Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার-এ আজকের গল্প : মৃত মানুষের পাঠ ২০১৮

মৃত মানুষের পাঠ ২০১৮

সাধন দাস

মহারাষ্ট্রে বিদর্ভ নগরে রোজ কমপক্ষে আট ঘন্টা লোডশেডিং চলে। বাদ থাকে শুধু মর্গ। কারণ প্রতি মুহূর্তে সেখানে চলে আসছে আত্মঘাতি কৃষকের লাশ। ময়না তদন্ত করে তুলে দিতে হচ্ছে পরিবারের হাতে নইলে মৃত চাষী পরিবারের হাহাকারে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে শহর।
বিদর্ভের গাঁয়ে গাঁয়ে মরা চাষীদের চিতা জ্বলতেই থাকে। চিতার আগুন থেকে চিতা জ্বালানো হচ্ছে। খেতে খামারে খানা খন্দ খাদে ভূতেরা লক লক করে বাড়ছে। অন্ধকারে কঙ্কালের থাবা কার কখন গলা টিপে ধরবে কেউ বুঝতে পারছে না। বিদর্ভ ছাড়িয়ে আত্মহত্যার ভয় গোটাদেশে এমন চাগিয়ে উঠেছে চাষবাস ছেড়ে বেকার হয়ে গেলাম। ঝাঁট দেওয়ার কাজও পেতে পারি গাঁয়ে এমন রাস্তা নেই। ভূতের হাতে মরার চেয়ে দেশে প্রতি মাসে বেড়ে যাওয়া দশ লক্ষ বেকারের মিছিলে আল ভেঙে হাঁটতে হাঁটতে আমিও শহরে ঢুকে পড়লাম।

লটারি মিলে গেলো। হতভাগ্য সেই ৩৬৬ পিয়ন পদে আবেদন করা ২৩ লক্ষ বেকার যাদের ২৫৫ জন পি এইচ ডি আর ২ লক্ষ ইঞ্জিনিয়ার! একই সাথে দুটো চাকরি পেলাম। বিদুর ডোম সাহেবের বাড়ি। তিনি মর্গে লাশকাটার ঠিকে কাজ করেন। তাঁর বাবাও করতেন। ঠাকুরদা চাষবাস করতেন। এ দেশে প্রথম শব ব্যবচ্ছেদকারী ডাক্তার মধুসূদন গুপ্তের আদর্শে মাঝে মধ্যে মরা কাটতেন। বাবা বলতেন, মর্গ কবে হিমঘর হবে জানিনে। তুই মানুষপচা গন্ধকে আপন করতে শেখ খোকা, সুবাস ভাবতে শেখ, নইলে কাজকে ভালোবাসতে পারবিনে।

মধুসূদন গুপ্তের উত্তরসূরি ফরেন্সিক ডাক্তার মুখার্জি খাতা হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন মর্গের বাইরে, অনেক দূরে। যেখানে মরা মানুষের পচা গন্ধ পৌঁছায় না। ফলে স্যর বিদুরের কাজকে ভালোবাসা সহজ হয়েছে। শিশুদের ভালোবাসতে হয় সবচেয়ে বেশি। কারণ শিশু মৃত্যুর হারে দেশ পৃথিবীতে প্রথম। বছরে প্রায় সাড়েসাত লক্ষ। মৃতশিশু এলেই তিনি মর্গে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। কোলে তুলে নেন নরম কুঁড়ির মতো দেহ। আদর করেন। চুমায় চুমায় ভরে দেন। তিনি শিশুদের খুব খুব ভালোবাসেন। হয়তো চোখবেয়ে গড়িয়ে নামে দু’এক ফোঁটা অশ্রু। পাত্তা দেন না। ছুরিখানা আদর করে ঢুকিয়ে দেন তার পেটে। যে কষ্ট পেয়ে মরেছে যেনো আর পেতে না হয়। এ দেশে জন্মালে এটাই পরিনতি। বাপ ঠাকুদ্দারা কাজে ফাঁকি দেয়নি। তিনিও পারেন না।
বাবুদের সুন্দরী যুবতিরা আসলে বিদুরস্যরের ভালোবাসা বান ডাকে। ভালোবাসার জোয়ারে একদিন যৌনসুখ উঠে এসেছিলো। স্যরের কাছে সেই লজ্জার আত্মকথন শুনেছি।
আজকাল চাষিদের মৃতদেহ আসে। ভারতবর্ষ জুড়ে সারবেঁধে প্রতিদিন আসছে। স্যরের গল্প শুনে তাঁদের আমি চিনতে পারি। জাত ভাই। তাঁরা আমার আত্মহত্যার ভয় নিয়ে আসে। লাঙ্গল টানা জামরো ধরা তালু, তামাক পোড়া আঙুল, নখে হলুদ দাগ। রোদ্দুরে আর বিষে মোটা কালো চামড়া, দুশ্চিন্তার বলিতে তিন নর্দমা আঁকা কপাল। আহ্‌, লজ্জা, লজ্জা! বুঝে ফেলেছেন, নিজের চেহারার বর্ণনা দিচ্ছি! বিশ্বাস করুন, আমার দুঃস্বপ্নে, বুকের কাঁপুনিতে, বর্তমান ভারতে প্রতি ঘন্টায় একজন চাষী আত্মহত্যা করে।

কাজে বেরুবার আগে স্যর বিদুর যখন খেতে বসেন, শুরু হয় আমার প্রথম কাজ, খবরের কাগজ পড়ে বেছে বেছে অস্বাভাবিক মৃতদের গল্প শোনানো। মৃত্যুকে সহজ করে নিতে সাহায্য করা। সুন্দর করে গুছিয়ে বলতাম, উনি পিঠ চাপড়ে দিতেন।
বলতেন- পৃথিবীতে যতো মানুষ বেঁচে আছে মৃতদের সংখ্যা তাঁদের চেয়ে বহুগুণ বেশি। মাষ্টার, এ দুনিয়া মৃতদের দখলে। যদি বাঁচতে চাও, মৃতদের ভালোবাসতে শেখো।
তিনি আমাকে ‘মাষ্টার’ ডাকতেন কারন আমার দ্বিতীয় চাকরি ছিলো, তাঁর মেয়েকে প্রাইভেট পড়ানো। ডোমবাবার ঘরে কুলটা মায়ের মেয়ে হয়ে জন্মানোর অপরাধে মেয়েটা স্কুলে পড়তে পারেনি। নিজেকে ঝালর দেওয়া সাদা ধবধবে ফ্রকে মুড়ে একটু ঝুঁকে পড়তে বসে। মুখখানা নিচু। উন্মুক্ত পা দুটো শরীরের পিছনে আড়াল রাখে। জগত সংসার থেকে নিজেকে যতোখানি লুকিয়ে রাখা যায়। সুন্দরী নিষ্পাপ সরল কিশোরী। শ্বেতপাথরে কোঁদা মূর্তির মতো স্তব্ধ। গোলাপ পাপড়ি ঠোঁট, আড়ষ্ট। খুলতেই চায় না। মুখের শূন্যপথে যদি কেউ দেখে ফেলে অপমানিত অন্তরাত্মার লজ্জা। টানা চোখ, টিকালো নাক, পানপাতা মুখ, বেঁচে থাকতে হবে, এই ভয়ে রক্ত শূন্য, ফর্সা। শান্ত, হতাশ কাচের মতো ম্লান, স্থির। স্বচ্ছতা ভেদ করে বুকের গভীর দেখা যায়। হীনমন্যতা, অসহায়তা, জমাট বাঁধা অন্ধকার ব্যথা। ওর দিকে তাকিয়ে ভুলে যাই, সুন্দর আসলে মৃত না জীবিত।

ওর মা ডাকসাঁইটে সুন্দরী। স্বাধীনচেতা। ছিলেন বনেদি বাড়ির বৌ। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তুখোড় যৌবনেই আত্মহত্যা করেছিলেন। ডেডবডি কাটার আগে মৃত সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে যুবক বিদুরের ভালোবাসা উথলে উঠেছিলো। শরীর শাসন মানেনি। যখন গোপন সুখে মৃত রমনীকে কাঁপিয়ে তিনি বাঁচিয়ে তুলছিলেন, বাড়ির লোকের হাতে ধরা পড়ে যান। বেধড়ক মার খেয়েও প্রাণে বেঁচে গেছেন। মরাকাটা অন্য ডোম পাওয়া যায়নি তাই চাকরিটা টিকে আছে। আর ডাক্তারের ভুল সার্টিফিকেটে মৃত কুলটা সেই মেয়েমানুষ বেঁচে উঠলেও সমাজ নেয়নি। আদরে, প্রেমে, শ্রদ্ধায় বিদুর সাহেব তাঁকে তুলে এনেছিলেন ঘরে।

তিনি আমার অন্নদাত্রী। জীবিত পৃথিবীর দিকে ঘৃণায় তাকিয়ে বলেন- মাষ্টার, মেয়েটিকে তুমি মৃত মানুষের পাঠ দিও।
আমি বিদ্যাসাগর, শরৎচন্দ্র, মাদাম কুরি, মার্ক্স, এঙ্গেলস, স্ট্যালিন এইসব মানুষদের গল্প শোনায়। আর পাথরের মূর্তি একটু একটু করে নড়ে ওঠে। সেই প্রাণ প্রতিষ্ঠার আনন্দে বেঁচে থাকি।

214

Leave a Reply