কুলিক রোববার, জুলাই ১৪, ২০১৯ :

কাকবলি

সোমা সরকার

ভোরে ঘরের দরজা খুলে সুজাতা বারান্দায় দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে উঠোনের তুলসি গাছ তলার দিকে তাকিয়ে আছে।
সবে ভোরের আলো ফুটেছে। আজ চারদিকটা একটু অন্যরকম। একটু গুমোট ভাব। দমবন্ধ করা পরিবেশ।প্রচন্ড গরম।ঘরে বাকিরা ঘুমিয়ে আছে। টেবিল ফ্যানের ক্যারক্যার করা কান ফাটানো আওয়াজ খুব বিরক্তি তৈরি করছে।

বাড়ির কেউ কাল থেকে ভালো নেই। কাল সুজাতার একমাত্র আদুরে ভাই স্বেচ্ছায় সব সম্পর্ক ছিন্ন করে না ফেরার দেশে চলে গেছে। যেখানে ফোন নেই,চিঠি নেই,কথা নেই।দেখা করার উপায় নেই। যা আছে তা শুধু স্মৃতি।

দিনের আলো এখন অনেকটা পরিষ্কার। বাড়ির সকলে একএক করে ঘুম থেকে উঠছে। আসলে ঘুম বললে ঠিক হবে না। জেগে ঘুম।

মনের ভেতরে চাপা অভিমান। প্রচন্ড ক্ষোভ। সুজাতার প্রচন্ড রাগ ওর ঐ আপন মানুষটির ওপর। ওর একটাই প্রশ্ন , এই পৃথিবীতে তুই যখন নিজের ইচ্ছায় আসিস নি তখন নিজের ইচ্ছায় যাওয়ার অধিকার কোথা থেকে পেলি?

ডিজিটাল ভালোবাসার যুগে ভালোবেসে তোরা কিছুদিন খুব ভালো থাকিস। তারপর একটু ছন্দপতন ঘটলেই বছর খানেকের সম্পর্কের জন্য কুড়ি, বাইশ বছরের সম্পর্ক হেলায় ফেলে চলে যাস। তোরা মানুষ……….??
তোরা খুব স্বার্থপর……….।
নিজের ছাড়া কিছু বুঝিস না।

এতো ভাবনার মাঝে কখন যে ঘড়ির কাঁটা ধীর গতিতে কিন্তু সময়ের অনেক আগে সময়ের চাকা টেনে চলেছে বুঝতে পারেনি সুজাতা।

ঐ দিকে বাড়ির চারিদিকে কাকের কা কা রব। জমাদার কাকিমা আপন মনে বলছে, আসলে বেলা তো অনেক হলো খিদা লেগেছে। তাই কা কা করছে। যা মা খাবারটা দিয়ে আয়।

*************

স্নান করে মৃত মানুষের নামে শ্রাদ্ধের আগে রোজ নিয়ম করে চাল কলা কাককে খাওয়াতে হয়।এটাই নাকি হিন্দু সমাজে প্রচলিত নিয়ম।আর সেই নিয়ম পালনের দায়িত্ব পরেছে সুজাতার ওপর। ওর ভাই যে ওর ছেলের তুল্য ছিলো।

রাত দেড়টায় যখন সুজাতার ফোনে ফোন এসেছিল রিক আর নেই, তারাতাড়ি হাসপাতালে আয়। তখন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিলো।
সুজাতার মনে তখন একটাই কথা, আবার……

রাগের মাথায় আপন মনে বলেছিলো মরবি যখন তখন বাড়িতে কেনো…?
রাস্তায় মরতিস…
কষ্ট কম হতো…….
মনে হতো দুর্ঘটনায় মরেছিস।

এখন বাড়িটাই মনে করাবে আমাদের স্মৃতি ঘেরা জায়গা আজ তোর মৃত্যুর কারণ হবার একটা কারণ…….

*******************************

সব মাথায় নিয়েই সকালে স্নান করে চাল কলা মাখিয়ে বাড়ির ছাদে অধির আগ্রহে কাকের অপেক্ষায় সুজাতা।.

মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধের আগে নাকি আপনজনটা কাক হয়ে এসে খাবার খেয়ে যায়।
অন্য সময় সুজাতা এগুলো কখনই মানতো না। কিন্তু আজ ওর খুব মানতে ইচ্ছে করছে।খুব ইচ্ছে করছে কাক রূপে নয় বরং মানুষ রূপেই ভাইটা আসুক। আর সামনে বসে সুজাতার হাতে খাবারটা খেয়ে যাক।
তাই আজ মন দিয়ে ডাকছে সুজাতা ওর আদুরে হারিয়ে যাওয়া ভাইকে…..
আয় আয় খেয়ে যা।
কাকবলি নিয়ে যা।

18