৩০/০৯/১৮,কুলিক রোববারঃ

আলোর বেণু

অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরী

কিছুদিন ধরে ঝিনুক আর সৌরভের সম্পর্কটা কিছুতেই ভালো যাচ্ছে না। ঘরের ভেতর গড়ে উঠেছে আলাদা ঘর। কখনো কখনো মনে হয় নির্ঘাত সৌরভের অন্য কোনো সম্পর্ক —। দূর এই রামগরুড়ের ছানার বুকে কোন রোমান্টিকতা অবশিষ্ট আছে নাকি! দেখতে দেখতে পূজা চলে এল। ঝিনুকেরও তো শখ হয় –।
মহালয়ার দিন বলল, কেনাকাটা তো কিছুই হল না।
—– কেন হয়নি! তোমাকে তো একমাস আগেই টাকা দিয়ে দিয়েছি।
মাখায় রক্ত চড়ে গেল ঝিনুকের। তবু নিজেকে সামলে বলল, যাবে আজ —।
—-আমার ওসব ভালো লাগে না। তুমি যাও।
লাফ দিয়ে উঠে পরল ঝিনুক। এই অসভ্য লোকটার সাথে কোন কথা বলাই বেকার।
ভোর শুরু হয়েছিল শেফালি গন্ধ, পদ্মরাগ আর আর “ জাগো দূর্গা”র নস্টালজিয়ায়। আর এখন দিন ভাদ্র গুমোটে অসহ্য হয়ে উঠল। ভ্রু কুঁচকে গেল সারাদিনের নামে। দূর, নিকুচি করেছে পূজার বাজার, আনন্দ ফুর্তি!
পরের দিন অফিস থেকে ফিরে সৌরভ বলল, গেছিলে বাজারে! ঝন্ ঝন্ করে উঠল চতুর্দিক।
—–কেন যাব বাজারে! কি আহ্লাদ আর আছে অবশিষ্ট! যেন নদীর বাঁধ কেউ হঠাৎ ভেঙে দিয়েছে। বলেই চলেছে ঝিনুক। সৌরভের নীরব উপেক্ষা ওকে আরও ক্ষিপ্ত করে তুলেছে। চিৎকার করে চলেছে।
— থামবে এবার! তবু থামল না ঝিনুক। সৌরভ দড়াম়্ করে দরজা বন্ধ করে দিল।
ষষ্ঠী পূজার ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে। সৌরভ অফিসের যাওয়ার জন্য খেতে খেতে বলল, আজ অফিসে একজন কাঁকড়া এনে দেবে। ভালোই হবে কাল সপ্তমী, ভাল করে কাঁকড়া কষা করো। তোমার হাতের কাঁকড়া —-।
—- আমাকে তুমি সেই রাঁধুনি ছাড়া কিছু ভাবতে পারোনা তাই না। সবাই এই কদিন রেস্টুরেন্ট খায় । এঁটো থালা তুলে বেসিনে ছুড়ে ফেলে দিল ঝিনুক।
রাতে হাতে করে সৌরভকে সেই কাঁকড়া নিয়ে ঢুকতে দেখে মাথা ফেটে যাবে মনে হচ্ছিল। সৌরভ ফ্রিজে ওগুলো রাখতে রাখতে বলল, রান্না করতে না পারলে ফেলে দিও।
সপ্তমীর অঞ্জলি দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল হাত জোড় করে। আজ ভীড় বেশি নেই। প্রচণ্ড আকুলিত ঝিনুক। হে মা, আমাদের দাম্পত্য —–। কি অপরাধ করেছি আমি। সবসময় অশান্তি। চোখে জল চলে এসেছিল । পুরোহিত হাতে ফুল দিচ্ছে। পেছনে এক বৃদ্ধা, ফুল নেওয়ার জন্য বাড়ানো হাতটায় ঝিনুকের কাঁধে ভর । ঝিনুক প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে বৃদ্ধার হাত ছিটকে ফেলল ঘাড় থেকে। আর তক্ষুণি অনুশোচনা, যেন চোখাচোখি হয়ে গেল মৃন্ময়ী মূর্তির । এক লহমায় মা বলে দিল অনেক কথার উত্তর ।
বাড়ি ফিরে ঝিনুক কাঁকড়া গুলো বের করে রান্না করল যত্নে। সঙ্গে আরও অনেক কিছু। মনটা বেশ হাল্কা মনে হচ্ছে আজ বহুদিন পর। খেতে খেতে সৌরভ বলল, রেডি হয়ে নাও শাড়ি কিনতে যাব আর হ্যাঁ রাতে বাইরে খাব আজ। ঝিনুক আনন্দে কাঁদতে শুরু করল। ও হুহু করে কাঁদছিল, সৌরভ ওকে শক্ত করে চেপে ধরেছে বুকে। মন্ডপ থেকে ভেসে আসছিল, “বাজল তোমার আলোর বেণু”।

14