ডাঃ নীলাঞ্জন মুখার্জি
সুস্থ থাকুন, ফেব্রুয়ারি ১৫,২০২০: স্টিফেন হকিংকে মনে পড়ে ? হুইলচেয়ারে বসেই একটা মানুষ কিভাবে সারা পৃথিবীতে চমক লাগানো তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন। বা এমনই বহু লোক যারা সঠিকভাবে দাঁড়াতে বা বসতে না পারলেও নিজেদের জীবনে কেবল সফলই নয় বরং অনেক প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন।
এই মানুষগুলো হতে পারতো আমার আপনার মতোই কিন্তু cerebral palsy নামক একটি সমস্যা এদের জীবনের খুশিকে গ্রাস করে নিয়েছে। কিন্তু কি এই CP ?
জন্মমুহূর্ত আমাদের কাছে কি প্রচন্ড গুরুত্বপূর্ন দেখা যাক। জঠরে শিশু তার বাঁচবার সকল রসদ মাতৃদেহ থেকে সংগ্রহ করলেও জন্মের পরমুহূর্তে তার কান্নার মাধ্যমে সে তার নিজস্ব অস্তিত্ব বোঝাতে থাকে এবং এই প্রথম কান্না বা first cry হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবমস্তিস্কের জন্য। কারণ স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে যতক্ষন না বায়ু থেকে অক্সিজেন সংগ্রহ করে শিশুর শরীরের কোষে কোষান্তরে সঠিক পুষ্টি পৌঁছায়, ততক্ষণ ধ্বংস হতে থাকে স্নায়ুকোষ বা neurone। অথবা মাত্রাতিরিক্ত জন্ডিসের কারণে বিলিরুবিন এর প্রভাবে নষ্ট হয়ে যায় মস্তিষ্কের বিশেষ অংশ( যাকে বলে Kernicterus)। বিলিরুবিন এনসেফালোপ্যাথি নামেও এই সমস্যাটি চিহ্নিত। আবার এমন ও হতে পারে সময়ের বহুপূর্বে জন্ম নেওয়া premature শিশু ফুসফুসের পরিণতির অভাবে RDS( রেসপিরেটরি ডিস্ট্রেস সিনড্রোম) থেকে একইভাবে স্নায়ুকোষ অবলুপ্তি।
বিপদ হলো, খুব ছোট অবস্থায় তেমন কিছু উপসর্গ বোঝা যায় না। বরং ৪/৫ মাসের আগে শিশুর শারীরিক কিছু সমস্যা শুরু হতেই সচেতন অভিভাবকই একমাত্র সনাক্ত করতে পারেন শিশুর এই সমস্যাটি। যেমন মানবশিশুর ডেভেলপমেন্টাল মাইলস্টোনে সময়মতো না পৌঁছলে অর্থাৎ ৩ মাসে ঘাড় শক্ত না হওয়া, ৬ মাসে ধরে বসতে না পারা,৯ মাসে দাঁড়াতে না পারা এবং ১ বছরে হাঁটতে পারে কিনা লক্ষ্য রাখতে হবে। জীবনের শুরুতেই এই ত্রুটিগুলো ধরতে পারলে একমাত্র early intervention এর মাধ্যমেই নিরাময় সম্ভব। নাহলে পরিণতি হিসাবে আঁকড়ে ধরে disability বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা।
এই মানুষগুলি কিন্তু অনেকাংশেই সুস্থ ও স্বাভাবিক। motor disorder বা শারীরিক সক্ষমতাই হলো CP অসুখের মূল ব্যাপার। physiotherapy এবং occupational therapy এর মাধ্যমে এই পেশির ক্ষমতাহ্রাস বহুলাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সেরিব্রাল পলসি নিয়ে জন্মানো শিশুর বুদ্ধিমত্তা কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক। অথচ শুধুমাত্র চলাফেরা না করতে পারার জন্য স্বাভাবিক জীবনধারণ অধরা থেকে যায় এদের কাছে। সাধারণত দুই ধরণের CP মানুষ দেখা যায়। প্রথম হলো spastic দ্বিতীয়ত flaccid, যেখানে পেশিগুলো প্রসারিত অবস্থায় থাকে।
এখন নিরাময়ের উপায় নিয়ে আলোকপাত করা যাক। পূর্বেই বলেছি অতি সত্বর সনাক্তকরণ এবং প্রতিকার শুরু করলে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা স্থায়ী প্রতিবন্ধকতাকে রোধ করতে পারি। তাই physical therapy কে প্রাধান্য দিতেই হবে। এছাড়াও এই শিশুগুলির অন্যান্য সমস্যা যেমন মুখনিঃসৃত অতিরিক্ত লালা ( drooling) বিভিন্ন রোগ ডেকে আনে। এছাড়াও এই শিশুদের অধিকাংশই এপিলেপ্সি বা খিঁচুনি রোগ থেকে ক্রমাগত মস্তিস্ক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
Inclusive education বা সকলের জন্য একইসাথে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেক কথা হলেও আজও সরকারি প্রচেষ্টা ও ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আমাদের মনে রাখতে হবে হুইলচেয়ার দেখে অনুকম্পার চোখে না তাকিয়ে সমাজে বিভিন্নভাবে অন্তর্ভুক্তিকরণ দরকার। Empathy is superior to sympathy।
সেরিব্রাল পলসি শিশুরা সাধারণত খুব বেশিদিন বাঁচতে পারে না। নিউমোনিয়া বা বারংবার খিঁচুনির প্রাবল্যে জীবনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় দশকেই স্বল্পস্থায়ী জীবনসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু যেদিন এই মানুষগুলো ও বাকিদের মতো হাসিখুশি জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে পারবে, সেদিনই আমরা পাবো এক পরিপূর্ন সমাজ।