১৬/০৯/১৮,কুলিক রোববারঃ

ফ্লাই ওভার

সাধন দাস

আমি একজন খুনি হতে চাই। ছাতা মাথায় একহাতে যখন সাইকেল চালিয়ে রেলগেটটুকু পার হই, ইচ্ছেটা চাগিয়ে ওঠে। চাপাচুপো দিয়ে ঠেসে রাখি।
কলেজ পাশ করে বেকার হয়ে গেছি, রেললাইনের উপর ফ্লাইওভার তৈরির কাজ চলছেই। হায়ার সেকেণ্ডারি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি, পথের দুধারে সারবাঁধা দোকান বুলডোজার এসে ভেঙে দিয়ে গেলো। গবাদার চায়ের খুপরিও ভেঙে দিলো। গবাদার বেঞ্চিতে আমাদের ঠেক। উদ্বাস্তু হয়ে গেলাম।

রেলগেটটা ভাঙা, বন্ধ হয় না। খানাখন্দে ভর্তি রেলক্রসিং পার হতে রোজই ছাতা ফসকে যায়। হাফ উড়তে উড়তে হাফ রেললাইনে গড়াগড়ি খায়। তখন হুইশেল শোনা যায়। ট্রেন আসছে। সাইকেল ফেলে তড়িঘড়ি ছাতার পিছনে ছুটি, ছুটতেই হয়।
রেল গেটের আগেই দোতলা বাড়িখানা। যার আলসেয় মেয়েটা রোদ্দুরে দিতো বেগুনে রঙের ফ্রক। গবাদার বেঞ্চে অপেক্ষায় থাকতাম। সেও বড়ো হয়ে গেছে। আজকাল আগুনে রঙের গাউন মেলতে রোজ আসেও না। তবু দেখতে যেই মাথা তুলি। অমনি ছাতা উড়ে যায়। সাইকেল পড়ে থাকে। ছাতার দিকে ছুটি । ট্রেন আমার দিকে। হুইসেল, গুমগুম শব্দ এগিয়ে আসে। তখন দোতলার আলসেই ওড়নায় চাপা মুখ, বিস্ফারিত চোখ হাঁ। আমারই শঙ্কায়, দুশ্চিন্তায় আশ্চর্য ব্যাকুল।

ফ্লাই ওভার তৈরি হলে গবাদার পুনর্বাসন হবে। বেঞ্চি পাতবে। বসবো। দোতলার আলসের চোখে ফুলঝুরি ফুটবে। রঙ ঝরবে। সেই স্বপ্নে ছাতার পিছনে ছোটা বাঁচিয়ে রাখি।
গবাদা বলে- দূর পাগলা, দোকান ঘর কোথায় পাবো তার ঠিক ঠিকানা আছে?

মায়েরা পাঁজি পড়ে জানেন, সূর্য কখন অস্ত যাবে, ক’টায় সন্ধ্যে হবে। তাঁদের শঙ্খধ্বনি শুনে রাত্রি নামে। শুরু হয়, বেঞ্চারদের দিস্তার পর দিস্তা চাকরির দরখাস্ত যুদ্ধ। কলম ঘোরাতে ঘোরাতে যদি ঘুমিয়ে পড়ি, মা জেগে থাকে। পৃথিবীর রাত শেষ হয়। বসে বসেই মা ঘুমিয়ে থাকে। যুদ্ধ শেষের শঙ্খ বাজায় না। আসলে যুদ্ধ শেষ হয় না। সন্ধ্যে হলে মা আবার শঙ্খ বাজায়। রাতের ঘাড়ে রাত নেমে আসে। যুদ্ধ বদলে যুদ্ধ চলতেই থাকে। ট্রেন ছুটে আসে। গুমগুম শব্দ। ছাতা ট্রেনের দিকে ছুটছে। আমি ট্রেনের দিকে। বেঞ্চিতে বসার যুদ্ধে আলসেই ঝুলে থাকে আমাদের একমাত্র আলো।

ভোট এসে গেছে। রেলিং তৈরি হয়নি। ফ্লাই ওভার শেষ হতে অনেক কাল বাকি। মুখ্যমন্ত্রী এসেছেন বাকিতেই উদ্বোধন করতে। ব্রিজের মাঝখানে বক্তৃতা চলছে। মঞ্চের সামনে পিছনে কাতারে কাতারে মানুষ। কবে তাঁরা ট্রেনলাইন ওভারক্রস করবেন। কবে গবাদারা দোকান পাবে, কোথায় বেঞ্চি পাতা হবে। ব্রিজের ধারে দাঁড়িয়ে আলসের দিকে তাকিয়ে শুনছি। গুমগুম, গুমগুম শব্দ। আলসে ফাঁকা। অন্ধকার।
গবাদাদের কথা, বেঞ্চির কথা মুখ্যমন্ত্রী কিছু বলছেন না। যতো বলছেন না, রাগ চড়ে যাচ্ছে। আমার খুনি হয়ে ওঠার ইচ্ছে চাগিয়ে উঠছে। ইচ্ছের শক্তি ক্রমাগত বাড়ছে। হঠাৎ ফ্লাইওভারটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লো।

11