কুলিক রোববার সেপ্টেম্বর ২২ ২০১৯ :

সমঝোতা


সোমা সরকার

অয়ন একটু খামখেয়ালি। অল্প বদমেজাজি। খামখেয়ালিপনার জন্য বন্ধু মহলে মাঝে মাঝে হাসির খোরাক হতে হয়। আবার বদমেজাজী হওয়ায় বাড়িতে বৌএর সাথে ঝামেলাও চরম হয়।

চাকরি নেই। গোদা বাংলায় বেকার। নিন্দুকদের চোখে বৌএর টাকায় দিন কাটায়।

শ্বশুরবাড়িতে মান নেই। বৌএর চোখে দাম নেই।
তাতে কি হলো…..
এতে অয়নের কিছু যায় বা আসে না।

বৌ চাকরি করে যা আয় করে অয়ন টিউশনি পড়িয়ে তার চেয়ে একটু না হয় কম আয় করে।কিন্তু টাকার জন্য বৌএর কাছে হাত তো পাততে হয় না। এটা প্রিয়াও ভালো করে জানে যে, অয়ন নিজের দায়িত্ব কর্তব্য নিজে পালন করতে জানে।

বছর দশেক হলো অয়ন প্রিয়ার বিয়ে। প্রেমের বিয়ে। যদিও বেকার বলে প্রিয়ার বাবা মার সেই বিয়েতে মত ছিলো না। তাই পালিয়ে বিয়ে করেছিলো তারা। তখন অয়নের টিউশনি ছিল তাদের আয়ের একমাত্র পথ। অল্প আয় থাকলেও ঘরে ছিলো অফুরন্ত সুখ।বাধ ভাঙ্গা ভালোবাসা। একে অপরকে আষ্টেপৃষ্টে থাকার চাহিদা। বছর খানেক বাদে প্রিয়ার চাকরি। আর্থিক নিশ্চয়তা ওদের অনেকটা শান্তি দিয়েছিলো কারন তখন প্রিয়া পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আনন্দ যেন বাধ মানে না।

যদিও সেই গল্প এখন অনেক পুরোন। সময়ের সাথে সব বদলায়। মানুষের প্রয়োজন, ভালোবাসা, বন্ধু, মন সব।

অয়ন ডাউটে আছে আদৌ সেই প্রেম ভালোবাসা এখন তাদের এই সম্পর্কে আছে তো?
তার প্রতি প্রিয়ার উদাসীন ভাব, সব সময় ইগনোর করার চেষ্টা একটা লম্বা দূরত্ব তৈরি করছে তাদের সম্পর্কে । সেটা অয়ন জানে। হয়তো প্রিয়াও গোপনে মানে।

এসব এখন পাত্তাই দেয় না অয়ন। বছর আটের একমাত্র সন্তান রিয়ান অয়নের জগত। ছেলের সব দায়িত্ব নিজের। টিউশন, স্কুল, খেলা সাথে গিটার সব কিছুর টাইম টেবিল বাপের নখদর্পণে। মায়ের সময় কম। চাকরি, নাচ, আবৃত্তি। সময়ে অসময়ে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে রাজধানী শহরে যাতায়াত লেগেই আছ।

মায়ের যে একদম সময় নেই সেটা বলাও ভুল। সকালে বাচ্চার টিফিন রেডি, ব্যাগ গোছানো প্রিয়ার কাজ, যদি সে বাড়ি থাকে। রাত ৮ টা থেকে ১০ টা ছেলে পড়ানো। ঐ সময় অয়নের টিউশনি।

প্রিয়ার রান্নার মাসি আর কাজের দাসী দুজনেই হেব্বি টাইমটেবিল নির্ভর। দশ মিনিট আগেও না দশ মিনিট পরেও না। টাইম তাদের কাছে টাইম। প্রিয়া দিদি ক্যাটক্যাট করলেও অয়ন দাদা তাদের কাছে খুব ভালো। মুখে হাসি তার যে লেগেই থাকে। তবে এই হাসির কারণে অয়নকে মাঝে মাঝে হেব্বি ঝাড় খেতে হয় প্রিয়ার কাছে।
অয়নের গাল ভরা হাসি প্রিয়ার চোখে ছ্যাবলামি। কাজের লোকেদের অত তোল্লাই দেবার কি আছে…..
একটা কাজ বেশি করতে বললে সটান বলে পারবো না..
তাদের অতো পাত্তার কি আছে??

তাছাড়াও অয়নের বন্ধু মহলটাও প্রিয়ার পছন্দ নয়। প্রিয়ার চোখে নাকি সবকটাই ছ্যাবলা। প্রিয়ার সব কথার জবাব অয়নের হাসি। এর বাইরে আর কিছু তার করারও নেই। কথায় কথা বাড়ে। বেশি বাড়লে আবার বদমেজাজি অয়ন কি যে বলে বসবে তা নিজেও জানে না অয়নের। তাই স্পিকটি নট….

এদিকে রিয়ানকে নিয়ে অয়ন মাঝে মাঝেই বিপদে পরে। স্কুল থেকে অভিযোগপত্র নিত্য আসতেই থাকে। অয়নের আবার উভয় চাপ। স্কুলে গিয়ে প্রিন্সিপালের কাছে মুখ নিচু করে বসে থেকে সব হজম করা, অন্যদিকে আবার বাড়ি ফিরে প্রিয়ার হাত থেকে রিয়ানকে বাঁচানো। অয়ন বাচ্চা পেটানোর পক্ষে নয়। বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাচ্চাকে সব শেখানোই তার লক্ষ্য। কিন্তু প্রিয়া ঠিক উল্টো। প্রিয়ার মতে ধোলাই একমাত্র পথ। তাই তার সব থেকে প্রচলিত ডায়লগ রিয়ান, অয়ন দুজনেরই মুখস্থ।

“রিয়ান,তোর পিঠের চালে কিন্তু ঢাক বাজাবো”

**********************

সময় বদলাচ্ছে। অয়নকে ঠেস দিয়ে প্রিয়ার কথাও বেড়েছে।অয়ন এতো দিনে নিজেকে লুজার ভাবতে শুরু করেছে। একটা হীনমন্যতা সব সময় ওর মধ্যে কাজ করে।বাড়িতে যত কিছুই হোক বাড়ির বাইরে প্রিয়ার সারথি সেই অয়ন।

লোকের চোখে অয়ন প্রিয়া বেস্ট কাপল। প্রিয়ার বুদ্ধিমত্তা আর অয়নের সরলতা সকলের মন কাড়ে। প্রিয়ার নাচের স্কুলের জন্য শহরে প্রায় তার নাম ডাক ভালোই আছে। সবাই মোটামুটি চেনে। আর অয়নকে চেনে প্রিয়ার ভালোবাসার মানুষ হিসেবে।

তবে ভেতরের খবর কজন রাখে…
আর রাখবেই বা কি করে…? মানুষ যে বাইরেটা দেখে সব বিচার করে।

বছর খানেক হলো অয়ন একটু নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। ওর দৃঢ় বিশ্বাস ওর ভালোবাসার মানুষটা এখন আর ওর নেই।কিছু যে অয়ন বোঝে না তেমন টা নয়। ফোন, ম্যাসেজ কিছু কিছু ওর হাতেও লেগেছে। তবে লুকিয়ে কারোর ম্যাসেজ পড়ে তাকে প্রশ্ন করা অয়নের রুচিতে বেধেছে। আর এটাই বা কি নিশ্চয়তা আছে যে প্রশ্ন করলে প্রিয়া সত্যি বলবে…
বরং হতেই পারে প্রিয়া উল্টে অয়নকে দোষারোপ করতে পারে। যেমনটা অনেক ক্ষেত্রেই নিজের দোষ লুকানোর জন্য মানুষ পাল্টা আক্রমণ করে। এতে বাড়ির পরিবেশ নষ্ট হবে। বাচ্চাটার ওপর প্রভাব পড়বে। কারণ এর আগেও এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে সে।
তাই সব ছেড়ে দিয়েছে সময়ের হাতে। প্রমাণ খোঁজার চেষ্টাও করে না আর সে। প্রমাণ পেলে মানতে কষ্ট হবে।অয়ন যে ছাড়তে পারবে না প্রিয়াকে। কোনো কিছু না থাক বাচ্চাটা তো বাপ মা দুজনকেই পাবে।
আর সমাজ কি বলবে…
সবাই তো সবটা বুঝবে না।

18