অক্টোবর ১৪, ২০১৯

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের গল্প : মুসলিম সমাজ মানস

পুরুষোত্তম সিংহ
সাহিত্যের মূল প্রেরণা কল্পনা না বাস্তবতা – এ নিয়ে বিভেদ আছে মতান্তর আছে। তবে লেখার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার জগৎই যে বড় কথা সে নিয়ে সংশয় নেই। কবিতার একটি বড় জায়গা অবশ্যই কল্পনা কিন্তু গল্প উপন্যাসের ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতাই বড় ভূমিকা নেয়। পারিপার্শ্বিক পরিবেশই লেখকের মননভূমি। তবে আধুনিক লেখকেরা আর কেউই পুরোপুরি বাস্তবতাকে নির্ভর করে গল্প লেখেন না। জাদুবাস্তব, কহুকের বাস্তবতা বা বাস্তবতার কুহক সেখানে বড় ভূমিকা নেয়। আর বড় লেখক কোনদিনই সমকাল, স্বজাতি ও স্বগোষ্ঠীকে অতিক্রম করে যান না। স্বজাতি ও স্বগোষ্ঠীর দ্বায়ভার যেন বর্তে যায় সেই সাহিত্যিকের কাছে। আর সেজন্যই লেখককে পেতে হয় আঞ্চলিক শিরোপা। বাংলা কথাসাহিত্যে মুসলিম জনজীবন প্রথম প্রবল ভাবে নিয়ে এলেন সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ। সিরাজের আগে পৃথক জাতি হিসেবে মুসলিম জনজীবনের কথা বাংলা কথাসাহিত্যে আসেনি । স্বাধীনতার পূর্বে শরৎচন্দ্র ও অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের লেখায় মুসলিম জনজীবন উঠে এলেও তা ছিল বাঙালি মুসলিম। পৃথক জাতি হিসেবে বা সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে মুসলিম সমাজের কথা তিনিই প্রথম তুলে আনলেন। আর সেই ধারকেই বহমান করে নিয়ে চলেছেন আফসার আমেদ, আবুল বাশার, সোহারাব হোসেন ও নীহারুল ইসলাম।
বিমল কর ‘আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা’ গ্রন্থে লিখলেন –“আমাদের অবাক করার মতন গল্প সিরাজের জামার পকেটে অনেক ছিল” (পৃ. ৬৫ )। গল্পের বহুমাত্রিকা আখ্যান নিয়ে তিনি আসরে এসেছিলেন। আসলে আলকাপ দলের মাস্টার যে গল্পভুবনেও মাস্টার হয়ে উঠবে তা সেদিন বিমল কর বুঝতে পরেছিলেন। বিমল কর তাঁকে ইয়ার্কি করে বলতেন ‘সিরাজ সাহেব’ আর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলতেন –‘এই যে বাংলার শেষ নবাব’। স্বাধীনতা উত্তরকালে বাংলা কথাসাহিত্যে অর্থ শতাব্দী ধরে তিনি তো রাজত্বই করে গেলেন, আর এপার বাংলায় মুসলিম জীবনের ইতিবৃত্ত লেখায় তিনি শেষ নবাব নয় প্রথম নবাব। তবে তাঁর গল্পের শেষ সত্য কী, তা জেনে নেওয়া যেতে পারে কথাসাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য থেকে –“সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের গল্পে মানবিকতা চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। মানবিকতার কোনো বিকল্প নেই, এই সত্যটিকে পাঠক হৃদয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করে দিতে চান। এর ভেতর যন্ত্রণা আছে, দুঃখ আছে, বেদনা আছে কিন্তু কলিজার সত্যই চূড়ান্ত সত্য। “ ( শতাব্দী শেষের গল্প, মিত্র ও ঘোষ, প্রথম প্রকাশ ২০০১, পৃ. ১০৭ )
বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম সমাজের কথা উঠে এসেছে আবুল ফজলের ( ‘মা’, ‘পরিণাম’, ‘বিবর্তন’, ‘সংস্কার’,’ শরীফ’) নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ( ‘রস’, ‘তালাক’) গল্পে। মহাশ্বেতা দেবীর গল্পে যেমন এসেছে তেমনি বিপুল ভাবে এসেছে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের গল্পে। মুর্শিদাবাদের হিজল অঞ্চলের অন্ত্যজ হিন্দু- মুসলিম সমাজের কথা বারবার উঠে এসেছে তাঁর রচনায়। এ প্রসঙ্গে কথাসাহিত্যিক অমর মিত্র বলেছেন –
“ গত শতকের ৫০ এর দশকে যে লেখকদের আবির্ভাব তাঁদের ভিতরে সিরাজ, শ্যামল, মহাশ্বেতার লেখায় অন্ত্যজ মানুষ এসেছে তার রক্তমাংস নিয়ে। আর সিরাজ এখানে নিজেকে আলাদা করে নিলেন অন্ত্যজ বাঙালি মুসলমানকে আমাদের সাহিত্যে নিয়ে এসে। হ্যাঁ, স্বাধীনতার পরে এই বাংলাব সিরাজই প্রথম অর্গল খুলে দিলেন। তার আগে সেইভাবে কিছু ছিল না। দেশভাগের পর ওপার বাংলায় বাঙালি মুসলমান তার আত্ম পরিচয় লিখেছে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আবু ইসহাক, মহামুদুল হক থেকে পঞ্চাশের দশকে হাসান আজিজুল হক বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। এই বাংলায় আরম্ভ করলেন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ।“ (‘গল্পের হাতছানি’, প্রথম প্রকাশ ২০১৫, কারিগর পৃ. ৮৪)
বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে এক মাইলস্টোন ‘অলীক মানুষ’। হ্যাঁ. শুধুমাত্র এই একটি মাত্র উপন্যাসের জন্যই সিরাজ দীর্ঘদিন জীবিত থাকবেন বাঙালি পাঠকের মনে, অন্য উপন্যাসের কথা বাদ দিলেও। মুসলিম জীবনের মিথকে কেন্দ্র করে এরকম উপন্যাসের কাহিনি গড়তে একমাত্র তিনিই পারেন। সিরাজ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ অক্টোবর মুর্শিদাবাদের খোশবাগপুরে। ‘ইবলিশ’ ছদ্মনামে প্রথম গল্প ‘কাঁচি’ প্রকাশিত হয় বহরামপুরের ‘সুপ্রভাত’ পত্রিকায় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে। প্রথম উপন্যাস ‘নীল ঘরের নটী’ প্রকাশ পায় ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে নবপত্র প্রকাশের উদ্যোগে। খোসবাসপুর হিজল এসবই সিরাজের রচনার প্রেক্ষাপট। তবে তিনি কিন্তু আঞ্চলিক চিত্রকর নন। এক সর্বজনীন গ্রাহ্যতাবোধ তাঁর মধ্যে ছিল। এজন্যই কথাসাহিত্যিক ভগীরথ মিশ্র তাঁকে ‘ভারতীয় কথাকার’ বলতে দ্বিধা করেন নি। কেননা গ্রামীণ ভারতবর্ষকে তিনি তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছেন। দেশজ- লোকজ ঘরনার কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। এই গ্রামীণ প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেন-
“ শহরে যখন থাকি, তখন মনে হয় গ্রামে চলে যাই, গ্রামে গিয়ে থাকি। পাখি, গাছপালা, পুকুর এইসব। এই নিসর্গ চিত্রগুলো আমার চোখে ভাসে। আর যদি বিশেষ কোনো ছবির কথা বলতে চাও তাহলে বলবো আমাদের গ্রাম, গ্রামাঞ্চল তো, পূর্বদিকে ধাপে ধাপে মাঠে নেমে গেছে নদীর দিকে। তো নদী আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় দু মাইল।“(‘বিনির্মাণ ১২’, জানুয়ারি ২০১৩, পৃ.৮৪)
মুসলিম জীবন নিবে লেখা একটি অসাধারণ গল্প হল ‘জুলেখা’। সিরাজ সাহেব মানবতার শিল্পী। তিনি নিছক মুসলিম জীবনের ধর্মান্ধতায় বিশ্বাস করেন না। অসাধারণ বর্ণনাভঙ্গির দ্বারা তিনি তুলে ধরেছেন জুলেখা ও অঞ্জুমানের বাল্যজীবনের ভাঙা- গড়ার কাহিনি। জুলেখা কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে। পদ্মা নদীর ধারের যেসব গরিব মানুষের দল রাঢ় অঞ্চলে ভাত খাওয়ার লোভে আসতো তাঁদের দলেই এসেছিল জুলেখা। সেই জুলেখা ও অঞ্জুমানের বাল্যজীবনের যে নিবিড় সখ্য গড়ে উঠেছিল তাঁকে কেন্দ্র করেই এ গল্পের কাহিনি নির্মিত হয়েছে। নারীর মধ্যে রয়েছে ভালোবাসার বীজ, আর সেই ভালোবাসাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে একটি বৃত্ত কিন্তু নারী বিকেন্দ্রীভূত হলে বৃত্ত শূন্য হয়ে যায়- আর সেই ভাঙা বৃত্তেই এ গল্পের পরিণতি পৌঁছেছে। অঞ্জুমানের থেকে জুলেখা দুই বছরের বড় হলেও তাঁদের কোনো বাঁধাধরা নিয়ম ছিল না। নারী মানেই নীড়, নারী মানেই বিবাহ। কিন্তু জুলেখার যৌবন তখনও বিকশিত হয় নি। অন্যদিকে অঞ্জুমান ভেবেছে জুলেখার বিবাহ হয়ে গেলে সে তাঁর খেলার সাথি হারাবে, প্রিয় সঙ্গী হারাবে এজন্য সেও চেয়েছে যেন বিবাহ না হয়। সব মিলিয়ে এটি বিপন্ন শৈশবের গল্প। অঞ্জুমানের প্রিয় সাথি কালু কুকুরকে হত্যা করে প্রথমে ডিপুটি মামা তাঁদের দলের যে ভাঙন ধরিয়েছিলেন শেষে জুলেখাকে নিয়ে গিয়ে অঞ্জুমানের বুক শূন্য করে গিয়েছেন। বাল্য, কিশোর ও যৌবনের প্রবেশ এই তিনটি পর্যায় লেখক অত্যন্ত সুন্দর ভাবে দেখিয়েছেন। প্রথম জীবনে অঞ্জুমান জুলেখাকে স্পর্শ করতে চাইলে জুলেখা সম্পর্কের প্রশ্ন তুলতো। অঞ্জুমান যখন বড় হলে সেই তাঁকে বিবাহ করতো তখন জুলেখা বলেছে সে তাঁর পিসি হয়, পিসিকে বিবাহ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আজ জুলেখা যৌবনে প্রবেশ করেছে যৌন সত্তাগুলি বিকশিত হয়েছে। জুলেখা প্রথম যৌনতার স্বাদ পেতে চেয়েছে অঞ্জুমানের কাছ থেকেই। ভিন্ন পুরুষকে সে মেনে নিতে পারেনি-
“ জুলি আমাকে সে রাতে আদরে অস্থির করে ফেলেছিল। সে আমার গালে ঠোঁটে রেখে ফিসফিস করে অনর্গল কথা বলেছিল। সে বলছিল, ‘শিগরির- শিগগির তুমি বড়ো হয়ে ওঠো। সোনার ছেলেটা ! তুমি যদি বড়ো হতে, কে সাহস পেত আমাকে বিয়ে করার ? সে দু –হাতে আমার মুখটা আঁকড়ে ধরে আবেগে ছটফট করে বলছিল ‘ছোটো বেলাকার মতো আমার নাক চুষে দাও। আমার গাল কামড়ে খেয়ে ফেলো।‘ আমি চুপচাপ দেখে সে কাত হয়ে চুল খুলে সেই চুল ছড়িয়ে আমাকে ঢেকে দিতে দিতে বলছিল ‘আমার এই চুলগুলো তুমি কত ভালোবাস। এই নাও তোমাকে চুল দিয়ে লুকিয়ে রাখলাম।“ (‘জুলেখা’, ‘ শ্রেষ্ঠ গল্প’, তৃতীয় সংস্করণ ১৪১১, দে’জ, পৃ. ১৪৮)
মুসলিম সমাজে নারী সম্পূর্ণ পরাধীন, তার সমস্ত আশা- আকাঙ্ক্ষা বির্সজন দিতে হয় পরিবারের ইচ্ছার কাছে। ব্যতিক্রম নয় জুলেখাও। তাই বিপত্নীক মামা ডেপুটি ম্যাজিস্টেটের সঙ্গে বিবাহ করতে হচ্ছে। ভুলে যেতে হচ্ছে অঞ্জুমানকে। অঞ্জুমান ও জুলেখার স্নেহের বাল্য জীবন বিপর্যস্ত হতে চলেছে, আর পাঠকের মনে পড়ছে সেই স্মরণীয় উক্তি- ‘বুঝিবা বাল্যপ্রণয়ে অভিসম্পাত আছে।‘
নকশাল আন্দোলন, জমি পাট্টা ও জমিদারের শোষণ নিয়ে একটি অসাধারণ গল্প হল ‘মাটি’। এ গল্পের মূলে আছে শোষণ। জমিদার – কৃষকের দ্বন্দ্ব সমাসে কৃষক কীভাবে নিঃস্ব হয়ে যায় তারই করুণ চিত্র উঠে এসেছে এ গল্পে। আশির দশকে পাট্টা প্রথায় জমি পেলেও বহু জমিদারের অত্যাচারে সে জমি টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না তা উঠে এসেছে। তেমনি স্বাধীনতার কুড়ি বছর পরেও জমিদারি শাষণ অব্যাহত ছিল, কারো ভাগ্যে একশো বিঘা আর কেউ নিঃস্ব। সেই নিঃস্ব মানুষদেরই প্রতিনিধি ল্যাংচা ফৈজু। পাট্টা প্রথায় সে জমি পেয়েছিল একুশ শতক,সঙ্গে ব্যাঙ্ক থেকে লোন পেয়েছিল হাল বলদ ও বীজ।জীবনে প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও সে উঠে দাঁড়িয়েছিল। নানী ফতেমার কথা মত বিবাহ করতে রাজি হয়েছিল। বিবাহ করে এনেছিল কালা বোবা এক কন্যাকে। কিন্তু বিধাতা বিরূপ। ফৈজুর জীবনে যখনই সুখের আভাস এসেছে তখনই সে জমির দিকে নজর যায় মোক্তার কানুহরির। জমিদারের অত্যাচারে সমস্ত ফসল নষ্ট হয়ে যায়। জমি, ফসল হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনের সন্ধানে ফৈজু পাড়ি দেয় শহরে। স্ত্রী-পুত্র থাকায় এখন দায়িত্ববোধ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। শহর থেকে ফিরে এসে দেখে পুত্রের মৃত্যু হয়েছে। এভাবেই ভেঙে গেছে একটি মুসলিম পরিবার- ট্র্যাজিক চরিত্রে পরিণত হয়েছে ফৈজু। লেখক অনবদ্য গদ্য ভাষায় ফৈজুর জীবনের পরিণতি তুলে ধরেছেন-
“ নিষ্ঠুর মুখে বুড়ি বলল, ছেলে কি আছে বাপ ? চিমসে হয়ে ঝুলত কোলে। বাছা আমার গোরে শুয়ে আছে শান্তিতে। ফৈজুর বাপের মন। গোরস্থানে গিয়ে ছেলের কবর খুঁজে হন্যে হয়। তিন মাসের বাচ্চা। ভিড়ের অলায় চাপা পড়ে আছে কোথায়। ফৈজু যায় শ্বশুর লেদুমিয়ার গাঁয়ে। মিয়ার ভিটেতে ঘুঘু চরছে। বিটিতে নিয়ে বাপ চলে গেছে শহরে। শহরে সুখ, গাঁয়ে অকাল বারোটা মাস। কুড়িয়ে খেলেও দুটো মানুষের পেট ভরে যাবে।“(‘মাটি’, ‘গল্প সমগ্র’ প্রথম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ ২০১৩, করুণা প্রকাশনী, পৃ. ১৭৬)
নিয়তিবাদ, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা, মুসলিম সমাজের প্রথাবদ্ধ সংস্কার ও সংস্কারকে অতিক্রম করে স্বাভাবিক ভাবে বাঁচা, তাঁকে কেন্দ্র করে ব্যঙ্গ- বিদ্রুপ সমস্তই প্রাধান্য পেয়েছে ‘দিওজেনিসের মৃত্যু’ গল্পে। ধর্মকে অবলম্বন করেই বেঁচে থাকে গ্রামীণ জীবন, সেই গ্রামীণ জীবনে প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে আঘাত আনলে বরণ করে নিতে হয় একঘরে জীবন, পদদলিত হতে হয়েছে এ গল্পের মহতাবকে। মুসলিম সমাজের প্রচলিত ধর্মীয় আচার নিয়ম মানে না মহতাব – এজন্য সমাজের কাছে বারবার গ্লানি সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। এজন্য কোনো ক্ষোভ দুঃখ নেই মহাতবের। গ্রাম্য জীবনে এক নিঃসঙ্গ নায়ক মহতাব। সে আজ মৃত্যুপথযাত্রী, তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই এ গল্পের প্রেক্ষাপট গড়ে উঠেছে। সবাই ভেবেছে মহতাবের নরকে স্থান হবে। মৃত্যু শয্যায় সবাই প্রার্থনা জানিয়েছে মহতাবের কাছে সে যেন ক্ষমা চেয়ে নেয় সবার কাছে। কিন্তু মহতাব এক মেরুদণ্ড শক্তিশালী যুবক, জীবনে সে কারো কাছে কৃপা ভিক্ষা প্রত্যাশী নয়। সে মুসলিম ধর্মীয় রীতি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পালন করতে অনিচ্ছুক। মহতাবের এই বৈরাগ্যের কারন পরিস্ফুটনেই গল্পের কেন্দ্রীয় সত্যটি উঠে আসে।কবর শয্যায় মহতাব শুধু ক্ষমা ভিক্ষা চেয়েছে ওহিদের কাছে। কেননা ওহিদের মৃত্যু ঘটেছিল মহতাবের জন্যই। মহতাবের প্রণয় ছিল ওহিদের স্ত্রীর সঙ্গে। তাই ওহিদের মৃত্যু। তাই ওহিদের মৃত্যু ঘটলে মহতাব বিবাহ করতে পারবে তাঁর স্ত্রীকে। ফলে ওহিদের বাঘের মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু মহতাব শেষ পর্যন্ত ওহিদের স্ত্রীকে বিবাহ করেনি- বিবাগী হয়ে গেছে। তাই কবর শয্যায় ক্ষমা চেয়েছে ওহিদের কাছে-
“ না । কথা দিয়ে কথা রাখলে না। ইদিকে খামকো আমাকে একটা লোকের কাছে দূষী করল। সে মরার আগে বলে গেল, তুইও জানতিস মাগী ! আমি মাথা ভেঙে বললাম, বিশ্বেস করো। …. সে দু হাঁটুর ফাঁকে মুখ ঢুকিয়ে আবার কান্নাকাটি জুড়ে দিল। বুঝলাম, অকারণ একটা অতীতকাল বয়ে এনে এই প্রাক্তন নায়িকার ওপর ছুঁড়ে ফেলেছি। ওকে আঘাত করেছে।“(‘দিওজেনিসের মৃত্যু’ ঐ, পৃ. ৩৮১)
কিন্তু এখন প্রশ্ন হল গল্পের নাম ‘দিওজেনিসের মৃত্যু’ কেন ? লেখক মহতাবের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন গ্রীকবীর দিওজেনিসের ছাপ। দিওজেনিসের প্রেমে পড়েছিল করিনাথের রাজকুমারী ইডোরা। কিন্তু ইডোরার সাথে বিবাহ হয় দিয়াক্রসের। ফলে দিওজেনিসের চক্রান্তে দিয়াক্রসের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু দিওজেনিসের আর বিবাহ করে নি ইডোরাকে। সেই দিওজেনিসের ছাপ লেখক দেখেছেন মহতাবের মধ্যে। তবে মহতাবের মৃত্যুর পর কোনো মৃর্তি স্থাপিত হয় নি। সে এক অতিসাধারণ মানুষের মৃত্যু বলেই বিবেচিত হয়েছে। আসলে মহতাব ভারতবর্ষের মানুষ। ভারতবর্ষের প্রতিবাদী মানুষদের পরিণতি বোধহয় এমনই হয় !
সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের ‘কুর্শি- নামা’ গল্পের কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই মনে পড়ে প্রফুল্ল রায়ের ‘সাতঘোরিয়া’ ও অমর মিত্রের ‘হস্তান্তর’ গল্পের কথা। ‘সাতঘোরিয়া’ গল্পে দেখা যায় চাঁপিয়া নামে এক নারী সাত নম্বর ঘর করতে চলেছে। চাঁপিয়ার প্রথম বিবাহ হয় পঁচিশ বছর বয়সে। মাত্র পনেরো বছরের মধ্যেই তাঁকে পাল্টাতে হয়েছে ছয়টি ঘর শুধুমাত্র জীবনে বেঁচে থাকার জন্য সমান্য খাদ্যের প্রয়োজনে। ভয়ঙ্কর জীবন চাঁপিয়ার, বিবাহ যেন ছেলেখেলা –
“ বন্যায় চষের জমি ডুবে যাওয়ায় জমি মালিক কাজ থেকে তাকে ছাড়িয়ে দেয়। সুতরাৎ বিয়েও বরবাদ। পাঁচ নম্বর বিয়েটো চৌপট হল মরদ মরে যেতে। ছ- নম্বর বিয়েটা ভাঙলো আজন্মার জন্য।“(‘সাতঘোরিয়া’, ‘প্রফুল্ল রায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প’, নবম সংস্করণ ২০১১, দে’জ, পৃ ১৬০)
তবু চাঁপিয়া ভেঙে পড়েনি, বিবাহ যেন নতুন করে বেঁচে থাকার কৌশল। অন্যদিকে অমর মিত্রের ‘হস্তান্তর’ গল্পের বিষয় হল মুসলিম পরিবারের বিবিজান নামে এক নারীর হস্তান্তর। বিবিজানের বিবাহের সংখ্যা চার। কাউকে পচন্দ হয় নি জীবিকার জন্য, কেউ মনের উপযোগী নয়, কেউ বা যৌন পিপাসা চরিতার্থ করতে অক্ষম। মুসলিম এক নারীর স্বাধীন জীবনের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেছেন লেখক। তেমনি সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ‘কুর্শি- নামা’ গল্পে সালমা নামে এক প্রতিবাদী নারীর ব্যক্তি স্বতন্ত্রতার সাতকাহন লিপিবদ্ধ করেছেন। সালমা যেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় – এ নারী খেলা করবার নয়, এ নারীকে নিয়ে ঘর বাঁধা যায় না। মুসলিম সমাজের প্রচলিত সংস্কার সে ভেঙে দিয়েছে। সংসারের বদ্ধ নিয়মে আটকে থাকা নারী সে নয়। সেকেন্দারের বিবি থাকার সময় সে অন্তঃপুর থেকে বহিঃবিশ্বে পা দিতে চেয়েছে – যা সেকেন্দারের অন্য বিবিদের ভালো লাগে নি। এখন প্রশ্ন হল সালমার এই প্রতিবাদী চরিত্রের উৎস কোথায় ? সালমা এক ধর্ষিতা মেয়ে, ছোটবেলা থেকেই অভাবকে সঙ্গী করে বড় হয়ে উঠেছে। সালমার প্রতিবাদী চরিত্রের দুটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যাক –
ক/ “ আমাকে চমকে দিয়ে ঘর থেকে সালমা চেঁচিয়ে উঠল- খর্বদার মাগী মাগী করবিনে গুখেকোর ব্যাটাল তোর চৌদ্দপুরুষের চৌদ্দটা বউ মাগি।“
খ/ “ সালমা বলল – মরে যাই ! চলে আয় বললেই বুঝি আর যাওয়ার হবে ! তুমি চলে যাও মিয়া, সালমা মির্জার বাড়ি থেকে আর যাচ্ছে না।“ (‘কুর্শি –নামা’, গল্প সমগ্র, ঐ, পৃ.৪৬)
চরম অভাবকে সঙ্গী করেই বড় হয়ে উঠেছে সালমা। কিন্তু সে লোভী নয়। লেখক সালামাকে মহৎ করে অঙ্কন করেছেন। তাই সেকেন্দারের বাড়ি থেকে তালাক নিয়ে যাওয়ার সময় সে সমস্ত পরিত্যাগ করে গেছে কুর্শিনামা। সৈয়দ মুস্তফা সিরাজকে এজন্যই আমারা ভারতীয় কথাকার বলতে চাই সে সব সময় বিভেদ ঘোঁচাতে চেয়েছেন। মনে পড়ে ‘ভারতবর্ষ’ গল্পের কথা, এ গল্পের সালমা কুর্শি-নামা চুরির মাধ্যমে মুসলিম সমাজের শ্রেণিগত বিভেদ দূর করতে চেয়েছেন। আসলে এক ভারতীয়ত্ববোধের সন্ধানই ছিল তাঁর গল্প উপন্যাসের মূল কথা। এজন্যই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন –“আমরা থাকব না, কিন্তু সিরাজের নাম বাংলা সাহিত্যে থেকে যাবে।“
( ২ )
‘দেশ’ (১৩৮৩ ) পত্রিকায় নিজেকে বক্তব্যজীবী লেখক বলে নিজেকে ঘোষণা করলেন সিরাজ। আবার ‘কেন লিখি’ শীর্ষক প্রশ্নের উত্তরে লিখলেন ‘আমার কিছু বলার আছে’। ছোটবেলা থেকেই মনে ইচ্ছা ছিল লেখক হবেন। কিন্তু কলেজে উঠে মিশে গেছেন আলকাপ দলে। পিতামাতা বাড়ি ফিরিয়ে সাতাশ বছরের সিরাজকে বিবাহ দিয়ে দিয়েছেন সংসারি হওয়ার জন্য, কাগজ কলম নিয়ে বসে আছেন, কী লিখবেন ! সামান্য জীবনে সংগ্রহ করেছেন বিপুল অভিজ্ঞতা, তাই সাজিয়ে দিতে চাইলেন কথাভুবনে । ফলে আমরা পেলাম মুর্শিদাবদের হিজল লালবাগ সহ রাঢ় বাংলার এক ভিন্ন চিত্র। তবে এ চিত্রের সঙ্গে তারাশঙ্করের মিল নেই। সিরাজ নিজেই নিজের পথ করে নিয়েছিলেন। কানে সর্বদা বাজত স্ত্রীর কথা –“নিজের মতো করেই লেখো। অন্যের মতো নয়।“
‘সাড়ে চার হাত মাটি’ এক কৃষকের জীবনে নিপীড়নের গল্প। আর সে নিপীড়নের দর্শক ছিলেন লেখক নিজেই। দেশ স্বাধীন হয়েছে, জমিদারি প্রথা বিলোপ হয়েছে কিন্তু কৃষকের ওপর অত্যাচার আজও কমেনি। আজ জমিদারের স্থান দখল করেছে সুদখোররা। বাবর আলি ওরফে বাবরু এক কৃষি পাগল মানুষ। জমির সঙ্গে তাঁর হৃদয়ের সম্পর্ক। কিন্তু তাঁর সব জমিই গেছে খাজনা দিতে না পারার কারণে। আর খাজনা দেবেইবা কী করে, বর্ষায় ফসলই হয় নি। এমনকি নিজের বাড়িটিও সুদের কারণে হাতছাড়া হয়েছে। বাবরুর চিন্তা নিজের কবর নিয়ে। কেননা সে সবার পাশে গোরস্থান নিতে চায় না। আজ বাবরু ভূমিহীন চাষি, সে শিশিরের ফার্মে কাজ করে। সে অত্যন্ত পরিশ্রমী কিন্তু তাঁর একটাই জেদ – এই ফার্মে কিছু জমি তাঁর ছিল ফলে সেখানেই যেন তাঁর কবর দেওয়া হয়। বাবরুর এই দাবির মূল্য কতটুকু জমিদারের সন্তান শিশিরের কাছে ! ফলে তা হাস্যকর মনে হয়, এমনকি বাবরুকে মনে হয় পাগল –“বাবরু বলল, “কথাটা মোনে আছে তো বাবুমশাই ? পয়সা লয়, কিছু লয় –খালি চারহাত মাটি বাবুমশাই –আপনার পায়ে ধরি। সাড়ে তিন হাতেই চলত। তবে কিনা মাথার পেছনে আধহাত পায়ের পেছনে আধহাত জায়গা লাগবে। ক্যান কী, দুদিকে ফেরেশতা এসে দাঁড়াবে। তেনাদেরও জায়গা চাই।“ (গল্প সমগ্র, প্রথম খণ্ড, করুণা, ১৯৮৭, পৃ. ৫৬ ) কিন্তু জায়গা হয় নি ! আর কেনইবা জায়গা হবে, ভারতবর্ষে দরিদ্র মানুষদের জন্য জায়গা কোথায় ? পঞ্জবার্ষিক যোজনায় গড়ে ওঠা একটি ড্যামের অবস্থা বিপন্ন দেখে সব দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। সেই জলে সমস্ত গ্রাম ভেসে গেছে, ভেসে গেছে বাবরুও। তাঁর দেহ শিয়াল কুকুরে খেয়েছে ,আর তাঁর কবর হয় নি। সেই যে কবি বলেছিলেন –“মাটিতে যাদের ঠেকে না চরণ মাটির মালিক তাহারাই হন।“ সেই রীতিতে আজ জমিদার শিশিররা। আর মাটিতে সামান্য জায়গা হয় নি বাবরুর। তাই বাবরুর কথক শেষে শুনিয়ে যান –“তাহলে বাবরু শেষ পর্যন্ত মাটি পেল না ! কেন পেল না বাবরু ? সে তো মাটিকে ভালবাসত । মাটির গন্ধ শুঁকে আবিষ্ট পৃথিবীকে দেখত। তবু সে মাটি পেল না কেন ? বেশি নয়, মাত্র সাড়ে চার হাত মাটি !” (তদেব, পৃ. ৫৭ )
‘ডালিম গাছের জিনটি’ গল্পে মুসলিম মিথের সঙ্গে সমসাময়িক হিংস্রার রাজনীতি স্থান পেয়েছে। চিরকালই শ্রেণিশত্রুরা সাধারণ মানুষকে সামনে রেখে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করেছে। আর সে চরিত্র যদি মুসলিম হয় তবে অত্যাচার আরও প্রবল। নাসিররা চিরকাল পরাজয়ের নায়ক। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ গ্রামজীবন দেখেছেন, গ্রামের রাজনীতির জটিলতা বুঝেছেন ফলে এসব আখ্যান খুব সহজেই তাঁর হাতে সফল রূপ পেয়েছে। একদিকে দুগারাজি ও অন্যদিকে মির্জার কন্যা দিলবাহার ভোটে দাঁড়িয়েছে। নাসির হল দুগারাজির বেতনভুক্ত কর্মচারী। এই নাসিরের পরিচয় দিতে গিয়ে লেখক লিখেছেন –“কপালে, দুই ভুরুর মধ্যিখানে স্থায়ী লম্বাটে নীল তিলক, যার স্থানীয় নাম ‘রাখাল – ফোঁটা।‘ সে অতীতে এক রাখাল ছিল। ন্যাকড়ায় ঘুটিঙ বেঁধে থুতু দিয়ে তার স্মৃতি। নাসিরকে রূপবান করেছে ওই চিহ্ন, তাতে ভুল নেই। তায় গোঁফ, ঝাঁকড়া চুল, ব্রোঞ্জ নির্মিত শরীর, তার মুখের হাসিতে ঐতিহাসিক ফৌজদারদের লক্ষণ আছে, এবং মধ্যযুগে ইচ্ছে করলে এরাই নবাব –বাদশাহ হতে পারত। কেল্লাবাড়ি থেকে কাটরা কলোনি পর্যন্ত ঘরে ঘরে তার সাগরেদ।“ (গল্প সমগ্র, পঞ্চম খণ্ড, করুণা, প্রথম প্রকাশ ২০০২, পৃ. ৩০ ) দুগরাজি নাসিরকে বলেছিল সে যেন দিলবাহারকে বিবাহ করে। কিন্তু নাসির কোনদিনই বলতে পারে নি। বলতে গিয়েছিল কিন্তু পারে নি। ইতিমধ্যেই ভোটের রাজনীতি শুরু হয়েছে, দুগারাজির পক্ষ দিলবাহারদের পরাজিত করতে উদগ্রীব হয়েছে। যখন দেখছে নাসিরের দ্বারা কোন কাজই হচ্ছে না, তখন দুগরাজির পক্ষ নাসিরকে হত্যা করে সমস্ত দোষ চাপিয়ে দিয়েছে দিলবাহারের ওপর। ভোটে হত্যার জন্য যেহেতু বিরোধী পক্ষই দায়ী সেই সুযোগ নিয়েছে দুগরাজিরা। প্রকৃত সত্য চাপা পড়ে গেছে মিথ্যার আড়ালে। ভোটের রাজনীতিতে একটি নিষ্পাপ নারী জীবনের পতন ঘটে গেছে।
মুসলিম জীবন নিয়ে এক অসামান্য গল্প ‘হরবোলা ছেলেটা’। পৃথিবীতে বোধহয় মাতৃস্নেহই সবচেয়ে মূল্যবান। মাতৃস্নেহের অভাবে সন্তান যেমন রুগ্ন হয়ে যায় তেমনি সব বোধ হারিয়ে ফেলে। এ গল্পে সিরাজ চমৎকার কায়দায় মাতৃস্নেহের অভাবে সন্তানের স্বভাবিক জীবনের বিচ্ছিন্নতাকে দেখিয়েছেন। তবে গল্পের প্লটে কোন মুন্সিয়ানা নেই। আসলে সিরাজের চরিত্ররা বড় হয়ে উঠেছে তাঁর ভূগোলেই। সে হিন্দুও হতে পারে, মুসলিমও হতে পারে। তিনি হিন্দু মুসলিমকে পৃথক করে গল্পের শ্রেণি চরিত্র সাজিয়ে দেন নি। সেই ভূগোলকে পরিস্ফূটিত করতে সেই সব চরিত্ররা স্বভাবিক ভাবেই উঠে এসেছে। এ গল্পের সাদেরালির ছেলে নাদেরালি। সাদেরালি ছিল দিন মজুর, তাঁর স্ত্রী পুত্র নিয়ে ছিল সুখের সংসার। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে সুলেমানের ছিল অবৈধ প্রণয়। আর তা একদিন সাদেরালির চোখে ধরা পড়ে যায়। ফলে স্ত্রী কাটারি দিয়ে আঘাত করে স্বামীর পায়ে, এমনকি স্ত্রী সুলেমানের সঙ্গে চলে যায়। স্ত্রী তালাক চাইলে সাদেরালি পাঁচ হাজার টাকা দাবি করে, কিন্তু দুই হাজার টাকায় রফা হয়। কাঁটা পা নিয়েই সাদেরালি কাজ করছিল কিন্তু সেখানে পচন ধরে তা বাদ দিতে হয়। ফলে আজ সাদেরালি ভিখারিতে পরিণত হয়েছে। প্রথমে পুত্রকে সঙ্গে নিলেও পুত্র এখন নিজেই যেতে পারে। কিন্তু পিতা বারবার বলে দিয়েছে সে যেন ভিক্ষা করতে কাঁকরগড়ে না যায়। কিন্তু সাদেরালি একদিন ভুল করে সেখানে গিয়ে মাতার কাছ থেকে দুই টাকা নিয়ে আসে, তা জানে না পিতা, সেই টকায় সামন্য চা খায় সে, কিন্তু যখন জানতে পারে এ টাকা স্ত্রীর তখন আর মেনে নিতে পারে না নিজেকে ও পুত্রকে –
“হঠাৎ হু হু করে কেঁদে ওঠে ছেলেটা। তখনি খোঁড়া লোকটা তার কাঁধ খামচে ধরে। থাপ্পড় মারে গালে। নেমকহারাম !
ছেলেটা পড়ে যায় । কান্না সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেছে। নিষ্পলক তাকিয়ে বাপের মার খায়। সাদেরালি হাঁফাতে হাঁফাতে তাকে টেনে ওঠায় ফের। বেধড়ক মারতে থাকে। কষা কেটে রক্ত ঝরে। হিঙন হাজির ঘিয়ে রঙের সোয়েটারে ধুলো আর রক্তের ছোপ।
সাদেরালি চ্যাঁচায়, আজ থেকে তুই ফের আমার সঙ্গে ঘুরবি। তারপর পকেট থেকে সেই পয়সাগুলো ছুড়ে ফেলে খালের জলে। বার বার থুতু ফেলে। ছেলেটা আস্তে আস্তে উঠে বসল।
কিছুক্ষণ পরে ছেলেটার কাঁধ খামচে ধরে সে মাঠের পথে নেমেছে। খোদাতালার আসমানকে শুনিয়ে বলছে, আজ আমি শুওর খেলাম। যতদূর যায়, খোঁড়া লোকটা ধুয়োর মতো আওড়ায় কথাটা।“ ( গল্প সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড, তদেব, পৃ. ৩১ )
সাদেরালি আজ পুত্রকে সঙ্গে নিয়েই যায়। মাতা বলেছিল প্রতিদিন সে গ্রামে আসার জন্য কিন্তু পুত্র আর যেতে পারেনি। ফলে মাতা বহু কিছু নদী ঘাটে এনেও ফিরে যেতে হয়েছে। তেমনি বাবার সঙ্গে গেলেও সাদেরালির গলা দিয়ে আজ আর পাখির আওয়াজ বের হয় না। যা দিয়ে সে এতদিন রোজগার করত মাতৃস্পর্শে সে যেন তা ভুলে গেছে। মাতা কোনদিন পুত্রের খোঁজ নেয় নি তবে দেখা মাত্রই চিনতে পেরেছে, আদর করেছে। আসলে সুলেমানের সংসারে নিজেরই পুত্র অনেক, ফলে আগের পুত্রকে ভুলে থাকতে হয়েছে। কিন্তু দর্শনেই মাতৃস্নেহ জেগে উঠেছে। তেমনি সাদেরালি এক ক্ষতবিক্ষত চরিত্র। তাঁকে আজ ভিক্ষা করতে হয়েছে পা হারিয়ে যাওয়ায়, তবুও সে পূর্বের স্ত্রীর দান স্পর্শ করবে না, এমনকি পুত্রকেও করতে দেবে না। সাদেরালি চরিত্র ধর্মীয় নিয়মের চেয়ে অভিমান বড় হয়ে উঠেছে, তেমনি নাদেরালিও মাতৃস্নেহ পেয়েও তা আবার হারাতে হবে বলে অভিমানকেই সঙ্গী করেছে। যে অভিমানে আর তাঁর গলা দিয়ে পাখির ডাক প্রকাশ হয় নি।
সিরাজের গল্প সম্পর্কে সমালোচক সুমিতা চক্রবর্তী লিখেছিলেন –“সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি –রক্ষার নামে সাম্প্রদায়িক বিভেদের চেতনাকে উশকে দেবার যে রাজনীতি আমরা প্রত্যক্ষ করছি আজকের ভারতে, সিরাজের গল্প তার বিষ –বাষ্প থেকে মুক্ত। তাঁর গল্প মানুষের গল্প। আর মানুষের যেহেতু একটা গোষ্ঠী নির্দিষ্ট ‘ধর্ম’ থাকে এখনও, তাই তাদেরও আছে। অবশ্য সম্প্রদায়িক বিভেদের দিকটাও এদেশে সত্যই প্রায়শ। কিন্তু সিরাজ এই নিয়ে লেখবার আগ্রহ বোধ করেননি। কোনো চাপিয়ে দেওয়া সাম্প্রদায়িক মিলনের বাণীও ঘোষিত হয়নি তাঁর গল্পে।“ ( ভূমিকা, গল্প সমগ্র, পঞ্চম খণ্ড, তদেব, পৃ. VII ) এ মন্তব্য একশো শতাংশ সত্য। তিনি জীবন সত্যের গল্প লিখতে চেয়েছেন। গল্পের যে সত্য তাই তিনি আবিষ্কার করেছেন। অর্থাৎ গল্পের অভিমুখ যে পথে গেছে তাই তিনি খুলে দিয়েছেন। এমনই একটি গল্প ‘মহারাজা’। এক মৃদু গদ্যে তিনি পাঠককে গল্প শুনিয়ে গেছেন। মানবতার জয় ঘোষিত হয়েছে এ গল্পে। সুলেমান মুহুরি আসে মহারাজার কাছে। বাল্যকালে এক নাটকে সামান্য অংশ গ্রহণের জন্য তাঁর এই নাম হয়েছিল। মিলিটারি চাকরি থেকে এসে সে এখন সাইকেল মেরামতের দোকান খুলেছে। কিন্তু তাঁকে গ্রামের লোক সম্মান দেয়, শ্রদ্ধা করে, তেমনি রয়েছে শারীরিক ক্ষমতা। সুলেমানের স্ত্রী চলে গেছে। তা ফিরিয়ে আনার জন্য জানায় মহারাজকে। সেও টাকার বিনিময়ে রাজি হয়। কিন্তু কেন সুলেমানের স্ত্রী চলে গেছে তা জানতে চায় নি। রাত্রির অন্ধকারে ভয় দেখিয়ে, চুরি করে সেই মেয়ে নিয়ে এসেছিল মহারাজা ও তাঁর দলবল। কিন্তু আজ সেই মহিলা আর গোপন রাখেনি কেন সে পিতৃগ্রহে চলে গিয়েছিল। সুলেমান এক অর্থপিশাচ লোভী, জমির প্রতি তাঁর প্রবল টান। আর সে মুনাফা লুটতে স্ত্রীকেও বেশ্যাতে পরিণত করতে ছাড়েনি। সমস্ত কথা শোনার পর মহারাজা আজ হতাশ। এই পরিস্তিতিতে নিজেকে বাঁচাতে সুলেমান আজ তালাক দিয়ে দেয় স্ত্রীকে। রাতের অন্ধকারে এই মহিলাকে কোথায় ফেলে আসবে মহারাজা ! ফলে নিজের বাড়িতেই নিয়ে আসে। এ গল্প পড়তে গিয়ে মনে পড়ে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘ডাকাত’ গল্পের কথা। তবে সিরাজ অচিন্ত্যকুমারের পথ অবলম্বন করেনি। তিনি নিজস্ব পথই গড়ে তুলেছেন। ‘ডাকাত’ গল্পে বিবস্ত্র তসলিমাকে নতুন বস্ত্র দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল ডাকাত দলের সর্দার দর্জন আলি। আর এ গল্পে তালাক প্রাপ্ত মহিলাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছে মহারাজা। দুজনই মানবতার নব দিশা দেখিয়েছে। কোন নীতি ধর্মের প্রচার বা বার্তা দেওয়া গল্পকারের উদ্দেশ্য নয়, জীবনের বহুবিধ পথে যে আদর্শ মানুষ এখনও আছে সেই কথাই লেখক ঘোষণা করতে চান। এবার আসি এ গল্পের গদ্য প্রসঙ্গে। ছোট ছোট হৃদয়গ্রাহী বাক্যে তিনি গল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন পরিণতির দিকে। অযথা শব্দ প্রয়োগ বা গভীর ব্যঞ্জনা নয়, তিনি যেন মেপে মেপে সাজিয়েছেন বাক্যগুলিকে –
“ঘোষহাটি পশ্চিমে, সোনাডাঙা পুবে। রাস্তাঘাট কাঁচা ওদিকে। বর্ষায় কাদা জমেছে। মাঠেও চাষ পড়েছে। জলকাদা প্রচুর। অতএব আলপথই ভাল। ঘন ঘাস গজিয়েছে। ভয়টা শুধু সাপের। সুলেমান মহুরির টর্চ আছে। সাপের কামড়ে এখন মরতে চায় না সে। কিন্তু তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে। পায়ের সামনে টর্চের আলো ফেলছে সারাক্ষণ। তার পিছনে মোট তিনটি লোক। সুলেমানের সংশয় ঘুচছে না, চেঁচামেচি বড্ড হবে। গাঁয়ের গুণ্ডাগুলো এসে পড়লেই বিপদ।“ ( গল্প সমগ্র, প্রথম খণ্ড, তদেব, পৃ. ৯৩ )
শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পে আমরা এক মুসলিম চাষির পশুপ্রীতির নিদর্শন পেয়েছিলাম। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ‘গোঘ্ন’ গল্পে পশুপ্রীতির এক গল্প শোনালেন। এ গল্প এক যাত্রাপথের গল্প। সেই যাত্রাপথে এক পরাজিত মুসলিম চাষির গল্প। এ গল্পপাঠের শেষে পাঠকের স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। এক আশ্চর্য ভাষাশিল্পীর দক্ষতায় তিনি গল্পকে বেঁধে রেখেছেন। হারাই দোলাই দুই ভাই। রাঢ়দেশের চারু মাস্টারের সঙ্গে তাঁদের বিশেষ সখ্য ছিল। তাই হারাই পূর্বের কথা মত চারু মাস্টারের কন্যার বিবাহতে কুমড়ো ও কলাই ডাল পৌঁছে দিতে গিয়েছিল, ফেরার পথে নিয়ে এসেছে কিছু ধান নিজের গরুর গাড়িতে। পথেই অসুস্থ হয়ে পড়ে গরু ধনা। এই ধনা –মনাকে হারাই নিজ সন্তানের মতোই ভালোবাসে। তাই ধনায়ের অসুস্থায় সে চিন্তিত, কবিরাজের কাছ থেকে ওষুধ নিয়েছে, তবে কিছুতেই যেন যাত্রাপথ শেষ হয় না। গোটা গল্প জুড়েই আছে হারাইয়ের যাত্রাপথের বিবরণ। দিলজান এই বলদকে কিনতে চেয়েছিল কিন্তু ধনাই বিক্রি করেনি, পথ চলতে ধনা আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে , ফলে সকালের পরামর্শ মত সে ত্রিশ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে। পথেই দেখা হয়েছে বদর হাজীর সঙ্গে, তিনি মানুষ খাওয়াতে ভালোবাসেন। খেতে বসেই জানতে পেরেছে সে নিজের প্রিয় বলদের মাংস মুখে দিয়েছেন, তখনই চিৎকার করে ওঠে –“হামাকে হারাম খাওয়ালেন ! ….. হামাকে হামারই বেটার গোশতো খাওয়ালেন। হেই হাজীসাব ! হামার ভেতরটা জ্বলে খাক হয়ে গেল যে ! এক পদ্মার পানিতেও ই আগুন নিভবে না গো।“ ( গল্প সমগ্র, প্রথম খণ্ড, করুণা, প্রথম প্রকাশ ২০১৩, পৃ. ৩১১ ) গ্রামীণ মানুষ পশুকে সন্তান হিসেবেই ভালোবাসে। আর এ ভালোবাসা আরও বেশি কেননা এই গরু কৃষির সঙ্গে জড়িত, কৃষকের অন্নের সঙ্গে জড়িত। তাই হারাই পকেটে থাকা সামান্য পয়সা দিয়ে নিজে না খেয়েও ধনার চিকিৎসা করেছিল। তেমনি এই বলদ গুলি বাড়িতে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই পা ধুয়ে দিতেন স্ত্রী। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই বলদ ছাড়া কৃষকের এক মুহূর্ত পরিত্রাণ নেই। শুধুমাত্র এই বলদের অভাবে বাঘাড়ীগ্রামে বহু মানুষ ভিখারিতে পরিণত হয়েছে। তাই বলদের মৃত্যু ঘটলে হারাইয়েরও কিছু করার থাকবে না ভিখারিতে পরিণত হওয়া ছাড়া। সেজন্য বলদের প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর –
“ব্যাটা মরবে, ব্যাটা জন্মাবে। কিন্তু গরু মলে গরু কোথায় পাবে হারাই ! একটা গরুর দাম যোগাতে অর্দ্ধেক জমি বেচতে হবে। খোদা কি এটা বোঝেন না ? একটা গরুর অভাবে তার গাড়োয়ানী বন্ধ হবে। চাষবাস বন্ধ হবে। খন্দ ফলমুল ফিরি করতে আসা হবে না রাঢ়ে। বাঘড়ীমুলুকে কে এসব কিনবে ? না খেয়ে মারা পড়বে হারাইয়ের বহু- বেটা –বিটিয়া। ‘মুসাফির’দের মতো তাদেরও যে মরসুমে ভিখ মাঙতে যেতে হবে রাঢ়ে ! ঠিক এমনি করে একটা গরুর অভাবে বাঘড়ীর কত মানুষ মসাফির ভিখিরি হয়ে গেছে ! তাই ভেবে হারাই কাঁদে। নমাজে বসে থাকে অনেকক্ষণ। খোদাতালাকে ইনিয়ে বিনিয়ে সব কথা বোঝাতে চায়।“ ( তদেব, পৃ. ৩০৬ )
নিজের গল্প সম্পর্কে সিরাজ নিজেই জানিয়েছেন –“নিটোল গার্হস্থ্যের গল্প আমার আসে না। যৌবনে তো ছিলাম ছন্নছাড়া উড়ানচন্ডী ভবঘুরে। ক্রমে জেনেছিলাম, মানুষ যতই বড়াই করুক প্রকৃতপক্ষে সে প্রকৃতির করতলগত। প্রকৃতির হাতে লাটাইয়ের মাঞ্জা –সুতোর ডগায় মানুষ যেন এক বর্ণময় ঘুড়ি। তাই আমার গল্পে আনিবার্যভাবে এসে গেছে সেইসব মানুষজন, যারা নিজেদের বন্দিদশায় আক্রান্ত এবং সতত আর্তনাদ করে।“ (বিননির্মাণ ১২, তদেব, পৃ. ৩২ ) আসলে সিরাজ নিজেও ছিলেন এক চিরপালাতক যুবক, প্রকৃতি গহীন অরণ্যেই তিনি নিজের স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। যেখানে নিজের স্বাধীনতা খুন হয়েছে সেখান থেকেই পালিয়ে গেছেন, সে বাড়ি হোক আর চাকুরি ক্ষেত্র হোক ! ফলে তাঁর গল্প উপন্যাসে মানুষের বন্দি দশার মর্মরহস্য আমরা দেখতে পাই। তবে কিন্তু এ বিষয়ে তিনি জগদীশ গুপ্ত বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরাসূরী নন, সে পথ সিরাজের নিজস্ব, সেখানে তিনি একক ও দক্ষ শিল্পী।
স্বামীর ভাগ কোন নারীই কাউকে দিতে চায় না। নারীত্বের চিরন্তন সত্য প্রতিষ্ঠিত স্বামীকে কেন্দ্র করে একার সংসারের মধ্য দিয়ে, সেখানে সতীনকে ভাগ দিতে চায় না। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘বাদশা’ গল্পেও নারীর সেই চিরন্তন আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গল্পের মধ্য পথে মনে হয়েছিল লেখক বুঝি আনমনীকে মহৎ, উদার নারী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেবন, কিন্তু তিনি সেই পথে না গিয়ে নারীর চিরন্তন আদর্শেরই জয় ঘোষণা করেছেন। হাজী সাহেবের বাড়িতে রাখালের কাজ করত বাদশা। কিন্তু হাজী সাহেবের ইচ্ছা ছিল তাঁর জমি, বাড়ি ঘরের যেন কিছু ক্ষতি না হয়। এজন্য তিনি বাদশার সঙ্গে নিজের কন্যার বিবাহ দিয়ে বাদশাকে ঘর জামাই করে রেখেছিলেন। সংসার সুখেই চলেছিল কিন্তু বাদশার আর ভালো লাগে না আনমনীকে, কেননা আনমনীর যৌবন বিদায় নিয়েছে। আর মুসলিম হাদিসে যেহেতু চার বিবাহের নিয়ম আছে ফলে বাদশা আবার বিবাহ করতে চায়। কারণ হিসেবে জানায় আনমনীর নাকে গন্ধ, তাই সে তাঁর পাশে ঘুমাতে পারে নি ফলে নতুন বিবাহ করবে। আসলে এ ছিল মিথ্যা অভিযোগ। তা বুঝতে পারে আনমনী, ফলে সে নানাভাবে প্রমাণের চেষ্টা করে নাকে গন্ধ নেই। কিন্তু মুসলিম নিয়ম অনুসারে তো আর আনমনী স্বামীর বিবাহ ঠেকাতে পারে না, ফলে সে জানায় এ বাড়িতে সতীন আনা চলবে না। আর এ বাড়ি যেহেতু আনমনীর বাবার ফলে অর্থের হাতছাড়া হবে বলে বাদশা তালাকও দিতে পারে না। ফলে বাদশা শহরে গিয়ে আবার বিবাহ করে আয়নাকে। কিছুদিনের মধ্যেই সব টাকা শেষ হয়ে যায়, বাড়িতে যেহেতু আয়নাকে আনা যাবে না তাই সে আয়নাকে তালাক দিয়ে আবার গ্রামে ফেরে। প্রথমে আনমনী অভিমান করলেও পরে স্বামীকে মেনে নিয়েছে। আয়না চালের ব্যবসা করত, আজও সে গ্রামে এসে বাদশার বাড়ি থেকে চাল কিনেছে, আনমনী ও আয়না দুজনেই সব জানে তবুও কিছু বলেনি।
আসলে এই বিবিধ বিবাহের ফলে সবচেয়ে ক্ষতবিক্ষত হতে হয়েছে নারীদের। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এ গল্পে সেই তালাকের প্রসঙ্গ এনে নারীর ক্ষতবিক্ষত অবস্থানটি চিহ্নিত করেছেন। বাদশা তালাক দিতে পারে নি আনমনীকে শুধুমাত্র অর্থের প্রত্যাশায়। কিন্তু গ্রামীণ জীবনে এই তালাক সহজেই ঘটে। আনমনী তাঁর স্বামীকে ফিরে পেয়েছে, আয়না দরিদ্র বলেই পরাজয় বরণ করে নিতে হয়েছে। এ গল্পে দুই নারী এক পুরুষ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষ নিজের খেয়াল খুশি মত নারীকে ব্যবহার করেছে। তবে ব্যঙ্গ যে নেই তা নয় ! বাদশা আজ আনমনীর কাছে ফিরেছে শুধুমাত্র অর্থের জন্যই। সেই সঙ্গে মনে পড়ে গ্রামীণ প্রবাদ ‘সুখে থাকতে ভূতে কিলায়’ এর কথা। বাদশার সেই ভূত চেপেছিল কিন্তু যখন দেখল অর্থই জীবনের শেষ সত্য তখন সে আয়নাকে তালাক দিতে বাধ্য হল। তবে আনমনী প্রতিবাদ করেছিল ঘরে সতীন আনতে দেবে না, আয়নারা কোন প্রতিবাদ করেনি। গরিব বলেই প্রতিবাদের কোন জায়গা ছিল না। সে অর্থহীনতায় হয়ত গর্ভবতী হয়েছিল কিন্তু যেখানে ক্ষুধাই একমাত্র সত্য সেখানে নারীর সতীত্বের মূল্য কতটুকু ! আর বাদশারা নিজের সুখকেই ভালোবেসেছে, নারী হৃদয় বোঝে নি। লেখক বাদশার চমৎকার বর্ননা দিয়েছেন –
“বাদশা বরাবর শান্ত, নিরীহ আর অমায়িক। তার চেহারায় উদাসীন সৌন্দর্য আছে। দৃষ্টি ভাসা –ভাসা অনেক দূরে ঘোরে। মাঠের দিকে তাকালে পুরো একটা দিগন্ত ও আধখানা আকাশকে ধরে রাখার ক্ষমতা তার ঈষৎ পিঙ্গল চোখ দুটির আছে। তার এই চাউনি দেখলে মনে হবে, সে আজীবন ধানক্ষেতের মধ্যে দিয়ে হেঁটে কোন এক মক্কায় পৌঁছাতে চায়। একদা সন্ধ্যায় রাখাল ছেল বাদশাকে বাঁ-কাধে চাঁদ নিয়ে মাঠ থেকে আসতে দেখেই পছন্দ হয়েছিল ধার্মিক মানুষ তোরাপ হাজীর।“ ( গল্প সমগ্র, পঞ্চম খণ্ড, তদেব, পৃ. ২৪৪ )
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এক মহান ভারতীয়ত্ববোধের কথাকার। মুসলিম সমাজের প্রসঙ্গ তাঁর গল্পে এলেও তিনি ভারতবর্ষের অতি সাধারণ মানুষের কথা লিখতে চেয়েছেন, আর প্রেক্ষাপট হিসাবে বেছে নিয়েছেন মুর্শিদাবাদের প্রান্ত অঞ্চলগুলিকে। সেই মিলনগাথার কাহিনি শুনিয়েই আমরা সিরাজের প্রসঙ্গ শেষ করব। গল্পের নাম –‘বুঢ়াপীরের দরগাতলায়’। দরিদ্র মানুষের কোন ধর্ম নেই, ক্ষুধার্ত মানুষের কোন ধর্ম নেই, আর তা থাকা সম্ভবও নয়, সেই সত্যে লেখক গল্পের চরিত্রকে পৌঁছে দিয়েছেন। পীরকে আমরা হিন্দু মুসলমানের মিলন কেন্দ্র হিসাবেই দেখেছি। সিরাজ এ গল্পে সেই পীর তলাকে পটভূমি করে এক মহান মিলন সংগীত আমাদের শোনালেন। আজ বিচ্ছিন্ন ভারতবর্ষের সমাজ ব্যবস্থায় এ গল্প বড় প্রাসঙ্গিক। দরগাতলায় মানুষের দানের আশায় বসে থাকে বেন্দাবন। সে অন্ধ বলে ছেলে নির্মলকে সঙ্গে নিয়ে যায়। সে পরিশ্রমী ছিল কিন্তু আজ অন্ধ, সংসারে অভাব বলে এখানে সামান্য সাহায্য পাওয়া ছাড়া আর তাঁর উপায় নেই। কিন্তু আজ দরগাতলায় মানুষও বেশি আসে না। একদিন এক হাজিসাহেব এই দরগাতলায় প্রণাম করতে আসে। সে হিন্দুর ছেলে নির্মলের আনা জলে পা ধুয়ে নামাজ পড়ে –“হাজিসায়েব একটু হকচকিয়ে যান। হিঁদুর ছেলের হাতের পানিতে ওজু করেছেন ! কোদাতলার গোঁসা হবে না তো ?” ( গল্প সমগ্র, প্রথম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ ১৩৯৩, পৃ. ১৪০ ) বাচ্চা ছেলেটি মুগ্ধ করে হাজিসাহেবকে। আর হাজিসাহেবের আচারণে মুগ্ধ হয় বেন্দাবন। বহুদিন পরে সেও সমান্য খেতে পেয়েছে হাজিসাহেবের করুণায় –“হাজিসায়েব গলা চড়িয়ে অন্ধের উদ্দেশে বলেন, বেন্দাবন ! খোদা-ভগমানের দুনিয়ায় খাদ্যের জাত নাই। আছে কি ? তুমার ছেলেটাকে কিঞ্চিৎ হালুয়া পরটা দিই।“ (তদেব, পৃ. ১৪৪ )
হাজিসাহেবের আচারণে বেন্দাবন মুগ্ধ। হাজিসাহেব নিঃসন্তান বলে বেন্দাবনের ছেলেকে নিয়ে যেতে চায়। বেন্দাবন দত্তকের কথা বলে হাজিসাহেব জানায় মুসলিম ধর্মে দত্তকের রীতি নেই তবে সব দানপত্র করে দেব। বেন্দাবন এ কথায় রাজি হয়, নগদ পঞ্চাশ টাকাও পায়, শুধুতাই নয় মাঝে মাঝে সন্তানকে দেখে আসার কথাও বলে। কিন্তু এই হাজিসাহেব ছিল আসলে ছেলেধরা। ফলে স্ত্রীর কাছে যেমন গঞ্জনা শুনতে হয়েছে তেমনি বড় পুত্রও ভৎসনা এনেছে। তবে হাজিসাহেবের টাকায় বেন্দাবন আজ বিড়ি বাঁধে, সেখান থেকে সংসার আজ কিছুটা সুখের মুখ দেখেছে। বেন্দাবনের স্ত্রীর নাম সুখেশ্বরী, সে কোনদিন সুখের মুখই দেখেনি। অথচ আজ কিছুটা সুখে এসেছে কিন্তু সন্তানকে হারাতে হয়েছে। আজ বেন্দাবন দরগাতলায় বসে শুধু পীরের কাছে কামনা করে সন্তান যেন সুখে থাকে, কোনদিন যেন ফিরে আসে। গল্প শেষে পিতৃহৃদয়ের আর্তনাদ বড় হয়ে উঠেছে। সিরাজের গল্পে প্রকৃতি ভীষণ বড় হয়ে ওঠে। তাঁর চরিত্রগুলি যেন প্রকৃতিরই সন্তান। সিরাজ মুসলিম জীবন নিয়ে লিখলেও এক উদার মানবপ্রেমিক জীবনবোধ তাঁর ছিল। তাঁর গল্পে হিন্দু মুসলিম পৃথক কোন জাতি বা সত্তা নয়, আসলে তিনি নিজের ভূগোলকে সামনে রেখে ভারতবর্ষের গল্প লিখতে চেয়েছেন, ফলে সেখানে কখনও হিন্দু বা মুসলিম এসেছে, আর এই শ্রেণি পরিচয় উড়িয়ে দিয়ে বলা যায় মানুষ এসেছে।

899