২/১০/১৮,কুলিক ইনফোলাইনঃ

বাংলা কবিতায় মহাত্মা

কলমে
পুরুষোত্তম সিংহ

(অখণ্ড)

পর্ব ১

আজ জাতির জনক গান্ধীজির জন্মদিন। ভারতের জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে তাঁর অবদান সম্পর্কে আমরা সবাই সচেতন। বাংলা ও বাঙালি নিজের আপন করে নিয়েছে গান্ধীজিকে। রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজির সম্পর্কের কথা আমরা সবাই অবগত। এমনকি বাংলা উপন্যাসেও গান্ধীজির কথা এসেছে। আজ আমরা দেখবো বাঙালি কবিরা কিভাবে কবিতায় গান্ধীজিকে স্মরণ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে প্রথমেই মনে আসে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কথা। সত্যেন্দ্রনাথের বন্ধু প্রীতি ছিল অসম্ভব রকমের ভালো।তাঁর কবিতায় বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নিবেদিতা ও অরবিন্দ সহ বহু মনীষীদের কথা উঠে এসেছে। সত্যেন্দ্রনাথ ‘ গান্ধীজি’ কবিতায় গান্ধীর জীবনের জয়গাথা রচনা করেছেন। জাতির জীবনে গান্ধীজির ত্যাগ তিতিক্ষা ও জীবনবীক্ষার এক ভাষ্য রচনা করেন। গান্ধীজিকে শ্রদ্ধা জানান এভাবে -” অহিংসা যার পরম সাধনা হিংসা সেবিত বাসে/ আসন যাহার বুদ্ধের কোলে, টলষ্টয়ের পাশে”। কবি সক্রেটিস সহ সম্রাট দানিয়েলের সঙ্গে গান্ধীর তুলনা করেন। সমস্ত ব্যঙ্গ বিদ্রুপের উর্ধ্বে গান্ধীর আহবানে আজ সারা দিয়েছে ত্রিশ কোটি মানুষ। সমস্ত জাতি ধর্মের উর্ধ্বে আজ মানুষপ গান্ধীজিকে আপন করে নিয়েছে – ” তার আগমনী গা রে ও খেয়ালী! গৌড়বঙ্গময়/ গাও মহাত্মা পুরুষোত্তম গান্ধির জয়। ”

পর্ব ২

অচিন্ত্যকুমার ‘ মহাত্মা গান্ধী ‘ কবিতায় গান্ধীর ত্যাগ ও কর্মমুখর জীবনের কথা ব্যক্ত করেন। রুগ্ন দেহে গান্ধী সমগ্র ভারতবর্ষের মানুষের বাহুতে বল এনেছিল। কবির কাছে গান্ধীজি যেন নব সূর্যদয়ের পথ এনেছেন। ব্রিটিশ অপশাসন থেকে মুক্ত হতে গান্ধীই যেন অগ্রদূত – ” চাম মেদ মাস কিছুই দেখি না/ আমি শুধু দেখি হাড়/ সংহার শেষে আনিল ঘা দেশে / নব উপসংহার “। আবার ‘ মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যু” কবিতায় মিথ ও ইতিহাসের মেলবন্ধনে নান্দনিক সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলেন। যে মানুষটি চিরজীবন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করে গেল সেই আজ বলি হয়েছে ক্ষমতালোভী পিশাচের হাতে। দেশের জন্য গান্ধীজি যেন দধীচি মুনির মতো জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। এই মৃত্যু কবির কাছে মহান – ” এ মৃত্য তাঁর জীবন শ্লোকের প্রকৃত ভাষ্যকার “।

পর্ব ৩

প্রেমেন্দ্র মিত্রের ” তিনটি গুলি ” কবিতায় কবির অন্তর বিগলিত হৃদয় উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেয়েছে। যে মানুষ নিজের জীবনের সমগ্র অংশ জাতির জন্য উৎসর্গ করেছে ভারতবাসী তাঁকে বিনিময়ে দিল তিনটি গুলি উপহার। সেই গুলির শব্দ কবিকে ক্ষত বিক্ষত করেছে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের “মহাত্মাজীর প্রতি ” কবিতায় পরাধীন ভারতবর্ষের ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। গান্ধীজিই যেন ভারতীয় জনগণকে নব পথের দিশা দেখিয়েছে। মানুষের মনে নবচেতনা সঞ্চারে গান্ধীই যেন নতুন আদর্শ-” তাইতো এখানে আজ ঘনিষ্ট স্বপ্নের কাছাকাছি / মনে হয় শুধু তোমারই মধ্যে আমরা বেঁচে আছি/ তোমাকে পেয়েছি অনেক মৃত্যু উত্তরণের শেষে/ তোমাকে গড়ব প্রাচীর, ধ্বংস – বিকীর্ণ এই দেশে”।

পর্ব ৪

দীনেশ দাশ শ্রেণি সংগ্রামের প্রতীক রূপেই গান্ধীজিকে দেখেছেন। জাতপাতের উর্ধ্বে গান্ধী এক নতুন ভারতবর্ষে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন। ধর্মীয় বাতাবরণের উর্ধ্বে জনপদ জীবনের প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে তাঁর বিশেষ সখ্য গড়ে উঠেছিল। এই মহান মানবকে কবি স্বাগত জানান এভাবে – ” তুমি বলেছিলে খালি / দিল্লী নয়, চল নোয়াখালি “। আজ দেশ স্বাধীন। কিন্তু কোন সকাল আমরা পেয়েছি? তাই কবি আশাহত কণ্ঠে বলেন -” হারায়ে গিয়েছে সেই সাত্ত্বিক সকাল / আমরা পেয়েছি শুধু পৃথিবীর স্থবির কঙ্কাল “। আবার “শেষ ক্ষমা ” কবিতায় গান্ধীজির ভারতীয় বোধ প্রবল হয়ে ওঠে। ত্যাগের দেশ ভারতবর্ষে গান্ধীজি ত্যাগের মধ্যেই বিলীন হয়ে গেছেন। কিন্তু গান্ধী হীন ভারত কোন পথে চলবে সে নিয়ে কবি সংশয়বাদী।। তাই কবি গান্ধীর আবার নবজন্মের প্রার্থনা জানান -” ছেয়ে দাও করুণা – করুণ ঘন মেঘের বন্যায়/ তুমি জন্ম নাও আর মানবতা নবজন্ম নেয়”

. . . পর্ব ৫

জীবনানন্দ দাশ ‘ মহাত্মা গান্ধী ‘ কবিতায় দুই যুগের ব্যবধানের স্বরূপ অঙ্কন করেন। কবির মনে হয়েছে ভগবান বুদ্ধ ই যেন মানবতার বাণী নিয়ে নবরূপে ভারতবর্ষে এসেছে। তবে অতীতের সেই জ্ঞান, দর্শন, ভালোবাসা ও মূল্যবোধ পাল্টে গেছে আর সে জন্যই ভারতবর্ষ পরাধীন -” তাদের অন্তর্দান সবিশেষ সমুজ্জ্বল ছিল, তবু আজ/ আমাদের পৃথিবী ঢের বহিরাশ্রয়ী”। মানব মৈত্রীর বন্ধন আজ পরাস্ত, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম বড় হয়ে উঠেছে। সাম্য -মৈত্রী- স্বাধীনতার কথা বললেই গুলি বর্ষিত হয় -” প্রার্থনা করার মতো বিশবাসের গভীরতা কোনো দিকে নেই”। সুলেমান হাফিজী বিষাদব্যথা থেকে লেখেন ” গান্ধীজি ভিক্ষা করে বসন্তের ফুটপাতে ” কাব্য। অবক্ষয়িত মূল্যবোধের পৃথিবীতে স্বার্থসিদ্ধি আজ বড় হয়ে উঠেছে। স্বপ্নের ভারতবর্ষের প্রকৃত পরিস্থিতি অনুসন্ধনে আজ এসেছেন গান্ধীজি,এসে ব্যথিত হয়েছেন। সমস্ত স্বপ্ন ভেঙে গেছে – ” মোল্লার হাতের তসবি আর পুরুতের জপমালার/ পরস্পর দাঙ্গা হাঙ্গামায় বেচারাম আর/ কেনারামের তেজারতি / অন্ধকার গুদামে দম আটকে মারা যায় “।বাংলার কবিরা এভাবেই গান্ধীজিকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। আসলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কবিতায় ব্যক্তি জীবনের অনুভবসহ ব্যক্তির মহানুভবতার কথা প্রকাশ পায়- বাংলার কবিদের কবিতায় সে কথাই প্রকাশ পেয়েছে, মহৎ গান্ধীজির চরিত্র উদ্ভাসিত হয়েছে।

90