১০/২/২০১৯, কুলিক রোববার :

কল্পপথে কাব্যরথে : এক রোমান্টিক জীবনকাব্য
– পুরুষোত্তম সিংহ
‘কল্পপথে কাব্যরথে’(২০১৮) চড়ে কবি যাদব চৌধুরী বাস্তবের মাটি থেকে হাওয়ার আকাশে উড়ান দিতে চেয়েছেন। বহেমিয়ান জীবন নয় জীবনের অতলন্ত গভীর রহস্যে ডুব দিয়েছেন।কাব্যের আখ্যাপত্রে রয়েছে একটি চরণ- ‘রাধিকার মতো সেঁটে/ রকম ভেঙে চলা রোমান্টিক কবিতা।‘- হ্যাঁ তিনি রোমান্টিক কবিতাই লিখেছেন, কিন্তু সেই রোমান্টিকতায় মিশে থাকে গণ্ডিবদ্ধ জীবনের সাতকাহন। আবার ব্যঙ্গের চাবুক মারতেও পিছপা হন না- অন্নহীন নারীর নাম অন্নপূর্ণা, তবে সেখানেও রয়েছে শাশ্বত সত্যের সন্ধান-“ একজন ছাড়া জগৎ চলে না এ ধারণা বড়ো মিছে।“ ‘শঠে শাঠ্য চিত্রনাট্য’, ‘ খালি পেট’ কবিতায় আছে গল্পের আভাস। শোষণ , যন্ত্রণা, দারিদ্র্য ও বাঁচার ইঙ্গিতের এক আশ্চর্য কোলাজ ফুটে ওঠে সেখানে।
## ৫০টি কবিতায় আপাত সরলতায় তিনি জীবন রহস্যের খোঁজে অগ্রসর হয়েছেন।অনাবশ্যক শব্দাড়ম্বর বা জটিলতা নয় শ্রুতিমধুর শব্দচয়নে ছন্দের দোলায় কবিতাকে দুলিয়েছেন।তিনি হালকা চালে গভীর জীবনবেদ রচনায় দক্ষ-‘ দল বদলের তোড়ে পরাজয় জনতার’। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে হয়েছিল লেখক কলম পেষা মজুর,সেখান থেকে যাদব চৌধুরী সরে এসে ঘোষণা করেন- শব্দের শ্রমিক নয় কোনো / শব্দের শিল্পী বলো তাকে’। কবি যাদব চৌধুরীর কাছে কবিতা সত্য দর্শনের অন্বিষ্ট পথ। চালচিত্রের উদ্ভাসিত সত্যের জটিল গহ্বর খুঁজে পান কবিতায়- ‘সত্য জীবন, ঈশ্বর তাই- কবিতা বলে সত্য’।
##বিবর্তিত পৃথিবীর অস্তচক্রে সময়ের মরণফাঁদে মানুষকে কিভাবে বদলে যেতে হয় তারই চিত্র রয়েছে ‘শৈশব’ কবিতায়। সত্তা কিভাবে অভিশপ্ত হয়, ভালোবাসা কিভাবে আকাঙ্ক্ষার কাছে বিসর্জিত হয় তা উদ্ভাসিত হয়েছে। তবুও মানুষ বেঁচে থাকার ট্রমা আবিষ্কার করে, নবান্ন হয়ে ওঠে ‘আনুষ্ঠানিক’। আবার আত্মসমীক্ষণে উপস্থিত হন ‘অপরাগতা’ কবিতায়। অভিমানী বালকটির ইচ্ছা ছিল কিন্তু কিছুই হয়ে ওঠে নি। এই হয়ে না ওঠার কাব্য তিনি রচনা করেন, যেখানে মিশে থাকে দুঃখ- “দিনে দিনে বেড়ে গেছে না পাবার দুখ/ জগৎ সংসার মাঝে লজ্জানত মুখ !” যাদব চৌধুরীর দুঃখে মিশে থাকে সুখের জোয়ার। আপাত ভাবে পাঠক ভাবেন লক্ষ্য বস্তু হয়ত অন্য কেউ। কিন্তু তিনি সচেতন ভাবে সমকালকেই ব্যঙ্গ করে যান ‘দুঃখবাদ’ কবিতায়।
## নিজেকে দেখার এক জলজ দর্পণ যেন কবিতা। অভিশপ্ত পৃথিবীর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বেঁচে থাকার অবলম্বন যেন কবিতা।আজ আর কবিতাকে ছুটি দেওয়ার পালা নেই,ভীষণ ভাবে আঁকড়ে ধরার পালা।তাই কবি বলেন- “সবশেষে তাকে ফিরতে হয় তার নিজের কাছে / কবিতায় “। আবার সেই কবিই গর্জে ওঠেন ‘পরিবর্তন’ কবিতায়- স্বাধীন আমরা বলছি কাকে / মানুষ তো নয়,পতাকাকে”। জনজীবনের এই ক্লান্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে আবার কখনো আশ্রয় নেন অতীত চারিতায়। সমকালকে সামনে রেখেই তিনি এগিয়ে যান। কখনো নস্টালজিক মন, কখনো ভালোবাসার গহীন গাঙে ডুব, আবার কখনো জীবনসমুদ্র মন্থনে অমৃত পিপাসু- সব মিলিয়ে এক রোমান্টিক কবিসত্তা ফুটে ওঠে এ কাব্যে।
## সহজ সরল ভাবেই তিনি জীবনের কথা বলেছেন। আসলে তিনি জীবনকে দেখেছেন চশমাবিহীন নির্ভেজাল মনন দিয়ে। তিনি জীবনের পঙ্কিল বারি সঞ্চয় করতে চান না, সহজিয়া জীবনের অনললব্ধ পঙ্কিলতা তাঁর কাব্যে নেই ,আছে মৃদুমন্দ বাতাসে ভেসে যাওয়া জীবন প্রবাহের কথা-“ সহজ জীবন সহজ ভাষায় কাব্যে আসে”।

43