থাকে, তা হলে আপনার খাওয়াদাওয়া হয়তো যথাযথ হচ্ছে না। হয় আপনি অতিরিক্ত পরিমাণে জাঙ্ক ফুড খাচ্ছেন অথবা পর্যাপ্ত জল খাচ্ছেন না। জাঙ্ক ফুডে কোনও পুষ্টি থাকে না, শুধু ক্যালরি ঠাসা থাকে যা চুলেরও ক্ষতি করে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল আর প্রোটিন রাখুন। পরিশোধিত চিনি বা ময়দা দিয়ে তৈরি খাবার থেকে দূরে থাকুন কারণ এ সব খাবার আপনার শরীরে কর্টিসলের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। এর সঙ্গে সিলিকোন বা প্যারাফিন যুক্ত সমস্ত প্রডাক্ট, শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার এড়িয়ে চলতে হবে। এই প্রডাক্টগুলো সাময়িকভাবে চুলের ঝলমলেভাব বাড়িয়ে দেয় ঠিকই, কিন্তু আখেরে চুলের আরও বেশি ক্ষতি করে দেয়।

৫)স্বাস্থ্যোজ্জ্বল চুল:- কিছু সহজ নিয়ম মেনে চলুন, আপনার চুল থাকবে মজবুত, স্বাস্থ্যোজ্জ্বল৷

এবার আসি এই সমস্যাগুলোর সমাধানে কি কি করবেন সেই বিষয়ে :-

১) নিজের চুলের উপযোগী শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার বেছে নিন৷ এর জন্য কোনও ত্বক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন।

২) চুল শুকোনোর সময় বা স্ট্রেট করার আগে তাপ থেকে চুল সুরক্ষিত রাখতে থার্মাল প্রোটেক্টর ব্যবহার করুন৷

৩) স্বাস্থ্যকর, সুষম খাবার খান৷

৪) খুব আঁটোসাটো হেয়ারস্টাইল করবেন না, তাতে চুল ভেঙে বা ঝরে যেতে পারে৷ একান্ত যদি করতেও হয়, তা হলেও মাঝেমাঝেই বিকল্প হিসেবে হালকা আলগা হেয়ারস্টাইলও করুন৷

৫) যদি হঠাৎ চুল উঠতে শুরু করে এবং না কমে, তা হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

এবার বলি কি কি করবেন না সেই বিষয়ে :-

১) খুব ঘনঘন চুলে শ্যাম্পু করবেন না। তাতে চুল শুষ্ক হয়ে যায়, ফলে তেলাভাবও দ্রুত ফিরে আসে।

২) অতিরিক্ত সোডিয়াম সালফেট যুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করবেন না, তাতে চুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৩) ব্রাশ দিয়ে চুলের জট ছাড়াতে যাবেন না, বিশেষ করে ভেজা চুলের তো নয়ই, কারণ ভেজা চুলের স্থিতিস্থাপকতা বেশি হয় ও চট করে ভেঙে যেতে পারে। খুব ঘনঘন চুল আঁচড়ানোরও দরকার নেই। সকালে একবার আর রাতে একবার চুল আঁচড়ালেই যথেষ্ট! চুল খুব জোরে জোরে ঘষবেন না, তাতে চুলের গোছা দুর্বল হয়ে যায়। তোয়ালে দিয়ে হালকাভাবে চুল মুছে নিন।

৪) খুব গরম বা খুব ঠান্ডা জলে চুল ধোবেন না। তাতে চুল যেমন শুস্ক হয়ে যেতে পারে, তেমনি স্ক্যাল্পে অতিরিক্ত পরিমাণে সেরাম উৎপাদনও হতে পারে।

৫) চুলে তাপ লাগতে পারে এমন পরিস্থিতিতে, অর্থাৎ রোদে বেরোনোর আগে বা চুল আয়রন করার আগে তেল লাগাবেন না। তাতে চুল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তার জন্য বিশেষভাবে নির্মিত তাপ-প্রতিরোধক তেল রয়েছে।

সবশেষে বলি, আপনার স্বপ্নের ঝলমলে একরাশি চুলের জন্য আপনাদের জন্য আমরা হাজির করছি পরীক্ষিত ও প্রমাণিত কয়েকটি টিপস :-
১) নিয়মিত মাথা ও স্ক্যাল্পে তেল মালিশ করুন। কারণ হচ্ছে, শরীরের যে কোনও অংশে মাসাজ করলে সেই জায়গাটি রিল্যাক্সড হয়৷ উন্নত হয় রক্ত চলাচলের পদ্ধতি, ওই অঞ্চলে বাড়ে রক্তের জোগান৷ মাথা বা মাথার তালুর ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে৷ যতবার চুল ধুচ্ছেন, ততবার যদি হালকা হাতে মাথায় মাসাজ করতে পারেন তা হলে দেখবেন মাথা ঠান্ডা থাকছে, দিনের শুরুতে মন-মেজাজ থাকছে তরতাজা৷

২) রাসায়নিক নয় বরং ঘরোয়া পদ্ধতিতেই চুল ও স্ক্যাল্প নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন।
৩) চুলের জন্য সঠিক প্রডাক্ট খুঁজে বের করুন। খুব ঘন ঘন শ্যাম্পু,সাবান বা চুলের অন্য প্রোডাক্ট বদলাবেন না।
৪) রোজ অন্তত একটি করে মরসুমি ফল খান। অতিরিক্ত ভাজাভুজি, ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলুন। পরিমান মতো জল পান করুন। রাতের ঘুম যাতে ঠিকঠাক হয় সেদিকে নজর দিন।

69