২৬/০৮/১৮,কুলিক রোববারঃ

শিস

সবুজ সেন

অনিন্দিতা সিঁড়ি দিয়ে উঠছে । প্রত্যেকটা সিঁড়ি অতিক্রম করার সাথে সাথেই তার বুকটাও ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে । আজ তার প্রথম দিন । সে ডেপুটেশানে এই স্কুলে চারমাস ভুগোল পড়াবে । স্কুলটা কো-এড ।

প্রথম দিন যে কোন নতুন শিক্ষক শিক্ষিকা কে ক্লাসঘরে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার একটা দস্তুর সব স্কুলেই রয়েছে । সে কাজটা সাধারনত প্রধান শিক্ষক বা অন্য কোন সহ শিক্ষক-শিক্ষিকারাই করে থাকেন । অনিন্দিতার বেলায় সে রকম কিছু ঘটল না । তাকে শুধু বলে দেওয়া হয়েছে , দোতলায় উঠে বাঁ দিকের দ্বিতীয় ঘরটা ।

সিঁড়ি ভাঙ্গা শেষ হল । অনিন্দিতা লম্বা টানা বারান্দাতে এসে দাঁড়ালো ।বারান্দাতে চারটে ছেলে দাঁড়িয়ে আছে । তাদের দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গীটা যথেষ্ট অস্বস্তিদায়ক ।

অনিন্দিতা ক্লাস এইট ‘ বি ‘ সেকশানে ঢুকল । বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলোও তার পেছন পেছন সে ঘরে ঢুকল । কোন অনুমতি তারা চাইল না ।

ক্লাসঘরের একদিকে ছেলেরা বসেছে , অন্যদিকে মেয়েরা । সেই ছেলেগুলো চারজন একসাথে মেয়েদের সারির এক্কেবারে পেছন দিকের বেঞ্চে গিয়ে বসল । সমস্ত ক্লাসঘর জুড়েই হাট-বাজারের মত সমবেত শব্দ তরঙ্গ গমগম করছে ।

কে যেন বলল , ম্যাডাম আপনার নাম কি ?
অনিন্দিতা তার নাম বলল । হট্টগোলের মধ্যে সে নাম কেউ শুনতে পেল না…কিন্তু ক্লাশঘরের শেষের দিক থেকে একটা তীক্ষ্ণ শিস শোনা গেল। সেই শিসের কম্পাঙ্কটা ভালো নয় ।খারাপ ইঙ্গিত বহনকারী ।

অনিন্দিতা উঠে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে বড় বড় করে নিজের নামটা লিখল । নামটা লেখার সময়েও সেই খারাপ ইঙ্গিত বহনকারী শিসটা আরও দুই-তিন বার শোনা গেল ।

অনিন্দিতা এবার হেঁটে হেঁটে পেছন বেঞ্চগুলোর দিকে এগিয়ে এলো । সেই চারজন ছেলে কে বলল , তোমরা বেরিয়ে এসো ।

ছেলেগুলো হাউমাউ করে বলে উঠল , কেন ? আমরা কি করেছি ?

অনিন্দিতা বলল , করোনি । এবার করবে । ওই বোর্ডে নিজেদের নাম লিখবে ।
ছেলেরদল বুঝে উঠতে পারছে না কি হতে চলেছে । গোটা ক্লাস জানে শিস তারাই দিয়েছে কিন্তু একজনেও সে কথা বলবে না । সে দম করো নেই ।

অনিন্দিতা দুটো চক কে ভেঙ্গে চারটে করল । চারজন কে সেগুলি ধরিয়ে দিয়ে বিরাট বড় কালো বোর্ডটার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল । সে নিজে গিয়ে বসল এক্কেবারে মেয়েদের সারির পেছনে । যেখানে ওরা বসেছিল । গোটা ক্লাসঘর এখন উত্তেজনায় থম থম করছে ।

” স্টার্ট…নাম লেখা শুরু করো তোমরা “…পেছন থেকে অনিন্দিতা বলল ।

ছেলেগুলো তাদের নামের প্রথম অক্ষরটা লেখা মাত্রই গোটা ক্লাসঘর কে স্তম্ভিত করে দিয়ে পেছন থেকে একটা তীক্ষ্ণ শিস ছুটে এল । ঠিক আগের মতই । তবে এর কম্পাঙ্কের ইঙ্গিত আগের গুলোর চাইতেও তীব্র । অনেক বেশি ভয়াবহ । এই শিস যেন দেওয়াল পর্যন্ত ফাটিয়ে দিতে পারে ।

সমস্ত ক্লাসটা এখন পেছন ঘুরে দেখছে । শুধু অনিন্দিতা বাঘিনীর মত ব্ল্যাক বোর্ডের দিকে স্থির চোখে নিস্পলক ।
আবার সে একটা শিস দিল । একটা ছেলের চক ভেঙ্গে পড়ে গেল । বাকি তিনজন কোন অজানা আতঙ্কে কাঁটা হয়ে গেছে । কিসের আতঙ্ক তা জানা নেই । তবুও একটা অসহ্য ভয় ।

অনিন্দিতা উঠে তাদের কাছে গেল ।
হাত থেকে চকের টুকরো গুলো নিয়ে বলল , আজ থেকে আর কক্ষনো মেয়েদের দিকে বসবে না । মেয়েরা যা পারে তোমরা তা পারো না । যাও , নিজের জায়গায় গিয়ে বসো ।

নতুন দিদিমনির এই ঘটনাটা টিচার্স কমনরুম পর্যন্ত পৌঁছুতে বিশেষ দেরি হল না । টিফিন টাইমে এটাই আলোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ালো । এই প্রসঙ্গটা নিয়ে শিক্ষক শিক্ষিকাদের পৃথক জটলাও তৈরি হয়ে গেল । সেই জটলার কোনটিতেই অনিন্দিতা কে নেওয়া হল না । প্রথম দিনেই একরকম একঘরে হয়ে পড়ল অনিন্দিতা ।

তবে আশ্চর্যের ব্যাপার এটাই যে , সেদিন স্কুল ছুটি হওয়া পর্যন্তও ক্লাস এইট ‘ বি ‘ সেকশানের ব্ল্যাকবোর্ড থেকে বড় বড় করে ‘ অনিন্দিতা ‘ লেখা এই নামটা কেউ মুছে দিতে সাহস করল না ।

16