মাজুলী আসামের আধ্যাত্মিক রাজধানী

সুকুমার বাড়ই

নিশ্চই ভাবছেন আজ কোন নতুন দেশে বেড়াতে নিয়ে যাবো আপনাদের? না না নতুন দেশে নয় স্বদেশের একটি পৃথিবী বিখ্যাত জায়গায় আপনাদের নিয়ে যাব। আসলে আজ আমি নিজের বেড়ানোর গল্প শোনাবো–যে জায়গাটা নিয়ে গল্প শোনাবো তার নাম ‘মাজুলি’| আসামের মাজুলি ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপর অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম নদী দ্বীপ। এর কাছাকাছি শহরটি হলো জোরহাট। আমার বেড়ানোর গল্প যদি ভালো লাগে তবে নিজেই

বেড়িয়ে আসবেন সপরিবারে। ঘোরার বিবরণ দেওয়ার আগে
আসামের আধ্যাত্মিক রাজধানী মাজুলি সম্পর্কে কিছুটা জানলে পাঠকদের বোধকরি সুবিধে হবে ।

ইতিমধ্যেই অসমের মাজুলিকে বিশ্বের বৃহত্তম নদী দ্বীপের তকমা দিয়েছে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস। জানা যায় এখানে বসবাসকারী মানুষের অধিকাংশ অরুণাচল প্রদেশ থেকে আগত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর। তাঁদের জীবনও নদীকেন্দ্রিক।

আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা অবলুপ্তির পথে। ফলে অসমিয়া ও দেউরি ভাষাতে কথা বলেন মাজ়ুলির বাসিন্দারা। বর্তমানে মাজুলিতে রয়েছে ১৪৪টি গ্রাম। জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার। প্রসঙ্গত, এই কেন্দ্র থেকেই বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই করেছিলেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোওয়াল।

এই দ্বীপে প্রায় একশ ধরনের চাল উৎপাদিত হয়। মানুষের প্রধান জীবিকা চাষ আবাদ। এর আগে UNESCO-র পক্ষ থেকে মাজুলিকে হেরিটেজের তকমা দেওয়া হয়েছিল। তারপর মাজ়ুলির মুকুটে জুড়ল বৃহত্তম নদী দ্বীপের পালক। আগে ব্রাজ়িলের মারাজ়ো ছিল পৃথিবীর বৃহত্তম নদী দ্বীপ।

আসাম সরকার মাজুলি দ্বীপকে একটি আইল্যান্ড জেলা হিসাবে ঘোষণা করেছে ২০১৬ তে । ব্রহ্মপুত্র নদীতে বিস্তৃত এই মাজুলি দ্বীপ ভারতের প্রথম আইল্যান্ড জেলা । মাজুলি আসামের ৩৪ তম জেলা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে । এর আগে জোরহাট জেলা মহকুমা হিসাবেই ছিল মাজুলি ।

অনেকদিন আগে এক বিধ্বংসী বন্যা ও জলোচ্ছাসে ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ পরিবর্তন হয় এবং নদী দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়। দক্ষিণ ব্রহ্মপুত্র বা বুড়ালুই, উত্তরে সুবনসিরি বা খেঁরকুটিয়া। জুতি (ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী) দ্বীপটিকে ঘিরে রাখে। এই খেঁরকুটিয়া নদীটি উত্তর দিকে এসে সুবনসিরি নদীতে মিশেছে। তাই সুবনসিরি নদী উত্তর দিক থেকে এবং ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ পাড় মাজুলি দ্বীপকে মূল ভূখণ্ড থেকে পৃথক করে রেখেছে। উত্তরে লখিমপুর, দক্ষিণ-পশ্চিমে গোলাঘাট, দক্ষিণ-পূর্বে শিবসাগর ও দক্ষিণে জোরহাট কুড়ি কিলোমিটার দূরে।
ক্রমাগত ভূমিক্ষয় ও ভূকম্পের ফলে এই বৃহত্তম নদী-সৃষ্ট দ্বীপ মাত্র ৪২১.৬৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনে এসে পৌঁছেছে।

অতীতের ২৪৩টি গ্রামের মধ্যে এখন মাত্র ১৪৪টি গ্রাম নিয়ে মাজুলি বিরাজমান। ষোলোশো শতাব্দীর সাংস্কৃতিক রাজধানী ছিল এই মাজুলি। প্রতি দিন ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ পরিবর্তনে এক-একটি গ্রাম ক্রমক্ষীয়মান। মিশিং, দেওরি, সনোওয়াল, কোশারি উপজাতিদের বাস এই দ্বীপভূমিতে। চৈতন্যদেবের জন্মের ৩২ বছর আগে শঙ্করদেবের আবির্ভাব ঘটে। শঙ্করদেব ও মাধবদেবের মণিকাঞ্চন যোগাযোগও ঘটে এই দ্বীপে। অসমিয়া সংস্কৃতির ও বৈষ্ণব ধর্মের মূল কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠে এই মাজুলি। তৈরি হয় মঠ ও ধর্মীয় আখড়া, অসমিয়া ভাষায় ‘সত্র’। ৬৫টি সত্রের মধ্যে ভাঙনে মাত্র ২৩টি টিকে আছে। উল্লেখযোগ্য সত্রগুলি হল গড়মুর সত্র,কমলাবাড়ি সত্র,আউনিটি সত্র,সামাগুড়ি সত্র,দক্ষিণপাট সত্র। নানান জীববৈচিত্র গাছ-গাছালি, পাখ-পাখালি ভরা সুন্দরী মাজুলিকে ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা দিয়েছে। অথচ ভয়ঙ্কর ভূমিক্ষয় ও ঘন ঘন বন্যা-সহ প্রাকৃতিক কারণে আজ ধ্বংসের পথে মাজুলি দ্বীপ।

মধ্যযুগে নব্য বৈষ্ণব ধর্মের প্রচারক-সংস্কারক শঙ্করদেব জাতপাত ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানবতার যে প্রসার ঘটান তারই সংগঠিত রূপ মাজুলি-র সত্র। ষোড়শ শতকে সেখানে প্রথম সত্র প্রতিষ্ঠা করেন শঙ্করদেব। ১৭ শতক থেকে অহোম রাজারাও বৈষ্ণব ধর্মের পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠলেন। তাঁদের দান-করা জমিতেই তৈরি হল প্রধান সত্রগুলি। দ্বীপের প্রান্তিক মানুষদের বড় অংশ বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নিলেন। ‘পুরো উনিশ শতক জুড়েই নব্য বৈষ্ণবধর্ম-অনুপ্রাণিত এক সংস্কৃতি মাজুলিকে মাতিয়ে রেখেছে… এই দ্বীপে সত্রের প্রাচুর্য এবং অসমের সামাজিক জীবনে এদের প্রভাব লক্ষ্য করেই মাজুলিকে বলা হয় অসমের আধ্যাত্মিক রাজধানী।

এবার ফিরে এলাম মাজুলি ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কাহিনী নিয়ে।

মাজুলির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু:

এবারের যাত্রা সঙ্গী ঔপন্যাসিক,গল্পকার, প্রকৃতিপ্রেমী সুদর্শন ব্রহ্মচারী। অনেকবার টিকিট বিভ্রাটের ঝক্কিঝামেলা সামলে এন জে পি আসি ২২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সকালবেলা। কোলকাতা -ডিব্রুগড় ট্রেনে রওনা। সীমাহীন বিলম্বে অবশেষে গৌহাটি এলাম রাতে। স্টেশনের পাশে নেপালী মন্দির সংলগ্ন বাঙালি আশা হোটেলে সিদলসহ পঞ্চব্যাঞ্জনে আহার সেরে আবার ট্রেন। গৌহাটি – জোরহাট ইন্টারসিটিতে পরদিন ২৩ নভেম্বর শুক্রবার সকাল ৮ নাগাদ জোরহাট টাউনে পৌঁছাই। ওখান থেকে নিমাতিঘাট। এই ফেরি ঘাটটি শহর থেকে বেশ দূরে, তাই শেয়ার ট্যাক্সি নিই। অসাধারণ ছিল আমাদের ফেরি যাত্রা| বিরাট লঞ্চ। এসময় মাজুলিতে চলছে রাস উৎসব। তাই লঞ্চে ভীষণ ভীড়। চার চাকা,দুই চাকার গাড়ি উঠল অনেকগুলো। ভেতরে দোকান আছে। খেয়ে নিলাম কিছু। পাশে স্থানীয় মানুষ ছিলো। তাদের সাথে কথা বলে মাজুলি সম্পর্কে অনেক অজানা কথা জানতে পারলাম। আকর্ষণ আরও বাড়তে থাকে। ব্রহ্মপুত্র নদীতে ভাসতে ভাসতে চলতে লাগলাম। বাড়ির কথা মনে পড়ছিল। লঞ্চের বেশির ভাগ মানুষ বৈষ্ণব ধর্মের। ৫০ মিনিট নদী বক্ষে বিহারের পর আসি মাজুলির অফলামুখ। ওখান থেকে গাড়ি করে দক্ষিণ পাট সত্র। পাশেই “আশ্রয়”অতিথিশালায় থাকার ব্যবস্থা। স্নান খাওয়া সেরে বেড়িয়ে পরি।

দ্রষ্টব্য স্থান:

১। দক্ষিণ পাট সত্র
প্রথমে দক্ষিণ পাট সত্রর রাস উৎসব দেখি। উৎসবে আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে ভক্তগণ এসেছেন। তাঁরা বলেন,রাস অশুভ শক্তিকে দূর করে সমাজকে এক সুতোয় বাঁধে। আন্তরিক ভাবে পূজা দিচ্ছেন স্থানীয় মানুষেরা।

২।সামাগুড়ি সত্র/মাস্ক মেকারের হাউজ:

এবার গন্তব্য মাজুলির আরেকটি বিশেষ সত্র সামাগুড়ি দর্শন। বিশেষ বলার কারন এখানে রাস উৎসব ধুমদামের সাথে পালিত হওয়ার পাশাপাশি যা দেখতে পর্যটকগণ আসেন তা হল এখানেই থাকেন আসামের প্রখ্যাত ভাষ্কর্যশিল্পী হেমচন্দ্র গোস্বামী। তাঁর হাতের তৈরি বিভিন্ন মুখোশ দেখে সকলে মুগ্ধ হয়। এই বিখ্যাত শিল্পী যিনি রামায়ণ, মহাভারত এবং আরো অনেক কিছু আরোপিত স্টেজ নাটকের জন্য মাস্ক তৈরি করেন এবং ব্যবহার করতে দেন। আমরা বিভিন্ন রকম মাস্ক পরে ছবি তুললাম। ভীষণ ভালো লাগলো। সত্রের বিভিন্ন দেওয়ালে তাঁর ভাষ্কর্যগুলো অসাধারণ লাগছিলো।

৩)মিশিং গ্রাম

সামাগুড়ি দর্শন সেরে গেলাম মাজুলির মিশিং উপজাতীয় গ্রাম দেখতে। তেলিগাও একটি প্রাচীন গ্রাম মিশিং গ্রাম। দেখলাম ঘরবাড়িগুলো ব্রহ্মপুত্রের রোষের হাত থেকে বাঁচার উপযুক্ত করে তৈরি। কাঠের পিলারের বাঁশের বাড়ি। এক ফালি কাঠ লম্বা করে ঘরের দরজা থেকে নিচে দেওয়া। এটাই সিরি। প্রত্যেক বাড়ির সামনে এখানকার ঐতিহ্যবাহী গামছা ও শাড়ী বুননের ব্যবস্থা আছে। গ্রামবাসীদের সাথে খুব ভালো করে কথা বলতে পারলাম না কারণ আমরা অসমীয়া জানিনা আর এরাও হিন্দি বা ইংরিজি জানে না। কিন্তু এরা সকলেই ভীষণ আন্তরিক ও অতিথিবৎসল। এক গ্রামবাসী তাঁর বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে টাটকা রাইস-বিয়ার খাওয়ালো। দারুন সুন্দর গ্রাম।

৪) রেগাম দর্শন
মাজুলির বিভিন্ন আদিবাসী সমাজের মহিলারা বাড়িতে বিভিন্ন ঐতিহ্য রক্ষাকারী কাপড়ের পোশাক তৈরি করে থাকে। একটি গ্রামে রেগাম নামের একটি সংস্থা দেখলাম। মিশিং উপজাতি মহিলাদের তৈরি ঐতিহ্য রক্ষাকারী কাপড়ের পোশাক ভান্ডার। নানা রকমের গামছা,জ্যাকেট, জামা, শাড়ি,মেখলা ইত্যাদি রয়েছে রেগামে।

৫)সানসেট পয়েন্ট

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। গ্রাম ঘুরে চলে এলাম একটা জলাশয়ের ধারে। এখানে সূর্যাস্তের অপূর্ব শোভা দেখার জন্য দূরদূরান্ত থেকে লোক আসে, তাই এটিকে সানসেট পয়েন্ট বলা। সত্যিই দৃশ্যটি অতুলনীয়। ক্যামেরাবন্দি করলাম সেসব। সূর্যাস্ত দেখে সোজা ফিরলাম আশ্রয় শালায়।

দক্ষিণ পাট সত্রের শেষ দিনের রাস উপলক্ষে বসেছে বিশাল মেলা। সত্রের ভেতর মঞ্চে রাস উপলক্ষে গান বাজনা শুনলাম। আশেপাশের গ্রাম থেকে যারা এসেছেন তারা সকলেই মন্দির প্রাঙ্গণে সারি সারি প্রদীপ জালিয়ে দিয়েছেন। দূর থেকে মনে হতে লাগলো আলোর মালা। দেখলাম ভক্তদের নগর কীর্তন।

৬) কমলাবাড়ী সত্র

সময় কম। তাই আবার বেড়িয়ে পরি মাজুলির আরেকটি বড় ও পুরনো সত্র দেখতে। কমলাবাড়ি গ্রামটি বেশ বড়। উত্তরকমলাবাড়ি সত্র শংকরদেব কৃষ্টি সংঘের পরিচালনায় পালিত হলো রাস উৎসব।
গুনিজন সম্মাননার পর শুরু হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শুরুতে সমবেত শাস্ত্রীয় খোল বাজনা আমাদের সকলের মন কাড়ল। ছিল শাস্ত্রীয় নৃত্য ও অন্যান্য অনুক্রম। একটু দূরেই কমলাবাড়ি বাজারের পাশে বিশাল মাঠে দেখলাম রাস যাত্রা। কমলাবাড়ি সম্মিলিত শিল্পী সমাজের উদ্যোগে সম্পুর্ণ রাসলীলা পালায় দেবকীর অভিনয়ে আসামের চলচিত্র অভিনেত্রী প্রীতি কংকনার অভিনয়ে ছিল নিপুণতার ছোঁয়া। ওখানকার অধিবাসী প্রনব সইকিয়া বলেন, রাস মহোৎসব সব অশুভ শক্তিকে দূরে ঠেলে দিয়ে সকলকে চেতনার উন্মেষে নদী দ্বীপ মাজুলি একটা মহান ভূমিকা পালনের ক্ষমতা রাখে।

অনেক রাতে ফিরে আসি গেস্ট হাউসে। রাতের খাবার ঘরে ঢাকা দেওয়া ছিল। তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পরি। সারাদিন এত ধকল গেছে। তাই শুতে শুতেই ঘুমিয়ে পরেছিলাম।

পরের দিন সকালে দেখলাম রংবেরঙের প্রচুর পাখি। এতো হরেক জাতের পাখি দেখে আর তাদের গান শুনে মনে হলো কোনো স্বর্গীয় জায়গায় রয়েছি।

বাড়ি ফেরার পালা:

পরদিন সকালের খাবার খেয়ে খেয়া ঘাটে আসি। আবার লঞ্চ যাত্রা। গৌহাটি এসে লঞ্চে ব্রম্মপুত্র নদীর মাঝে উমানন্দ ভ্রমণ ছিল বাড়তি পাওনা। রাতে শংকর দেবের জন্ম স্থান নলবাড়ির রাস উৎসব দেখতে গেলাম। একমাস ধরে মেলা হয়। ভক্তি আন্দোলনের জোয়ারে ভেসেছেন এখানকার মানুষ। বিরাট সাংস্কৃতিক মঞ্চে চলছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। বাংলার বাউল অঙ্গের গান দর্শকদের মন ভরিয়ে দেয়। অবশেষে সমস্ত মজার মুহূর্তগুলি স্মৃতির পাতায় কয়েদ করে মাজুলি দ্বীপের রঙিন সফরটি শেষ করে ফিরে গেলাম পুরোনো জীবনে।

172