কুলিক রোববার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯ :

ও নদী রে

সুকুমার বাড়ই

পর্ব-২
তীর্থ নদী নিয়ে কাজ করে চলেছে ছোট বেলা থেকেই। ও পরিবেশ, নদী, জলকে ভীষণ ভালোবাসে। ও রাজ্য নদী বাঁচাও কমিটির আহবাহক।সব সময় কাজ আর কাজ। কিভাবে পরিবেশ সুস্থ থাকবে সেই নিয়েই ওর ভাবনা। মাধবের জন্মগত আর কেশবের মনগত একটা টান রয়েছে পুনর্ভবার উপর। দূর থেকে থেকে নদী পাড়ের এক বাড়ি থেকে ভেসে আসছে হেমন্তের কন্ঠে
“ ও নদীরে –
একটা কথা শুধাই তোমারে
বল কোথায় তোমার দেশ
তোমার নেই কি চলার শেষ?—”
কেশব তীর্থকে বলল, আচ্ছা পুনর্ভবা সম্পর্কে একটু বল না। নদী দেখি সবে জানিনা নদীর সৃষ্টি কোন খানে? খানিকক্ষণ চুপ থেকে তীর্থ বলতে লাগলো, পুনর্ভবা নদী উত্তরবঙ্গে প্রবাহিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। এটির বর্তমান উৎপত্তিস্থল হচ্ছে দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার শিবরামপুর ইউনিয়নের বিলাঞ্চল। পতিত হয়েছে মহানন্দা নদীতে। তবে এ নদীর প্রাচীন উৎস ব্রাহ্মণপুর বরেন্দ্রভূমি। ১৭৮৭ খ্রীষ্টাব্দে হিমালয়ের বন্যায় প্রচণ্ড ভূমিধ্বসে সানুর নিকট এ নদীর পার্বত্য উৎসমুখ বন্ধ হয়ে যায়। এদেশের উত্তর দিনাজপুর , মালদা দিয়ে প্রবাহিত এই নদী। অবিভক্ত বাংলার মৃত ঘাঘরা, গাবুরা, কাঁচাই প্রভৃতি নদী এক সময় পুনর্ভবারই উপনদী ছিল। নদীর গতিপথ উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত। বালুরঘাটের কাছে আত্রাই থেকে কয়েক কিলোমিটার পশ্চিমে পুনর্ভবার উচ্চতর গতিপথ। দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হওয়ার পর পুনর্ভবা ঢেপা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে, যা করতোয়া নদীর একটি শাখা নদী। দিনাজপুর শহরের ঠিক দক্ষিণে নদীটি পশ্চিম এবং পশ্চিম-কেন্দ্রীয় বরেন্দ্রভূমির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এর নদীবিস্তৃত ভূমির প্রশস্ততা ৩ থেকে ৮ কিলোমিটার। পুনর্ভবা নদীটি জোয়ার-ভাটা প্রভাবিত নয়। এই নদীর তিনটি উপনদী রয়েছে, সেগুলো হলো টাঙ্গন নদী , কুলিক নদী এবং নাগর নদী। কেশব বলল, বাহ, তীর্থ তোমার কাছ থেকে পুনর্ভবা সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলাম। এবারের নদী চারণ সার্থক। মাধব বলল, নদীর উৎস, নদীর গুরুত্ব সবই নৌকো বিহারের মাধ্যমে জানা হয়ে গেল। কেশব মাধবকে এ সফর লেখার কথা মনে করিয়ে দিল।
ওদিকে তীর্থ আবার উশখুশ করছে। ওদের কথায় যেন তৃপ্তি পাচ্ছে না সে । ও বলল , এ তো গেল নদীর আকাশ জোড়া প্রভাবের গল্প। পরের গল্প হোক অল্প। কেশব বলল, হোক হোক। মাধব বলতে লাগলো, মানব জীবনে নদীর এত প্রভাব থাকলে কি হবে ? তারপরও পরিবেশ বিপর্যয় থেকে শুরু করে আর্থ- রাজনৈতিক নানা কারণে বাংলা তথা উত্তরবঙ্গের নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ আজ সংকটের সম্মুখীন। তীর্থ আক্ষেপ করে জানতে চাইল, কেন এরূপ হচ্ছে? মানুষ কবে ভাববে? কেশব জবাবে বলে উঠল, মানুষের বোকামোর জন্যই আজ নদী –পরিবেশ সব আমাদের কেমন যেন হাতছাড়া হয়ে উঠছে। প্রকৃতি যেন শোধ তুলছে। অবাধ নদী শাসন শুরু হয়েছে। ফলে বাংলার সংস্কৃতি ও সমাজ জীবন প্রচণ্ড ক্ষতির সম্মুখীন।

নদীতে মাছ ধরছিল একদল জেলে । ওদের কাছে পৌঁছে গেল তীর্থরা। মন্টু মাঝি ওদের দেখে বলল, “কি দেখতে আইছেন গো বাবুরা? আমাগো দেহনোর কি আছে?” কেশব বলল, “নানা তেমন কিছু নয়। জালে মাছ উঠেছে?” জেলেরা সকলে মিলে বলেতে লাগলো, “হা বাবুরা দেহে যান কত মাছ? বড় মাছের মইধ্যে মদের বতল মাছ, পেলাস্টিকের বতল মাছ, আর আছে চুনা মাছের মইধ্যে পেলাস্টিকের ছোট বড় ব্যাগ মাছ।” তারা বলতে লাগলো, “নদী আমগো মা। তার উপর যা অত্যাচার চলতাছে তা কওন যায় না। কারু কোন নজর নাই। না মানুষের না সরকারের। নদী ভালো নাই গো বাবুরা নদী ভালো নাই।” কিছুটা এগিয়ে দেখা গেল নদীর পাড় ভর্তি বস্তা কা বস্তা নোংরা। নদী আজ ডাস্টবিন। জলে ভেসে চলেছে জীবজন্তুর লাশ,

আবর্জনা ইত্যাদি। পাড় কেটে অপরিকল্পিতভাবে চলছে চাষ। এসব দেখে আর ওদের ভালো লাগছে না।
মাধব মাঝিকে নৌকো ঘোরাতে বলল। এবার সামনের দিকে আর না। তারা ফিরে চলল পেছন দিকে। জেলেদের কথা তীর্থের মাথায় বন বন করে ঘুরতে লাগলো। ও বলল, দেখেছ মাধব-কেশব অবস্থা দেখেছ? আমরা শিক্ষিতেরা আজ ওদের কথার কাছে কেমন জব্দ। কেশব বলে উঠল, আরে আমিতো পাল আমলের কৈবর্ত বিদ্রোহের আগুন দেখলাম ওদের চোখে মুখে। ওরা যে তাদেরই বংশধর। তখনও ওরা পাল প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শাণিত করেছিল। আজও যেন সেই সুর ভাসল পুনর্ভবার জলে। এই সুর সব জলে ভেসে যাক । মিলেমিশে যাক। জলেরা এক হোক। গর্জে উঠুক। ধ্বনিত হোক উচ্চসুর- জল বাঁচাও— প্রাণ বাঁচাও। নদী ভালো নেই – আমরাও ভালো নেই। মাধব এক নিঃশ্বাসে বলে থেমে গেল। তীর্থ এসব দেখে কিছু না বলে চোখ বন্ধ করে আছে। আর ভাবতে থাকে কি করবে? মন ছুটে গেল ওর স্কুলে। শুরু করে দিল নাটকের রেহার্সিল। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পথ নাটকের মাধ্যমে নদী বাঁচাও এর বার্তা দিতে লাগলো। বলতে লাগলো নদী ভালো নেই- আমরাও ভালো নেই। এভাবে একদিন ডি এম অফিসের সামনে ছেলে মেয়েরা পথ নাটক করছে । ডি এম তা দেখে মুগ্ধ। তীর্থকে তিনি ডেকে পাঠালেন। বললেন, নদী বাঁচানোর পরিকল্পনা জমা দিন। আপনাদের সহযোগিতায় নদী সংস্কারের কাজ করতে চাই।
“নামেন বাবুরা। ঘাটে আইস্যা গেছি।” অনুকূল মাঝির কথায় সম্বিত ফিরে পায় তীর্থ। ওরা তিন জনই কেমন যেন চিন্তাক্রান্ত। এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে। না বলা কথা বলে দিল অনেক কথা। ওদের একই ভাবনা নদী কিভাবে বাঁচবে। বাঁচবে হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত বাঙালি সংস্কৃতি। অনুকূলের নৌকো ঘাটে এলেও মানুষের চেতনা নৌকো কি কোন দিন কূলে এসে ঘাট খুঁজে পাবে? —

ব্যক্তিঋণঃ সুদর্শন ব্রহ্মচারী, তুহিন শুভ্র মন্ডল,অনুকূল সরকার, সুভ্রা বাড়ই, ঈশিকা বাড়ই, সময়িতা বাড়ই।

115