কুলিক রোববার ফেব্রুয়ারি ২,২০২০:

রাজসিক রাজশাহী


সুকুমার বাড়ই

পর্ব ৪ ; এই পর্বে আছে পুঠিয়া আর নাটোর রাজবাড়ির কথা।

গতকাল জন ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের অধিকর্তা মেসবাহ কামাল স্যার বলে দেন ২৮ সেপ্টেম্বর,২০১৯ শনিবার রাজসিক রাজশাহী ভ্রমণের কথা। সেদিন মহালয়া। পশ্চিম বাংলার মানুষ মেতেছে মহালয়ায়। ওদেশে শঙ্খধনির আওয়াজ নেই। নেই সকালে ওঠার তাড়া। নেই পদ্মা পাড়ে পিতৃ তর্পণের কোন আয়োজন। পুজোর গন্ধ ওখানে পাওয়া যায় না। অন্যান্য দিনের মতই আরেকটি দিন ক্যাম্পাসে। সকালে সকালে চলে আসি ক্যাফেটেরিয়াতে। প্রতিদিন হয় দেশি চিকেন কসা না হয় মটন কসা। তবে একদিন জোটে পদ্মার বড় ইলিশের পাতুরি। যেমন রান্না তেমনি আপ্যায়ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন মিশ্রের সকলকে আপন করে নিয়ে আপ্যায়ণের কথা ভোলার নয়।যাই হোক আমরা সকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে উঠে পড়লাম। চলি রাজসিক রাজশাহী পরিদর্শনে। অল্প সময় পর পৌঁছে যাই পুঠিয়া রাজবাড়ী।

নদী ওদেশের প্রাণ আর নদীর স্রোতের মত বহমান বাঙালি জাতির উত্থান – পতন। উত্থান – পতনের ধারাবাহিকতায় বাংলায় প্রবর্তিত হয় নানা শাসন ব্যবস্থার। পুরো দেশ জুড়েই নানাভাবে সে সব শাসক তথা জমিদারদের বহু কীর্তি রয়েছে ছড়িয়ে। কালের সাক্ষী তাঁদের বিশাল বসতবাড়িগুলো মনে করিয়ে দেয় অতীতের ঐশ্বর্যকে। সেই জমিদার আর জমিদারি আজ আর নেই কিন্তু ঝলমলে অতীতের চিহ্ন বুকে দাঁড়িয়ে আছে বহু প্রাসাদ। তারা যেন সেই ইতিহাসের গল্প কথা শোনাতেই আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে। এই পুঠিয়া রাজবাড়ির গোড়াপত্তন হয় মোঘল আমলে। পুঠিয়া রাজবংশের সর্বশেষ উত্তরাধিকারী ছিলেন মহারাণী হেমন্তকুমারী দেবী। ১৮৯৫ সালে বর্তমানে যে মূল রাজবাড়িটি আছে তা তিনি নির্মাণ করেন। নির্মাণের পর তিনি রাজপ্রাসাদটি শাশুড়ি মহারাণী শরতসুন্দরী দেবীর স্মরণে উৎসর্গ করেন। উল্লেখ্য, রাজা যোগেন্দ্র নারায়নের সাথে শরতসুন্দরী দেবীর বিয়ে হয় মাত্র পাঁচ বছর বয়সে এবং তিনি বিধবা হন তার সাত বছর পরেই। তার কোনো সন্তানসন্ততি না থাকায় রজনীকান্ত নামে এক ছেলেকে দত্তক নেন। পরবর্তীতে রজনীকান্ত ‘রাজা যতীন্দ্রনারায়ন’ নামে পরিচিত হয়ে হেমন্তকুমারী দেবীকে বিয়ে করেন। হেমন্তকুমারীর মৃত্যুর পর রাজবংশ এবং জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির ফলে পুঠিয়া রাজবাড়ি তার জৌলুশ হারাতে থাকে। আমরা দেখলাম এখনো এর কিছু নিদর্শন রয়েছে, যেগুলার বর্তমানে আরও সংস্কার প্রয়োজন।

আমাদের বাস বিশাল এক মাঠের সামনে থামে । ওই মাঠের পরেই পুঠিয়া পাঁচআনি রাজবাড়ি চোখে পড়ে। বৃষ্টির যেন হাজিরার সময় পার হয় নি তাই সে কাজ করেই চলেছে। ছাতা মাথায় নেমে পড়লাম ইতিহাস খুঁজতে। দোতলা বিশিষ্ট এই রাজবাড়িটি প্রায় ৪.৩০ একর জমির উপর নির্মিত। কাঠামোগত দিক দিয়ে এটি আয়তাকার। ইট, সুরকি, লোহা, চুন ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে প্রাসাদটি নির্মাণে। মূল ভবনে প্রবেশের জন্য দুটি ঝুলবারান্দা রয়েছে। কাঠের তৈরি সিঁড়িও আছে উপরে ওঠার জন্য। সিঁড়ি দিয়ে প্রবেশপথের পরের দরজা বন্ধ দেখলাম। এ ধরণের কাঠামো ইন্দো-ইউরোপীয় সময়ের স্থাপত্য রীতিকেই নির্দেশ করে। এলাকাবাসীর মুখ থেকে শোনা যায় প্রাসাদটির মাটির নিচেও কক্ষ আছে। বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তা বন্ধ আছে। আরো রয়েছে গোপন, সুরঙ্গ যেগুলোতে প্রবেশ নিষেধ। কথিত আছে, সুড়ঙ্গপথ নাকি পাশের দিঘীগুলোর নিচ দিয়ে চলে গেছে অপরপাড়ে, যাতে কখনো আক্রমণের শিকার হলে সহজেই পালিয়ে যাওয়া যেত। তথ্যগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আমার মতো আরও অনেকের। পুঠিয়া রাজবাড়ির অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে শিব মন্দির। ওখানকার সেবাইত জানান, রাণী ভুবনময়ী দেবী এটি নির্মাণ করেন তৎকালীন তিন লক্ষ টাকা খরচ করে। এটি নির্মাণে প্রায় সাত বছর লেগে যায়। এই উপমহাদেশের মধ্যে অন্যতম বড় শিব মন্দির এটি। মন্দিরটির সামনে রয়েছে বিশাল দিঘি। পুরো পুঠিয়া রাজবাড়ি জুড়েই এমন ছোট বড় আরো ৫টি দিঘি দেখতে পাই। মন্দিরটিতে প্রবেশের জন্য এবং পেছনের দিঘিতে নামার জন্য দুটি মূল সিঁড়ি রয়েছে। ১৪.৩০ মিটার পরিমাপের মন্দিরটি ৪ মিটার উচু মঞ্চের উপর নির্মিত। মন্দিরটিতে একটি মূল চূড়া এবং তার চারদিকে ৪টি করে ছোট ছোট চূড়া রয়েছে। মূল চূড়াটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ মিটার। দেখলাম শিব মন্দিরটিতে এখনো হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন পূজা অর্চনা করে চলেছেন। পুঠিয়া পাঁচআনি রাজবাড়ির ঠিক মাঝখান দিয়ে একটা প্রবেশপথ আছে। গিয়ে যে মন্দির দেখি তার নাম গোবিন্দ মন্দির। ভাঙাচোরা কাঠের দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে গিয়ে হয়তো একটু কেমন যেন লাগে। কিন্তু প্রবেশের পরে গোবিন্দ মন্দিরটির সৌন্দর্য দেখে কেমন করা ভাব নিমেষে উবে যায়। কি অসাধারণ কারুকার্য! মন্দিরটির মাঝখানে রয়েছে প্রশস্ত ঘর, যেখানে গোবিন্দ মূর্তি রয়েছে। তার চারপাশে রয়েছে চারটি ছোট কক্ষ। বারান্দা দিয়ে প্রবেশপথ ৩টি এবং মূল প্রবেশপথ পশ্চিমে হলেও মন্দিরটির চারপাশেই ৪টি খিলান দরজা রয়েছে। উপরতলায় ওঠার জন্য সিঁড়ি রয়েছে। মন্দিরের দেয়াল খুব সুন্দর করে খোদাই করা। পোড়ামাটির দেয়ালগুলোয় বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি, পালকি, ঘোড়া, ধনুক, তীর, হাতি, ফুল ইত্যাদির নকশা খোদাই করা রয়েছে। এবার এলাম চারআনি রাজবাড়ী।এর গঠনশৈলীর জন্য এবং ভেতরের ঘরগুলোর প্রবেশপথে মোটা মোটা লোহার গারদ থাকার জন্য অনেকেই একে জমিদার বাড়ির জেলখানা মনে করে ভুল করে থাকেন। দেখি পাঁচআনি রাজবাড়ির পশ্চিমে অবস্থিত এই রাজবাড়িটির অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। কাছারি এবং কোষাগার ভবন কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। তবে ধরা হয়, জমিদার বাড়ির বিভিন্ন কার্য সম্পাদনের জন্য এটি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখানে রাজবাড়ির কর্মচারীরা থাকতেন এবং হাতি-ঘোড়া রাখারও ব্যবস্থা ছিল।

চারআনি রাজবাড়ির পর আরেকটু সামনে হাঁটলেই তিনটি মন্দির পাশাপাশি দেখতে পাই । গোপাল মন্দির, ছোট গোবিন্দ মন্দির এবং বড় আহ্নিক মন্দির। দেখে মনে হয় এই তিনটি মন্দির হয়তো সবচেয়ে যত্নে রাখা হয়েছে। কারণ অন্য নিদর্শনগুলোর ক্ষয়ক্ষতি হলেও বা বয়সের ছাপ পড়লেও এই মন্দিরগুলোকে চিরযৌবনা বলে মনে হয়। মন্দিরের সামনের দেয়াল ব্যতীত অন্যান্য দেয়ালে কোনো নকশা নেই। সামনের দেয়ালে বিভিন্ন যুদ্ধের কাহিনী এবং দেব-দেবীর মূর্তি খোদাই করা আছে।
শিব মন্দিরে ঢুকলেই হাতের ডান দিকে আরেকটি ছোট মন্দির দেখতে পাওয়া যায় , যা রথ বা জগন্নাথ মন্দির নামে পরিচিত। প্রবেশপথে রয়েছে বেলে পাথরে তৈরি চৌকাঠ। ভেতরে রয়েছে প্রশস্ত বারান্দা। বারান্দার চারপাশে আটটি পিলার রয়েছে। এটি একটি দোতলা কাঠামো, মূল কাঠামোর উপরের কক্ষটি আকারে ছোট। জানা যায় মূল শিব মন্দির নির্মাণের সাথে সাথে এই মন্দিরটিও রাণী ভুবনময়ী দেবী নির্মাণ করেন। তবে দেখে খারাপ লাগে মন্দিরটি বর্তমানে অনেকটাই পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
শিব মন্দির ছেড়ে আরো সামনে চলে আসি। সাদা রঙের আরেকটি বড় মন্দির সামনে। এটি দোল মন্দির। দেখে মনে হয় সাদা চুনকাম করা। শিব মন্দিরের মতো দোল মন্দির কোনো উঁচু মঞ্চের উপর নির্মিত নয়। তবে সমতল ভূমি থেকে এর উচ্চতা ২০ মিটারের মতো মনে হয়। মন্দিরটি দেখতে বেশ। উপরের দিকে ক্রমশ সরু। অর্থাৎ নিচতলা থেকে দোতলা আকারে ছোট, দোতলা থেকে তৃতীয় তলা আরো ছোট। মন্দিরটির নির্মাণশৈলীতে একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার , এতে প্রচুর প্রবেশপথ রয়েছে। নিচতলার চারদিকে সাতটি করে মোট ২৮টি প্রবেশপথ রয়েছে। দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ তলায় যথাক্রমে ২০টি, ১২টি এবং ৪টি করে সর্বমোট ৬৪টি প্রবেশপথ রয়েছে। জানা যায়, এতগুলো প্রবেশপথের জন্য পুঠিয়াবাসী এই মন্দিরকে ‘হাজারদুয়ারি’ নামে ডাকে। তবে অবাক করা বিষয় , এই মন্দিরে কোনো পূজা অর্চনা হয় না। এমনকি লোকসমাগমও তেমন নেই। গেটগুলোও বন্ধ থাকে বেশিরভাগ সময়। স্থানীয় লোকদের মুখে জানা যায়, রাজা ভূবেন্দ্র নারায়ণ তাঁর নাবালিকা স্ত্রীর সাথে লুকোচুরি খেলার জন্য এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। ইতিহাসের আতর মেখে ওখান থেকে বেড়িয়ে আবার বাসে নাটোর অভিমুখে দিই ছুট।

ইতিহাস চুপিচুপি কথা কয়। সে সব কথা শুনতে শুনতে আধ ঘুমের আবেশ মেখে বেশ খানিক পরে নাটোর রাজবাড়ী পৌঁছাই। কবির বনলতা সেন আর ইতিহাসের অর্ধবঙ্গেশ্বরী নামে পরিচিত রানী ভবানী। তিনি বিখ্যাত করেছেন নাটোরকে। জানতে পারি, অষ্টাদশ শতকের শুরুতে নাটোর রাজবংশের উৎপত্তি হয়। ১৭০৬ সালে পরগণা বানগাছির জমিদার গণেশ রায় ও ভবানী চরণ চৌধুরী রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থ হয়ে চাকরিচ্যুত হন। দেওয়ান রঘুনন্দন জমিদারিটি তাঁর ভাই রাম জীবনের নামে বন্দোবস্ত নেন। এভাবে নাটোর রাজবংশের পত্তন হয়। রাজা রাম জীবন নাটোর রাজবংশের প্রথম রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন ১৭০৬ সালে, মতান্তরে ১৭১০ সালে। ১৭৩৪ সালে তিনি মারা যান। ১৭৩০ সালে রাণী ভবানীর সাথে রাজা রাম জীবনের দত্তক পুত্র রামকান্তের বিয়ে হয়। রাজা রাম জীবনের মৃত্যুর পরে রামকান্ত নাটোরের রাজা হন। ১৭৪৮ সালে রাজা রামকান্তের মৃত্যুর পরে নবাব আলীবর্দী খাঁ রাণী ভবানীর ওপর জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। রাণী ভবানীর রাজত্বকালে তাঁর জমিদারি বর্তমান রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, যশোর, রংপুর, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহ জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রাজবাড়ির মোট আয়তন ১২০ একর। ছোট-বড় ৮টি ভবন আছে। ২টি গভীর পুকুর ও ৫টি ছোট পুকুর আছে। রাজবাড়ি বেষ্টন করে আছে দুই স্তরের বেড়চৌকি। পুরো এলাকা ২টি অংশে বিভক্ত – ছোট তরফ ও বড় তরফ। রাজবাড়ির উল্লেখযোগ্য মন্দিরগুলো শ্যামসুন্দর মন্দির, আনন্দময়ী কালিবাড়ি মন্দির, তারকেশ্বর শিব মন্দির। তবে রাজবাড়ীর অবস্থা বেশ খারাপ। সংস্কার প্রয়োজন। বোর্ডে লেখা দেখলাম ১৯৮৬ সাল থেকে রাজবাড়ির পুরো এলাকাটি রানী ভবানী কেন্দ্রীয় উদ্যান বা যুবপার্ক হিসেবে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে দেখি ইতিহাস কেঁদে চলেছে নিরবে।

(শেষ হয়েও হইল না শেষ — শেষ পর্ব ৫, পড়ুন পরের রোববারে।)

283