9/12/2018, কুলিক রোববার, গ্রন্থ সমালোচনা :

প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সীর ‘অযোধ্যা সায়াহ্নে’: ফিরে দেখা

-পুরুষোত্তম সিংহ

প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সীর পরিচয় রাজনৈতিক ব্যক্তি বা জননেতা হিসেবে। কিন্তু রাজনৈতিক সত্তার পাশাপাশি শিল্পী সত্তা প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ অযোধ্যা সায়াহ্নে’(১৯৯৩,এপ্রিল,দে’জ পাবলিশিং) কাব্যে।হ্যাঁ তিনি শিল্পীই। আধুনিক কবিতার চালচিত্রের ধারণা নিয়েই তিনি কাব্য সমুদ্রে নেমেছেন।‘ অযোধ্যা সায়াহ্নে’ কাব্যগ্রন্থটি ৪০ টি কবিতার একটি সংকলন।রবীন্দ্রনাথ ‘ভাষা ও ছন্দ’কবিতায় লিখেছিলেন- “ কবি তব মনভূমি/ রামের জনম স্থান অযোধ্যার চেয়ে সত্য যেন”।

সেই ধারণাকেই মানুষ বহন করে চলেছে যুগ থেকে যুগান্তরে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষলগ্নে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক লড়াই।কিন্তু কবি সাম্প্রদায়িকাতার উর্ধ্বে মানবতার কথা ঘোষণা করেছেন। কবির দৃষ্টিতে বর্তমান ভারতবর্ষে রামচন্দ্র আবার ফিরে এসেছেন।কিন্তু সাম্প্রদায়িক হানাহানি দেখে আবার বনবাসে যাত্রা করেছেন।ভাই দিয়ে ভাই হত্যা না করিয়ে যে রামচন্দ্র বালিকে নিজে হত্যা করেছিলেন সেই দেশে সাম্প্রদায়িকতার হানাহানি দেখে কবি ব্যথিত। তাই কবিতায় উচ্চারিত হয়-“ কর্মযোগ নয়/ নির্বোধের আস্ফালন দেখে/বৈদিকের মনুষ্যত্ব/ অযোধ্যাকে উপহাস করে/ প্রভাতের আগে/ সূর্যদেব সায়াহ্নের কাছে/ প্রায়শ্চিত্তে মাথা নীচু করে”( ‘অযোধ্যা সায়াহ্নে’,পৃ. ১১) ‘সভ্যতা গান’ কবিতায় কবি যুগান্তরের ভাষ্য রচনা করেছেন। সেই মহাভারতের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত চলেছে অন্যায়, অবিচার।শোষণ যন্ত্রের মেশিনগান থেকে সাধারণ মানুষ কোনদিন রেহাই পায় নি, আর বোধহয় পাবেও না !যুধিষ্টির থেকে প্রেমচাঁদ,ইকবাল,কামাল পাশারা দেশ জাতির কল্যানে লড়াই শেষে আত্মবিসর্জন দিয়েছে। কিন্তু তাদের সমস্ত লড়াই ব্যর্থ হয়েছে। যুগের দুঃশাসন বিচ্ছেদের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলছে সুদীর্ঘকাল ধরে। তাই কবি আশাহত কন্ঠে উচ্চরণ করেন-“ পিলসুজের সলতে/ দিয়াশালাইয়ের বারুদ/ কোনকিছুই কি অবশিষ্ট নেই ?/ এখন এই বিস্ফোরণে / কোথায় যে যাই / বন্ধু কেউ নাই”( ‘সভ্যতার গান’,পৃ.১৩)
## রবীন্দ্রনাথ নজরুলের দেশ ভাগ হয়েছিল শুধু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে ভিত্তি করেই। সেদিন ভারতবর্ষ সমস্ত ভুলে জাতিচেতনাকেই বড় করে দেখেছিল।সে জাতিচেতনা স্বাধীনতার চার দশক পরেও ভারতবাসী আজ ভুলতে পারে নি। তাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার উর্ধ্বে সত্য বলে ঘোষিত হয়েছে আদবানীর ধর্মীয় চেতনা। শিল্প কিভাবে রাজনীতির কাছে হেরে যায় তা তিনি দেখিয়েছেন। কবিতার উর্ধ্বে রাজনৈতিক নেতার মতাদর্শ আজ গ্রহণ করেছে ভারতবাসী। রবীন্দ্রনাথের ‘তোতাপাখি’ গল্পের কথা আমরা সবাই জানি। সেই ধারণাকে সামনে রেখেই তিনি গড়ে তুলেছেন ‘ এনভায়রনমেন্ট’ কবিতাটি। কবিও রূপকের আশ্রয় নিয়েছেন।পাখির রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন বন্দি নারীর ভাষ্য। শাহাবানুরা কিভাবে হারিয়ে যায়, কবি নিদারুণ ব্যঙ্গের চাবুকে তুলে ধরেছেন। প্রিয়রঞ্জন বাবু এক ভারতীয়ত্ব বোধ নিয়েই কাব্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি জাত-পাত শ্রেণি চেতনার উর্ধ্বে এক মহান জীবনবেদ রচনা করতে চেয়েছেন।সমস্ত ধর্মের মানুষের ধর্মীয়সত্তা অবলুপ্ত করে এক সারিতে এনে দাঁড় করাতে চেয়েছেন।তিনি মহান ভারতবর্ষের ঐক্য বাণী তিনি কখনই ভোলেন নি। এক সর্বব্যাপী উদার মন নিয়েই তিনি কাব্য ক্ষেত্রে নেমেছেন।কখনো গর্জে উঠে বলেন-“ আমাদের নৈতিকতা ধর্মান্ধতা হয় / অযোধ্যাকে অপবিত্র করে।“( ‘ ধর্মযুদ্ধ’, ৪৯) এ কাব্যের বহু কবিতাতেই অযোধ্যার বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া সাম্প্রদায়িক প্রসঙ্গ এসেছে। কবি সাম্প্রদায়িককে অতিক্রম করে এক আদর্শ পৃথিবী গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখিয়েছেন।যেখানে হিংস্রা, বর্বরতা, নগ্নতা হানাহানি নয়, আছে ভালোবাসা,মানুষের প্রতি মানুষের সমবেদনা।ধর্ম সত্তার উর্ধ্বে তিনি নিজস্ব বাণী ঘোষণা করেন-
“ অযোধ্যার নির্বাসিত রাম
দরিদ্র ফকির গৃহে নামাজের শেষে
সামান্য পানীয় আর ফলমুল নিয়ে
বৌদ্ধ মন্দির থেকে গীর্জা পরিক্রমা সেরে
মসজিদের অভ্যন্তরে আল্লার অতিথি হয়ে থাকে”
( ‘ধর্মযুদ্ধ’, পৃ. ৪৮)
আপাত সহজ সরল শব্দবন্ধন দিয়েই তিনি কাব্যসজ্জা সাজিয়েছেন। আসলে তিনি জীবনের বাণী রচনা করতে চেয়েছেন। যে বাণী মানুষকে বাঁচার মন্ত্র শেখায়, আদর্শ পৃথিবীর আলোর সন্ধান দেয়। একজন কবির প্রার্থীব্য বিষয় বোধহয় সেটিই। তিনি সেই আইডিয়াল পৃথিবী গড়ে তোলার পথে অগ্রসর হয়েছেন। কর্মজীবন ও কবিতায় একই মর্মভাষ্য উচ্চারিত হয়েছে। প্রকৃত জননেতার মতো মানুষের কথা সাধারণ লিপিকুশলে বলেছেন। কাব্য আভারণ শিল্পে দক্ষতা নয় বক্তব্য প্রকাশেই তিনি বেশি সচেতন। সেই বক্তব্য হয়ে উঠছে কোমল মৃদুমন্দ শরতে ভেসে যাওয়া মেঘের মতো।

16