কুলিকরোববার, ফেব্রুয়ারি ৯,২০২০:

৭১’ এর একটি অগ্রন্থিত অমুদ্রিত ইতিহাস

সবুজ সেন
      ________________________________
১১ই ডিসেম্বর , ১৯৭১ । দিনাজপুর জেলার একটি সামান্য গ্রাম । সকাল এগারোটা । এক সম্পন্ন গৃহস্থ বাড়ির উঠোনের এককোনে মোড়ার ওপরে জুবুথুবু হয়ে বসে আছেন এক বৃদ্ধ । উঠোনের এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটা মুরগী ।
মাটির বারান্দায় বাঁশের খুঁটিতে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে এক তরুণী । তার সাজ পোশাকের ঠিক নেই । বুকের থেকে আঁচল পড়ে গেছে । সে ভ্যাবলার মত মাটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । সেই দৃষ্টিতে প্রাণ নেই ।
তখনই হুড়মুড় করে ওরা ঢুকে পড়ল । এক্কেবারে বাড়ির উঠোনে । ভারি বুটের আওয়াজ , এই আওয়াজ এই বাড়ির মানুষগুলি খুব ভালো করে ছেনে…এগুলো পাকিস্তানি সৈন্যের বুটের আওয়াজ ।
এবারের দলটা ছোট , মোট পাঁচজন । এদের জামাকাপড় অবিন্যস্ত , বোঝাই যাচ্ছে এরা মুক্তিবাহিনীর তাড়া খাওয়া পাক সৈন্য । ওরা এসে পড়তেই বারান্দায় বসে থাকা মেয়েটা পড়িমরি করে ছুটে ঘরে ঢুকে পড়ল । উঠোনের কোনায় মোড়ায় বসে থাকা বৃদ্ধ মোড়া থেকে উঠে দাঁড়ালেন ।
ওরা বলল , পানি…পানি ।
বৃদ্ধ একটা ঘটি করে পানি এনে দিলেন । কুয়োর পাড়ে একটা খাটিয়া কাত করে রাখা ছিল , ওরা সেটা পেতে বসল । ওদের কম্যান্ডার লোকটি বেঁটে ।
সে বলল , চাচা ডরো মৎ ।
খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে কম্যান্ডার একটা চুরুট ধরাল ।
বলল , উও জেনানা কউন হ্যায় ?
বৃদ্ধ পরিষ্কার বাংলায় বললেন , নাতনি ।
নাতনি শব্দটা বোধহয় ওদের কাছে নতুন । ওরা সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল । নিজেরাই ‘নাৎনি’…‘নাৎনি’ বলে সমস্বরে হাহা হোহো হাসি ।
কম্যান্ডার জানতে চাইল , ঘর মে অউর কউন কউন হ্যায় ?
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন । কেউ নেই ।
কম্যান্ডার কোমরের বেল্ট ঢিলে করতে করতে বলল , নাৎনি কো লে আও…পেয়াস লাগি হ্যায় ।
বৃদ্ধ কোনও কথা বললেন না । মাত্র চারমাস আগেই এমন করেই অন্য একটা সৈন্যদল এই বাড়ির উঠোনে এসেছিল । সেদিঙ তারা পানি খেতে চায়নি । উঠোনের মাঝখানে বসে বৃদ্ধের জোয়ান ছেলেটা রেডিও শুনছিল । বঙ্গবন্ধুর রক্তগরম করে দেওয়া বক্তৃতা । একজন সৈন্য তার হাত থেকে রেডিওটা কেড়ে নেয় , তার অণ্ডকোষে একটা লাথি মেরে সৈন্যটা বলেছিল , থুঃ…শালা বাঙ্গালি মুসলমান । তারপর মোট চারটে গুলি করেছিল ছেলেটার বুকে আর পেটে ।
নাতনিটাকে উঠোনেই ওরা ছয়জন মিলে চেপে ধরেছিল । তবে এই বৃদ্ধকে ওরা কিছু বলেনি শুধু যাওয়ার সময় একজন টান মেরে তার লুঙ্গিটা খুলে দিয়েছিল ।
বৃদ্ধ কোনও কথা বলছে না দেখে বেঁটে কম্যান্ডার লোকটা খাটিয়া থেকে উঠে দাঁড়াল । এগিয়ে এসে সে বৃদ্ধের চোখে চোখ রাখল , তারপর ফটাস্‌ করে একটা থাপ্পড় লাগাল বৃদ্ধের গালে । অশক্ত শরীরে এই ধাক্কা সামলাতে না পেরে বৃদ্ধ মাটিতে পড়ে গেলেন । পড়েই থাকলেন , ওঠার কোনও চেষ্টা তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করা গেল না ।
চারজন পাকসেনা ধুপধুপ করে দৌড়ে মাটির বারান্দায় উঠে পড়ল । উঠোন থেকে ঘরের ভেতরটা পুরো কালো অন্ধকার দেখাচ্ছে । সেই অন্ধকার ঘরে রয়েছে বৃদ্ধের নাতনি ।
চারজন হুড়মুড় করে সে ঘরে ঢুকতেই কোন মেয়েলি আতঙ্ক চিৎকারের বদলে ওটি পরিচিত কিন্তু সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটি শব্দ শনা গেল , সেটা নাইন এম এম মেশিনগানের শব্দ । মাটির বারান্দায় ছিটকে এলো বেশ খানিকটা তাজা রক্ত ।  
খাটিয়ায় বসে থাকা বেঁটে কম্যান্ডার তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল । সে ভুল জায়গায় এসে পড়েছে । ঘরের মধ্যে নিশ্চই মুক্তিবাহিনীর লোক বসেছিল । দ্রুত এই জায়গা ছেড়ে পালাতে হবে ।
কিন্তু কম্যান্ডারের চিন্তার চেয়েও দ্রুতগতিতে সেই ঘর থেকে বেরিয়ে এল একজন তরুণী , যার সাজপোশাকের ঠিক নেই । সে বৃদ্ধের নাতনি । সত্যিই তার হাতে নাইন এম এম মেশিনগান । এই অস্ত্র সে পেল কোথায় !!!!!
কম্যান্ডার পিছিয়ে যাচ্ছে । মেয়েটি এগিয়ে আসছে ।
উঠোনের এক্কেবারে শেষপ্রান্তে একটা কচুঝোপ । সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা হয় । পিছিয়ে যেতে যেতে কম্যান্ডার সেই আবর্জনার ঢিবিতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল ।
নাতনির মেশিনগান এখন কম্যান্ডারের মুখের ওপর তাক করা । কম্যান্ডারের চোখে মৃত্যুভয় নেই কিন্তু সে এই বাঙ্গালি মেয়ের পৈশাচিক স্পর্ধা দেখে স্তম্ভিত ।
মেয়েটি আর সময় নিল না , কারন ঘেন্নাময় জিনিষগুলির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না । সে ট্রিগার চেপে দিল । এক…দুই…তিন…চার…পাঁচ…ছয়…সাত…পরপর গুলি বেরিয়ে যেতে লাগলো মেশিনগান থেকে । কম্যান্ডারের মুখ চেনার আর কোনও উপায় রইল না ।
এবার সেই বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন । হেঁটে হেঁটে সেই কচুঝোপের পাশে এসে লুঙ্গি তুলে প্রস্রাব করতে বসলেন , বৃদ্ধবয়সে ঘন ঘন প্রস্রাব পায় । তিনি প্রস্রাব শুরু করেছেন , এবার তাঁর প্রস্রাবের বর্ণহীন ধারা আর কম্যান্ডারের লাল রক্তের ধারা দুটোই ঢাল বরাবর একই দিকে গড়িয়ে যেতে লাগলো ।

26