জুলাই ৩০, ২০১৯ :
গার্ল-ফ্রেন্ড

অঞ্জন রক্ষিত

অনেক বন্ধুবান্ধবী থাকলেও মৃণাল যেন একটা শূন্যতায় ভোগে। যখন সব বন্ধুরা নিজেদের গার্লফ্রেন্ডদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে ওদের মাঝে নিজেকে কেমন যেন অবাঞ্ছিতও মনে হয়।ওরা যদিও কিছু বলে না তবুও মৃণাল বোঝে।মনে মনে চায় এমন যদি কেউ থাকতো।কাউকে খুঁজতে গিয়েও মাথায় যেন কাঁটার মতো বিঁধে থাকে
-কি ?তুই?
সেই ছোটবেলা থেকেই শব্দদুটো মৃণালকে ঘুণপোকার মতো কেটে চলেছে।প্রথম যখন ছোটবেলার বন্ধু সৌরভের কাছে টুকলি করা শিখতে চাইল তখন “আরে তুই? তোর দ্বারা হবে না।’’প্রথমবারেই বিকাশ স্যারের কাছে ধরা খেয়েই আবার শুনল “তুই?।বখাটে ছেলেদের সাথে না পেরে উঠে তিনি গোটা ঘরের ঝাল মেটালেন সাদাসিধে মৃণালকে এক্সপেল করে।আবার যখন কোন কঠিন অঙ্ক টিউশনে সে করে দেখাতো তখনও “তুই?”স্যারের মুখে যেন একটা কষ্টের,হেরে যাওয়ার ছাপ মৃণালের কাছে।মৃণাল এভাবেই সকলের কাছেই যেন এক বিস্ময়ের বস্তু-অন্যরকম কিছু। মৃণালেরও মনে হয় যদি ওর একটা গার্লফ্রেন্ড থাকতো!!! কিন্তু কিকরে আবার তো সবাই বলবে
-তুই?
তাই একটা সময় এসব ভাবা ছেড়েও দেয় কিন্ত আল দিয়ে জল চুঁইয়ে আসার মতই ভাবনাগুলো কোত্থেকে যেন চলে আসে।কিছুদিন ধরে মৃনাল আর বাইরে বের হয়নি।একটু উদাসীন, টিভি চালায় কিন্তু তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে।মা ডাকে
-কি রে?
-গার্লফ্রেন্ড।
-গার্লফ্রেন্ড?কিসের?কার?কি বলিস!
-ও না কিছু না।
মৃণাল নিজেকে সামলে নেয়।বুঝতে পারে ভুল হয়ে গেছে।মাও আর তেমন পাত্তা দেয় না।কিন্তু মৃণাল মনে মনে একটা কষ্ট পেল মা কেন বিষয়টা নিয়ে আর কিছু শুনতে চাইল না। তারচেয়ে বেশি রাগ হল নিজের ওপর, কেন যে একনাগাড়ে গড়গড়িয়ে সব বলে দিলো না। ভাবনাগুলো কেমন অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরেছে।রাতে ঘুম নেই, মনকে শুধু শান দেয় প্রতিদিন একটু একটু করে-এবার বলেই ফেলব মাকে। যদি ফালাফালা হয়ে কেটে যায় তো কাটবে, যদি বিস্ফোরন হয় তো হবে।শান্ত, ধীর,স্থির মৃণাল একদিন শেষমেশ মাকে ডেকে বলল
-জান,সব বন্ধুদের গার্লফ্রেন্ড আছে।
-হু তো তোর কি?
-আমার একজনকে পছন্দ।
-তুই!!!!!
আবার?এবার মা ও!সারা পৃথিবী না হয়…কিন্তু মা তুমিও!গরম তেলে ফোড়নের মতো মনটা চিড়বিড় করে উঠলো। একটা জেদ চেপে বসল-মাকে দেখিয়েই ছাড়ব।যেমন ভাবা তেমনই কাজ। এই “তুই” শব্দটাকে জীবন থেকেই ডিলিট করে দিতে ইচ্ছে করছে । কঠিন একটা প্রতিজ্ঞা, যদি ফের কেউ ঐ শব্দটা উচ্চারণ করে তাহলে শুনিয়ে দেবে দু-চার কথা
-হ্যাঁ,সবাই দেখ,আমি মৃণালকান্তি রায়,আমি একজন খুব সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ।
মনটাকে সে একরকম প্রস্তুত করেই ফেলেছে যে পারমিতাকে এবার প্রপোজটা করেই ফেলবে-একদম পুরপুরি নির্ভয়ে।মাকে দেখিয়ে দিতেই হবে।শুধু মা কেন বাকিরা কি আর কম কিছু যায়!একদিন টিউশন শেষে মৃণাল পারমিতাকে বিকেলে দেখা করতে বলল স্টেশনে। মৃণাল যথারীতি হাজির ছিল আগে থেকেই।পারমিতা এসে বলল
-বল,কি বলবি।
-আমার গার্লফ্রেন্ড হবি?
-মৃনাল!!!তুই?
-হ্যাঁ আমি।
-তুই?
-তোকে হতেই হবে।
-তুই কি পাগল হলি?
-কেন পাগল কেন ঠিকই বলেছি।আমি তোকে তো পছন্দ করি।
-ঐ দাঁড়া দাঁড়া ।আমাকে একটু ভাবতে দে।আমি পরে জানাবো।
বলেই যেন ভুত দেখার মতো পালিয়ে গেল পারমিতা। মৃণাল ধরেই নিল আর কোন আশাই নেই।কিন্তু না, শেষ হল না।জবাব পেলো মৃণাল এক সপ্তাহ পরে। মৃণালকে ডেকে বলল
-আমি রাজি কিন্তু আমার কিছু বলার আছে।
-কি বলবি বল।
-আমার সব কথা শুনে চলতে হবে।
-আমি সব কথায় রাজি।
-আরেকটা বিষয়—-কোনো উপচে পরা প্রেম-টেম নয় শুধু কিন্তু গার্লফ্রেন্ড,বউ টউ ভাবা চলবে না।আর আমিও শুধু বয়ফ্রেন্ডের মতই ট্রিট করবো।
মৃণাল হাবাগোবা একটা ছেলে ওর মাথায় কি আর অত্তকিছু ঢোকে। প্রেম-বর-বউ-বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড কি যে সব গরগর করে বলে গেল। ও শুধু বলল
-ঠিক আছে তুই রাজি হলেই হল। অতকিছু ভাবার দরকার নেই।
মৃণালের মা পারমিতাকে আগে থেকেই চিনতো,পাশের পাড়াতেই বাড়ি।মাকে এসে বলল
-মা জানো হয়ে গেছে।
-কি?
-গার্লফ্রেন্ড।
-কে?
-পারমিতা।
প্রথমে বিশ্বাস হয়নি কিন্তু ছেলের পছন্দে অভিভূত হল।দুজনেরই মেজাজ বেশ ফুরফুরে।পারমিতা মৃণালকে ভাবতো শুধু বয়ফ্রেন্ড,আর মৃণাল ভাবতো একগুচ্ছ স্বপ্ন।পারমিতা যেন দীর্ঘজীবনের সব ব্যর্থতার জবাব।সাপলুডো খেলায় মৃণাল বেশ কয়েক ধাপ ওপরে উঠে এলো। একটু খটকা ছিল ওসব প্রেম-বর-বউ-বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড নিয়ে;কিন্তু সেসব ভেবে ভেবে মৃণাল আর মনখারাপ করতে চায় না।
মৃণালের দিনগুলো বেশ ভালই কাটছিল।পারমিতার সঙ্গে ঘুরে,আডডা মেরে, রেস্তোরায় গিয়ে,গল্পগুজব করে।শুধু পারমিতার মধ্যে কি যেন একটা কম কম অনুভব করে।পারমিতা মাঝে মাঝে এমন করে যেন মৃণাল ওর ওপর চেপে বসেছে। দুঃখগুলো কখনো কখনো বেরিয়ে আসতে চায়,কিন্তু মৃণাল ওদের প্রশ্রয় দিতে চায় না। মৃণাল ফ্রেন্ডশীপ ডে তে সুন্দর শাঁখের কাজ করা একটা ব্যাগ উপহার দিল।পারমিতা বেশ খুশিই হল
-ও মা! কি সুন্দর।এত্ত সুন্দর গিফ্ট আমাকে আজ অবধি কেউ দেয়নি।থ্যাঙ্ক উ সো মাচ মৃণাল।
বলেই মৃণালকে জড়িয়ে ধরলো। পারমিতার উচ্ছাস মৃণালের ক্ষতে যেন খানিকটা প্রলেপ। মৃণালের এই সামান্য উপহার যে পারমিতা এমন সাদরে গ্রহণ করবে সে তা ভাবেইনি।অনেকদিন আর কোন পুরনো ভুতও মৃণালকে তাড়া করেনি।
সেকেন্ড ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হয়েছে সবে। টিউশনগুলো এখনো সেভাবে শুরু হয়নি।পারমিতার সঙ্গেও দেখা হয়নি বেশ কদিন হল। মনটা খুব ছটফট করছে,পারমিতা সময় করেই উঠতে পারছে না।কিন্তু বেশিকিছু বলে চাপ দিয়ে আবার পারমিতাকে চটাতেও চাইছে না। অনেকদিন পর কেমন যেন মনে হচ্ছে স্টেশনে গিয়ে একটু হাওয়া খেতে।স্টেশনে গিয়ে লক্ষ্য করলো একটি মেয়ে,পারমিতার মতই।কাছে গেল। হ্যাঁ ঠিক তাই,এ যে পারমিতাই।কিন্তু সঙ্গে ছেলেটি,সে কে? আগে তো দেখিনি। পারমিতা মৃণালকে দেখেনি,দুজনেই মোবাইলে কি যেন দেখছিল। কিন্তু এটা কি ছেলেটার কোলে-শাঁখের কাজ করা, হ্যাঁ ঠিক, আমার দেওয়া—-!শুধু অবাকই হল না,পায়ের তলা থেকে যেন সমস্ত মাটিটাই সরে গেল মৃণালের। স্টেশনের সমস্ত যাত্রী,পথচারি,পারমিতা, ছেলেটা সবাই মিলে যেন ব্যঙ্গাচ্ছলে বলছে
তুই???
ভেতরের মৃণালটা বেরিয়ে ছুটে চলে যেতে চাইছে।কে এত কাছাকাছি?আর কিছু ভাবা যাচ্ছে না। উঃ অসহ্য। বাড়ি চলে এল তাড়াতাড়ি। বন্ধুদের ফোন করে জানতে চাইল পারমিতার খবর।সঞ্জয় বলল,
-………………ও আচ্চা ও? ও তো পারমিতার লাভার।
বন্ধুত্ব,প্রেম,ভালবাসা সবটা মিলিয়ে কেমন যেন মৃণালের গুলিয়ে আসছে।এ কেমন অনুভুতির বহিঃপ্রকাশের ধরন! হয়ত উচ্চমানের চুলকাটা আর দাড়ি কামাতে দুজন বিশেষজ্ঞ নাপিতের দরকার হবে অদূর দিনে।
এত যত্নের ,এত ভালবাসার উপহারটা ছেলেটার কোলে!!!!এটা একদম ঠিক করলি না পারমিতা।মনে হচ্ছে এক থাপ্পড় মেরে নিয়ে আসি ব্যাগটা।
মৃণাল কেমন যেন উসখুস করে চলেছে।মা কয়েকবার জিজ্ঞাসাও করেছে ব্যাপারটা কি, সে এককথায় উত্তর সেরেছে
-কিছু না।
পরেরদিন আবার মৃণাল স্টেশনে গেল একই সময়,কিন্তু প্লাটফর্মে কোথাও পারমিতা নেই।ভেতরটা কেমন যেন অস্থির লাগছে,প্রতিদিনই পারমিতাকে যেন আরও বেশি করে মনে পড়ছে। সারাক্ষণ শুধু দেখা করতে মন চাইছে খুব। কিন্তু ফোন করলেই বলছে নট রিচেবল।সব সামনাসামনি জিজ্ঞাসা করে পরিষ্কার হতে চাইছে।দুদিন এমন ছটফটানির পর বাজারের এক গলিতে দেখতে পেলো পারমিতাকে,একটি রেস্তরাঁর সামনে। মৃণালের মাথাটা প্রচণ্ড গরম হয়ে গেল,সঙ্গে সেই ছেলেটিকে দেখে। মৃণাল পারমিতার কাছে গিয়েই কিছু না বলে কাঁধে ঝোলানো সেই ভ্যানিটি ব্যাগটি ছোঁ মেরে নিয়ে নিল।আর তক্ষুনি পাশ থেকে ছেলেটি ‘চোর,চোর’ বলে চিৎকার করতে লাগলো ।পারমিতা ওকে থামিয়ে কিছু বলতে চাইল কিন্তু কে শোনে কার কথা,ইতিমধ্যেই বাজারের লোকজন জড়ো হয়ে গেলো,বেদম পেটাল মৃণালকে ।কিছু পরিচিতরা দেখে বলল
-কি রে তুই??
মৃণালের মুখ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত পরছে। মুখটা মাটিতে গোঁজা।নিঃশ্বাসের সঙ্গে উড়ে যাচ্ছে ধুলো। কিন্তু শব্দটা এখনও তাতাচ্ছে মৃণালকে। বারবারই বলতে চাইছে ও ছিনতাই করেনি কিন্তু কেউ শোনেইনি।পারমিতা বলতে চাইছিল কিন্তু ওকে ওখান থেকে টানতে টানতে নিয়ে গেল ছেলেটি। আবার‘তুই’কথাটি কানে এলো,এবার শুনে ক্ষেপে গেল মৃণাল। সমস্ত শক্তি নিয়ে যেন মাটি থেকে উঠে লোকটিকে বসাতে চাইলো এক ঘা।কিন্তু থেমে গেলো… এ তো বিকাশ স্যার। জীবনের অনেককিছুর নিয়ন্ত্রক বাজার, বাজারের লোকগুলো থামলো না।এবার মৃণালকে মেরে সোজা পাঠালো হাসপাতালে।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও মৃণাল আর কাউকে এখন চিনতে পারে না।বাড়িতে থাকলে জিনিসপত্র ভাঙচুরও করে,মা সামলাতে পারে না।কিছুদিন শেকলে বাঁধা ছিল তারপর ছেড়ে দিয়েছে, চোখের সামনে মা এভাবে মৃণালকে দেখতে চায়নি। মৃণাল এখন রাস্তাঘাটে মহিলাদের ভ্যানিটি ব্যাগ দেখলেই ছোঁ মেরে কেড়ে নিতে চায়।তারপর গণপ্রহার চলে। ওর মা কখনো যায় খবর পেলে,বাড়িতে নিয়ে আসে,সাধ্যমত শুশ্রূষা করে। ঠিক হলে মৃণাল আবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, ভ্যানিটি দেখলে কেড়ে নিতে চায় নাহয় থুথু ছেটায়। যদি কোন মহিলা দয়াবশত দু-চার টাকার কয়েন ব্যাগ থেকে বের করে দিতে চায় তো নেয় না,উল্টে ছুঁড়ে মারে তারই মুখের ওপর। কোন মহিলা রাস্তায় মৃণালকে দেখলেই আৎকে ওঠে বলে
-আবার তুই?

20