অমর মিত্রের গল্পের এক বহুমাত্রিক পাঠ
বিকাশ রায়
গ্রন্থ : অমর মিত্রের গল্পবিশ্ব : আখ্যানের বহুমাত্রিকতা।
লেখক : পুরুষোত্তম সিংহ।
প্রথম প্রকাশ ২০১৮। সোপান। মূল্য-২০০ টাকা।
বর্তমান সময়ের এক অন্যতম কথাসাহিত্যিক অমর মিত্র। নিজের সাহিত্যজীবন শুরু করেছিলেন গল্প দিয়েই। নিজেই আত্মকথনে জানিয়েছেন ‘গল্পগ্রন্থ প্রকাশের চেয়ে মধুর কোন অভিজ্ঞতা আমার জীবনে নেই।“ অমর মিত্রের গল্পের এক বিবিধ ব্যাখ্যায় অবতীর্ণ হয়েছেন তরুণ গবেষক পুরুষোত্তম সিংহ তাঁর ‘অমর মিত্রের গল্পবিশ্ব : আখ্যানের বহুমাত্রিকতা’ গ্রন্থে। সদ্য এম.এ পাস করেই এই গবেষণা কার্যে সে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তরুণ হলেও পরিশ্রমী ও মননশীল পাঠকসত্তা তাঁর গ্রন্থের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে।
তিনি গ্রন্থটিকে দশটি অধ্যায়ে সাজিয়েছেন। সৃষ্টিকর্তার জীবনের সঙ্গে সাহিত্য যেন অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। এজন্যই বঙ্কিমচন্দ্র উচ্চারণ করেছিলেন- কবিত্ব অপেক্ষা কবিরে বুঝিতে পারিলে গুরুতর লাভ। সেই লেখককে বোঝার পাঠ আমরা পাই গ্রন্থের ‘অমর মিত্রের জীবন ও সাহিত্য’ অধ্যায়ে। লেখকের জন্ম-বাল্যকাল থেকে সাহিত্য সৃষ্টির সূত্রপাত, ক্রম পরিণতি, উপন্যাসে যাত্রা, সাহিত্য ভাবনা ও গল্প-উপন্যাসের বাঁক বদলের এক সুপষ্ট চিত্র আমরা প্রথম অধ্যায়ে পাই। অমর মিত্র নিজে দেশভাগ দেখেন নি, অথচ দেশভাগের যন্ত্রণা উপলব্ধি করেছিলেন, সেই যন্ত্রণারই আত্মপ্রকাশ তাঁর সাহিত্য। যে যন্ত্রণা লেখককে ‘কাঁটাতার’, ‘দশমী দিবসে’ ‘কুমারী মেঘের দেশ চাই’ এর মত উপন্যাস লিখতে বাধ্য করেছিল, সেই যন্ত্রণারই প্রকাশ রয়েছে ছোটগল্পে। গল্পের দেশভাগ নিয়ে আলোচিত হয়েছে দ্বিতীয় অধ্যায়ে। গ্রাম যাত্রা লেখকের কাছে যেন ভারতবর্ষ আবিষ্কার। সেই ভারতবর্ষের সন্ধানেই লেখক নিজের জীবনের প্রথম জীবন কাটিয়েছেন মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনার গ্রামে গ্রামে। সেই অভিজ্ঞতাই উঠে এসেছিল ‘ভারতবর্ষ’, ‘দানপত্র’ গল্পে। অমর মিত্রের নিম্নবর্গীয় ভাবনা ও ভারতবর্ষ আবিষ্কারের সন্ধান নিপূর্ণতার সঙ্গে আলোচিত হয়েছে তৃতীয় অধ্যায়ে।
অমর বাবু সময়ের কথাকার, বিপন্ন বাস্তবতার কথাকার। কথকের বাস্তব সচেতনতা নিয়ে যেমন তরুণ গবেষক আলোচনা করেন তেমনি লেখকের বাস্তবতা নিছক বাস্তব নয় তা যেন অলীক বাস্তব। লেখকের জাদুবাস্তবতা নিয়েও তেমনি আলোচনা উঠে আসে। তবে এই জাদুবাস্তবতা ভারতীয় জাদুবাস্তবতা। তা ‘জাদুজীবন’, ‘ব্ল্যাকম্যাজিক’ ‘আকাল’ গল্পে ফুটে উঠেছে। ‘ব্ল্যাকম্যাজিক’ গল্প সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে গবেষক লিখেছেন-“ ভোগবাদী পণ্য আজ বাঙালির জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে দ্রুত, বিজ্ঞাপনের সৌজন্যে। বাঙালিও আজ ঘরে বন্দি নেই, সেও উন্মুক্ত হয়েছে, পা মিলিয়েছে বিশ্বের সঙ্গে। যন্ত্রসভ্যতার ভোগবাদী মানসিকতাকে আপন করে নিতে বাঙালি আজ বড় ব্যাকুল, সেই মানসিকতা প্রতিফলিত হয়েছে এ গল্পে।“ বাঙালি কথাকারদের প্রবল বাধা ছিল মুসলিম অন্তঃপুর জীবনে প্রবেশের। সে বাধা অনেকটাই অতিক্রম করে চলেছেন আধুনিক কথাকাররা। অমর মিত্রের গল্পে মুসলিম জীবনের কথা নিয়ে যেমন আলোচিত হয়েছে তেমনি রয়েছে অমর মিত্রের নারী ভাবনার পরিচয়।
এ শতাব্দী তথ্য প্রযুক্তির জগৎ, ভারচ্যুয়াল ওয়ার্ল্ডের জগৎ। অমর মিত্রের বিজ্ঞানভবনা নিয়ে যেমন তরুণ গবেষক অবতীর্ণ হন তেমনি গল্পের লোকায়ত জীবন নিয়েও দক্ষতার সঙ্গে আলোচনা করেন। সব মিলিয়ে অমর মিত্রের গল্পের এক বহুল ও বিবিধ বিশ্লেষণ চোখে পড়ে। নিছক বর্ণনা নয় তথ্য ও ব্যাখ্যায় এক নিজস্ব আত্তীকরণে বিশ্লেষণ ধাপে ধাপে এগিয়ে গেছে, যা অবশ্যই প্রশংসার ও সাধুবাদযোগ্য। পাঠক মহলে গ্রন্থটি যে বিশেষ সমাদৃত হবে সে বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই।