রাজসিক রাজশাহী

সুকুমার বাড়ই

পর্ব-১

(সংস্কৃত ‘রাজ’ ও ফারসি ‘শাহ’ এর বিশেষণ ‘শাহী’ শব্দযোগে ‘রাজশাহী’ শব্দের উদ্ভব, যার অর্থ একই অর্থাৎ রাজা বা রাজা-রাজকীয় বা রাজসিক বা বাদশাহ বা বাদশাহী।) মানুষ চির যাযাবর । মানুষের রক্তে রয়েছে ভ্রমণের নেশা।অজানাকে জানার, অদেখাকে দেখার কৌতুহল মানুষের চিরন্তন।বিশাল এই পৃথিবীর চারিদিকে কত কি দেখার,জানার রয়েছে,কত রহস্য রয়েছে লুকিয়ে। সেই অপরিচয়ের দুস্তর মহাসমুদ্রের অদৃশ্য তরঙ্গ প্রতিনিয়ত আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে । সেই অজানাকে জানবার জন্যে আমাদের অসীম আগ্রহ, অনন্ত উৎকণ্ঠা । এই দুর্নিবার আকর্ষণে আমরা রুদ্ধ দুয়ার খুলে বের হয়ে পড়ি অজানার সন্ধানে । আর ওই দুর্নিবার আকর্ষণে আমি গতবছর বেড়িয়ে পড়েছিলাম বাংলাদেশের রাজশাহীর উদ্দেশ্যে। আসল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের জন ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত আন্তর্জাতিক আলোচনা চক্রে যোগ দেওয়া। যাবতীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে ২৫ সেপ্টেম্বর,২০১৯, বুধবার রায়গঞ্জ থেকে খুব সকালে রওনা দিয়েছিলাম। বালুরঘাট হয়ে হিলি সীমান্তে পৌঁছেছিলাম সকাল ১০ টা নাগাদ। এপারের কাজ শেষ করে ওপারে গিয়েই দেখতে পাই দিনাজপুর থেকে এসে গেছেন সফিকুল বাবলূ ভাই। দুজনে কোলাকুলি করে নিলাম। এ যেন দুদেশের ভাষা আর মনের টানে তারকাঁটার বেড়া ভেদ করে মিলেমিশে গেল। ওপারের কিছু করণীয় কাজ শেষ করে বাবলু ভাইয়ের সাথে ওপারের হিলি অর্থাৎ হাকিমপুর পরিদর্শনে বেড়িয়ে পড়লাম। ওখানকার স্কুল, কলেজ, বাজার ইত্যাদি দেখার পাশাপাশি দেখলাম বেশ কয়েকটি দুর্গাপূজা মণ্ডপ। পূজার আগ মুহুর্তে সেখানে সাজসাজ রব। বিকেলে রাজশাহী যাবার বাস এল। কয়েকদিন ধরেই শরতের আকাশে মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছিল। সে আর আকাশে থাকতে না পেরে অঝোরে ঝরতে থাকে। আমাদের বাস স্নান করতে করতে এগিয়ে চলে রাজশাহীর দিকে। অবশেষে রাতে পৌঁছেছিলেম স্বপ্নের রাজসিক রাজশাহীতে। ওখানকার মানুষের ভাষা আমার মনকে নিয়ে এল মালদাতে। আসলে রাজশাহী আর মালদাতো পাশাপাশি দুটি জেলা। এর প্রভাব পড়েছে ভাষাতে। মনে হল না বিদেশ এসেছি। প্রথমেই এ জেলা বা শহরের নামকরণ নিয়ে কিছু বলা যাক।

এই জেলার নামকরণ নিয়ে রয়েছে প্রচুর মতপার্থক্য । তবে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়’র মতে রাজশাহী রাণী ভবানীর দেওয়া নাম। অবশ্য মিঃ গ্রান্ট লিখেছেন যে, রাণী ভবানীর জমিদারীকেই রাজশাহী বলা হতো এবং এই চাকলার বন্দোবস্তের কালে রাজশাহী নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। পদ্মার উত্তরাঞ্চল বিস্তীর্ন এলাকা নিয়ে পাবনা পেরিয়ে ঢাকা পর্যন্ত এমনকি নদীয়া, যশোর, বর্ধমান, বীরভূম নিয়ে এই এলাকা রাজশাহী চাকলা নামে অভিহিত হয়। অনুমান করা হয় ‘রামপুর’ এবং ‘বোয়ালিয়া’ নামক দু’টি গ্রামের সমন্বয়ে রাজশাহী শহর গ’ড়ে উঠেছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে ‘রামপুর-বোয়ালিয়া’ নামে অভিহিত হলেও পরবর্তীকালে রাজশাহী নামটিই সর্ব সাধারণের কাছে সমধিক পরিচিতি লাভ করে। রাজাশাহী শব্দটি বিশ্লেষণ করলে দুটি ভিন্ন ভাষার একই অর্থবোধক দুটি শব্দের সংযোজন পরিলক্ষিত হয়। সংস্কৃত ‘রাজ’ ও ফারসি ‘শাহ’ এর বিশেষণ ‘শাহী’ শব্দযোগে ‘রাজশাহী’

শব্দের উদ্ভব, যার অর্থ একই অর্থাৎ রাজা বা রাজা-রাজকীয় বা রাজসিক বা বাদশাহ বা বাদশাহী। তবে বাংলা ভাষায় আমরা একই অর্থের অনেক শব্দ দু-বার উচ্চারণ করে থাকি। যেমন শাক-সবজি, চালাক-চতুর, ভুল-ভ্রান্তি, ভুল-ত্রুটি, চাষ-আবাদ, জমি-জিরাত, ধার-দেনা, শিক্ষা-দীক্ষা, দীন-দুঃখী, ঘষা-মাজা, মান-সম্মান, দান-খয়রাত, পাহাড়-পর্বত, পাকা-পোক্ত, বিপদ-আপদ ইত্যাদি। ঠিক তেমনি করে অদ্ভুত ধরনের এই রাজশাহী শব্দের উদ্ভবও যে এভাবে ঘটে থাকতে পারে তা মোটেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই নামকরণ নিয়ে অনেক কল্পকাহিনীও রয়েছে। সাধারণভাবে বলা হয় এই জেলায় বহু রাজা-জমিদারের বসবাস, এজন্য এ জেলার নাম হয়েছে রাজশাহী। কেউ বলেন রাজা গণেশের সময় (১৪১৪-১৪১৮) রাজশাহী নামের উদ্ভব। ১৯৮৪ সালে রাজশাহীর ৪ টি মহকুমাকে নিয়ে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর এবং নবাবগঞ্জ- এই চারটি স্বতন্ত্র জেলার উদ্ভব ঘটে।
এবার জেনে নেওয়া যাক শহর রাজশাহী প্রসঙ্গে কিছু কথা । বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐত্যিহবাহী মেট্রোপলিটন শহর হল রাজশাহী। ওদেশের উত্তরবঙ্গের সবথেকে বড় শহর এটি। এ শহর পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত। রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় শহর এটি । রাজশাহী শহরের কাছেই প্রাচীন বাংলার বেশ কয়েকটি রাজধানী শহর অবস্থিত। এদের মাঝে লক্ষণৌতি বা লক্ষণাবতি, মহাস্থানগড় ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। রাজশাহী বেশ কয়েকটি জিনিসের জন্য বিখ্যাত । এগুলো হল- রেশমীবস্ত্র, আম, লিচু এবং মিষ্টান্নসামগ্রী । রেশমীবস্ত্রের কারনে রাজশাহীকে রেশমনগরী নামে ডাকা হয়। এখানে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের অনেকগুলোর খ্যাতি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। নামকরা এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য রাজশাহী শহর শিক্ষানগরী নামেও পরিচিত। রাজশাহী শহরে এবং এর আশেপাশে বেশ কিছু বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক রাজবাড়ী, মসজিদ, মন্দির ও উপাসনালয় তথা ঐতিহাসিক স্থাপত্য স্থান

দেখতে পাওয়া যায়। এ শহর বাংলাদেশের শহরগুলির মধ্যে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন এবং সবুজ। রাজশাহী ছিল প্রাচীন বাংলার পুন্ড্র সাম্রাজ্যের অংশ। বিখ্যাত সেন বংশের রাজা বিজয় সেনের সময়ের রাজধানী বর্তমান রাজশাহী শহর থেকে মাত্র ৯ কিমি দূরে অবস্থিত ছিল। মধ্যযুগে বর্তমান রাজশাহী পরিচিত ছিল রামপুর বোয়ালিয়া নামে। এর সূত্র ধরে এখনও রাজশাহী শহরের একটি থানার নাম বোয়ালিয়া। রাজশাহী শহরকে কেন্দ্র করে ১৭৭২ সালে এ জেলা গঠিত হয়। ১৮৭৬ সালে গঠিত হয় রাজশাহী পৌরসভা। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরিত হয়। ব্রিটিশ রাজত্বের সময়েও রাজশাহী বোয়ালিয়া নামে পরিচিত ছিল। তখন এটি ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গ ও আসাম অঞ্চলের অর্ন্তগত রাজশাহী জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র। রাজশাহীকে সে সময়ে রেশম চাষের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছিল। তখন রাজশাহীতে একটি সরকারী কলেজ ও রেশম শিল্পের জন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়। সেসময় থেকে দেশবিভাগের পূর্ব পর্যন্ত পদ্মা নদীর উপর দিয়ে প্রতিদিন যাত্রীবাহী স্টিমার চলাচল করত। ১২ জুন ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে রাজশাহী শহরের বেশীরভাগ ভবন ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পরবর্তীতে অনেক ভবন আবার নতুন করে স্থাপিত হয়। রাজশাহী শহরটি দীর্ঘদিন ধরে পুরনো সংস্কৃতি বজায় রেখে এক প্রকার অপরিবর্তিত অবস্থায় ছিলো । কিন্তু ২০০৯ সালের পর থেকে প্রাচীন এই শহরটি আধুনিকতার পরশে নতুন রুপে সজ্জিত হয়। রাতের বৃষ্টি ভেজা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বর দেখে মনে হয়েছিল কোন এক স্বপ্নের জগতে চলে এসেছি। ওদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়াতে অসাধারণ আপ্যায়ণে রাতের খাবার খেয়ে অতিথি নিবাসে গিয়ে ক্লান্ত শরীরে ঘুমের জগতে চলে যাই।

চলবে -----

59