২০/০১/২০১৯, কুলিক রোববার :

ভালোবাসার অন্য গল্প

সোমা সরকার

এই শুনছিস..
ভাবছি একটা গল্প লিখবো। ঠিক তোর মতো। তোর মতো গুছিয়ে। একটু প্রেম একটু আবেগ অনেকটা অভিমান আরো অনেক কিছু। লিখবো নানা রংএর গল্প।আমার গল্পে কোনো মেকি রাজকুমার কিংবা রাজকুমারী থাকবে না৷থাকবে রক্ত মাংসে গড়া মানুষ।

আচ্ছা, শোন….
মনে আছে তোর…..
জবা দির কথা?
যাকে তুই দেখতে চেয়েছিলিস। আমার প্রথম লেখা জবা দিকে নিয়েই। পড়িস। তোর সময় কম জানি।খুব ব্যস্ত। তবুও বলবো পড়িস। এছাড়া তোর কাছে আমার এখন আর কিছুই চাওয়ার নেই।

জবা দি, যে আমার একদম পাশের বাড়িতেই থাকতো। যার জানালার উল্টো পাশে আমার পড়ার টেবিল ছিলো। জানিস, ওর সাথেই পাল্লা দিয়ে পড়তাম। আমাদের এখানে জবাদি-ই প্রথম আর্টসে ফার্স্ট ডিভিশনে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে। ওটা ৯৮ সাল। ওর গুণ হলো ইংরেজী বাদে বাকি সব ও নিজেই পড়তো। টিউশন ছিলোনা। আর থাকবেই বা কেমন করে? বাবা ছিল না। দাদাটা লম্পট। মা অসুস্থ। পোষ্ট অফিসে কিছু জমানো টাকা থেকে সুূদ আর জবাদির টিউশনের আয়। তারপরেও অমন রেজাল্ট মন কেড়েছিল সক্কলের। আমি কলেজে আসার দুবছর আগেই জবা দি নার্সিং পড়ার সুযোগ পায়। সরকারি কলেজ, খরচ সামান্য তারপর আবার পাশ করলেই চাকরি। অমন সুযোগ কেউ ছাড়ে? তারপর আবার অভাবের সংসার। পাড়া প্রতিবেশী সকলেই খুব সাহস দিয়েছিল। তাই মনে একটু ভয় থাকলেও জবাদি তৈরি হয়ে যায় নতুন কিছু করার জন্য। যেদিন জবাদি কোলকাতা রওয়ানা হবে তার আগের দিন অনেক গল্প হলো। বললো জানিস সোমু, প্রথমে আমার নার্সিং এ যাবার ইচ্ছা তেমন ছিল না। তবে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রাজি হয়ে গেলাম। আমি জবা দিকে বলেছিলাম ইচ্ছা যখন ছিলোনা ফর্ম ফিলাপ করেছিলে কেনো? আমাকে থামিয়ে জবা দি বললো প্রশ্নটা দামী কিন্তু হাওয়া বুঝিস তো। সেই হাওয়ায় ভেসে গিয়েছিলাম। বান্ধবীরা করলো আমিও করলাম। ওরা পেলো না আর আমি পেলাম।

একটু দীর্ঘশ্বাস….
তারপর আবার বললো ও.. যা হবে দেখা যাবে। পাশ করলে একটা সরকারি চাকরি তো হবে। বল আর কি চাই এছাড়া?

একটু শাসনের সুরেই আমাকে বললো পড়াশোনাটা ভালো করে করবি। বুঝলি। চাকরি তোকে পেতে হবেই।

পরের দিন জবা দি ওর মায়ের সাথে কোলকাতা চলে গেলো। তখনি আমিও মনে মনে ঠিক করলাম নিজের পায়ে আমিও দাঁড়াবো। দাঁড়াতে আমাকে হবেই।

এরপর অনেক দিন কেটে গেছে। আমিও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে কলেজে। ইতিহাসে অনার্স নিয়ে। নতুন কলেজ নতুন পরিবেশ। গার্লস স্কুলে পড়া মেয়ে হঠাৎ করে অন্য পরিবেশে।
দিব্যি বিন্দাস কাটছে সময়। ভয় মেশানো ভালোলাগা। উফ্ কি দারুন সময়।

এরই মধ্যে বার কয়েক জবা দি বাড়ি এসে ঘুরে গেছে। এবার এসে আমার রেজাল্ট শুনে খুব খুশি হয়ে জবা দি বললো, আমি জানতাম তুই যে আমার থেকেও ভালো রেজাল্ট করবি। তা নার্সিং এর ফর্ম ফিলাপ করবি না? করে ফেল। তোর চান্স পাক্কা। আমি কিন্তু জবা দিকে অকপট ভাবেই বললাম ভয় লাগে। আমি করবো না। আর তুমিও করতে চাওনি প্রথমে। এখন আমাকে বলছো?

জবাদি একটু থেমে আমাকে বললো, ধুর বোকা। আমি তো মনে মনে ভয় ছিলো বলে বলেছিলাম। এখন যখন ট্রেনিং করছি তখন মনে হচ্ছে ভগবান আমাকে এই কাজের জন্যই পাঠিয়েছে। মানুষকে সুস্থ করে তোলা, সেবার করার সুযোগ ভাগ্যবানরা পায়। নার্স না থাকলে ডাক্তার একা সব পারবে বল?একটু হেসে বললো, আমরা বড়ো ডাক্তার নাইবা হলাম। কিন্তু আমরা হলাম গে মিনি ডাক্তার। বুঝলি সোমু।

আর আমাদের এই বীর পালোয়ান নার্সিং ট্রেনিং কি কারণে ভয় পায় শুনি?? জানিস আমি কিন্তু সেদিন সোজা বলেছিলাম রক্ত।তাই শুনে কি হাসি জবা দির। হাসি দেখে আমার কিন্তু মনে মনে খুব রাগ হয়েছিলো। খুব। জবা দি বুঝেছিলো। তাই হয়তো হাসি থামিয়ে বললো ধুর, বাদদে তো ওসব। এখন বল কলেজ কেমন হচ্ছে। বন্ধু টন্ধু হলো? মুখটা ভার করেই বলেছিলাম বন্ধু হবে না কেনো? হয়েছে তো। অনেক।

জানিস, এরপরই বদমাশটা খপ করে হাতটা ধরে বললো বন্ধু….. বুঝেছিস? সেই বন্ধু।এবার একটু থামিয়ে বললাম সেই বন্ধু মানে কোন বন্ধু?? তুমি কি বলছো বলোতো জবা দি।
হাত ধরে আঙ্গুল টানতে টানতে বলতে শুরু করলো সেই বন্ধু মানে সেই বন্ধু যে অন্যদের থেকে একটু আলাদা হয়।না না একটু না, অনেকটাই। যাকে দেখলে মনটা খুশিতে ভরে যায়।মনে হয় তার সাথে কথা বলেই যাই। যার সব কিছুই ভালো লাগে। যে তোকে একটু বেশি কেয়ার করবে। আমি তার কথা বলছি বুঝলি সোমু রানী।

এবার আমার পালা বুঝে গেছি। আমি ধরলাম তাই জড়িয়ে। কি ব্যাপার জবা দি। খুব প্রেম প্রেম গল্প ঝাড়ছো?? ব্যাপারটা কি? সুযোগ পেয়েছি। এবার ছাড়া যায় তুই বল? আমাকে এতক্ষণ ধরে হেজিয়ে আসলে ব্যাটা নিজের কথা বলছে। এটা তো জবা দির মুখ থেকে বের করতে হবেই।

আমার থেকে বয়সে বড়ো হলেও সেদিন কখন যে দুজন সমবয়সী হয়ে গেলাম খেয়াল করিনি।জানিস একটু চাপাচাপি করতেই বলে ফেললো এই রঙ্গিন কথার আসল কারন৷ প্রেমে পড়েছে জবা দি। চুটিয়ে প্রেম করছে। জানিস কার সাথে?? ওর থেকে এক বছরের বড়ো এক হবু ডাক্তারের সাথে। রাজাদার কথা বলতেই চোখগুলো কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠলো জবা দির। মাঝে আমি খালি একটু ফোড়ন কেটে বলেছিলাম মাত্র এক বছরের বড়ো.,? জবা দি শান্ত ভাবে উজ্জ্বল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো ভালোবাসা কি বয়স বোঝে?

তারপর থেকে আসলেই রাজা দার কথা। খুব ভালো লাগতো শুনতে। আর ভালো লাগার কারন ছিলো। মনে প্রেম থাকলে প্রেমের কথা শুনতে ভালো লাগবে নাই বা কেনো? আমিও যে তখন তোর নেশায় বুদ ছিলাম। পড়ার পালে কম প্রেমের পালে বেশি হাওয়া লাগছিলো তখন।আমারো তো তখন একি অবস্থা। তুই তুই আর তুই। আচ্ছা তুই সব ভুলে গেছিস তাই না রে। আমার কথা মনে পড়ে তোর? ভাবিস আমি কেমন আছি এখন?কেমন হয়েছি দেখতে? কি করছি?

জানিস আমি তোর ঠিকানা এখন জানার চেষ্টা করিনা আর। খালি তোর বই গুলোর, তোর লেখা গুলোর খোঁজ রাখি। কখন বের হবে..। আচ্ছা তুই এখনো ছবি তুলিস? এখনো বনে জঙ্গলে গিয়ে ওঁতপেতে বসে থাকিস পাখিদের ছবি তোলার জন্যে??এখন তোর সঙ্গ কে দেয় রে? তুই নিশ্চই এখন সিগারেটের পরিমানটা আরো বাড়িয়েছিস?

…………

প্রেম বুঝি এমনি হয় তাই নারে। আনন্দের থেকে দুঃখ বেশি।

জানিস, জবাদির প্রেমটার মাঝ পথে ছন্দপতন হয়েছিলো। তবুও ওরা সারা জীবন একে অন্যের হয়ে থেকে গেলো।
রাজা দা আর জবা দি একসাথে পথ চলতে পারেনি বেশি দিন…….

উফ্…
এমন কি করে হলো?
কেন হলো?
খালি ভাবি।

আমি একটা পরীক্ষা দিতে বাইরে গিয়েছিলাম। বাড়ি এসে শুনলাম জেঠি কোলকাতা গেছে। জবা দির কিছু হয়েছে। কলেজ থেকে ফোন করেছিলো। খুব তাড়াতাড়ি যাওয়ার কথা বলেছে। জেঠি মালদা থেকে ট্রেনে গেছে। সাথে এবার লম্পট দাদা অজয়টাও গেছে।
দশ দিন পর ওরা তিনজন বাড়ি ফিরলো। জবা দির চোখের চারিদিকে কালো দাগ। দেখে মনে হয়েছে কত রাত ঘুমায়নি।

মায়ের কাছে দেখলাম জেঠি এসে গুজগুজ করে কি সব বলছে। পরে মায়ের কাছে জানতে চাইলে বলে সব কিছু অতো জানতে হবে না। এখনো অতো বয়স হয়নি।

এটাই একটা জ্বালা। মায়েদের কাছে সন্তানদের বয়স কখনোই হয়না পাছে নিজের বয়স বেড়ে যায়। কিন্তু জানতে তো আমায় হবেই। জবাদির বলে কথা।

কিছু দিন চিকিৎসা চলার পর জবাদি আগের থেকে অনেকটাই সুস্থ। আমি বললাম ফাইনাল পরীক্ষাটা দিবা না গো?জবা দি চুপ। আবার বললাম। এবার হঠাৎ করেই মনে হলো আগ্নেয়গিরি ফাটলো। চিৎকার করে বললো না দিবো না।কি করবি? হঠাৎ চিৎকারে আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম একটু।আমি এমন জবাদিকে আগে দেখিনি।কোনো দিনই না । জবাদির চিৎকারের মা ও জ্যেঠি দুজনে দৌড়ে আসলো। জ্যেঠি আমার দিকে একটু বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে জবা দিকে নিয়ে চলে গেলো। আর আমার মা ঠাস করে গালে একটা লাগিয়ে বললো এই মেয়েটার বোধ বুদ্ধি কোনো দিনও হবে না দেখছি।

আমি একটু অবাক হয়ে উঠানের ওখানেই বসে থাকলাম,যেখানে আমি আর জবাদি দুজনে বসে ছিলাম। দু চোখ গড়িয়ে গাল বেয়ে জল নেমে আসলো।নিজের ওপর রাগ হলো। খুব রাগ। জবা দি আমার সাথে কেনো এমন করলো? মা আমাকে কেনো মারলো? কি এমন বললাম যাতে এমন ব্যবহার করলো ও।

ভাবতে ভাবতে সেদিন রাত কেটেছিল। পরের দিন খুব সকালে জেঠি কলিং বেলটা এসে বাজালো। জেগে থাকলেও ইচ্ছা করে যাই নি খুলতে। একটা অভিমান ছিলো। তাই চুপ করে শুয়েই ছিলাম। মা গেট খুলে এসে আমাকে বললো, ঐ ওঠ। জ্যেঠি তোকে ডাকছে। আমি বললাম ডাকুক গে আমি যাবো না। মা একটু রাগেই বললো যাবো না।

যা বলছি। জবা তোর সাথে কি কথা বলবে বলে ওর মাকে পাঠিয়েছে। এবার আমিও একটু চিৎকার করে বললাম যাবো না বললাম যখন যাবো না না না। ঠিক তক্ষুনি শুনি জ্যেঠি বলছে সোমু তোর জবাদি তোর সাথে কথা না বলে ফাইনাল দিতে কলকাতা যাবেনা বলেছে। তুই চল মা। নইলে ও আবার বিগড়ে যাবে। হয়তো পরীক্ষাটাই আর দেবে না।

এবার একটু শান্ত হয়ে বললাম, তুমি যাও জ্যেঠি আমি আসছি। একটু পরেই আমি উপস্থিত হলাম জবা দির কাছে। একটু দূর থেকেই বললাম, বলো কি বলবা? আমার তাড়া আছে।

জবা দি চৌকি থেকে নেমে নিজেই এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে চৌকিতে বসালো। আর বললো তাড়া থাকলেও আজ তুই আমাকে একটু সময় দিবি।

এদিকে আমি তো মনে মনে ভাবছি, তাড়া আমার নেই। কাল তুমি আমার সাথে খুব খারাপ করেছো। মারটাও জুটে ছিলো কপালে। তাই আজ অভিমান করে ওটা বলেছি। তোমার কথা শুনতে আমি কবে থেকে অপেক্ষা করছি। এই ভাবতে ভাবতেই জবা দি বললো কাল তোর সাথে অমন করাটা আমার উচিত হয়নি রে। sorry বললাম। দেখ কানটাও ধরলাম। কিন্তু এরকম করার কারণটা জানতে চাসনা তুই সোমু।

সুযোগ পেয়েছি। তাই কথা শেষ করার আগেই বললাম হ্যাঁ। বলো।

রাজার কথা মনে আছে তোর…..

আমি বললাম হ্যাঁ। তোমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসতা তো…

কি হয়েছে রাজা দার??

কিছু না। আমার প্রেমের গল্পটা শুনবি নারে সোমু??

আমি একটু অবাক হলাম। বললাম, বলো।
জবাদি এবার বলতে লাগলো। জানিস সপ্তাহে একদিন বাইরে বের হবার সুযোগ পেতাম।বান্ধবীরা মিলে বের হতাম। বেরিয়ে রাস্তায় রাজার সাথে একসাথে চলে যেতাম এদিক ওদিক। ওরাও তো বন্ধুরা বের হতো।

কখনো গঙ্গার ঘাট, কখনো ভিক্টোরিয়া আবার কখনো ময়দান। আমরা দুজন। শুধু দুজন যেতাম।খুব ঘুরতাম। ঘোরাটা শেষ ছয় মাস খুব বেড়েছিলো। কোলকাতা চষে ফেলেছিলাম আমরা দুজনে। অল্প পয়সায় বাসে ট্রামে ট্রেনে কখনো হেঁটে ঘুরেছি। আমাদের প্রেমে টাকা পয়সার দরকার খুব কম ছিলো। দেওয়া নেওয়াটা মনের মধ্যেই আটকে ছিলো। তবে রাজা বার কয়েক আমাকে কিছু উপহার দিয়েছিলো। ওগুলো আমার হস্টেলের রুমে আছে। আর আছে অনেক ছবি। ওর ক্যামেরায় আমাদের ছবি। পথচলতি মানুষকে অনুরোধ, দাদা একটা ছবি তুলে দেবেন। তারপর ছবি।

একটু চুপ থেকে আবার জবা দি বলতে শুরু করলো…

জানিস সোমু, আমার গঙ্গার ঘাট খুব ভালো লাগতো। পাশাপাশি দুজনে হাতেহাত রেখে চোখে চোখ দিয়ে কথা।নদীর ঠান্ডা বাতাস। একটা অন্য পরিবেশ।সেখানে কখন যে সময় পেরিয়ে যেতো বুঝতে পারতাম না। কিন্তু কলেজ হস্টেলে ফেরার চিন্তাও তো থাকতো। ও হাতটা ধরে বলতো বসো তো। না ঢুকতে দিলে কি হবে?
পালিয়ে যাবো তাহলে।পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করবো। তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাবো। আমি বলতাম, রোমিও হুঁশ মে আও। তোমার ডাক্তারির ফাইনাল আর কয় মাস জানো? আমার নার্সিং ফাইনালটাও??? সময় নেই। চলো। প্রেম সাগরে পরে ডুব দিও।

আমি শুনছি আর জবা দির চোখ গুলো দেখছি। এবার কিন্তু চোখটা আগের মতো আর উজ্জ্বল নেই। কেমন যেনো একটা গভীর শূন্যতা।

জবা দি বলেই চললো। জানিস ভিক্টোরিয়া যেতাম। কি সুন্দর স্থাপত্য। খুব সুন্দর। কলকাতা গেলে অবশ্যই দেখবি। জানিস ভিক্টোরিয়ায় আমাদের প্রথম ঠোঁটে ঠোঁট। লজ্জা লেগেছিলো। কিন্তু তারপর বুঁদ হয়ে গিয়েছিলাম। নেশা হয়েগিয়েছিল। শুনি মানুষের এটার ওটার নেশা লাগে। আমাদের ঠোঁটে ঠোঁট লাগানোর নেশা হয়েছিলো। ওটার মধ্যে একটা উত্তেজনা আছে। এক অনুভূতি আছে।

আমি নির্বাক।একদম চুপ। ঘরটাও শান্ত।

সোমু তোকে এগুলো বলতে আমার আর লজ্জা নেই রে। কি সের লজ্জা বলতো? প্রেম কি লজ্জার?

একটু থেমে………..

জানিস সোমু…….

ময়দানে হাত ধরে ঘুরে বেড়ানোর সময় রাজা সেদিন বললো, চলো জবা আমরা ফাইনালের আগেই রেজিস্ট্রি বিয়ে করে নিই। তাহলে বাড়ির লোকের আপত্তি থাকলেও কিছুই হবে না আর।
রাজা কে বললাম চলো। কবে করবা?

সেদিন নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে দেখতে অনেক দেরি হয়েগিয়েছিল হস্টেলে পৌঁছাতে। গেটে তালা পরে গিয়েছিলো। ভয়ে ডাকিনি গার্ড দাদাকে। ফিরে আসি।তারপর দুজনে শিয়ালদাতে একটা হোটেলে যাই। ভালো হোটেল। বড়ো।আধুনিক সুযোগ সুবিধা ছিলো। আমার সামান্য টাকা থাকলেও রাজার কাছে ছিলো। দুজনে মিলে (আমার অনেক কম) টাকা দিই হোটেলর। রাজার চেহারা একটু ভারিক্কি গোছের। আর আমি উঁচু লম্বা। হোটেলে ঢোকার আগেই রাজা বলেছিল আমরা স্বামী স্ত্রী হয়ে উঠবো হোটেলে। তাহলে রুম পেয়ে যাবো।কথা গুলো খুব বোকা বোকা লেগেছিলো। আমি ওর পাশেই দাড়িয়ে ছিলাম ঠিক ওর বৌএর মতো। নাম ঠিকানা লেখা হলো।একটা আইডেন্টিটি কাগজ চাইলো।রাজার কাছে ওর ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিলো। ওটাই দেখালো। হয়ে গেলো। স্যার লাগেজ??? রাজা বললো আমার মিসেস এখানেই নার্সিং ট্রেনিং করে। আমি বাড়ি থেকে ওর সাথে দেখা করতে এসছি।আমার আর কি লাগেজ হবে। ম্যানেজার আর কোনো প্রশ্ন বাড়ায়নি। ম্যানেজারের সাথে কথা বলে অবশেষে চলে গেলাম ৪০১ নং রুমে।পরিস্কার ঘর।খাট, টিভি,ফোন আলমারি সব ছিলো আর সব নতুন।হোটেলটাও নতুন ছিলো। রাজার পরিস্কার পরিচ্ছন্ন সব জিনিস পছন্দ।তাই এই হোটেলে টাকা একটু বেশি লাগলেও এখানেই উঠিছিলো। কি সুন্দর রুম জানিস সোমু। আমি আগে এই রকম হোটেল কখনোই দেখিনি।

হাত পা ধুয়ে একটু খাবার খেয়ে সিনেমা দেখছিলাম। বলতো কোন সিনেমা?
আমি বললাম কোন সিনেমা?? জবা দির উত্তর DDLJ দিলবালে দুল হানিয়া লে জায়েঙ্গে। রাত যত বাড়ছিলো একটা অদ্ভুত নেশা দুজনের চোখেও বাড়ছিলো। দুজন দুজনের কাছাকাছি। হঠাৎ করেই রাজা আমার ঘাড়ে, গলায় হাত বোলাতে লাগলো।

এখানেই আমি জবা দিকে থামিয়ে বললাম, জবা দি থাক এসব। জবা দি বললো এখন কি বাচ্চা আছিস? আমার বলতে অসুবিধা না থাকলে তোর শুনতে কিসের অসুবিধা? আর তুইও তো ঐ একটা কবি না লেখক আরে তোর ঐ বন্ধুটা,যার নাম টা কোনো দিনও বললি না… তার সাথে প্রেম করছিস । বাচ্চা যখন তুই না তখন চুপ করে বোস।

আমিও আর কথা বাড়ালাম না। বললাম বলো।

ঘাড়, কান চুল হাতিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট ………………….

সেদিন সত্যি কোনো বাধা ছিলো না আমাদের মধ্যে। ওর শরীর আর আমার এক হয়ে গিয়েছিলো।নীল আলো। শরীর জুড়ে উষ্ণ স্রোত। স্বর্গ সুখ। দুজনের চোখে মুখে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি।কি ভাবে রাত শেষ হলো বুঝতেই পারলাম না।

হস্টেলে ফিরে আজগুবি মিথ্যা বানিয়ে হস্টেল ইন চার্জ কে জবাব। দেরি হলেও সেই যাত্রায় রক্ষে পেয়েছিলাম।

তারপর…

তারপর কি এমন হলো জবা দি, যে তোমার আজ এই অবস্থা??

জবা দি বললো, তোকে ডেকেছি বলার জন্য বোন। কাউকে না বললে যে পাগল হয়ে যাবো।

এরপরের দুমাসে আমরা বহুবার মেলামেশা করেছি। দুজনের ইচ্ছায়। কারন আমরা জানতাম আমরা বিয়ে করবো।রাজা আমাকে খুব ভালো বাসতো। খুব। ও বলেছিলো আমাকে বিয়ে করতে না পারলে কাউকে বিয়ে করবে না। আমাকে না পেলে ও মরে যাবে। সত্যি আমি ওকে খুব ভালোবাসি জানিস।খুব। ওকে ছাড়া বাঁচার কথা এখনো ভাবতে পারিনা। ও বাড়ি যাবার আগে আমাকে বললো বাবা মায়ের সাথে কথা বলে তোমাকে আমার বাড়ি নিয়ে যাবো। বাবা মায়ের সাথে পরিচয় করাতে।ও বাড়ি গেলো। ফিরেও আসলো। কিন্তু ওর বাড়িতে নিয়ে যাবার কথা আর বললো না। ও বাড়ি থেকে আসার পর আমাকে হাসপাতালে বললো আজ একটু বাইরে যাবে? দরকার আছে। আমি বললাম হ্যাঁ। বিকেল ৪ টা নাগাদ বাইরে বের হলাম। আজ কোনো হোটেল নয়। আজ গঙ্গার ঘাট। দুজনেই বসে আছি। ও আমার হাতটা বুকের কাছে নিয়ে ধরলো।বললো হার্টবিট শুনতে পাচ্ছো? বললাম হ্যাঁ।

আমি একটু চুপ থেকে রাজাকে বললাম, কি হয়েছে তোমার? বাড়ি থেকে ফেরার পর তোমাকে উদাস লাগছে। ও বললো, না তেমন কিছু না। বাড়িতে তোমার কথা বললাম।
কি বললো?
চলবে না তো?
আমি জানতাম। অসুবিধা কি? তুমি আমি এখানে। আমরা এখানেই থেকে যাবো। কি বলো..
আমি একটু রাজাকে হাল্কা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হলো না। ও আমার হাতটা আরো জোরে চেপে ধরে বললো, বাবা বলেছে আমার ঘরে কোনো নিচু জাতের মেয়ে আসবে না। প্রয়োজনে উঁচু জাতের ভিখারীর মেয়ে আনবো তবুও নিচু জাত না। মা, বাবা, ঠাকুমা সবাই কে খুব বোঝানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু হলো না। বরং উল্টে আমাকে বললো তোমাকে বিয়ে করলে ওনারা নাকি আত্মহত্যা করবেন।মাথার দিব্যি নিয়েছি তোমাকে ভুলে যাওয়ার।

এবার আমার ঝটকা লাগলো।

হঠাৎ মনে হলো ওর হার্টবিটটাও অনেক বেড়ে গেছে ।

আমার মাথাটা কেমন করতে লাগলো।

রাজা এবার আমাকে জড়ি ধরে কাঁদতে লাগলো। আমি ওকে আগে কখনো কাঁদতে দেখিনি। আমরা দু চোখ বেয়ে জল। রাজা বললো, আমি বাবা মার মৃত্যুর কারণ হতে পারবো না জবা। আমি তোমাকেও ছাড়া বাঁচবো না । এদিকে কখন বিকেল গড়িয়ে রাত নেমেছে বুঝতেই পারিনি। আমি বললাম সব ঠিক হয়ে যাবে। সময় দাও রাজা।

আচ্ছা রাজা চলো এখন ফেরা যাক। আমার হাতটা টেনে আমাকে জড়িয়ে সেদিন ও আমার ঠোঁটে ওর ঠোঁটটা আগের মতো আবার ধরলো। অনেকক্ষণ। তারপর একসময় আমার বুকে মাথা নিয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগলো আমায় ক্ষমা কোরো জবা। আমায় ক্ষমা কোরো। আমি বললাম কেনো? কি জন্য ক্ষমা। তুমি কোনো দোষ করোনি। এবার চলো ফিরে যাই। একটু সময় দিই সব ঠিক হয়ে যাবে।বাবা মাকে আমরা দুজনে বুঝিয়ে নেবো।
ও বললো তুমি আমার পরিবারকে জানোনা জবা। ওরা যা বলে তাই করে।
সেদিন গোটা রাস্তা ও আমার হাত চেপে ছিলো। হস্টেলের সামনে এসে দাড়িয়ে ছিলো আমার না ঢোকা পযন্ত। সেদিন ওকে খুব বিধ্বস্ত লাগছিলো। সারাদিনের ক্লান্তি শরীরকে ভেঙ্গে দিয়েছিলো আর রাজার কথাটাও মাথায় ঘুরছিলো।ও কেনো ক্ষমা চাইছিলো? এই ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম জানিনা।সকাল চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙ্গলো। বারাদন্দায় যেতেই সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি একটু অবাক হলাম। বললাম কি হয়েছে? কেউ কিছু বলছে না। চিৎকার চেচাঁমেচি হঠাৎ কেমন শান্ত হয়ে গেলো। একটা খটকা লাগলো। রাজা, বললাম রাজার কিছু হয়েছে নাকি? পাশ থেকে আমার জুনিয়ার রিয়া বললো জবা দি তোমার রাজা আর নেই। রিয়া কে টেনে এক চড় মেরে বলেছিলাম খবরদার ফালতু কথা বলবি না। বাজে কথা বলার সাহস কোথায় থেকে পেয়েছিস। এর পর শাহেনাজ হাত ধরে বললো জবা শান্ত হয়ে বোস।কষ্ট হবে তোর জানি। তবু তোর জানা দরকার। আমি ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম।শাহেনাজ বললো কাল রাতে রাজা দা সুইসাইড করেছে। ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলো। যখন বুঝতে পেরেছে সবাই ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে। রাজা দা নাকি একটা চিঠি লিখেছে। তাতে বাবা মাকে বলেছে আমি লজ্জিত যে আমি তোমাদের যোগ্য সন্তান হতে পারিনি। আমার জন্য তোমাদের আত্মহত্যা করতে হোক আমি সেটা চাইনা। আমি তোমাদের খুব ভালোবাসি৷ আমি জবাকেও খুব ভালোবাসি। আমি জবাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না। জবা তুমি আমাকে ক্ষমা কোরো। তোমাকে ছাড়া বাঁচার কথা ভাবতেও পারি না।

এরপর জবা দি চুপ হয়ে গেলো। চোখ দিয়ে জল ভেসে যাচ্ছে। মুখ বন্ধ। একদম চুপ।

ঘরটা যেন কেমন চুপ করে গেলো। একদম চুপ। ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটার আওয়াজটাও. . . .

এরপর হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভাঙ্গলো। জবা দি বললো সেই রাতে আমিও খেয়ে নিলাম ঘুমের ওষুধ। কিন্তু আমার কপাল। আমার পাশের বেডের চিরশত্রু রুমি সেদিন আমার সাথে বেশি শত্রুতা করলো। মরতে পারলাম না ঐ রুমির জন্যে। হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিলো। তারপর তো ফিরে আসলাম।

আজ আবার রাতের ট্রেনে মালদা থেকে কোলকাতা যাবো। দুদিন পর পরীক্ষা। রাজা বলতো আমি ভালো নার্স হবো। তাই যাচ্ছি নার্স হবার শেষ পরীক্ষা দিতে। মরার চেষ্টা করবো না আর। রাজা তো আমার সাথেই আছে। ওতো এখন শুধুই আমার৷ কাল রাতে সেটাই বলে গেলো।

তুই ভালো থাকিস বোন। ভালো করে পড়িস। নিজের পায়ে দাড়াস। যা এখন যা। আর তোর তো তাড়া ছিলো।অনেক দেরি করে দিলাম। তোর জবা দি আজ থেকে রাজার জবা হয়েই বাঁচবে। মানুষের সেবা করবে। ওটাই যে আমার কাজ।

ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। বিকেলে জবা দি কলকাতা গেলো। তবে এবার একদম একা। জ্যেঠি রাজি না হলেও জবা দির জেদের কাছে হার মেনেছিলো সে দিন।

তারপর প্রায় পনেরো বছর পর এই সেইদিন দেখা হয়েছিলো জবা দির সাথে কোলকাতায়। অফিসের কাজে গিয়েছিলাম।বালিগঞ্জে দেখা। এখন পাকাপাকি কোলকাতার বাসিন্দা।আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো ওর ফ্ল্যাটে।গল্প, কথা, খাওয়া।অনেক দিন পর পুরানো সেই রকম সময়টা কাটালাম। জবা দি তোর কথা জিজ্ঞেস করেছিলো। বললাম পথ আলাদা। আর কিছু বলেনি। তুই শুনলে খুশি হবি যে, জবা দি আজ সিস্টার টিউটর। একটা বাচ্চা দত্তক নিয়েছে। ছেলে।নাম দিয়েছে রাজ। জবা দির বেডরুমে রাজা দা আর জবা দির একটা বিশাল ছবি। ভালো আছে। রাজ আর রাজাদার স্মৃতি নিয়ে খুব ভালো আছে।

131