Categories
প্রথম পাতা Special occasion

বেগম রোকেয়ার জন্মবার্ষিকীতে কুলিক ইনফোলাইনের শ্রদ্ধার্ঘ্য।কলমে পুরুষোত্তম সিংহ

বেগম রোকেয়ার নারীভাবনা : প্রসঙ্গ

‘মতিচূর’
-পুরুষোত্তম সিংহ
আজ থেকে প্রায় ১৩৮ বছর পূর্বে বেগম রোকেয়া(১৮৮০) জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের সমাজজীবনে তখন এক টাল-মাটাল অবস্থা। তখনও ছোটগল্পের আবির্ভাব হয় নি, প্রবলভাবে চলছে ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলনের বাত- বিতর্ক। স্বাভাবিক ভাবেই বঙ্কিমের উপন্যাসে সে ধর্ম আন্দোলনের( বিধবা বিবাহ, ব্রাহ্ম আন্দোলন) প্রসঙ্গ চলে এসেছে। শিবনাথ শাস্ত্রীর উপন্যাসে ধর্ম আন্দোলনের বাতাবরণের কোলাহলে উপন্যাসের প্লটই হারিয়ে গেছে। আজকের যে তথাকথিত নারীবাদ তা উনিশ শতকের প্রেক্ষাপটে ছিল না অবশ্যই তবে নারীর নিজস্ব অধিকারের কথা প্রতিষ্ঠিত হয়ে চলেছিল ধীরে ধীরে। বঙ্কিমের প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশ নন্দিনী’তে ঘোষিত হল- ‘ এই বন্দী আমার প্রাণেশ্বর’।শুধুমাত্র নারীকণ্ঠ ঘোষিত হতে প্রকাশিত হল ‘বামাবোধিনী’, ‘দাসী’ ‘মহিলা’, ‘বঙ্গলক্ষ্মী’,’অন্তঃপুর’ পত্রিকা।রবীন্দ্রনাথের ‘ত্যাগ’ গল্পেও কম প্রতিবাদ বর্ষিত হয় নি। উনিশ শতকের নারী কবিতায় নিজস্ব বক্তব্য এসেছিল। এই প্রেক্ষাপটে রোকেয়ার জন্ম বাংলাদেশের রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে এক মুসলিম পরিবারে। স্বভাবতই নবজাগরণের আলো সেখানে পৌঁছায় নি। ১৭৫৭ খ্রীস্টাব্দে সিরাজের যেই পতন ঘটল মোটামুটি তখন থেকেই মুসলিম সমাজ পিছিয়ে গেল। সাহিত্যেও তার প্রভাব পড়ল। উনিশ শতকের সাহিত্যে এক মীর মশাররফ হোসেন ছাড়া আমরা তেমন কোন ব্যক্তিকে পাচ্ছি না। শুধু তাই নয় সমাজের ভেদাভেদ এতই প্রবল যে বঙ্কিমচন্দ্র হাসিম শেখ, রামা কৈবতের সৃষ্টি করেছেন সেই বঙ্কিমচন্দ্রকেই লিখতে হল ‘রাজসিংহ’ পরিশিষ্ট।
##বেগম রোকেয়ার প্রথম রচনা ‘পিপাসা( মহরম)’ প্রকাশিত হয় ‘নবপ্রভা’ পত্রিকায় ১৩০৮-১৩০৯ বঙ্গাব্দের চৈত্র ও বৈশাখ সংখ্যায়। প্রবন্ধটি পরে ‘মতিচূর’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ড সংকলিত হয়। উল্লেখ্য তখন লেখিকার বয়স বাইশ বছর। প্রথম ইংরেজি রচনা ‘Sultana’s Dream’(১৯০৫) খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় মাদ্রাজের ‘Indian Ladies’পত্রিকায়।আমাদের আলোচ্য ‘মতিচৃর’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ড(১৯০৪) ও দ্বিতীয় খণ্ড (১৯০৭) খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।আমরা শুধু প্রথম খণ্ডের আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবো।এ গ্রন্থে সাতটি প্রবন্ধ রয়েছে। প্রবন্ধগুলি হল- ‘পিপাসা(মহরম)’,’স্ত্রীজাতির অবনতি’, ‘ নিরীহ বাঙ্গালী’, ‘অর্দ্ধাঙ্গী’, ‘সুগৃহিণী’, ‘বোরকা’,ও ‘গৃহ। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার জানিয়েছেন এটি মুসলিম মহিলা রচিত প্রথম বাংলা গ্রন্থ।পাঠক ভেবে দেখুন তখন বঙ্গদেশের রাজনৈতিক ইতিবৃত্ত, বঙ্গভঙ্গের প্রচেষ্টা চলছে আর রোকেয়া দৃঢ় চিত্ত নিয়ে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন।দক্ষিণারঞ্জন মজুমদার ‘কোহিনুর’ পত্রিকায়( ১৩১৩ বৈশাখ, আশ্বিন ও মাঘ) সংখ্যায় এ গ্রন্থ সম্পর্কে লিখেছেন-“ যে সাহিত্য সমাজের বিশেষ প্রয়োজনীয় বিভাগের সমস্যাপূর্ণ বিষয় লইয়া স্বয়ং মহিলাগণ পর্য্যন্ত আলোচনা করিতেছেন, সে সাহিত্য বাস্তবিকই পরিপূর্ণতার পথে বহুদূর অগ্রসর হইয়াছে। কিশোরী বঙ্গভাষার পক্ষে ইহা বড়ই আশাপদ- পরম আনন্দ পুলক কর।“( রোকেয়া রচনাবলী,কথা, প্রথম প্রকাশ ২০১৪,পৃ. ২০১৪)।এই উদ্ধৃতি থেকে আমরা দুটি শব্দবন্ধ চয়ন করে নিতে পারি-‘ সমাজের বিশেষ প্রয়োজনীয়’ ও ‘মহিলাগণ’। রোকেয়া নারী হিসেবেই নারীর সমস্যাকে দেখেছেন। উচ্চবিত্ত পরিবারের মহিলা হলেও সমাজের গভীর তল দেশ পর্যন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছেন। জন্ম থেকেই বঞ্চিত নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য সারাজীবন লড়াই চালিয়েছেন।
## ‘মতিচূর’(প্রথম খণ্ড) প্রথম প্রকাশে কোন ভূমিকা বা নিবেদন ছিল না। কিন্তু এ গ্রন্থের গ্রন্থ সমালোচনায় দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার লিখেছেন-“মতিচূর’ পড়িতে পড়িতে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কমলাকান্ত’, ‘লোকরহস্য’ এবং কালীপ্রসন্নের ‘ভ্রান্তিবিনোদ’ মনে পড়ে। অতুল কাব্যালঙ্কার, বিপুল রহস্য বিজড়িত রসপূর্ণ যে সুগভীর সমস্যা- প্রশ্নসমুচ্চয়ে কমলাকান্তাদির উৎপত্তি হইয়াছিল, ‘মতিচূর’ও সেই সেইরূপ অগণ্য সমস্যাভাব আনিয়া উপস্থিত করিয়াছে। পার্থক্য কেবল তাহাদের মূল প্রধানতঃ দর্শনে ; ইহার ভিত্তি সমাজ সমস্যার উপরে।“( রোকেয়া রচনাবলী, ঐ,পৃ.৫৯৫)- এ লেখাটি ১৩‌১৩ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত। ‘মতিচূর’এর পরবর্তী সংস্করণে রোকেয়া একটি ভূমিকা লিখে দিলেন। যেখানে তিনি পরিষ্কার জানালেন কালীপ্রসন্ন বা বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থপাঠ করেন নি। কিন্তু প্রশ্ন হল কেন এই কৈফিয়ৎ ? নারী বলেই কি সমাজ এ লেখা মেনে নিতে চাইছে না।দক্ষিণারঞ্জন বাবু তো পরিষ্কার উল্লেখ করেছেন-“ ইহার ভিত্তি সমাজ সমস্যার উপরে” তবুও লেখিকার কেন এ সংশয় ! সমালোচক হিসেবে একজন পাঠকের তো যে কোন গ্রন্থের কথা মনে পড়তেই পারে। আসলে শুধু রোকেয়া নয় এ সমস্যায় প্রতিভা বসু থেকে নবনীতা দেবসেন প্রত্যেককেই পড়তে হয়েছে। আবার পুরুষের বিরুদ্ধে নারীরাও যে আঘাত আনেনি তা নয়। মনে পড়ে বুদ্ধদেব বসুর প্রথম গল্প ‘রজনী হলো উতলা’ পড়ে এক মহিলা লিখেছিলেন- এ ছেলেকে আঁতুর ঘরেই বিষ দিয়ে মেরে ফেলা হয় নি কেন ?
## বেগম রোকেয়ার ‘স্ত্রী জাতির অবনতি’ প্রবন্ধটি নারীর আত্মজাগরণের অন্যতম মাইলস্টোন বলা যেতে পারে। তাঁর লক্ষ্য মূলত মহিলা সমাজ। তা আরো স্পষ্ট করে দেন প্রবন্ধের শুরুতে ‘পাঠিকাগণ’ শব্দটি উল্লেখ করে। যুগ যুগ ধরে নারীরা বড় হয়ে উঠেছে গৃহিণী হিসেবে।তাঁদের জন্য সীমাবদ্ধ অন্তঃপুর। সেই অন্তঃপুরের মহিলাদের তিনি বহিঃবিশ্বের দরবারে নিয়ে এসেছেন। তিনি প্রথমে নারী জাতির পিছিয়ে থাকার কারণগুলি আবিষ্কার করেছেন। অলংকার নারীর ভূষণ। কিন্তু রোকেয়ার কাছে অলংকার যেন দাসী হয়ে গড়ে ওঠার নামান্তর। চুড়ি বা বালা মানেই বন্ধন। পুরুষ একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে নারীকে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়, বালা যেন তারই নিদর্শন। আবার হার বা মালাকে তিনি বলেছেন ‘গালবন্ধ( Dogcollar)। কুকুরকে যেমন শিকল পড়িয়ে বন্দি করে রাখা হয় নারীও তেমন অন্তঃপুরে বন্দি থাকা এক জীব। অলংকার নারীকে রমণীয় করে তোলে, সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলে।কিন্তু তাঁর মনে হয়েছে এই সৌন্দর্যও দূর্বলাতারই নিদর্শন। এই দূর্বলতাই আজ গ্রাস করেছে নারীকে। করে তুলেছে অন্তঃপুরে বন্দি পক্ষি শাবকের মতো। রোকেয়ার মতে নারী জাগরণের জন্য প্রথম প্রয়োজন শিক্ষা। এই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত নারীদের জন্য তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন-“ কোন বিষয়ে জ্ঞানলাভ করিবার শক্তিটুকুও ইহাদের নাই। আমাদের উন্নতির আশা বহূদূরে-ভরসা কেবল পতিতপাবন।“( রোকেয়া রচনাবলী, ঐ, পৃ.১৯) সেই জ্ঞানলাভের জন্যই তিনি গড়ে তুলেছিলেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল। সারাজীবন অনন্ত পরিশ্রম করে তিনি এ বিদ্যালয়কে লালন করে গিয়েছেন। অর্থ সংকট অবশ্যই ছিল তবে তিনি হেরে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি জানতেন প্রতিকূল পরিস্তিতি কিভাবে জয় করতে হয়। বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য অর্থ সংকটের পরিচয় পাওয় যায় মরিয়ম রশীদকে লেখা( ৫ই জানুয়ারি,১৯২৬) এক চিঠিতে-“ আমি যদি কিছু টাকা পাইতাম ( ধর, মাত্র দুই লক্ষ ) তবে কিছু করিয়া দেখাইতে পারিতাম। কিন্তু খোদা আমাকে টাকা দেন নাই।“( রোকেয়া রচনাবলী, ঐ,পৃ. ৫৩১)। মাত্র বাহান্ন বছর বয়সেই তিনি এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। নিজের শরীরের প্রতি যন্ত্র নেবার কোন অবকাশ ছিল না। অদম্য মানসিকতাকে ভর করেই তিনি এগিয়েছেন। নারী চিন্তাই ছিল তাঁর রক্তমাংস জুড়ে, নিজের কথা ভাবেন নি। মোহসেনা রহমানকে লেখা এক চিঠিতে( ২১ মে,১৯২৯) লিখেছেন-“ তোমার প্রেরিত কাসন্দ পেয়ে সুখী হয়েছি। বুয়া ! তুমি কাসন্দ না দিয়ে যদি স্কুল ফাণ্ডে চার পাঁচটা টাকা পাঠাতে তা’তে আমি বেশি সুখী হতুম।“( রোকেয়া রচনাবলী, ঐ, পৃ.৫৩৪)। নারী জাতির পিছিয়ে পড়ার কারন হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন নারী জাতি শারীরিক শ্রমে অক্ষম। এই অক্ষমতার সুযোগ নিয়েছে পুরুষ। কিন্তু তিনি নারীকে অন্তঃপুর থেকে বাইরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। নিজের স্বাধীন চালচিত্তের জন্য অর্থ উপার্জনের পথ দেখিয়েছেন।সমাজের নির্মাণ কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকে নারী-পুরুষের যুগল কার্যকলাপে। প্রাবন্ধিকের বক্তব্য সেখানে নারীদের পিছিয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। কেননা সমাজে নারীরা অর্দ্ধঅঙ্গ। নারী ছাড়া একটি সুস্থ সমাজ কখোনই বিকশিত হতে পারে না-
“ আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে ? কোন ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে, সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে ? পুরুষদের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে- একই। তাঁহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা, আমাদের লক্ষ্যও তাহাই। শিশুর জন্য পিতামাতা- উভয়ই সমান দরকার। কি আধ্যাত্মিক জগতে, কি সাংসারিক জীবনের পথে- সর্ব্বত্র আমরা যাহাতে তাঁহাদের পাশাপাশি চলিতে পারি, আমাদের এরূপ গুণের আবশ্যক।“( রোকেয়া রচনাবলী, ঐ, পৃ. ২৩)

কবির ভাষায় ‘ভাষায় নারী তুমি অর্ধেক আকাশ’। এই অর্ধ আকাশের কথাই রোকেয়া ব্যক্ত করেছেন ‘অর্দ্ধাঙ্গী’ প্রবন্ধে। প্রবন্ধটি গিরিশচন্দ্র সেন প্রবর্তিত ‘মহিলা’ পত্রিকায় ১৩১০ বঙ্গাব্দের ( শ্রাবণ, আশ্বিন ও কার্তিক ) সংখ্যায় প্রকাশিত। নারীর মানসিক অবস্থা নিয়ে তিনি সচেতন হয়েছেন। পুরুষের বক্র চক্ষুকে উপেক্ষা করেছেন। তিনি পুরুষের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন নি।পুরুষতান্ত্রিক শাসনে থেকেই নারীর অধিকারকে আদায় করতে চেয়েছেন। আরো ভালো করে বলতে গেলে পুরুষকে পাশে রেখেই নিজের স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনেও দেখেছি স্বামী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন তাঁর সমস্ত কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিয়ে এসেছেন। সভ্যতার বিকাশ কোনদিনই নারী ছাড়া হতে পারে না। অথচ নারীরা যুগযুগান্তর ধরে বঞ্চিত হয়ে আসছে। সেই বঞ্চনার বিরুদ্ধে তিনি লেখনী তুলে নিয়েছেন। পুরুষের সাথে এক সারিতে নারীকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন-“ শারীরিক দুর্ব্বলতাবশতঃ নারীজাতি অপর জাতির সাহায্যে নির্ভর করে। তাই বলিয়া পুরুষ “প্রভু” হইতে পারে না।কারণ জগতে দেখিতে পাই, প্রত্যকেই প্রত্যেকের নিকট কোন না কোন প্রকার সাহায্যে প্রার্থনা করে,যেন একে অপরের সাহায্য ব্যতীত চলিতে পারে না।“(‘ আর্দ্ধাঙ্গী, রোকেয়া রচনাবলী, ঐ,পৃ.৩৩) শুধু তাই নয় আরো বলেছেন- নারী ‘উত্তমার্দ্ধ( Belter halves)’, পুরুষ ‘নিকষ্টার্দ্ধ(worse halves), নারী অর্দ্ধাঙ্গ আর পুরুষ অর্দ্ধাঙ্গ।

এই অর্ধ আকাশের কথা, স্বাধীনতা কথা ব্যক্ত হয়েছে রোকেয়ার কবিতেতেও-
“ সোনার পিঞ্জরে ধরে রেখো না আমায়
আমারে উড়িতে দাও দুর নীলিমায় !
খুঁজিব তারার দলে কেন গগনের তলে
আমারে সে নিরমাতা রয়েছে কোথায়
যেজন স্বপন ঘোরে পাগল করেছে মোরে
এমন উদাসী যেই করেছে আমায় :”
( ‘মনের উক্তি’,রোকেয়া রচনাবলী, ঐ, পৃ.৫০০)
## রোকেয়ার সন্তানরা পূর্বেই মৃত হয়েছিল।১৯০৯ এ চলে গেলেন স্বামী।তখন রোকেয়ার কাছে একটিই জগৎ, গড়ে তুললেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল।এখানেও বাধার সম্মুখীন হলেন।ধর্ম সম্পর্কে তাঁর প্রবল জ্ঞান ছিল। পিতার কাছে কোরান পাঠে প্রকৃত শিক্ষার শিক্ষিত হয়ে উঠেছিলেন।তাই কখনো নিজ জাতির উদ্দেশ্য ঘোষণা করেন –“ সত্যিকার মুসলমান হবার জন্য চেষ্টা করুন”( খান বাহাদুর অসদ্দক আহমদাক লেখা চিঠি, রোকেয়া রচনাবলী,ঐ,পৃ.৫৩৭)।স্বামীর নামে স্কুল করার জন্যেও এসেছে ব্যঙ্গ।স্মৃতি নয় তিনি ভালোবাসার ভিখারি।আর এ ভালোবাসা বঙ্গদেশের প্রতি, বাংলাদেশের নারী জাতির প্রতি।সামাজিক নিপীড়ন থেকে বাঁচতে কখনো ঈশ্বরের সহায়তা প্রার্থনা করেছেন- “ চিরকাল আমি স্ত্রীস্বাধীনতার জন্য কিছু করবার চেষ্টা করেছি, আর আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ আমাকে দুঃখ দিয়ে তিনি পরীক্ষা করেছেন, কিন্তু আমার আশা যে শিগগিরই তিনি আমাকে দয়া করবেন।“(খান বাহাদুর তসদ্দক আহমদকে লেখা চিঠি, রোকেয়া রচনাবলী,ঐ,পৃ.৫৪৩) নারী জাতির শিক্ষা চেতনা নিয়ে সরব হয়েছেন ‘সুগৃহিণী’ প্রবন্ধে।প্রবন্ধটি গিরিশচন্দ্র সেনের ‘মহিলা’ পত্রিকায় ১৩১০ বঙ্গাব্দের( মাঘ ও ফাল্গুন) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। প্রাবন্ধিকের মতে সুগৃহিণী হওয়ার জন্য সুশিক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন।তিনি বিভিন্ন দৃষ্টান্ত দিয়ে দেখিয়েছেন নারী জাতির কেন শিক্ষা প্রয়োজন। প্রবন্ধের নিবিড় পাঠে দেখা যায় কৃষিবিদ্যা, নার্সিং, উত্তাপ তত্ত্ব ও আত্মরক্ষার জন্য সুশিক্ষা প্রয়োজন। সন্তান যেহেতু মাতার উত্তরাধিকারী হিসেবেই বড় হয় ; তাই মাতার সমস্ত গুণ শিশুর মধ্যে পরিব্যাপ্ত থাকার জন্য শিক্ষা আবশ্যক। শুধু বর্ণমালার শিক্ষা নয় চিত্র ও সংগীততের শিক্ষাও প্রয়োজন বলে প্রাবন্ধিকের মত। শিক্ষা চেতনাই একজন মহিলাকে ভারতীয়ত্ববোধে নিয়ে যায়। জাতির সাম্প্রদায়িকতা ও ক্ষুদ্র গণ্ডির বন্ধন ভাঙতে প্রয়োজন শিক্ষা। শিক্ষাই মানুষকে ক্ষুদ্র পরিসর থেকে বৃহত্তর পরিসরে এনে দাঁড় করায়-“ আমরা শুধু হিন্দু বা মুসলমান কিম্বা পারসী বা খ্রীষ্টিয়ান অথয়া বাঙ্গালী মান্দ্রাজী, মাড়োয়ারী বা পাঞ্জাবী নাহি- আমরা ভারতবাসী। সুগৃহিণী এই সত্য আপন পরিবার মধ্যে প্রচার করিবেন। তাহার ফলে তাঁহার পরিবার হইতে ক্ষুদ্র স্বার্থ, হিংস্রা দ্বেষ ইত্যাদি ক্রমে তিরোহিত হইবে।“( ‘সুগৃহিণী’, রোকেয়া রচনাবলী, ঐ ,পৃ.৪২)। সমস্ত কাজের জন্যই প্রয়োজন মানসিক উন্নতি। আর সে মানসিক উন্নতির প্রধান সহায়ক শিক্ষা।
## বেগম রোকেয়ার ‘বোরকা’ প্রবন্ধটি ‘নবনুর’ পত্রিকায় ১৩১১ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।আজ বর্তমান সামজে যেখানে বোরকা তুলে দেওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে রোকেয়া বাঁচার অবলম্বন হিসেবে বোরকা বেঁছে নিয়েছেন। এমনকি নারীদের জন্য স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি তুলেছেন। এ বড় আশার কথা বাংলাদেশ সরকার এই সাম্রাজ্ঞী মহিলাকে স্মরণ করে তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। নারীকে তিনি অবরুদ্ধ হিসেবে দেখতে চান না। বোরকা যে নারীকে সমাজ থেকে বিচ্যুত করে এ মত তিনি মানতে নরাজ।ভালোমতো শরীর আবৃত না করাকে তিনি বলেছেন ‘বে- পর্দা’।আসলে আমাদের সে সময়টাকে মনে রাখতে হবে। আজকের যে নারীবাদ বা স্ত্রী স্বাধীনতা সেদিন পরাধীন দেশে তা ছিল না। তাই রোকেয়া সমাজে ও পরিবারে থেকেই সামাজিক শাসন কাঠামো ভাঙতে চেয়েছেন। বোরকাকে মনে করেছেন নারীর বাঁচার অবলম্বন।সভ্যসমাজে যে বোরকার প্রচলন নেই তা নয়। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন সভ্যতার সঙ্গে অবরোধ প্রথার কোন বিরোধ নেই।তবে এই রক্ষণশীল সমাজে অবরুদ্ধ প্রথা ভীষণ শক্তিশালী।নারীকে আপন শাসন যন্ত্রে বিদ্ধ করা হয়। অন্তঃপুর নামক প্রতিষ্ঠানে রেখে নারীকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়। সেই পঙ্গুত্ব থেকে রোকেয়া নারী সমাজকে জাগাতে চেয়েছেন। আর এই জাগরণের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা। এদেশে নবজাগরণ বহুদিন ঘটেছে আর নারী জাগরণ ঘটল স্বাধীনতারও তিরিশ বছর পরে। ভাবতে অবাক লাগে সেই অন্ধকার তমসাচ্ছন্ন সময়ে বসে একটি মুসলিম নারী নিরন্তর ভেবে চলেছেন নারী শিক্ষার কথা-“ আমরা উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত না হইলে সমাজেও উন্নত হইবে না। যতদিন আমরা আধ্যাত্মিক জগতে পুরুষদের সমকক্ষ না হই, ততদিন পর্য্যন্ত উন্নতির আসা দুরশা মাত্র।আমাদিকে সকল প্রকার জ্ঞানচর্চা করিতে হইবে।“(‘বোরকা’, রোকেয়া রচনাবলী, ঐ, পৃ.৪৭)। নারী জাতির পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে তিনি শিক্ষার অভাবকেই দায়ী করেছেন। আর পুরুষতান্তিক সমাজ সেই শোষণের সুযোগ নিতেই নারীদের অন্তঃপুর বন্দি রেখেছে। সেই বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার অভিলাসই তাঁর জীবনের ধ্রুব লক্ষ্য।
## বেগম রোকেয়ার ‘গৃহ’ প্রবন্ধটি ‘নবনুর’ পত্রিকায় ১৩১১ বঙ্গাব্দের আশ্বিন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এ প্রবন্ধের শেষে পাদটিকায় তিনি উল্লেখ করেছেন- যে সকল ভগ্নী গৃহসুখভোগ করেন, এ সন্দর্ভটি তাঁদের জন্য নয়, গৃহহীনদের জন্য লিখিত। বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হলেও মুসলিম সমাজ আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বহুবিবাহতে অংশগ্রহণ করত। ফলে অন্তঃপুরে বঞ্চিত হতে হত নারীকে। সেই বঞ্চিত নারীদের পক্ষ নিয়ে তিনি কলম ধরেছন। প্রাচীর দিয়ে ঘেরা পরিসরই গৃহ হতে পারে না। এই প্রাচীর পুরুষ তুলেছিল নারীকে শোষণ করতেই। তাই ‘বাসর ঘর’কে তিনি ‘কবর’ বলতেও পিছপা হন নি। উনিশ শতকের নারী কবিরা নারী জাতির শোষণ লাঞ্ছনা র জন্য শুধু সহানুভূতি ও সমবেদনা জানিয়েছেন। প্রতিরোধ বা প্রতিবাদের কোন অস্ত আবিষ্কার করেন নি। নারী হিসেবে কবি মানকুমারী দেবী কেবল জানিয়েছেন সহানুভূতি-
“ কাঁদ তোরা অভাগিনী। আমিও কাঁদিব
আর কিছু নাহি পারি, ক’ ফোঁটা নয়ন বারি
ভগিনী ! তোদেরি তরে বিজন ঢালিব ;
যখন দেখিব চেয়ে অনূঢ়া ‘প্রাচীনা মেয়ে’
কপালে যোটেনি বিয়ে – তখনি কাঁদিব
যখন দেখীব বালা সহিছে সতিনি জ্বালা
তখনি নয়ন জলে বুক ভাসাইব ;
( ‘গৃহ’, রোকেয়া রচনাবলী, ঐ, পৃ.৫৭)
পাশাপাশি এ শতকে লেখা একটি কবিতা আমরা বিচার করতে পারি। মানকুমারী যেখানে সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন সেখানে মল্লিকা সেনগুপ্ত সরাসরি প্রতিবাদ জানিয়েছেন-
“ পুরুষের কাজ পুরুষ করেছে, করুক
এখন থেকে আমার ঘর ধর্ষকের খাট
বরের সঙ্গ এখন থেকে বারণ।
আমদরবার বিচার করুন
আমি কি এক মাংসটুকরো
শয়তান এসে চেটেছে বলেই বরবাদ আমি
আমার ঘর, আমার খসম, সব বরবাদ ?
এই কি আমার শান্তির দেশ ভারতবর্ষ ?
আমি ইমরানা, আপনাদের জবাব চাই।
( ‘আমি ইমরানা’, মল্লিকা সেনগুপ্ত, শ্রেষ্ঠ কবিতা, দে’জ,
শ্রাবণ ১৪১৯পৃ.১৬৬)
সে কালে বসেই রোকেয়া সে কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। স্পষ্ট জানিয়েছেন-“ তাঁহার সহিত একমত হইয়া সুরে সুরে মিলাইতে পারিতেছি না” ( ‘গৃহ’, রোকেয়া রচনাবলী, ঐ, পৃ.৫৭)আদর্শ গৃহ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন শারীরিক ও মানসিক শান্তিবোধ। তাঁর লক্ষ্য গৃহহীনদের আদর্শ গৃহে ফেরানো।
## ‘মতিচৃর’ গ্রন্থে তিনি সাধু গদ্যে সমাজ জীবনে নারী সমস্যার নানা প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। প্রথম প্রবন্ধ ‘পিপাস (মহরম)’ এ মিথকে তিনি নতুন ভাবে দেখলেন। মহরমকে কেন্দ্র করে যে শোকস্মৃতি ও নারীর বঞ্চনা সেদিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। এ প্রবন্ধে স্বপ্নচারীতা ও আপাত কল্পনায় বঙ্কিমীয় স্টাইল লক্ষ্য করা যায়।মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের ‘কাব্যে উপেক্ষিতা’ প্রবন্ধের কথা। মহাকাব্যে উপেক্ষিত নারীদের তিনি বিরাট ভাস্কর্যে তুলে ধরেছিলেন। তেমনি মহরমে হাসান, হোসেনকে সবাই মনে রাখলেও শহরবানু ও জয়নবের কথা কেউ মনে রাখেনি। সন্তানের জন্য মাতৃহৃদয়ের পিপাসাকে তিনি বড় করে দেখেছেন। সমস্ত বিষয়েই রয়েছে পিপাসা -,প্রেম, জ্ঞান, মানবজীবন ও জীবনচেতনা। আর সেই পিপাসাকে দেখেছেন একজন নারী হিসেবে নারীর দৃষ্টিকোন থেকে- “ আমি যে পিপাসা দেখি,তাহা সত্য – কল্পিত নহে ! আমি যে পিপাসা শুনি,তাহাও সত্য- কল্পনা নহে। ঈশ্বর প্রেম, এ বিশ্বজগৎ প্রেম পিপাসু।( ‘পিপাসা ৯ মহরম), রোকেয়া রচনাবলী, ঐ,পৃ. ১১)
##বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেই একটি মুসলিম নারী সামাজিক আত্মপীড়নের যুপকাষ্টে বলি হওয়া নারীর স্বপ্রতিষ্ঠার জন্য সরব হয়েছেন। এ গ্রন্থের প্রকাশকাল ১৯০৪, আর একটু আগেই রবীন্দ্রনাথ বিধবা বিনোদিনীর স্বপ্রতিষ্ঠতার কথা ঘোষণা করেছেন। যুগের তুলনায় রোকেয়া অনেক আধুনিক ছিলেন। সমস্ত সুখ স্বপ্ন ত্যাগ করে নারীর ভবিষ্যৎ গঠনে আত্মমগ্ন হয়েছিলেন। জাতপাত ধর্মীয় বেড়াজালের উর্ধ্বে মহান মানবতার বাণী নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। রোকেয়ার মূল্যায়ন সম্পর্কে মোহিতলাল মজুমদারের উদ্ধৃতি দিয়েই এ প্রসঙ্গের অবতারণা শেষ করি- “ একালে হিন্দু সমাজেও এমন নারী চরিত্র বিরল।কিন্তু তজ্জন্য হিন্দু আমি কিছুমাত্র লজ্জা বোধ করিতেছি না ; কারণ বেগম রোকেয়া শুধুই মুসলিম মহিলা নহেন, তাঁহার জীবনবৃত্তান্ত পাঠ করিয়া আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়াছে যে তিনি খাঁটি বাঙ্গালীর মেয়ে।“ ( রোকেয়া রচনাবলী, ঐ, পৃ. গ) পুরুষোত্তম সিংহ সুভাষগঞ্জ ,রায়গঞ্জ,উত্তর দিনাজপুর পিন-৭৩৩১৩৪ চলভাষ- ৮৭৫৯১০৪৪৬

1106

Leave a Reply