২৬/০৮/১৮,ওয়েবডেস্কঃ বিগত কয়েক বছরের আন্তর্জাতিক স্তরের খেলাধুলার প্রতিযোগিতামূলক আসরগুলির দিকে নজর দিলে একটা জিনিস পরিষ্কার বোঝা যায় সেখানে ভারতীয় পুরুষদের থেকে মহিলাদের ফলাফল তুলনায় অনেক আশাপ্রদ। খুব সম্ভবত ২০১৮ এশিয়ান গেমসেও তার অন্যথা হবে না।

লক্ষ্য করার মতো বিষয় একশো মিটার দৌড়ে পুরুষ বিভাগে যেখানে কোনো প্রতিযোগি অংশগ্রহণই করার সুযোগ পায়নি, মহিলা বিভাগে সেখানে দ্যুতি চাঁদ পদকের অন্যতম দাবিদার। দ্যুতি শেষ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ব্রোঞ্জ মেডেলিস্ট এবং ঘটনাচক্রে ভুবনেশ্বরে অনুষ্ঠিত এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ওই রেসের চেয়ে অনেক ভালো করার ক্ষমতা দ্যুতির আছে।
সঙ্গে রয়েছেন আরও এক ভারতীয় সাম্প্রতিক কালের অন্যতম চর্চিত ভারতীয় আথলিট হিমা দাস। এই প্রতিবেদন লিখতে লিখতেই খবর এলো, রেকর্ড সৃষ্টি করে হিমার পদকপ্রাপ্তির। ১৪ বছরের জাতীয় রেকর্ড ভেঙে মাত্র ৫১ সেকেন্ডে ৪০০ মিটারের সোনার দৌড় সম্পূর্ণ করলেন অসমের ঢিঙ গ্রামের মেয়েটি। ৪×৪০০ মিটার মিক্সড ইভেন্ট ( পুরুষ সঙ্গী আনাস, রাজীব আর মহিলা সঙ্গী পূবামা) থেকেও হিমার হাত ধরে সোনার আশায় রয়েছে ভারত।

৪০০ মিটারে দেশের আশা নিয়ে শুধু হিমাই নয়, সঙ্গে থাকবে তেইশ বছরের নির্মলা শ্রন।

৪*৪০০ মিটার রিলে রেসে রয়েছে রায়গঞ্জের ঘরের মেয়ে সোনিয়া বৈশ্য। সোনিয়া কে নিয়ে চূড়ান্ত আশাবাদী রায়গঞ্জ তথা উত্তরবঙ্গ বাসী। ইতিমধ্যেই শহরের বিভিন্ন জায়গায় সোনিয়ার সাফল্য কামনা করে শুভেচ্ছা বার্তা লাগানো হয়েছে। ওর পরিবার সহ পুরো শহরের মানুষই উৎকণ্ঠিত চিত্তে চেয়ে আছেন জাকার্তার রানিং ট্র্যাক এর দিকে। এছাড়াও উত্তরবঙ্গের আরেক সোনার মেয়ে জলপাইগুড়ির স্বপ্না বর্মন। স্বপ্না এই এশিয়ান গেমসে হেপটাথলনে ভারতীয় দলের প্রতিনিধি। ৮০০ মিটার বিভাগে দৌড়বে টিঙ্কু লুক্কা।

ঊনত্রিশ বছরের টিঙ্কু শেষ এশিয়ান গেমসের ৮০০ মিটারের গোল্ড মেডেলিস্ট। অনেকে অবশ্য বলেন নিজের সেরা সময়টা টিঙ্কু ছেড়ে এসেছেন। যদিও তার কোচ পিটি ঊষা এখনও বিশ্বাস করেন টিঙ্কু দারুন কিছু করার ক্ষমতা রাখে সামনের দিনগুলোয়।

টিঙ্কু কি করবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও প্রশ্ন নেই পিইউ চিত্রার ১৫০০ মিটারের ভবিষ্যৎ নিয়ে। খুব বড় অঘটন না ঘটলে পদক নিয়েই দেশে ফিরবে ‘এক মাইলের রাণী’ চিত্রা। বর্তমান এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন চিত্রা মারাত্মক লড়াকু স্বভাবের মেয়ে। তাকে বিশ্ব অ্যাথলিট মিটে না পাঠানোয় জমি বিক্রি করে কোর্টে নাকানি চোবানি খাইয়েছেন ফেডারেশন কর্তাদের। আর ঠিক এই স্বভাবের জন্যেই চিত্রা এখন লং রেঞ্জের এশিয়ান কুইন।

অন্যদিকে ভেরি লং রেঞ্জে (৫ কিমি, ১০ কিমি) দুটো বিভাগেই সঞ্জীবনী যাদব আর সুর্যা অংশগ্রহণ করলেও কিরগিস্থানের ম্যাসলোভার দাপটে বিশেষ কিছু করার সুযোগ খুব কম। যদিও নিজের দিনে যে কোনো লং রেঞ্জ স্প্রিন্টার অঘটন করার সামর্থ্য রাখেন, তবুও এই বিভাগে সোনা জেতার সুযোগ ভারতের নিতান্তই কম।

তুলনায় ভারতের সামনে ভালো সুযোগ ৩০০০ মিটার স্টিপেলচেসে সোনা জেতার, যেখানে নামছে সুধা সিংয়ের মতো অভিজ্ঞ প্রতিযোগী। সুধার বয়স একটু বেশি হলেও বয়সের জন্যে পারফরমেন্স ডাউন হয়নি সেভাবে। তাই সুধার ফর্ম ভারতের কাছে অবশ্যই আশার আলো হয়ে দেখা দিতে পারে।

এগুলো ছাড়াও ভারতের দল থাকছে ৪০০ মিটার হার্ডলস আর ৪×৪০০ মিটার রিলেতে। হার্ডলস নিয়ে আশা বেশ কম আর রিলেতে কম্বিনেশন একেবারে নতুন। যদিও ভারত শেষ এশিয়ান গেমসের রিলেতে সোনা পেয়েছিল বলে আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। সেহেতু রিলেতে একটু হলেও আশা দেখতেই পারে দেশ।

অ্যাথলেটিক্সে পরে রইলো ফিল্ড ইভেন্ট। সেখানে ভারতের সবচেয়ে বড় বাজি অবশ্যই ডিসকাস থ্রোতে শেষ এশিয়ান গেমসের চ্যাম্পিয়ন সীমা পুনিয়া। সীমার অভিজ্ঞতার ঝুলিও মন্দ নয়। এশিয়ান গেমসে সোনা ছাড়াও পরপর চারটে কমনওয়েলথে পদক আছে সীমার নামে। সীমা ছাড়াও যাচ্ছে অন্নু রানী – জ্যাভলিন থ্রোতে আর নয়না জেমস – লং জাম্পে। দুজনেই এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ব্রোঞ্জ মেডেলিস্ট। নয়নার পার্সোনাল বেস্ট আহামরি কিছু না হলেও তারই সহযোদ্ধা নিনা ভারাকিলের পার্সোনাল বেস্ট এশিয়াডের গোল্ড মেডেল স্ট্যান্ডার্ডের। নিনা শেষ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের সিলভার মেডেলিস্ট। ঘটনাচক্রে ওই ইভেন্টের চ্যাম্পিয়ন ভিয়েতনামের থাও আর নিনা দুজনেই লাফিয়েছিল ৬.৫৪ মিটার করে। আবারও দুর্ভাগ্য দেশের। অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিচার করে নিনাকে দেওয়া হয় সিলভার আর থাওকে গোল্ড। তবে এভাবে নিনা, থাওকে টেক্কা দিতে পারলে সোনা জেতার সুবর্ণ সুযোগ থাকছে দেশের সামনে। কারণ বাকি লং জাম্পারদের মধ্যে নয়না ছাড়া আর কেউ প্রতিযোগিতার ধারেকাছে নেই।

এরা ছাড়াও চোখ রাখা দরকার পূর্ণিমা হেমব্রম আর স্বপ্না বর্মনের দিকে। হেপ্টাথলনের মতো কঠিন খেলায় অংশ নেবে ওরা। সাম্প্রতিক ফর্মের বিচারে স্বপ্না কিছুটা এগিয়ে থাকলেও দুজনেই দারুন কিছু করার সামর্থ্য রাখে এশিয়াডে।

সত্যি বলতে কি এশিয়াডের মতো বড় মঞ্চ বড্ড অনিশ্চয়তায় ভরা। এখানে সংশ্লিষ্ট দিনে নিজের সেরাটা দেওয়াই চ্যালেঞ্জ। আর খুব গুরুত্বপূর্ণ দেশের বাকি খেলোয়াড়দের পারফরমেন্স। বাকিরা ভালো করলেই একটা অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস চলে আসে প্রতিযোগীদের মধ্যে।

শেষ এশিয়াডে অ্যাথলেটিক্সে ভারতের মুখ রেখেছিল মেয়েরা। দুটো সোনা, একটা রুপো আর পাঁচটা ব্রোঞ্জ নিয়ে ফিরেছিল ওরা। এবারের নির্বাচন নিয়ে ভুরি ভুরি অভিযোগ থাকলেও যে দল যাচ্ছে তারা এর দ্বিগুণ, এমনকি তিনগুনও ভালো ফল করার ক্ষমতা রাখে।

মেয়েদের অভিযান শুরু হয়েছে কাল থেকে। লড়াই কঠিন, খুব কঠিন। তবে মাতঙ্গিনী-প্রীতিলতা-লক্ষীবাইয়ের দেশের মেয়ে ওরা, লড়াই ওদের রক্তে।

একশো তিরিশ কোটি আশার শেষ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেই ফিরবে ওরা – মিলিয়ে নেবেন।

কুলিক পরিবারের শুভেচ্ছা রইলো ওদের সকলের জন্য।

7