১৭/০২/২০১৭:কুলিক রোববার :

কবির চোখে জীবনানন্দ দাশ
-পুরুষোত্তম সিংহ
রবীন্দ্রোত্তর যুগের অন্যতম কবি জীবনানন্দ দাশ। রবীন্দ্রনাথের কথা মাথায় রেখেই বলছি জীবনানন্দ আমার প্রিয় কবি। বাংলা কাব্যে জীবনানন্দের আত্মপ্রতিষ্ঠতার পথ সুগম ছিল না।

সেদিনের বাঙালি পাঠক জীবনানন্দকে ঠিক উপলব্ধি করতে পারে নি। কেননা সেদিন বাঙালি পাঠকের মানসিকতা গড়ে উঠেছিল রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রানুসারী কবিদের কবিতা পড়ে। বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দকে প্রথম উপলব্ধি করেছিল। ‘কবিতা’ পত্রিকার পাতায় শুধু কবিতা ছাপা নয় নিগূঢ় বিশ্লেষণে বাঙালি পাঠকের মননে জীবনানন্দকে পৌঁছে দিয়েছিলেন। স্বয়ৎ রবীন্দ্রনাথও জীবনানন্দের শব্দ ব্যবহার ও ভাষা নিয়ে খুশি হতে পারেন নি- “ কিন্তু ভাষা প্রভৃতি নিয়ে এত জবরদস্তি কর কেন বুঝতে পারিনে। কাব্যের মুদ্রাদোষটা ওস্তাদীকে পরিহাসিত করে ।“ ( চিঠিপত্র, ১৬ খণ্ড ) তবে জীবনানন্দের কবিতায় ছবি আঁকার প্রসঙ্গকে রবীন্দ্রনাথ প্রশংসা করেছিলেন- “ তোমার লেখার রস আছে, স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে “ ( তদেব, পৃ. ৯ )। আজ জীবনানন্দের জন্মদিন। আমারা দেখে নেবো বাংলার কবিরা কবিকে কিভাবে শ্রাদ্ধা জানিয়েছে-
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর ‘জীবনানন্দ’ কবিতায় কবিকে আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক জীবনের বিশৃঙ্খলা ছেড়ে সুদূর নির্জনে চলে যাওয়ার। যেখানে হেঁটে হেঁটে কবি সময়ের কথা, প্রকৃতির কথা শুনতে চেয়েছেন। নাগরিক কলকাতার কোলাহলে কবি ক্লান্ত, তাই এইসব বিশুদ্ধতা ছেড়ে কবি প্রকৃতির কাছে জীবনানন্দকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। বুদ্ধদেব বসু ঘোষণা করেছিলেন জীবনানন্দ বাংলা কবিতার সবচেয়ে নির্জন কবি। জীবনানন্দ এতটাই শান্ত ছিলেন যে পথে কোন বন্ধু দেখলে কথা যেন না বলতে হয় সেজন্য গলিতে প্রবেশ করে যেতেন। এমনকি জীবনানন্দ কোন সভাতেও বিশেষ যেতেন না। জীবনানন্দের এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জানতেন অচিন্ত্যকুমার। তাই তিনি জীবনানন্দকে প্রকৃতির কাছেই নিয়ে যেতে চেয়েছেন-
“ আশ্চর্য জলের দেশে, সেই সব স্নেহঢালু জলের কিনার,
প্রাণে- মজা তাজা- তাজা ঘাস
শাদা স্বপ্নে লেখা পাখা উড়ে আসে অলিখিত দিগন্তের হাঁস-
চলো যাই চলে যাই
ছুঁয়ে ছুঁয়ে চিনিবার মত যেথা অতল অমল অন্ধকার ।“
কবির মতে এই নির্জনতা একমাত্র অন্তরেই পাওয়া সম্ভব। দিনের ক্লান্তি ঢাকতে যেমন আগমন ঘটে সন্ধ্যার তেমনি আকাশে সব সময় শকুন থাকে না, একটা সময় তা সৌন্দর্যে ভরে ওঠে। কবি সেই সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করতে বলেছেন। কেননা জীবনে বিশ্বাস থাকলে সমস্ত সংকটকে অতিক্রম করে যাওয়া যায়। কবির কাছে জীবনানন্দ সেই আশাদীপ্ত বিশ্বাসের কবি। সমস্ত কবির দৃষ্টি যেখানে শেষ হয় জীবনানন্দ সেখান থেকেই শুরু করেন। এজন্যই রবীন্দ্র পরবর্তীকালে কবি প্রতিভায় জীবনানন্দ এক ও অদ্বিতীয়। কবি জীবনানন্দকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন এভাবে-
“ সমস্ত বোধের শেষে আরো এক বোধ থাকে বাকি
তুমি শান্ত প্রাণ এক মহাণ একাকী।“
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘ জীবনানন্দের মহাপৃথিবী’ কবিতাটি স্থান পেয়েছে ‘উলুখড়ের কবিতা’(১৩৫১) কাব্যে। জীবনানন্দ যে মহাপৃথিবীর কথা বলেছিলেন সময়ের পরিবর্তনে তা অনেক পাল্টে গেছে। মূল্যবোধের পৃথিবীতে সমস্ত কিছু নিজের আয়ত্ত্ব করার মানসিকতা মানুষকে ক্রমেই ক্ষুধাতুর করে তুলেছে। ভালোবাসা নয় হিংস্রার পৃথিবীতে আজ পাশবিক অত্যাচার সংঘটিত হচ্ছে। আত্মগ্রাসী মানুষ নিজেকেই যেন ভোগ করে চলেছে দিন দিন। সেই অবক্ষয়ী মন ও সময় প্রাধান্য পেয়েছে এ কবিতায়। ব্যক্তি পৃথিবীর মধ্যেও যে যন্ত্রণার পৃথিবীতে বা ঐশ্বর্যের মধ্যেও যে অশান্তি সেই সবই তুলে ধরেছেন কবি-
“ কিন্তু তারই সময় হয়ে গেলে
যমকে প্রশ্ন করে
যদিও অনেক মানুষ প্রত্যহ
দ্বিতীয়বার মরে।“
নজরুলকে শিরোধার্য করেই বাংলা কাব্যে অবতীর্ণ হয়েছিলেন জীবনানন্দ। কিন্তু অচিরেই তিনি নিজস্ব পথ খুঁজে নিয়েছিলেন। জীবনানন্দের কবিতার স্বরূপ সে সময়ে বিশেষ জনপ্রিয় হয় নি, কেননা বাঙালি পাঠক জীবনানন্দকে উপলব্ধিই করতে পারেনি। কিন্তু কিছুদিন অবগত হতেই তার কাব্যের স্বরূপ পাঠক ধরতে পেরেছিলেন। সীমাতীত মেঘালোক বা লীলাময়ী প্রকৃতি যা দর্শনেরও সীমার বাইরে, সেই প্রকৃতিকেই সৌন্দর্যের সীমায় কবিতায় বেধেছিল জীবনানন্দ। তিনি বোধের কবি। সেই বোধই তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল মৃত্যুসজ্জায়। ট্রামে চাপা পড়ে মৃত হন। এই মৃত্যু সেদিন কেউই মেনি নিতে পারেনি। জীবনানন্দের সেই যে কবিতা-‘ মাথার ভিতরে কোন এক বোধ কাজ করে’- সেই বোধের সন্ধানে বা অন্য কোন বনলতা সেনের সন্ধানে অগ্রসর কবির দেহ রক্তাক্ত হয়ে গেল ট্রামে। কবির এই মৃত্যুকে কবি তুলনা করেছেন জীবন্ত হরিতকী ফলের পতনের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ যে মানসসুন্দরীর কথা বললেন তাই আমরা ফিরে পেলাম বনলতা সেন’এ। সে পথেই পরবর্তীকালের কবিরা অগ্রসর হলেন- সুনীল গঙ্গোপাধ্যাবের নীরা, বিনয় মজুমদারের মুকুর, ভাস্কর চক্রবর্তীর সুপর্ণা’রা। বিনয় মজুমদার আশাদীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন জীবনানন্দের কাব্য কবিতা চিরকাল থেকে যাবে, কিন্তু জীবনানন্দ না থাকার জন্য ব্যথিত হয়েছেন-
“ সংশয় সন্দেহে দুলে একই রূপ বিভিন্ন আলোকে
দেখে দেখে জিজ্ঞাসায় জীর্ণ হয়ে তুমি অবশেষে
একদিন সচেতন হরিতকী ফলের মতন
ঝরে গেলে আকস্মাৎ, রক্তাপ্লুত ট্রাম থেমে গেল।“
তারাপদ রায়ের ‘জীবনানন্দ দাশ ১৯৬২’ কবিতাটি স্থান পেয়েছে ‘ছিলাম ভালোবাসার নীল পতাকাতলে স্বাধীন’( ১৯৬৭ ) কাব্যে। জীবনানন্দের নায়ক সমস্ত থাকা সত্ত্বেও কোন এক বোধে লাশকাটা ঘরে চলে গিয়েছিল। কবিও এক বিস্মিত বোধেই ট্রামে চাপা পড়লেন।কবি তারাপদ রায়ের কাছে এই মৃত্যুর কারণ অন্ধকারাচ্ছন্ন। তারাপদ রায় নিজেই জানিয়েছিলেন তিনি যে কোন সময়ই কবিতা লিখতে পারতেন। কিন্তু কবির মৃত্যু তাঁকে বড়ই যন্ত্রণা দিচ্ছে, লেখাগুলি ছন্নছাড়া হয়ে যাচ্ছে। কবিতা লিখতে বসেছেন, অথচ জীবনানন্দের ডাককে উপেক্ষা করতে পারছেন না। রাতের অন্ধকারে লাশকাটা ঘরের নায়ক কবিকে অলৌকিক মায়ার জগতে নিয়ে যান, যেখানে উপেক্ষা করা ছাড়া অন্য উপায় নেই। ফলে কবিতা লেখাও হয় না, তাই কবি আজ নিজেই জীবনানন্দকে অপেক্ষা করতে বলেছেন-
“ স্যার, বারান্দায় একটু অপেক্ষা করুন।
দুলাইন লিখে নিতে দিন, একটু একটা লিখতে দিন
আপনার উৎপাতে বড় ব্যতিব্যস্ত আছি।“
কবি তুষার চৌধুরী’র ‘জীবনানন্দ’ কবিতাটি স্থান পেয়েছে ‘স্বপ্নলোকে কোথায় শিকারী’( ১৯৮২ ) কাব্যে। জীবনানন্দের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কবি এ কবিতা লিখেছেন। জীবনানন্দের কাব্যের আধুনিকতা কোথায়, পূর্বের বাংলা কবিতা থেকে জীবনানন্দ কোথায় দূরে সরে গেলেন তা তিনি দেখিয়েছেন। কবির নিয়তি, নিঃসঙ্গতা, ব্যক্তিজীবনের ব্যর্থতা সমস্ত মিলিয়ে তিনি এক রোমান্টিক রাজ্যে বিচরণ করেছেন। কবির নায়ক- নায়িকা ( বনলতা, শঙ্খমালা, সুরঞ্জনা, সবিতা, অনুপম ত্রিবেদী )র যন্ত্রণা, মর্মকাতরতা, একাকিত্ব, কবির সমাজচেতনা, সময়, বিপন্নবোধ- সমস্তকেই কবি ধরতে চেয়েছেন ক্ষুদ্র কবিতায়। কখনও আবার ব্যঙ্গ করে লেখেন-
“ প্রেমবিরহকে কালিদাসের ন্যাকামো
মনীষাকে রবীন্দ্রনাথের শাদা দাড়ি ছাড়া কিছুই ভাবি না
অবচেতনার নামে প্রশ্রয় পেয়েছে ঢের মোদকের ভুতুড়ে কারসাজি
আমি কবি নিসর্গ রবীন্দ্রনাথ ঐতিহ্য মানবিকতা শ্লেষ মতিভ্রম”

রণজিৎ দাশ ‘রূপসী বাংলা’ কবিতায় এক মায়াবি ভাষায় জীবনানন্দকে আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন। কবি জীবনানন্দের পথযাত্রার সঙ্গী হয়েছেন। তবে জীবনানন্দ থেকে তিনি ভিন্ন মানসিকতার। জীবনানন্দ যেখানে বিপন্ন বিষ্ময় খোঁজেন সেখানে থেকে কবি ফিরে এসেছেন বিশুদ্ধ বিষ্ময়ে। জীবনানন্দের নায়ক লাশকাটা ঘরে চলে যেতে চান কিন্তু কবি লাশকাটা ঘর থেকে ডাকঘরে যেতে চান, যেখান থেকে মাতার কাছে ফিরে যাওয়া যাবে। জীবনান্দ রূপসী নদীতে গাঙুরে ভেলা নিয়ে নিরুদ্দেশ যাত্রায় চলে যেতে চান কিন্তু কবি মাতার কাছে ফিরতে চান। জীবনানন্দের সঙ্গী বন্ধু আজ কুসুমকুমারী দেবীর আলোয়ে গিয়েছেন। মাতা অনেক আদর যত্নের পর সন্তানের খোঁজ নিলে কবি পথ দেখিয়ে দেন। যে পথ দিয়ে রবি ঠাকুরের দেশে জীবনানন্দ বাংলার পথ মাঠে খুঁজে চলেছেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কবি অত্যন্ত মনোরম ভাষায় এ কবিতার কাব্য সৌন্দর্য পরিস্ফুটন করেছেন।হাজার বছর ধরে যে পথ হাঁটতে চেয়েছিল কবি তা মাত্র পঞ্চান্ন বছরেই শেষ হয়ে গেছে। এই ট্র্যাজেডি কবি মনে নিতে পারেন নি। কবির দৃষ্টিতে জীবনানন্দ এখনও বাংলার পথে মাঠে হেঁটে চলেছেন-
“ বলেন, ‘জীবনানন্দ কোথায় গিয়েছে, তুমি জানো ?’
আমি তাঁকে নীরবে দেখাই
লাজুক জীবনানন্দ, দূরে, বহু দূরে
বাংলার পথে-ঘাটে রবি ঠাকুরের সঙ্গে হেঁটে চলেছেন।“
জীবনানন্দ জন্মেছিলেন বরিশাল জেলায়। মৃত্যুর আগেই ঘটে গেল দেশভাগ।কাঁটাতারের বিভেদ দিয়ে পৃথক করে দেওয়া হল দুটি দেশকে। জন্মভূমি হয়ে গেল পৃথকভূমি। তবে সে বঙ্গের মানুষ জীবনানন্দকে নিজের আত্মার সঙ্গেই মিলিয়ে দিয়েছেন। কিছুদিন আগেই বরিশালের মানুষ দাবি জানিয়েছেন জীবনানন্দের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় করার জন্য। বাংলা কাব্যে জীবনানন্দের যেমন পূর্বসূরী নেই তেমনি নেই উত্তরসূরী। তবে পরবর্তী কবিরা সৌন্দর্য বর্ণনায় ও চিত্রকল্প সৃজনে জীবনানন্দ দ্বারা বিশেষ ভাবে প্রভাবিত। শামসুর রহমানের ‘জীবনানন্দকে নিয়ে’ কবিতাটি ‘হেমন্ত সন্ধ্যায় কিছুকাল’ কাব্যে স্থান পেয়েছে। শীতের সকালে কবি কবিতা লিখতে বসে জীবনানন্দের চিত্রকল্প বারবার মনে ভেসে আছে। সদ্য যৌবনে যদি কবি এই কবিতাটি লিখতে পারতেন তাহলে মনে মনে তৃপ্তি পেতেন। নিজের মনে প্রেরণা সঞ্চার করতে পারতেন। কিন্তু বার্ধক্যে এসে কবি যতই জীবনানন্দকে অতিক্রম করে যেতে চান, জীবনানন্দ যেন তাঁকে আরো গভীরভাবে জড়িয়ে ধরে। তাই শীতের সকালে কবিতা লিখতে গিয়ে কলমের মুখে শুধুই জীবনানন্দের চিত্রকল্প ভেসে আছে-
“ এই ভোরবেলা, যখন রোদ বারান্দায় বিশ্রাম নিচ্ছে
হরিণের মতো, প্রাতঃস্মরণীয় জীবনানন্দ
বড়ো বেশি জ্বালাতন করছেন আমাকে। মনের মতো
কোনো একটি পঙক্তিও
লিখে উঠতে পারছি না তাঁর উৎপাতহীনতায়।“
দেশ বিভাজনে শামসুরের কাছে জীবনানন্দ আজ অন্য দেশের কবি। কিন্তু সাহিত্যকে তো আর কাঁটাতার দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না- তা হয়ে ওঠে বিশ্বজনীন। কবির খাতায় আজ অমাবস্যা নেমে এসেছে। কবি কোন চিত্রকল্পই খুঁজে পাচ্ছেন না, শেষে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন জীবনানন্দের প্রভাবের কথা। জীবনানন্দের চিত্রকল্প দিয়েই তিনি কবিতার ডালা সাজাতে চেয়েছেন। কবি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন এভাবে-
“আট্কে না রেখে তাঁরই শব্দগুলোকে আনকোরা পরিপ্রেক্ষিতে
স্থাপন করে কুড়িয়ে নেব অক্ষরগুলো, খাতার
অমাবস্যাকে বদলে দেব পূর্ণিমায়।
দেখি তিনি কী ক’রে
আমার নিজস্ব পঙক্তিমালার মাঝখানে এসে দাঁড়ান ।“
প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘জীবনানন্দ’ কবিতাটি স্থান পেয়েছে ‘সাগর থেকে ফেরা’ কাব্যে। জীবনান্দ যেমন প্রকৃতির কবি তেমনি নগর কলকাতার কবি। জীবনানন্দ যেমন নির্জনতার কবি তেমনি নগর কলকাতার কবি। জীবনানন্দের এই সমস্ত সত্তাকে কবি মিলিয়ে দিয়েছেন। নগর কলকাতার ট্রাম, বাস, ট্রেন যেমন তিনি উপলব্ধি করেছেন তেমনি ধানসিঁড়ি নদী থেকে রূপসী বাংলা, বাংলার প্রকৃতি তিনি গভীর ভাবে দেখেছেন। কিন্তু কবি আজ আর নেই। কিন্তু বাংলার কাছে তিনি রেখে যান এক সবুজ প্রত্যয়-
“ নেই সেই নাগরিক আর
নগর- আত্মার কাছে নিবেদিত হয়ে
রেখে গেছে তবু এক সবুজ প্রত্যয়।“
এই সবুজ প্রত্যয়ের সত্য যেন বহুস্বরিক ভাষ্যে পরিণত হবে। তবে সমস্ত সত্যকে যেমন মেনে নেওয়া যায় না তেমনি বহু সত্যকেই মেনে নিতে হয়। মৃত্যু তেমনই এক সত্য যা মানতে না চাইলেও অবশেষে স্বীকার করতে হয়। দেহ থাকে না, থেকে যায় অঙ্গীকার, বাণী ও জীবনদর্শন। সেই জীবনদর্শন বিপন্ন বিস্ময়ই যেন পরবর্তীকালের কবিদের হৃদয়ে প্রবাহিত হয়ে গেছে। কবি যেন তাঁদের কাছে প্রেরণা, কবিতালক্ষ্মী। সেই অনুভব কবি বহন করে চলেছেন।
নারীদের কথা প্রথম নারীদের মতো করে বলেছিলেন কবিতা সিংহ। নারীচেতনার যে পাঠ শুরু করেছিলেন কবিতা সিংহ তাকেই বৃহৎ ব্যপ্তি দেন মল্লিকা সেনগুপ্ত। নারীদের নিজস্ব অধিকার নিয়ে তিনি সরব হয়েছেন। মল্লিকা সেনগুপ্তের প্রায় প্রত্যেক কবিতাতেই নারীদের স্বাধিকারের কথা। তিনি সবসময়ই নারীদের পুরুষের সমকক্ষ বলে মনে করেছেন। তাঁর ‘ ও জানেমান জীবনানন্দ বনলতা সেন লিখছি’ কাব্যটি প্রকাশিত হয় ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে। নাম কবিতাতে জীবনানন্দের নায়িকা ও তাঁর কবিতাকে আধুনিক কালের প্রেক্ষাপটে বিচার করেছেন। জীবনানন্দের নায়িকাদের নিয়ে তিনি নারী চেতনার ভাষ্য রচনা করেছেন। একবিংশ শতাব্দীর সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি সমস্তই মিলিয়ে দিয়েছেন। কবির কল্পনার নায়িকাদের তিনি আধুনিক যুগের বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করিয়েছেন। বৃহৎ কবিতায় গদ-পদ্য ও শব্দ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তিনি কালের যে ব্যাপ্তি দিয়েছেন তা অবশ্যই প্রশংসার। মল্লিকা সেনগুপ্তের সমস্ত কবিতা বাদ দিয়ে শুধুমাত্র এই একটি কবিতা দিয়েই পাঠক কবি মনের সম্পূর্ণ পরিচয় পেতে পারেন। সেদিন কবি সুন্দর নারীদের নিয়ে প্রেমের রহস্যজাল বুনেছিলেন, মেয়েদের ইচ্ছা মতো ব্যবহার করেছেন। তবে জীবনানন্দের আগেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কুসুম কিন্তু প্রত্যাখ্যানের ভাষা তৈরি করেছিল। আজকের নারীরা আর পুরুষের বন্ধন জালে বন্দী নয়। আজকের নারীরা পুরুষকেই কাছে ডেকে নেয়, এ যেন কবির ভাষায়- ভালোবাসলে কাছে যেতে পারি আবার নাও যেতে পারি। জীবনানন্দের কল্পনা জগতে একাধিক নারী এসেছে তবে তিনি বনলাতাকেই সার্বাধিক প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই কবি আধুনিক নারীচেতনার মনন থেকে প্রশ্ন তোলেন বনলতা সেনকে বাদ দিয়ে অন্য নারীদের দিকে কেন নজর ? এ যুগের বনলতা আর অন্ধকারে বসে থাকে না। পরিবর্তিত পৃথিবীতে নারীরা আজ বেরিয়ে এসেছে, তাই বনলতা আজ র‍্যাম্পে হেঁটেছে। কবি আজ বনলতা সেনের বেনামীতে নতুন যুগের নারী মননের মহাকাব্য লিখতে চেয়েছেন। তাই কবি বলেন-
“ তোমাকে ডাকছি আমরা নতুন পাঠে
দেখে যাও এসে, শিখে যাও এসে জমানা
জীবনানন্দ তোমার ও যুগ ফালতু
আমার বিশ্বে দিক বিদিকের ইশারা।“
মল্লিকা সেনগুপ্তের কাব্য প্রান্ত থেকে নগরের নারীরা স্থান পেয়েছিল। আর সেই সব নারীদের মধ্যে তিনি প্রতিবাদের ভাষা সঞ্চার করেছিলেন। তাই মাওবাদী নারী থেকে দিনমজুর নারীরাও স্থান পেয়েছিল। তাই এযুগের বনলতাদের রাইফেল নিয়ে নামতে হয়েছে পথে। তেমনি নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বলেছেন কবিকে। শুধু প্রেমিকা বা গৃহিণী নয় সমযোদ্ধা হিসেবে ভাবতে বলেছেন নারীকে-
“ শোনো গো জীবনানন্দ,তুমি জানেমন
যদি ভালবাসা চাও, ভালবাস সমযোদ্ধা নতুন নারীকে
যদি ভালবাস চাও, রুগ্ণ প্রেমিকের গাছে জল দিয়ে টবে।“
বিবর্তিত পৃথিবীর ক্লান্তময় জীবনে নারী আর আজ পুরুষের উপর নির্ভরশীল নয়। স্বাধীনচেতা নারীরা নিজেদের জীবন সন্ধানের পথ নিজেরই করে নিয়েছে। সেই জীবনে যেন পুরুষ বাধা না দেয়। পুরুষ যদি নারীকে ভালোবাসে তবে যেন বন্ধনে আটকে না রাখে। সেদিনের নারীরা আজ নেমেছে পথে-
“ কী বললে, পালতে গেছি, তাই তুমি চিনতে পারোনি ?
পরনে ডেনিম জিন্স, টপলেশ সমুদ্র সফেন
পাখির নীড়ের মতো চোখে তার আইশ্যাডো ঘন মেঘ নীল
মেক ওভারে পাল্টে গেছে সেদিনের বনলতা সেন।“
সেদিনের বনলতা সেনরা আজকের অরুন্ধতী রায়। সেদিনের বনলতারা আজকের নেতামন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি। তেমনি রয়েছে শোষণেরও ইতিহাস।, ধর্ষিতা মাতা কন্যার আর্তনাদের ইতিহাস। আসলে, মল্লিকা সেনগুপ্ত নারীর জীবন যন্ত্রণার মর্মকাতরতার বিস্ফরণ ঘটিয়েছেন এ কবিতায়। শুধু জীবানানন্দ নয় , পুরাণের নারীদের ও পরিবর্তিত সময়ে বঞ্চিত নারীদের তিনি লড়াকু করতে শিখিয়েছেন। নারীরা স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকুক এই ছিল তাঁর অন্তরের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু বাংলা কবিতার দুর্ভাগ্য অকালেই সেই কবিকে আমরা হারিয়েছি। মল্লিকা বাঁচলে নারীজীবনের প্রতিবাদের এক মহাকাব্য হয়ত তিনি রচনা করে যেতে পারতেন। আর যা তিনি রেখে গেছেন তাই বা কম কি ! হাসপাতালের বেডে মৃত্যুশয্যায় লড়েও তিনি নারীদের জন্য লিখেছেন। নিজের আত্মচেতনার সঙ্গে যেন ভারতীয়ত্ববোধকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন। এই বাঙালিত্ব ও ভারতীয়ত্ববোধ হল নারী চেতনা ও নারী জাগরণের অভিলাসলব্ধ এক বোধ। তাই তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেও লিখে চলেন-
‌ “ কিন্তু না গো, এত সহজে আমি মরব না। লড়াই
চালিয়ে যাব যতক্ষণ আছি।
আমাকে বাঁচতে হবে।
আমাকে লিখতে হবে, সেই শেষ মহাকাব্য,
যা আমি
তোমাকে নিবে লিখব- বনলতার চিঠি
জীবনানন্দকে।“
‘আমি আর জুলেখা ডবসন’ কবিতায় মল্লিকা সেনগুপ্ত আবার আক্রমণ করেছেন জীবনানন্দকে। জীবনানন্দের জীবনে শত বেদনা থাকলেও কবিতায় তিনি কিন্তু রোমান্টিক। নারীচেতনার রোমান্টিক মননে তিনি বনলতা, সুচিরিতা, সুরঞ্জনাদের নিয়ে ধানসিঁড়ি নদী থেকে ঘুরে বেরিয়েছেন মিশর থেকে চিনে। নারীই যেন কবিদের কাছে কল্পনার, প্রেমের, রোমান্টিকতার হাতিয়ার। আমরা জানি সুনীলের ‘নীরা’র কথা, বহু কবিতাব কবি সেই অন্বেষণ করে গেছেন। তাই কবি প্রশ্ন তোলেন-
“ কী লিখেছিল রে জীবনানন্দ !
কী পেয়েছে তোর মধ্যে !
তোকে দেখলেই পুরুষ কবিরা
কী খুঁজে বেড়ায় পদ্যে।“
জীবনানন্দের কাব্যে পতিতা, ধর্ষিতা ও বঞ্চিত নারীরা স্থান পায়নি। প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প কবিতায় বঞ্চিত পতিতা নারীরা স্থান পেলেও দেঠশভাগের মতো শোচনীয় অবস্থাতে বসেও জীবনানন্দ নারীদের নিয়ে কল্পনায় ভেসে গেছেন, তবে তিনি কিন্তু প্রবল ভাবে সময় সচেতন। কল্পনায় নারীদের নিয়ে তিনি পৃথিবীর নানা দেশে ঘুরেছেন। কিন্তু বঞ্চিত নারিদের নিয়ে কবি প্রশ্ন তোলেন-
“ আমাদের কেউ স্বপ্নে দেখে না
হম্বিতম্বি ঘেন্না
আমাদের নিয়ে জীবনানন্দ
একটাও লিখলেন না !”
পুরুষ শাষিত সমাজে নারীচেতনার কথা বলতে গিয়ে কম লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয় নি কবিকে। কিন্তু সমস্ত লাঞ্ছনা, ব্যঙ্গ বিদ্রুপকে পিছনে ফেলে দিয়ে কবি কলম নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। জীবনানন্দ যে নারীদের নিয়ে স্বপ্ন বুনেছিল সেই নারীরা যেন এই একবিংশ শতাব্দীতে প্রতিবাদের কলম নিয়ে এগিয়ে এসেছে। কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত কাব্য লেখার প্রেরণা পেয়েছিলেন জীবনানন্দের কাব্যপাঠে। তাই ‘একশো আলোক বছরে’ হতাশার সুরে বলেন-
“ জীবনানন্দ তোমার জন্য
এত হেনস্থা সইছি
তোমার কবিতা পড়েই তবু তো
মারের ওজন বইছি।“
বাংলা কাব্যের পরিবর্তনে নতুনস্রোত আনার জন্য জীবনানন্দকেও লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছিল। সেদিন তিনি সমালোচকদের উত্তর দিয়েছিলেন কবিতা লিখে। মল্লিকা সেনগুপ্ত কাব্য পরিক্রমায় যেন জীবনানন্দ দাশেরই দোসর। তাই সমস্ত লাঞ্ছনা সহ্য করে বলে ওঠেন- ‘আমি তো তোমার বৃন্দা’। সমাজ জীবন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে কবি আজ জীবনানন্দের কাছে প্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন। সেই প্রেরণা এসেছে কাব্য পাঠে-
“ একটি কিতাব রূপসী বাংলা
বনলতা সেন একটি
সাতটি তারার তিমির এবং
নির্জন এক ব্যক্তি।“
সময়ের ব্যবধানে জীবনানন্দের দর্শন ঘটেনি কবির। সেই না দেখার অপ্রাপ্তির বেদনা কবি খুঁজে পেয়েছেন জীবনানন্দের সৃষ্টির বর্ণমালার অক্ষরে। এ কবিতায় কবি নিজেকে বঞ্চিত নারীর প্রতিনিধি হিসেবে দেখেছেন। কবি রাধা সাজতে চেয়েছেন, যে রাধারা হারিয়ে যায় পুরুষের কোলাহলে। সুরঞ্জনা নয় কবি বাউল, বৈষ্ণবী হতে চেয়েছেন। বঞ্চিত নারীদের প্রতিনিধি হয়ে কবি বলেন-
“ পৃথিবীর ধূলিকন্যা আমরা
কাঁদছি এমন অঝোরে
জীবনানন্দ তোমার জন্য
একশো আলোক বছরে।“
কবির জীবিতকালে প্রকাশিত কবিতা ছাড়াও বহু কবিতা অপ্রকাশিত থেকে গিয়েছিল। জীবনানন্দের মৃত্যুর পর সেগুলি প্রকাশিত হতে থাকে ধীরে ধীরে। পাঠক আবিষ্কার করে অন্য এক কবিকে। উপন্যাস, দিনলিপি থেকে অদ্ভুত ভাবে ব্যক্তি জীবন ও কবিসত্তাকে আবিষ্কার করা যায়। কন্যা পিতার কবিতা থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপলব্ধি করেছে। বর্তমান কলকাতা, অবসন্ন সময় থেকেই বিভাস রায়চৌধুরী ‘জীবনানন্দের মেয়ে’ কবিতায় প্রশ্ন তোলেন-
“কোনোদিন তরুণ কবিরা
আমাকে ভেবেছে কেউ ?
জীবনানন্দের এই কখনও না –ছাপা কবিতাকে ? “
শর্মিষ্ঠা ঘোষের ‘শুনুন জীবনানন্দ’ কবিতাটি স্থান পেয়েছে ‘এখন সংহত অন্দের’( ২০১৬) কাব্যে। উত্তর আধুনিক প্রজন্মের কবি শর্মিষ্ঠা ঘোষ। শব্দ ব্যবহারে তিনি আধুনিক জীবন যন্ত্রণা ফুটিয়ে তুলতে চান। বিশ্বয়ন ও মননবিশ্বের পরিবর্তনের সাথে সাথে জীবন যাত্রার শব্দ ব্যবহারের যে পরিবর্তন তা তাঁর কবিতায় ধরা পড়ে। আজকের প্রজন্ম থেকে কবি প্রশ্ন তোলেন –
“ লোহার কঠিন প্রণয় ছেড়ে নাগরিক চঞ্চল
পালন করেছি জীবনসুধা আলপথে হেটে।“
প্রেম, প্রেমের আখ্যান, প্রেম সম্পর্কে ব্যক্তি ধারণা ও প্রেমের মূল্যায়ণ পাল্টে গেছে অস্থির জটিল সময়ে। কেন্দ্র থেকে প্রান্তে নাগরিক কোলাহলে একে অপরকে আপন করে নেওয়ার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি তোমার সারাজীবন পাশে আছি পাশে থাকার মানুষগুলো আগে পিছুটান দেয়। আমি তোমাকে ভালোবাসি একথা যে কত বড় প্রতারণা, মিথ্যা এই অবক্ষয়িত পৃথিবীতে সেই সব প্রশ্ন নগর- প্রান্ত, কেন্দ্র- কেন্দ্রাতীত ফিরে এসেছে কবিতায়। শর্মিষ্ঠা ঘোষ ‘সবাই বনলতা নয়’ কবিতায় নারী চেতনার পক্ষ থেকে প্রশ্ন তুলেছেন। রবীন্দ্রনাথ যে বঞ্চিত মালতীর কথা বলেছিলেন সেই বঞ্চিত মালতীরাই এসেছিল জয় গোস্বামীর কবিতায়। বনলতা, আশালতা, কলমীলতার মতো বাংলাদেশের হাজার হাজার নারীরা বঞ্চিত হয়েছে পুরুষের লালসার কাছে। বাংলাদেশের গ্রাম্য মেয়ে বনলতাকে নিয়ে হাজারো কল্পনা করতে পারেন কবি কিন্তু মালতীরা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। আজ বনলতা প্রেমের নায়িকা, কবির মানসী কল্পনা, পরবর্তী কালের কবিদের প্রেমের অবয়ব মূর্তি। কিন্তু কবির কাছে বঞ্চিত বনলতা ভাগ্যহত বনলতা, নিপীড়িত, শোষিত বনলতা। তাই কবি প্রশ্ন তোলেন-
“ পাখির নীড়ের মত ভালো কি মন্দ জানেনি হতভাগী
বোঝেনি সে, কবিতার ভাষা কতটুকু বিশ্বাসী হয় !
প্রেম ভস্মরাশি তার হুটপাট ঠোঁটে করে নিয়ে গেছে
তোমারি সে পোষ মালা চিল।“
জীবনানন্দ বাংলা কাব্যে এক মাইলস্টোন। তরুণ কবিরা আধুনিকতার মন্ত্রদীক্ষা নিয়েছিল তাঁর কবিতা পাঠে। শুধু কবিতা নয় জীবনানন্দকে নিয়ে উপন্যাসও লেখা হয়েছে। কাব্যচেতনার পাশাপাশি এভাবেই বাংলার কবিরা প্রিয় কবিকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

143