পাঠকের কলমে, অক্টোবর ৯, ২০১৯ :

বিসর্জন

সোমা সরকার

মুনিয়া খুব কাঁদছে। অষ্টমীতে বাবার কিনে দেওয়া হলুদ জামাটা যেটা একদম পা পর্যন্ত ঝুল ছিলো, যেটা কেনার জন্য দোকানের কাকু গুলোর সামনেই কান্না শুরু করেছিলো মুনিয়া সেই জামা আজ নবমীর দিন ছিঁড়ে গেলো।কোমড়ের পাশ দিয়ে ঝোলা ঝুমঝুম আওয়াজ করা বলগুলোও ছিঁড়ে চাড়িদিকে ছড়িয়ে গেছে।ছোট্ট মেয়েটার ডান পায়ে প্রচন্ড ব্যথা। মনে হচ্ছে কেউ হয়তো পাটাকে মচকে দিয়েছে। কি করে ওর হাতের লাল চুড়ি গুলো ভেঙে গেলো মুনিয়া বুঝতে পারছে না। একটু দূরে আলো ঝলমল করছে। খুব কাছেই ঢাকের আওয়াজ হচ্ছে।মুনিয়া শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু ও উঠে যেতে পারছে না।ও চিৎকার করতে পারছে না। মনে হচ্ছে গলাটা কেউ খুব জোরে চিপে ব্যথা করে দিয়েছে। আওয়াজ বের হচ্ছে না। কথা বলতে গেলেই কাশি পাচ্ছে।ঠোঁট নাড়াতে পারছে না।খুব কষ্ট হচ্ছে। গলার মালাটার পুঁথি গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মানুষের আওয়াজ কানে আসছে।
কিন্তু কিছু সময় পর সব কেমন শান্ত হয়ে গেলো।
মুনিয়ার খুব ভয় লাগছে।
ঢাকের আওয়াজ এখন আর আসছে না কানে। মাইকে জোরে জোরে বাজা গান গুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। এখন রাত অনেক হয়েছে নিশ্চই।মুনিয়া ভাবছে আমি এখানে আছি আমার মা বাবা কি করে জানবে..?
ওরা তো আমার খোঁজ করবে। রত্না, সুমি ওরা আমাকে না নিয়ে বাড়ি চলে গেলো…
কি বলেছে আমার মাকে? আমি হারিয়ে গেছি যদি বলে তাহলেও হয়…
আমার বাড়ি বেশি দূর তো না। ওরা বললেই খুঁজে পাবেই বাবা।
কিন্তু যদি কিছু না বলে……
তাহলে.?
আজ নবমী। বাবা মায়ের সাথে রাতে শহরের পূজা দেখতে যাবার কথা ছিলো। বাবা বলেছিলো আজ আমার পছন্দের খাবার খাওয়াবে। কিন্তু আমি ফিরছি না দেখেও বাবা মা কেনো আমার খোঁজ করছে না…??
আমি কতক্ষণ এভাবে এখানে পরে থাকবো..

কাল তো দশমী। কালতো বিসর্জনের পালা।

এভাবেই প্রায় রাতটা শেষ হয়ে ভোরের আলো কেবল ফুটেছে।মুনিয়া খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোনো রকমে মায়ের মন্ডপের সামনে এসে পরেছে। ভোরের এক দর্শনার্থীকে দেখে সে বলছে কাকু আজ দশমী। মাকে বিসর্জন দিতে হবে। আমি তো বাড়ি চললাম। মন্ডপের পেছনে বছর ১২ এক জীবন্ত দুর্গা বিসর্জনের জন্য তৈরি হয়ে আছে। সবাইকে ডেকে নাও।
দর্শনার্থী কাকু কিছু জানতে চাওয়ার আগেই মুনিয়া ভোরের আবছা আলোতে মিলিয়ে গেলো।
মুনিয়ার কথায় মন্ডপের পেছনে গিয়ে মানুষটি অবাক। এই মেয়েটাই তো আমাকে বললো এখানে আসতে……..
মানুষটি বাকরুদ্ধ, শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছে। ততক্ষণে এক দুই করে লোকজমা হতে শুরু করেছে। লোকটি ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না।কিছু সময়ের মধ্যেই পুলিশও এসে হাজির। একজন মহিলা রক্তমাংসে গড়া দুর্গার প্রানহীন শরীরটার কাছে বসে মাথা থাপড়ে মুনিয়া মুনিয়া বলে কাঁদছে। তারপাশেই বসে একজন সদ্য সন্তান হারানো বাবা নির্বাক দৃষ্টিতে প্রাণহীন প্রতিমার মুখটি দেখে চলেছে।

এক কনস্টেবল তার অফিসারকে বলছে স্যার বীভৎস ভাবে বাচ্চাটাকে অত্যাচার করেছে। পা টাকে ভেঙে দিয়েছে কেমন করে দেখেছেন? গলা টিপে শেষে মেরেছে মনে হচ্ছে।

সকালে মুনিয়ার সাক্ষাৎ পাওয়া মানুষটি মন্ডপে মায়ের মুর্তির সামনে দাড়িয়ে চিৎকার করে বলছে…
মা জানিস মাটির তৈরি দুর্গা কেনো ঐ পশু গুলোর হাত থেকে রক্ষা পায়?
কারন মাটির এই দুর্গার তো যোনি হয় না। হলে হয়তো এই চার দিনের আগমনে তুইও মুনিয়া হতিস।

159