কুলিক রোববার মে ১২, ২০১৯ :

গ্রন্থ সমালোচনা:

‘এ -হৃদয় নকশিকাঁথা’: যাপনচিত্রের উৎসস্থল

পুরুষোত্তম সিংহ
সময়ের জাঁতাকলে বন্দি মানুষের আর্তনাদ থেকেই তাঁর কাব্যস্বর উচ্চারিত হয়। নিছক বিনোদন বা আপাত চাটুলতায় তাঁর বিশ্বাস নেই। যাপনের চিত্র থেকেই তিনি পাঠককে অন্য অভিসারে নিয়ে যেতে চান। তাই শরীরকে কেয়ার না করেই মনের উষ্ণতা নিয়ে হেঁটে চলেন। শব্দসজ্জায় গা ভাসিয়ে দিয়ে এক অনন্ত রাজ্যে বিচরণ করতে ভালোবাসেন, যেখানে থাকে শোষণের বিরুদ্ধ প্রতিবাদ।
উপরের এ কথাগুলি কবি নৃপেন্দ্রনাথ মহন্তের ‘এ-হৃদয় নকশিকাঁথা’ কাব্যপাঠে মনে এল। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল ‘পতঙ্গ বাসনা’ গল্প সংকলনের মাধ্যমে। গল্পগুলি পড়ে চমকে উঠেছিলাম। সামান্য উপকরণ নিয়েই তিনি গল্পে নেমেছেন অথচ অভূতপূর্বভাবে তা ব্যঞ্জনাধর্মী ও চিত্রময়। মনে হয়েছিল আমার জেলার এ লেখককে পড়া প্রয়োজন। একে একে পড়ি ‘ভেতরের মানুষ’, ‘হয়তো গল্প’, ও ‘শ্রীমতি, কুলিক ও ভূমিকম্পনারী’ ( কাব্য ) সংকলনগুলি। ইতিমধ্যেই তাঁর বেশ কিছু কাব্য প্রকাশিত হয়েছে, সদ্য প্রকাশিত হল ‘এ- হৃদয় নকশিকাঁথা’।
শারীরিক অসুস্থতা নিয়েই এ কাব্যের কবিতাগুলি লিখেছেন। কখনও প্রবল দৃঢ়তার সঙ্গে জানান-“শারীরিক অসুস্থতা কখনই আমার মনকে সংক্রমিত করতে পারেনি বলে আমার বিশ্বাস। এগুলি এক ঘরবন্দি মানুষের উড়ুক্ক মনের ডানা মেলার ইতিকথা, বৃহত্তর পরিসরের অনুসন্ধান।“ জীবনসন্ধ্যায় বসে তিনি রঙিন সুরে আর গান বাঁধতে চান না, তাঁর গান বরং বেসুরো, একতারার মত টুংটাং ধ্বনি তোলে। সে ধ্বনিতে মিশে থাকে একাকিত্ব। তিনি হেমন্ত সচেতন হতে চান না, প্রেমহীন এ পৃথিবী তাঁর কাছে শুধুই যেন শূন্য অবয়বমূর্তি। তবে ব্যর্থতার কথা, বেদনার কথা বলতে চান না, শোষণের মধ্যেও বেঁচে থাকার যে আর্তনাদ তা শোনান। আবার কখনও পাঠককে সরাসরি শোনান-
“ এটাই তবে জীবনমন্ত্র আজ
এ মন্ত্রই কি দিচ্ছে সত্য পাঠ ?
এ হৃদয় নকশিকাঁথা হলে
এ জীবন নকশিকাঁথার মাঠ। “ ( এ- হৃদয় নকশিকাঁথা )
সময়ের ক্যানভাসকে তিনি শব্দজালে জীবন্ত করেন। কবিতার ঘর সংসারের সঙ্গে কোন আপোস নয় নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী তিনি নিজেই। তাই শব্দের জাবর কাটায় তাঁর বিশ্বাস নেই। আবার কবিতাকে প্রতিবেদনধর্মীও করে তুলতে চান না। ফিনিক্স পাখির মত ঐশ্বরিক শক্তি নয়, বাস্তবের ছাইভস্ম থেকেই তিনি কাব্যচয়ন করেন। তাই ‘ভোটপ্রার্থী’ কবিতায় উচ্চারিত হতে শুনি-
“ সমস্ত যুদ্ধাস্ত্র এবং কৌশল করায়ত্ত যার
সব ভূত বশীভূত সেইসব মানুষের কাছে
তারা ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী, মানুষ কোন ছার
স্বর্গদ্বারের চাবি তাদেরই কোমরে গোঁজা আছে।“
জীবনানন্দ সেই কবে উচ্চরণ করেছিলেন-কবির পক্ষে সমাজকে বোঝা দরকার। এ শতাব্দীর অবক্ষয়িত সময়ে দাঁড়িয়ে কবিকেই আজ সত্যের পথ দেখাতে হবে। কাব্যবীণায় কোন সুর বা তার বাজবে তার কোন বাধ্যবাধকতা অবশ্যই নেই, তবে এই অন্ধকারচ্ছন্নতাই কবিতার প্রকৃত সময়। তাই কবি ‘আর কবিতা নয়’ কবিতায় কবিকে সমস্ত ছেড়ে ফসল ফলানোর আহ্বান জানান। তেমনি রয়েছে ব্যঙ্গের আঘাত। লেবেলসাটা কবি বাদে কেউই কবি নয় এই যে লুণ্ঠনতন্ত্র আজ চলছে সেখানে তিনি নতুন দিশা দেখান। গ্রামের কবি কবি নয়, সেলফি তোলা কবিই একমাত্র কবি, অকাদেমিতে কবিতা পাঠ করা কবিই শুধু কবি। ভণ্ডতন্ত্রের চরমসীমায় বাঙালি যখন স্বর্থসিদ্ধির আলগা স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছে তখন তিনি শোনান-
“ ও-ও-ও ! তুমিতো আবার ফালতু বুদ্ধিজীবী
অর্থাৎ কবি একজন
গাঁজাখুরি শব্দ সব গুঁজে দাও কাগজের বুকে
ফুল গুঁজে দাও কারো চুলে, শবদেহে,
কপালে চন্দনের ফোঁটা দেওয়া বাঁধানো ছবিতে
তোমার আর কী কাজ ?
উন্নয়নের স্বার্থে সেসব বন্ধ থাক আজ।“ ( আর কবিতা নয় )
কবিতা তাঁর যাপনের সঙ্গী, নিজেকে আত্মাবিষ্কারের এক জলজ দর্পণ। ফলে বিধ্বস্থ সময়ের চিহ্ন তাঁর কবিতায় ফিরে আসে। প্রকৃতি ধ্বংস, নারী শোষণ, ধর্ষণ, শিশুশ্রম ও বেকারত্বের যন্ত্রণা তিনি উপলব্ধি করেন। পুরুষের রক্ত চক্ষু আজ শোষণ করছে নারীকে, ক্ষমতার দম্ভে ন্যায় বিচার পাবার কোন অধিকার নেই গরিব রমণীর। এই আর্তনাদই যেন তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় কবিতা-“ পোড়াবাংলার লাগামছাড়া স্বাধীন যুবক / শকুনের সমগোত্র “ ( হেরোকি তেরাইকে )। নগর ও গ্রাম জীবন মিলেমিশে থাকে তাঁর কবিতায়। তবে তাঁর কবিতার উপাদান সামান্য। কখনও ঘেঁটু ফুল, কখনও বা দূর্বা, ভেড়া। আবার যখন নিজেই নিজের বিবেকের কাছে পরাজিত হচ্ছেন, কবিতার ভাষা সঞ্চার করতে পারছেন না তখন আশ্রয় চান শঙ্খ ঘোষের কাছে।
“ আমি চাই কবিতা আমার তথাকথিত অনুপ্রেরণাদাত্রী দলনেত্রী নয়, আমার সম্পন্ন সহকর্মী হক। “- সে পথ শধুই প্রতিবাদের ভাষ্য রচনা করে। আর কেনই বা লিখবেন না তাঁর ভূগোলের চারিদিকে শুধু হাহাকার, শোষণ, বঞ্চনা। গোটাকাব্য জুড়েই এক ফ্লেক্সিবল গদ্যে তিনি পাঠককে মুগ্ধ করেন। অনুপ্রাসের শব্দছটা, কোথাও বক্তব্য প্রধান, আবার কোথাও ব্যঞ্জনাপ্রধান। কাব্যপাঠই তাঁকে উপলব্ধির শ্রেষ্ঠ প্রন্থা। আলোচনা যেন দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো। তবুও কিছু উল্লেখ করি পাঠকের সুবিধার্থে-
ক/ “শব্দরা যেন তাই লা-ওয়ারিশ কুকুরের ছানা
রুষ্ট কবি গৃহিণীও—কবিতা লিখতে তাঁর মানা ।“ ( রোষের কারণ )

খ/ দুর্বোধ্য কবিতা লিখে জীবনের পাতায় পাতায়
কৃষ্ণগহ্বরে খুঁজে নেবো জীবনের পরম আশ্রয়। ( পরম আশ্রয় )

গ/ “ বির্সজন দেবো সংসারের পুরোনো ধারণাগুলি
চিরকাল রইবো দুজন-আমি নর তুমি নারী। “ ( প্রেম গৃহহীন )
শুধু প্রতিবাদ নয় তিনি প্রকৃতির গহন কাননেও বিচরণ করতে ভালোবাসেন। তবে ড্রেয়িং রুম বিলাসী সভ্য কবির প্রকৃতি বিলাস তাঁর কবিতায় নেই। গ্রাম বংলার প্রকৃতির এক সহজ সরল সাদামাঠা চিত্র ফুটে উঠতে দেখি। ফলে গোলাপের সৌন্দর্যে তিনি মুগ্ধ হন না, বরং তাঁর প্রিয় ঘেঁটু ফুল, ডাঁসা পেয়ারা, কদম ফুল। কোথাও প্রেমিকার চোখের জলে খুঁজে পান নিজের হারানো নদীকে। কুলিক, তুলাই ধান থেকে ‘বৃষ্টির বর্ণমালা’য় শোনান-
“বাড়ির কাছেই কুলিক নামের নদী
তার বুকে এক নারীর ছবি ভাসে
পরণে যার মেঘলা রংয়ের শাড়ি।“
এক সহজাত প্রবৃত্তি নিয়েই তিনি কাব্যবীণায় সুর তুলেছেন। সে সুর পল্লিবাংলার মেঠো সুরের মতোই সহজ সরল, এমনকি প্রকাশ ভঙ্গিও । ‘এ- হৃদয় নকশিকাঁথা’ অবশ্যই ‘প্রৌঢ় ঋতুর ফসল’ তবে আদ্যন্ত রোমান্টিক ও প্রতিবাদমুখর। কাব্যপিপাসু পাঠকের রস সঞ্চারের উৎসস্থল।

70