ফোনটা পেয়ে আর দেরী করলো না বসন্ত। কোনমতে শার্টটা গলিয়ে দৌড়োলো বিডিও সাহেবের বাড়ি। পেছন থেকে সুমনা চ্যাঁচালো,
– আরে চায়ে চুমুকটা তো দিয়ে যাও।
– ধ্যাত্তেরি তোমার চা! বুঝতেই পারছো না ব্যাপারটা।
– কি আর বুঝবো নতুন করে? ওতো বুঝে কাজ নেই। আমার বলে…
আরও কি সব বলছিল সুমনা। কানে না দিয়ে ঝড়ের বেগে রওনা দিল বসন্ত। ঘর থেকে বাইরে আসতে পেছন থেকে সুমনার গলা আবার কানে এলো,
– দেরী ক’র না কিন্তু…
বিডিও সাহেবের বাড়ি এসে বসন্ত দেখলো আরও কয়েকজন এসে গেছে। তাকে দেখেই বিডিও সাহেব বললেন,
– এই যে বসন্তবাবু…এবার কি হবে!
– আ..আ..আমি কি বলবো স্যার!
– সেটাও তো কথা। আপনি কি বলবেন।
– মা..মানে স্যার মাথায় কিছুই আসছে না।
– এস ডি সাহেব ফোন করেছিলেন। বুঝলেন?
– কি বললেন উনি? কোন উপায় বলেছেন?
– আরে ধুর, উনি আর কি বলবেন। বাচ্চা ছেলে। ডি এম সাহেবের ওপর নাকি প্রেশার আছে এটাই বললেন!
– ডি এম সাহেব অবধি পৌঁছে গেছে স্যার ব্যাপারটা?
– পৌঁছবে না? ওনার জন্যই তো। নাঃ…চলুন যাই। দেখা যাক কি করা যায়।

************************

বসন্তরা এনক্লেভ সেটেলমেন্ট ক্যাম্পে পৌঁছতে না পৌঁছতেই এস ডি ও সাহেব এসে হাজির। মুখ থমথম করছে। সত্যিই বাচ্চা ছেলে। সবে সেকেন্ড পোস্টিং। ঠিক মতো জানেনই না এনক্লেভ ব্যাপারটা কি!
যাই হক, সবাই মিলে ঢোকা গেল ক্যাম্পে। চল্লিশটা পরিবারের প্রায় তিনশো জনের ক্যাম্প। দু’কামরার টিনের বাড়ি আর দু’দিকে আট আট ষোলোটা বাথরুম-টয়লেট নিয়ে ক্যাম্প। ক্যাম্পের মাঝে মাঝে উঁচু খুঁটিতে আলোর ব্যবস্থা। কোনো কোনো টিউব জ্বলে, কোনোটা সারারাত দপদপ করতে থাকে। বাকিগুলি গেছে পাকাপাকি। টিউবওয়েল আছে ছয়টা। ফ্যাসফ্যাস আওয়াজে জল বেরোচ্ছে সেগুলি দিয়ে এটাই বেশি।
এখন গোটা ক্যাম্প সাতাশ নম্বর বাড়ির সামনে ভিড় করে আছে। লোকজন ঠেলেঠুলে বসন্তদের দল পৌঁছলো সেখানে। বাড়ির সামনে মাচা। মাচায় শুয়ে সনাতন বৈরাগী। মৃত। সনাতনের বউ পারুল চুপচাপ বসে আছে। ছেলেটা এক কোণায় দাঁড়িয়ে। মাথা নিচু। এস ডি ও সাহেব ফিসফিস করে বি ডি ও সাহেবকে বললেন,
– কি করা যায় বলুন তো এখন!
– হ্যাঁ স্যার, কি করা যায়?
– আরে আমি জানতে চাইছি। আর আপনি উল্টে আমাকেই বলছেন।
– না মানে স্যার…
– ওই ভদ্রলোক এসেছেন?
– কে স্যার?
– ওই যে আপনার শরৎ না কি যেন…
– ও বসন্ত! হ্যাঁ স্যার, ওই তো বসন্ত।
– ওহো তাই তো, খেয়াল করি নি। যা টেনশন! কি করি আর।
– তা ঠিক স্যার।
– ওকে একটু বলুন না!
– মানে কি বলবো স্যার।
– কি আর এই ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে।
– আচ্ছা বলি স্যার।
বসন্তকে বলায় বসন্ত ভেবে পায় না কি করে মেটাবে। তবে একটা ঘটনা ঠিক। মিডিয়া এখনও খবর পায় নি। পেলে চলে আসতো। ক্যাম্পের লোকগুলোর ওপারে সম্পত্তি-টম্পত্তি থাকলে হবেটা কি, বেশির ভাগই এসব বোঝে না। তার ওপর নতুন দেশের হালহকিকতের সাথে পুরোপুরি এখনও পরিচয়ও হয় নি। তা না হলে এতক্ষণে মিডিয়া চলে আসতো।
ব্যাপারটা কিছুই না। সনাতনের পরিবারের বাকি দু’জন এদেশের নাগরিক হলেও সনাতন নাগরিকত্ব পায় নি এখনও। কেননা সেনশাস যখন হয় তখন সনাতন এদেশে ছিল না। ওদেশে গেছিল সম্পত্তি বিক্রি করতে। না গিয়েও উপায় ছিল না। এদেশ থেকে বলা হয়েছিল নির্দিষ্ট অমুক তারিখের মধ্যে সম্পর্ক চুকোতে হবে ওদেশের সাথে। জলের দরে তাই সম্পত্তি বিক্রি করে সনাতন যখন ফিরে এলো ততদিনে সেনশাস শেষ। সইসাবুদের ব্যাপার থাকায় সেনশাসের কর্মী সনাতনের নাম নথিভুক্ত করতে পারে নি। এবার সনাতন পঞ্চায়েত, বিডিও অফিস, এসডিও অফিস, ডিএম সাহেবের দপ্তরে ধরণা-টরণা দিয়েও কিছু করতে না পেরে রেডি হচ্ছিল হাইকমিশনারের কাছে যাওয়ার জন্য যাতে অন্ততঃ ভিসার মেয়াদটা বাড়ানো যায়! তা ডি এম সাহেব এখানেই কি হল কে জানে দুম করে বলে বসলেন যে ব্যবস্থা একটা করে দেবেন। হাইকমিশনারের কাছে যাওয়ার দরকার নেই। ডি এম সাহেব যখন একথা বলেন তখন তার দু’পাশে এস ডি ও আর বি ডি ও সাহেব, পেছনে বসন্ত আর আরও কয়েকজন। আসলে ডি এম সাহেব বলতেন না। সেদিন সঙ্গে ছিলেন মন্ত্রী। মন্ত্রী মশাইয়ের সামনে ক্রেডিট নিতে আর নিজের ট্রান্সফারের ব্যাপারটা পোক্ত করতে ডি এম সাহেব লাফটা দিয়েছিলেন। মন্ত্রীও খুশী হয়েছিলেন কেননা এই এনক্লেভ সেটেলমেন্টের লোকেরা তার সমর্থক। সনাতনের জন্য এই ঘোষণায় সবাই মন্ত্রীর নামে জয়ধ্বনিও দিয়েছিল সেদিন। তা কিছু ব্যবস্থা করবার আগেই সনাতন তো দুম করে মরেই গেল! এখন সমস্যাটা হল একজন অবৈধ নাগরিকের দাহকার্য হয় কিভাবে! ডেথ সার্টিফিকেটই কিভাবে কি করা যায়!
– ও বসন্তবাবু! আরে মশাই একেবারে বমকে গেলেন দেখছি!
বিডিও সাহেবের চাপা স্বর শুনে চমকে ওঠে বসন্ত! আর বমকে যাওয়া। মনে মনে খিঁচিয়ে ওঠে বসন্ত। যত্ত ঝামেলা এদের জন্য। মন্ত্রীকে খুশী করতে ডি এম, ডি এম কে খুশি করতে এস ডি ও, এস ডি ও কে খুশী করার জন্য বি ডি ও…একেবারে সোনার চেন! আচ্ছা মন্ত্রী তবে কাকে খুশী করতে চাইছিলেন? উমমমমম….বসন্ত ভাবে…এই লোকগুলোকে! তাহলে সমস্যাটার মূলে এই লোকগুলোই। আচমকা রাগ ধরে সনাতনের। এই ছুটির দিনে কোথায় ঘরে বসে বউয়ের আদর খাবে তা না! শালা জীবনটাই যন্ত্রণার।
এসব ভাবনার মাঝেই এস ডি ও সাহেবের ফোন বাজে। চাপা গলায় কথা বলেন এস ডি ও। ফোন শেষে সরাসরি বসন্তের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন,
– ডি এম সাহেবও আপনার কথাই বললেন। বসন্তবাবু দেখুন কি করা যায়। এটা উতরে দিতে পারলে আপনার প্রমোশনটা…
প্রমোশনের কথা শুনেই বসন্তের মাথায় চিরিক করে উঠলো উপায়। হয়ে যাবে ব্যবস্থা। কেবল মানলে হয়! তবে না মানারও কারণ নেই।

************************

শ্মশান থেকে ফিরে স্নান-টান সেরে চা নিয়ে বারান্দার বেতের চেয়ারে বসে বসন্ত। ডি এম সাহেব তাকে ফোন করে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এস ডি ও সাহেবের দুশ্চিন্তা ঘুচেছে। বি ডি ও সাহেব খুব খুশী।
না…খুব বেশী ভাবতে হয় নি সনাতনকে। তার বাড়িতে থাকা প্রহ্লাদের ভোটার কার্ড, আধার কার্ড দাখিল করেছে সে। প্রহ্লাদ গেছিল কেরলে। খবর পেয়েছে বন্যার জলে সে বেপাত্তা। সাতকুলে কেউ না থাকা প্রহ্লাদের নথি বসন্ত কাজে লাগিয়েছে সনাতনের জন্য। সনাতনের পরিবারকে কিছু ধমকধামক আর কিছু টাকা দিয়ে চুপ করানো গেছে। একেই নতুন দেশ, নতুন নিয়ম, এস ডি ও, বি ডি ও, থানার ও সি…সব দেখে তারাও আর কিছু বলে নি। সনাতন প্রহ্লাদ হয়ে চিতায় উঠে পুরেও গেছে। অবৈধ নয়, বৈধ একজন নাগরিকের মৃত্যুতে ভোটার তালিকায় একটা নাম কাটতে হবে সংশোধনী তালিকায়…এটুকুই যা কাজ। ডেথ সার্টিফিকেটও বেরিয়ে আসবে। কোনো চিন্তা নেই।
চা’য়ের কাপে চুমুক দিতেই সনাতনের মুখটা ভেসে উঠলো বসন্তের চোখে। চিতায় ওঠানোর সময় মুখের কাপড়টা সরে গেছিল একটু। সনাতনের ঠোঁটের কোণায় কেমন একটা চাপা হাসি লেগেছিল যেন…না না সনাতনের নয়, প্রহ্লাদের……

(প্রথম প্রকাশ কুচবিহার সাহিত্য সভা পত্রিকা)

35