কুলিক রোববার ফেব্রুয়ারি ৯,২০২০:

রাজসিক রাজশাহী
সুকুমার বাড়ই

পর্ব ৫- এই পর্বে আছে দিঘাপাতিয়া রাজবাড়ি এবং বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের কথা।

এবারের গন্তব্য দিঘাপাতিয়া রাজবাড়ি। আবার বাসে চেপে এগোতে থাকি। বাসের ছাত্র- ছাত্রীরা লালনের গান ধরেছে-

” জাত গেল জাত গেল বলে
একি আজব কারখানা।
সত্য কাজে কেউ নয় রাজি
সবই দেখি তা না না না।।
আসবার কালে কি জাত ছিলে
এসে তুমি কি জাত নিলে।
কি জাত হবা যাবার কালে
সেই কথা ভেবে বলো না।।
ব্রাহ্মণ চন্ডাল চামার মুচি
এক জলে সব হয় গো শুচি।
দেখে শুনে হয় না রুচি
যমে তো কাউকে ছাড়বে না।।
গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়
তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়।
লালন বলে জাত কারে কয়
এই ভ্রম তো গেল না।।”

গান শুনতে শুনতে কিছু সময় পর পৌঁছে যাই দিঘাপাতিয়া রাজবাড়ি। নেমেই রাজবাড়ি দেখে মন ভরে গেল। কবির কল্পনায় নাটোর অমর হয়ে আছে কাব্যে। ঐতিহ্যের জৌলুশ, অতীতের রাজ- রাজন্যদের স্মৃতি, প্রাচীনত্ব আর সেসময়ের সোনালি দিনগুলোকে বুকে ধারণ করে ইতিহাসের নিরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দিঘাপাতিয়া রাজবাড়ি। নাটোর শহর থেকে ২ কিমি দূরে দিঘাপাতিয়া রাজবাড়ি এখন উত্তরা গণভবন নামে পরিচিত। এককালের দিঘাপাতিয়া মহারাজাদের বাসস্থান এখন উত্তরা গণভবন বা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সরকারী হাউস। জানা যায়, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান দিঘাপাতিয়া রাজবাড়ির নাম দেন উত্তরা গণভবন। শুনতে পাই, রাজপ্রাসাদটি প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। তখন রাজা প্রমদানাথ রায় ১৮৯৭ থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত ১১ বছর সময় ধরে বিদেশি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী ও চিত্রকর্ম শিল্পী আর দেশি মিস্ত্রিদের সহায়তায় সাড়ে ৪১ একর জমির উপর এই রাজবাড়ীটি পুনঃনির্মাণ করেন। দিঘাপতিয়া রাজের রাজা প্রমদানাথ রায় চারদিকে সীমানা প্রাচীর দিয়ে পরিবেষ্টিত রাজপ্রাসাদের ভেতরে বিশেষ কারুকার্য খচিত মূল ভবনসহ ছোট-বড় মোট ১২টি ভবন নির্মাণ করেন। তিনি মোগল ও প্রাশ্চাত্য রীতির অনুসরণে কারুকার্যময় নান্দনিক ওই প্রাসাদটিকে এক বিরল রাজ ভবন হিসেবে গড়ে তোলেন। এক এক করে রাজাদের রাজবাড়ির ভবনগুলো দেখতে থাকি ।

রাজকুমারী ইন্দুপ্রভার চিঠিতে যেন থরে থরে সাজানো রাজবাড়ির কীর্তি কাহিনি। দিঘাপতিয়া রাজবংশের রাজারা ছিলেন আধুনিক মন ও মানসিকতার অধিকারী। ১৭১০ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এই রাজবংশের রাজারা কৃতিত্বের সঙ্গেই রাজ্য শাসন করেন। ইতিহাসের পাতায় এখনো যারা অমর হয়ে রয়েছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিঘাপতিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা দয়ারাম রায়, জগন্নাথ রায়, প্রাণনাথ রায়, প্রসন্ননাথ রায়, প্রমথনাথ রায়, প্রমদানাথ রায়, প্রতিভানাথ রায় এবং অষ্টম ও বংশের শেষ রাজা কুমার প্রভাতনাথ রায়। দিঘাপাতিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা দয়ারাম রায় নাটোর রাজের রাজা রাম জীবনের দেওয়ান ছিলেন। রাজবাড়িতে মোট ১২টি ভবন দেখতে পাই। মূল ভবনসহ অন্যান্য ভবনের দরজা-জানালা সব মূল্যবান কাঠের নির্মিত। প্যালেসের দক্ষিণে রয়েছে পাথর এবং মার্বেল পাথরে কারুকাজ করা ফুলের বাগান। বাগানটি ইতালি গার্ডেন নামে পরিচিত। এই বাগানে রয়েছে দেশি-বিদেশি নানা জাতের দুর্লভ সব ফুলের গাছ। বাগানে ইতালি থেকে আনা শ্বেতপাথরের ৪টি নারী ভাস্কর্য আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। আকর্ষণীয় টাইপের ফোয়ারা এবং মাঝে মাঝে কারুকাজ করা লোহ ও কাঠ নির্মিত বেঞ্চ ও ডিম্বাকার সাইজের একটি মার্বেল পাথরের নির্মিত প্লাটফরম। এছাড়াও ভেতরে রয়েছে আগত অতিথিদের চলাফেরার জন্য ৪ ফুট চওড়া রাস্তা। সমগ্র বাগানে বিরল প্রজাতির ফুল আর নামিদামি গাছের সমাহার। পাশের দিঘিতে বৃষ্টি ফোটা পড়ছে অবিরাম।একটি ভাস্কর্যতে আছে এক নারী ছিপ দিয়ে মাছ ধরছে। মনভালো করা এক নৈসর্গিক পরিবেশ।

দিঘাপতিয়া রাজবাড়ির মূল প্রাসাদটি একতলা। এতে রয়েছে প্রশস্ত একটি হলঘর। বেশ উঁচু হলঘরের শীর্ষে রয়েছে একটি প্রকাণ্ড গুম্বুজ। এ গুম্বুজের নিচ দিয়ে হলঘরে পর্যাপ্ত আলোবাতাস প্রবেশ করার ব্যবস্থা রযেছে। হলঘরের মাঝে রাজার আমলে তৈরি বেশ কিছু আসবাবপত্র রয়েছে। এছাড়াও হলরুমে কারুকার্য খচিত একটি বড় সোফা রয়েছে যাতে একসঙ্গে চারজন চারমুখী হয়ে বসা যায়। এই সোফায় বসলে দেয়ালে আটকানো বড় আয়নায় প্রত্যেকে প্রত্যেককে দেখতে পাই। শিশু মন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।

মূল ভবনের সামনে রয়েছে রাজা প্রসন্ননাথ রায় বাহাদুরের আবক্ষ মূর্তি।এর দুপাশে রয়েছে ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশদের তৈরি করা দুটি কামান। মূল প্যালেসের মাঠের পূর্বে রয়েছে রাজার দোলমঞ্চ। পাশেই রয়েছে কুমার প্যালেস। এর সামনে বসানো চার চাকাবিশিষ্ট একটি কালো কামান আজও শোভা পাচ্ছে। মূল রাজপ্রাসাদের প্রবেশপথে সিঁড়ির দুপাশে দুটি কালো কৃষ্ণমূর্তি। এর পরই রয়েছে ধাতব বর্ম। এটা পরেই রাজা যুদ্ধে যেতেন। পিতলের তৈরি এ বর্মটি বিশেষভাবে নজর কাড়ল আমাদের। দিঘাপতিয়া রাজবাড়ীর সেই রাজা-রানীদের এখন আর কেউ নেই। আগের সেই গৌরবও আর নেই। গণভবন হলেও রাজবাড়িটি এখন শুধুই মুকুটহীনভাবে রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা হিসেবে পড়ে রয়েছে। ওখান থেকে সবাই ফিরে এলাম এক বর হোটেলে। ওখানকার এম পির সৌজন্যে দুপুরের আহারে ছিল বাহারি মেনু। নাটোরে এসে কাঁচাগোল্লা নেব না তাই কখনো হয়?

ঐদিন বিকেলে অর্থাৎ ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ হাজির হই বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে। বিস্ময় মাখা চোখে একটার পর একটা ঘর দেখেছি আর প্রত্ন সামগ্রীর মায়াবী টানে কেমন যেন ভ্যাবাচেকা খেয়েছি। ভাবতেই পারিনি এত সুন্দর একটি স্থান আছে। ইতিহাস যেন কথা বলছে। এটি রাজশাহী মহানগরের হেতেম খাঁতে স্থাপিত বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর। প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহের দিক থেকে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সংগ্রহশালা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন মিশ্র জানালেন, বরেন্দ্র জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় নাটোরের দিঘাপাতিয়া রাজপরিবারের জমিদার শরৎ কুমার রায়, আইনজীবী অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় এবং রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল এর শিক্ষক রামপ্রসাদ চন্দ্রের উল্লেখযোগ্য আবদান রয়েছে। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে তাঁরা বাংলার ঐতিহ্য ও নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি গঠন করেন। ঐ বছরে তাঁরা রাজশাহীর বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালিয়ে ৩২টি দুষ্প্রাপ্য নিদর্শন সংগ্রহ করেন। এই নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করার জন্য শরৎ কুমার রায়ের দান করা জমিতে জাদুঘরটির নিজস্ব ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। নির্মাণ শেষ হয় ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে। একই বছরের ১৩ নভেম্বর বাংলার তৎকালীন গভর্নর কারমাইকেল জাদুঘরটি উদ্বোধন করেন। উত্তরবঙ্গের নানা প্রত্নসামগ্রী,পুঁথি, দুস্পাপ্য গ্রন্থ বুকে নিয়ে এ কেন্দ্র ফিসফিস করে বলে চলেছে নানা ইতিহাসের কাহিনি। আর আমি যেন বলছি-
হে অতীত, তুমি হৃদয়ে আমার, কথা কও কথা কও–।


বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এটি পরিচালনা করে থাকে। ওখানকার ডিরেক্টর, কর্মচারীদের আতিথ্য মনে থাকবে আজীবন। রাতে ফেরার পথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি নাটকের দলের শিল্পীদের সাথে জমিয়ে আড্ডা মেরে রাতের খাবার খাই। সকলের মন খারাপ। এবারা যে ফেরার পালা। পরদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গাড়িতে বেড়িয়ে পরি বাড়ি অভিমুখে। বৃষ্টি তখন সঙ্গ ছাড়েনি। মন ভরে রাস্তার এক পাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখছি আর মন দোতারায় লালনের গানের সুর ভাজতে থাকি, জাত গেল জাত গেল —–। চলে আসি ছোট সোনা মসজিদ। সীমান্তের কাজ কর্ম সেরে মহদিপুর হয়ে ফিরে আসি রায়গঞ্জে। আজও রাজশাহীর স্মৃতি বয়ে বেড়াই। মনে হতে থাকে-
“দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী / মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরুভূমি, / কত না অজানা জীব, কত না অপরিচিত তরু রয়ে গেল অগোচরে।”

শেষ —-

32