৭/১০/১৮,কুলিক রোববারঃ

মা আসছে

পার্থ প্রতিম সাহা

রানওয়েতে প্লেনের চাকা ছোঁয়া মাত্র পিকলু অস্থির হয়ে উঠলো। টানা ১৫ ঘন্টা ফ্লাইটের পর মনে হচ্ছিলো কতক্ষণে বাড়ি ঢুকবে। ঘড়িতে তখন সময় রাত ২:৩০। এমন বিচ্ছিরি সময়ের জন্য বাড়ি থেকে কাউকে এয়ারপোর্টে আসতে দেয়নি পিকলু। অবশ্য আসার মধ্যে তো কেবল মা!

আজ প্রায় ১৯ বছর পর দেশে ফিরলো পিকলু। দীর্ঘ সময়! অনেককিছুই বদলে গেছে। বহু কাছের মানুষ দূরে চলে গেছে। বহু নিকট বন্ধুদের সাথে একটা অদ্ভুত দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এক সময় হাতের তালুর মতো চেনা এই শহরটারও অনেক কিছুই পাল্টে গেছে!

আবোল তাবোল পুরোনো কথা মাথার মধ্যে হুড়োহুড়ি করছিল৷ -চমক ভাঙলো, যখন কমলা রঙের সুটকেসটা কনভেয়ার বেল্টে ঘুরতে ঘুরতে এসে হাঁটুতে ঠোক্কর মারলো। মালপত্র গুছিয়ে, কাস্টমস ক্লিয়ার করে এয়ারপোর্টের বাইরে আসতে প্রায় ৩:৩০ বেজে গেলো। এই ভোর রাতেও বাইরে মেলা লোকজন। কয়েকজন ট্যাক্সি ওয়ালা ছেঁকে ধরলো পিকলুকে। মুচকি হেসে তাদের পাশ কাটিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে একটা ক্যাব বুক করে ফেললো পিকলু। গাড়ি সামনে এসে দাঁড়াতে, পিছনের সিটে উঠে গা এলিয়ে দেয় পিকলু। কল্লোলিনী এখন কতো আধুনিকা। স্মার্ট ফোন থেকে ট্যাক্সি বুক করা, তাও কলকাতায় -ভাবতেই অবাক লাগে পিকলুর।

এক গাদা পুরনো স্মৃতির অলিতে গলিতে পায়চারি করতে করতে কখন যেন চোখটা লেগে গেছিলো; “স্যার, স্যার” – ডাকে তন্দ্রা ভাঙ্গে পিকলুর। ট্যাক্সি থেকে নেমে নিঝ্ঝুম পাড়াটায় পা রাখে। দুটি আধা-ঘুমন্ত সারমেয় মৃদু প্রতিবাদ করে আবার ঘুমে ডুব দেয়।

কেয়াতলা রোডের প্রায়ান্ধকর বাড়িটার ওপর ক্লান্ত চোখ বোলায় পিকলু। এত বছর পর পিকলুকে পেয়ে কত কিছু যেন বলতে চাইছে বাড়িটা কিন্তু পারছে না। দম বন্ধ করে একরাশ স্মৃতির ফোয়ারা সাজিয়ে কেমন যেন বোবা হয়ে গেছে বাড়িটা। চতুর্দিকে আকাশচুম্বী আধুনিক অট্টালিকার ভিড়ে বাড়িটার যেন নিঃস্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।

ভোর হয়ে এলো।

পুজো আসতে আর ঠিক দু সপ্তাহ। পাড়ার প্যান্ডেলের কাঠামোটা দাঁড়িয়ে গেছে। দিনের প্ৰথম বাসটি রাস্তা কাঁপিয়ে ঝন ঝন করতে করতে ছুট্টে চলে গেলো। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে পাতলা সোনালি প্ৰথম সূর্যের আলো আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে সবকিছু।

মা র ঘরে আলো। বারবার বারন করা সত্ত্বেও সেই জেগে আছে! কে শোনে কার কথা! মাথাটা নামিয়ে ঘাড় নেড়ে নিজের মনেই হাসলো পিকলু। সেই ছোটবেলা থেকেই, -রাত জেগে পিকলু যতক্ষন পড়তো, মা ঠায় পাশে জেগে বসা। বোধহয় সব মা-ই এমন।

সুটকেসটা ট্যাক্সি থেকে নামিয়ে দরজার কাছে এগোতেই দেখে মা বারান্দায়।
“বাবু, এলি?”
“হ্যাঁ, মা”।
“দাঁড়া আসছি”।
“আঃ! আবার তুমি কেন!”
“আসছি, তুই দাঁড়া”।

“মা” আসছে।
——————-

14