২০/১১/১৮,ওয়েবডেস্ক: সিজন চেঞ্জের সময় এখন। প্রায়ই সর্দি কাশি জ্বরজারিতে ভোগে বাচ্চারা। সময়ের অভাবে কিংবা নেহাতই অভ্যাসবশত অনেকেই চেনা ওষুধের দোকান থেকে বলে ওষুধ খাওয়ান বাচ্চাদের। বড়রাও তো আকছার ই করে থাকি এই কাজ। কিন্তু এর ফল কি সেটা নিয়ে আপনি ওয়াকিবহাল তো সম্পূর্ণভাবে? সম্প্রতি হওয়া এক সমীক্ষায় উঠে আসা তথ্য কিন্তু অন্য কথা বলছে! সমীক্ষকদের মতে আমাদের এই অভ্যাসের নিদারুণ ফল হিসেবেই ভারতে এখন অ্যান্টিবায়োটিকের অভিশাপের বলি হয় বছরে ৫৮ হাজার শিশু। আর
প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় সাত লক্ষ প্রাণ কাড়ে অ্যান্টিবায়োটিকের ভুল এবং যথেচ্ছ প্রয়োগ।

জ্বর-সর্দি হলেই দোকান থেকে কিনে ফেলা নাম জানা অ্যামোক্সিসিলিন বা আজিথ্রমাইসিন, পেটের অসুখ হলেই যথেচ্ছ জনপ্রিয় মেট্রোনিডাজোল গোত্রের ওষুধ… এ ভাবেই তো সাধারণ অসুখ-বিসুখের চিকিৎসা সারে অধিকাংশ মধ্যবিত্ত। শুধু নিজেই খায় না, বাড়ির শিশুদের চিকিৎসাও অহরহ সেরে ফেলে এ ভাবেই। আর এর জন্যই যা আশীর্বাদ হয়ে ওঠার কথা ছিল, তা অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায় পরবর্তী জীবনে। কিন্তু এবার সাবধান হবার সময় এসেছে মত চিকিৎসকদের একাংশের।

আসলে সম্প্রতি সেন্টার ফর ডিজিজ ডায়নামিক্স ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিসি (সিডিডিইপি) –র সমীক্ষায় উঠে এসেছে ভয়াল এক তথ্য। তাদের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর শুধুমাত্র ভারতেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সংক্রমণে মারা যায় ৫৮ হাজার শিশু। শুধু তাই-ই নয়, এই বদভ্যাস ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে গোটা বিশ্বে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় সাত লক্ষ। বিশ্ব অ্যান্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ সবেমাত্র কাটিয়ে এসেছি আমরা। তার মধ্যেই এমন সমীক্ষার ফল দুশ্চিন্তায় রেখেছে চিকিৎসকদেরও।

কিন্তু এই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সংক্রমণ বিষয়টি আদপে কী? অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ শরীরে যাওয়ার পর তার সঙ্গে লড়ে যুঝে যাওয়ার ক্ষমতা লাভ করে বেশ কিছু ব্যাকটিরিয়া। ফলে নির্দিষ্ট অসুখ প্রতিরোধে যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, একটা সময়ের পর তা আর কাজ করে না। অনেক সময় ওষুধে কাজ না হওয়ায় মৃত্যু ছাড়া আর কোনও উপায়ও থাকে না।
কিন্তু কেন অসুখ প্রতিরোধী অ্যান্টিবায়োটিক তার ক্ষমতা হারাচ্ছে দিনকে দিন? তা হলে কি জীবাণুরা ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠছে ওষুধের চেয়েও?
কেনই বা নষ্ট হচ্ছে কার্যক্ষমতা?
বুঝিয়ে বললেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সুবর্ণ গোস্বামী। মূলত যাঁর হাত ধরেই আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালে ‘স্ট্যান্ডার্ড প্রোটোকল অব অ্যান্টিবায়োটিকস’-এর নিয়ম শুরু হয়েছে। তাঁর মতে, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার বিশেষ ক’টি কারণ আছে। এ নিয়ে প্রচুর সচেতনতা জারি করার চেষ্টা চললেও তা মেনে চলা হয় না কিছুতেই। কারণ হিসাবে মূলত, দু’টি বিষয়কে দায়ী করেছেন তিনি।
এক: খোলা বাজারে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিকের বিক্রি। এর জেরে ওষুধ কেনার জন্য কোনও রকম বাধা নিষেধই নেই। ফলে ইচ্ছামতো ওষুধ কিনে খাওয়ার উপায় রয়েছে।

দ্বিতীয়ত: ওষুধ যাও বা কেনা হল, তা পুরো কোর্স শেষ করেন না বেশির ভাগই। অসুখ ভাল হলেই ওষুধ খাওয়ার প্রবণতা কমে। ফলে শরীরে প্রবেশ করা অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাবে জীবাণুগুলো কিছু দিন ঝিমিয়ে গেল ঠিকই, অসুখও ভাল হল, কিন্তু কোর্স শেষ না করার কারণে কিছু দিন পরেই তারা আবার মাথা চাড়া দিল! শরীরের ভিতর সে সব জীবাণু বংশবিস্তারও করে ফেলেছে তত দিনে। জিন মিউটেশনের কারণে শিশু ব্যাক্টেরিয়ারা শরীরের ভিতরে থাকা তাদের শত্রু অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা নিয়েই জন্মায়। ফলে সে অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না।
এর নেপথ্যে কিছু চিকিৎসকের ভূমিকাকেও দায়ী করেন তিনি। তাঁর মতে, বেশ কিছু চিকিৎসকও অসুখের শুরুতেই কড়া মাপের অ্যান্টিবায়োটিক দেন। এতে অসুখ ভাল হয়ে গেলেও অসুখের জীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়।

তাই সুবর্ণবাবুর মতে, চিকিৎসকদেরও উচিত প্রথমেই কড়া মাপের অ্যান্টিবায়োটিক না দিয়ে নির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে ওষুধ দেওয়া।
ইতিমধ্যেই যক্ষ্মার জন্য নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের খোঁজে হন্যে এখন চিকিৎসকরা। ‘‘আগে যক্ষ্মার জন্য বাজারে পাঁচ-ছ’টি ওষুধ মিলত। এ সবের যথেচ্ছ ব্যবহার, বার বার কোর্স শেষ না করা ইত্যাদি কারণে আজকাল অনেক রোগীর শরীরেই পুরনো অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না। তাই নতুন ওষুধের সন্ধান চলছে।’’ জানালেন সুবর্ণবাবু।

অ্যান্টিবায়োটিকের অবৈজ্ঞানিক ও যথেচ্ছ ব্যবহার এই হারে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদ এই দেশের জন্য অপেক্ষা করছে বলে মত অন্যান্য চিকিৎসকদেরও। এরপরেও কি আপনি জেনেশুনে আর এমন ভুল করতে চাইবেন?

50