কুলিক রোববার জানুয়ারি ২০,২০২০ :

রাজসিক রাজশাহী

সুকুমার বাড়ই

পর্ব ৩ ; এ পর্বে আছে শিলাইদহ বা কুটিবাড়ি , মীর মোসারফ হোসেনের বাড়ি ও লালনের মাজারের কথা।

২৭ সেপ্টেম্বর শুক্রবার যথা নিয়মে সকালে উঠে পড়ি। একমুহুর্ত সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। কাঁধে ঝোলা নিয়ে হাঁটতে থাকি। ক্যাম্পাস থেকে অল্প একটু হাঁটলেই পদ্মা পাড়। এদিন বৃষ্টি নেই। তাই মন আনন্দে বিহ্বল। পদ্মা পাড়ে ভীষণ ভিড়। কেউ নৌকো চালিয়ে দূরে কোথাও চলেছে আবার কেউ দোয়ারি দিয়ে মাছ ধরছে। ওখানকার মানুষের সাথে কথা বলি। নদী পাড়ের মানুষের জীবনের কথা শুনতে শুনতে কখন যেন নিজেই ওদের একজন হয়ে পড়ি । সাইফুদ্দিন নামের একজন মানুষের বাড়িতে চা খাই। চায়ের টেস্ট ততটা ভালো না হলেও আন্তরিক আপ্যায়নে পুষিয়ে
যায়। ওখান থেকে চলে আসি । ঢাকা-রাজশাহী সড়কের পাশে এসে আর একবার চা খাই। ওখানকার মানুষের সাথে গল্প জমিয়ে দিই। আজ কোথায় যাই ভাবছি। এমন সময় একটি বড় বাস এসে থামে। খালাসি বলে চলেছে নাটোর– কুষ্টিয়া –ফরিদপুর —-। ফরিদপুর বলায় মনটা যেন কেমন করে ওঠে। হঠাৎ বাসে উঠে পড়ি। জায়গা পেয়ে যাই। পাশের সিটের যাত্রীর সাথে আলাপ করতে থাকি । তাঁর পরামর্শে গন্তব্য ঠিক করে ফেলি। কুষ্টিয়া। ওখানে রবি স্মৃতি বিজড়িত শিলাইদহ। না দেখে কি আসা যায়? বাস ছুটে চলেছে পুঠিয়া, নাটোর, ঈশ্বরদী, পাবনা হয়ে কুষ্টিয়ার দিকে। মাঝে পেলাম পদ্মা নদীর উপর বড় সেতু। নাম লালন সেতু। মনে পড়ে গেল লালনের সর্বধর্মবাদের কথা। জানতে পারি লালনের সমাধিও কুষ্টিয়ার কাছেপিঠে। ভ্রমণের তালিকায় আরেকটি নাম। অনেক কথা ভাবতে ভাবতে চলে আসি কুষ্টিয়া। প্রায় ৫ ঘণ্টার রাস্তা। পেটে তখন ছুঁচোয় ডন মারছে। অগত্যা ঠান্ডা করি। একটি গাড়ি ভাড়া করে চলি শিলাইদহ মানে কুটিবাড়ি । কুষ্টিয়া শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে কুমারখালি উপজেলার অর্ন্তগত শিলাইদহ ইউনিয়নের খোরেশদপুরে কুঠিবাড়ি অবস্হিত । মাঝে পাই গড়াই নদী। ফরিদপুরে এ নদী পাড়েই ছিল পৈত্রিক বাড়ি। কেমন যেন মন জুড়োনো বাতাস লাগে গায়ে। পৌঁছাই অল্প সময় পরেই। কুটিবাড়িটি এখন বাংলাদেশ সরকারের তত্বাবধানে জাদুঘর। জাদুঘরের গেটের পাশেই রয়েছে টিকেট কাউন্টার। বিদেশি টিকিট ১০০ টাকা। কেটে ঢুকে পড়লাম রবির দেশে। জানতে পারি রবীন্দ্রনাথের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮০৭ সালে এ অঞ্চলের জমিদারি পান। পরবর্তিতে ১৮৮৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে জমিদার হয়ে আসেন। এখানে তিনি ১৯০১ সাল পর্যন্ত জমিদারী পরিচালনা করেন। এ সময় এখানে বসেই তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালী, ইত্যাদি। গীতাঞ্জলী কাব্যের অনুবাদ কাজও শুরু করেন এখানে । ১৯৫৮ সাল থেকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ব্যবস্হাপনায় শিলাইদহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়িটি গৌরবময় স্মৃতিরূপে সংরক্ষিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কুঠিবাড়িটি গুরুত্ব অনুধাবন করে কবির বিভিন্ন শিল্পকর্ম সংগ্রহ করে একে একটি জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় । পুরো ভবনটি এখন জাদুঘর হিসেবে দর্শকদের জন্যে উম্মুক্ত । জাদুঘরের নীচ ও দ্বিতীয় তলায় ১৬টি কক্ষেই কবি রবীন্দ্রনাথ, শিল্পী রবীন্দ্রনাথ, জমিদার রবীন্দ্রনাথ, কৃষক বন্ধু রবীন্দ্রনাথ অর্থাৎ নানা বয়সের বিচিত্র ভঙ্গির রবীন্দ্রনাথের ছবি । বাল্যকাল থেকে মৃতু্শয্যার ছবি পর্যন্ত সংরক্ষিত আছে । ভারতের রাস্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির দেওয়া রবি ঠাকুরের বেশ কয়েকটি ছবি শোভা পাচ্ছে। তাছাড়াও রয়েছে শিল্পকর্ম এবং তাঁর ব্যবহার্য আসবাবপত্র দিয়ে পরিপাটি করে সাজানো। কবি ভবনে ব্যবহার্য জিনিসপত্রগুলোর মধ্যে আরো আছে চঞ্চলা ও চপলা নামের দুটো স্পিডবোট, ৮ বেহারা পালকি, কাঠের চেয়ার, টি টেবিল, সোফাসেট, আরাম চেয়ার, পালংক ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিস । দেখে মন ভরে গেল। রবির সেই স্মৃতিবিজড়িত বকুলগাছ, আমগাছ এখনো যেন কথা বলে চলেছে। তারা ডাল ঝুঁকিয়ে কি যেন কানে কানে বলে ওঠে । প্রচুর ছবি ও ভিডিও তুলে রবির আবেশ মনে মেখে ওখান থেকে চলে আসি কাছেই তাঁর প্রিয় পদ্মা পাড়ে। দিগন্ত বিস্তৃত নদী। বর্ষায় তখন ফুলে ফেঁপে উঠেছে। সময় কম তাই আবার ছোটা শুরু। গাড়ির ড্রাইভার রাহেল বলে, -কাছেই মীর মোসারফ

হোসেনের বাড়ি।
যাইবেন নাকি?
-আরে চল চল । আবার কবে আসব তার কি আর ঠিক আছে?
অগত্যা গাড়ি সেই দিকেই ছুটে চলেছে ।
চলে আসি কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলার গ্রাম লাহিনীপাড়ায়। ওখানে বহু ভাষায় পারদর্শী বিষাদ সিন্ধুর লেখক ও বাংলা সাহিত্যে উদীয়মান সূর্য মীর মোসারফ হোসেনের বাড়ি । এটিও সরকারের অধীনে জাদুঘর বানানো হয়েছে। লেখকের জীবন ও কর্মের কিছু নিদর্শন দেখে বেরিয়ে আসি। এবার গন্তব্য লালন সাইয়ের আখড়া। কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার ছেঁউড়িয়া গ্রামে কালীগঙ্গা নদীর তীরে বাউল সম্রাট লালন শাহের মাজার। মরমি ভাবসাধক ওখানেই মৃত্যুবরণ করেন। বাউল সম্রাটকে সমাহিত করা হয় ছেঁউড়িয়ার মাটিতেই। তাঁর মৃত্যুর পর শিষ্যরা এখানেই গড়ে তোলে মাজার বা স্থানীয়দের ভাষায় লালনের আখড়া। বিশাল গম্বুজে তাঁর সমাধি ঘিরে সারি সারি শিষ্যের কবর রয়েছে। এ মাজারটি বাউলদের তীর্থস্থান। মাজার থেকে কিছু দূরে রয়েছে একটি ফটক। এই ফটক দিয়েই মাজারে প্রবেশ করতে হয়। প্রতি বছর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে সাধু-ভক্তদের পাশাপাশি বাউল সম্রাটের টানে দেশ বিদেশ থেকে ছুটে আসে লাখো লাখো পর্যটকের দল। মাজারের পাশে রয়েছে লালন মিউজিয়াম। লালনের একটি দরজা, লালনের বসার জলচকি, ভক্তদের ঘটি-বাটি ও বেশকিছু দুর্লভ ছবি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। মাজার থেকে বেরিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেলাম লালনের আবক্ষমূর্তি। সব কিছু সুন্দর সাজানো গোছানো। মন চক্ষুতে দেখতে পাই লালন একতারা নিয়ে গাইছে একতার গান।

লালনের বেশ কিছু রচনাবলী থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তিনি ধর্ম-গোত্র-বর্ণ-সম্প্রদায় সম্পর্কে আদৌ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন না। ব্রিটিশ আমলে যখন হিন্দু ও মুসলিমের মধ্যে জাতিগত বিভেধ-সংঘাত বাড়ছিল তখন লালন ছিলেন এর বিরূদ্ধে প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। তিনি মানুষে-মানুষে কোনও ভেদাভেদে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর কাছে জাতি, ধর্ম, বর্ণ এসবের কোনও মূল্য ছিল না। তিনি ছিলেন মানবতাবাদী। লালন ফকিরের গান “লালন গীতি” নামে প্রসিদ্ধ। বাউলদের জন্য তিনি যেসব গান রচনা করেন, তা কালে-কালে এত জনপ্রিয়তা লাভ করে যে মানুষ এর মুখে মুখে তা পুরো বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লালনের গানে প্রভাবিত হয়েছিলেন। এখানে দেখি অতিথিদের জন্য প্রায়শই গান পরিবেশন করে থাকেন শিল্পীরা। আমার ভাগ্যেও জুটে যায়। দেখি লালন অডিটোরিয়ামের নিচে রয়েছে ভক্ত সাধুদের থাকার সুব্যবস্থা। মুক্ত প্রান্তরে সারা দিনমান তাঁরা আপন মনে পরিবেশন করে যায় লালনের মর্মভেদী গীত যা আগত অতিথিদের মন কেড়ে নেয় অতি সহজে এবং আবিষ্ট করে এক রহস্যময় আবেশে।দোতলায় লালন একাডেমিতে একটি ঘরে চলছে ধ্রুপদী গানের প্রশিক্ষণ। বসে পড়ি গান শুনতে। শিল্পী আর শিক্ষকদের সাথে ভাব বিনিময় করি। ওখান থেকে চলে আসি কুষ্টিয়া কুঠিবাড়ি বা টেগোর লজে। এই যা! সময়তো একদম কথা শুনতে চাইছে না। আর দেরি নয় এবার ফেরার পালা। দ্রুত খাবার খেয়ে রাজশাহী অভিমুখে ফিরে চলেছি। বাসে উঠে নানা কথা ভাবতে ভাবতে চলতে থাকি। ভাবতে লাগি আজও আমরা এগোনোর নামে কত পিছিয়ে। এখনো আমরা বোধের পিলসুজ জ্বালিয়ে চেতনা বৃদ্ধির নামে সভ্যতার ধ্বংস চিহ্ন এঁকে চলেছি। দিন যায় আর বেড়ে চলেছে ভেদাভেদ। কবে আমাদের হৃদয়ে প্রকৃত চেতনার বীজ বোপিত হয়ে লালনময় হবে?আরও কত কি ভাবছি এমন সময় হঠাৎ রাজশাহী রাজশাহী বলে চিৎকার শুনে ধরফড়িয়ে উঠে পড়ি। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বুঝতেই পারিনি। রাত ৮ টায় ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখলাম সমাপ্তি অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে। সাধারণের ইতিহাস নির্মাণ বিষয়ে নানা জনের কাছ থেকে নানা কথা শুনতে থাকি। ওদের কথার সাথে লালনকে মিলিয়ে ফেলি। কোথায় যেন সব এক হয়েও কত ফারাক! শেষে পারভিন আকতার সহ আরও কয়েকজন শিল্পীর কণ্ঠে শুনতে পাই রবি ও লোকগান। রাতের খাওয়া সেরে সারাদিনের স্মৃতির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে ঘুমিয়ে পড়ি।

233